মুসলিম বিশ্বমুখী পররাষ্ট্রনীতি ও জনশক্তি রপ্তানি
ড. খান শরীফুজ্জামান ও ফারিযা আক্তার প্রকাশ : যুগান্তর, ২০ অক্টোবর ২০২৫

প্রধান উপদেষ্টার সাম্প্রতিক চীন ও লন্ডন সফর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে সর্বোচ্চ গুরুত্বের দাবি রাখে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের চুক্তি ও সহযোগিতার পাশাপাশি টেকসই কূটনীতির জন্য প্রয়োজন জনগণের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের বিকাশ। চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক বিনিয়োগ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন যেমন আমাদের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য মাইলফলক হতে পারে, তেমনই লন্ডন সফরে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা ও সুশাসনের ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। এক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক বোঝাপড়া, বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের মিল যেমন মুসলিম বিশ্ব ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কোন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে, তেমনই এখন চীন ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে বহুমুখী সম্পর্কও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। পাশাপাশি, জনশক্তি রপ্তানি বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হওয়ায় নতুন বাজার সৃষ্টি ও বিদ্যমান বাজার সংরক্ষণকে পররাষ্ট্র সম্পর্কের কেন্দ্রীয় বিবেচনায় আনতে হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হয়ে উঠেছে প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স। আগস্ট ২০২৫-এ প্রবাসী বাংলাদেশিরা ২.৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮.৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ শ্রমিকরা প্রবাসে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন। মালয়েশিয়ায় একটি জাপানি কোম্পানির সাবকন্ট্রাক্টরের কাছ থেকে প্রায় ২৮০ জন বাংলাদেশি শ্রমিক বকেয়া বেতন দাবি করেছেন, যা তাদের আর্থিক নিরাপত্তাহীনতার চিত্র তুলে ধরে। এছাড়া বাহরাইনে একটি ভবনে আগুনে ১১ জন বাংলাদেশি শ্রমিকের মৃত্যু তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করছে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, শুধু রেমিট্যান্সের পরিমাণ বাড়ানো নয়, বরং প্রবাসী শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার, কর্মস্থলের নিরাপত্তা এবং মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করাও হওয়া উচিত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও কূটনৈতিক অগ্রাধিকার।
২০২৫ সালের জন্য নির্ভরযোগ্য প্রকাশিত তথ্য অনুসারে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মোট সংখ্যা ১৩ মিলিয়নের (১ কোটি ৩০ লাখ) কাছাকাছি, যা বাংলাদেশিদের বৈদেশিক রেমিট্যান্স ও আন্তর্জাতিক প্রভাব বেড়েছে। বাংলাদেশি অভিবাসীরা আজ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে আছেন প্রায় ১৭৬টি দেশে, যেখানে প্রধান গন্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব, কাতার ও ওমান, ইউরোপের ইতালি ও যুক্তরাজ্য এবং এশিয়ার সিঙ্গাপুর ও জাপান। সেপ্টেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত তাদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে আনুমানিক ৭৫ লাখ, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪.৩ শতাংশ। কেবল ২০২৪ সালেই প্রায় ১৩ লাখ মানুষ বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য গেছেন, যদিও এটি আগের বছরের তুলনায় কিছুটা কম। এ শ্রমশক্তিই বাংলাদেশের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রেখেছে। ২০২৩ সালে প্রবাসীরা রেমিট্যান্স হিসাবে পাঠিয়েছেন প্রায় ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বিশ্বে সপ্তম এবং দক্ষিণ এশিয়ায় তৃতীয় সর্বোচ্চ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩.৯ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের জিডিপির ৫.২১ শতাংশ। এটি প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সহায়তার চেয়ে বহুগুণ বেশি, যা প্রমাণ করে রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। তবে এ পরিসংখ্যানের আড়ালে লুকিয়ে আছে প্রবাসী শ্রমিকদের দুঃখগাথা। তাদের অনেকেই বিদেশে ঝুঁকিপূর্ণ কর্মপরিবেশ, অপ্রতুল স্বাস্থ্যসেবা, শোষণ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হচ্ছেন। তাই তাদের কেবল অর্থনৈতিক অবদান নয়, জীবনমান ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।
বাংলাদেশের মুসলিম বিশ্বমুখী পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান দিক হলো জনশক্তি রপ্তানি, যা দেশের অর্থনীতির জন্য রেমিট্যান্স আকারে এক বিশাল সহায়ক শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১৬৮টিরও বেশি দেশে বাংলাদেশি শ্রমিক কর্মরত আছেন। তবে সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো মুসলিম দেশগুলো এখনো প্রধান গন্তব্য। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, শুধু সৌদি আরবেই ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ১ লাখ ২০ হাজারেরও বেশি শ্রমিক গেছেন, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য। এদিকে রেমিট্যান্স প্রবাহও এ দেশগুলোয় ক্রমেই বাড়ছে।
সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের শ্রমবাজার সম্পর্ক নতুন এক দিগন্তে পৌঁছাতে চলেছে। ২০৩৪ সালের ফিফা বিশ্বকাপ, ২০২৭ সালের এএফসি এশিয়ান কাপ, ২০২৯ সালের এশিয়ান শীতকালীন গেমস এবং ২০৩০ সালের ওয়ার্ল্ড এক্সপো-এসব আয়োজনের জন্য সৌদি আরব ব্যাপক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যেখানে বাংলাদেশের শ্রমিকদের জন্য বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ঢাকায় সদ্য সাবেক সৌদি রাষ্ট্রদূত ঈসা আল-দুহাইলান জানিয়েছেন, প্রতিদিন গড়ে ৫ থেকে ৭ হাজার ভিসা প্রসেস করা হচ্ছে, যাতে দক্ষ ও অদক্ষ বাংলাদেশি শ্রমিকরা এ প্রকল্পে যুক্ত হতে পারেন।
এর আগে কাতারে অনুষ্ঠিত ২০২২ সালের ফিফা বিশ্বকাপে বাংলাদেশি শ্রমিকদের ইতিবাচক অবদানের দৃষ্টান্ত তুলে ধরে তিনি উল্লেখ করেন, এবার সৌদি আরবও সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশিদের বৃহৎ অবকাঠামোগত প্রকল্পে যুক্ত করতে চায়। আরব নিউজের তথ্যমতে, সৌদি আরব পাঁচটি শহরে ১৫টি স্টেডিয়াম নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে, পাশাপাশি হোটেল, পরিবহণ নেটওয়ার্ক এবং ক্রীড়া অবকাঠামোর জন্যও শ্রমিক প্রয়োজন হবে। নিঃসন্দেহে এ সুযোগ শুধু বাংলাদেশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থানেই নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে না, বরং বাংলাদেশ-সৌদি আরব সম্পর্ককেও আরও দৃঢ় করবে। প্রবাসী শ্রমিকরা আমাদের অর্থনীতির শক্তি, আর এ প্রকল্পগুলোয় তাদের অংশগ্রহণ দেখিয়ে দেবে যে, রেমিট্যান্সের পাশাপাশি মর্যাদাপূর্ণ শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান কতটা শক্তিশালী হচ্ছে।
বাংলাদেশ ও মধ্যপ্রাচ্যের সম্পর্ক হাজার বছরের ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। প্রাচীন যুগে আরব বণিকদের মাধ্যমে বঙ্গভূমিতে ইসলামের প্রসার ঘটে। সেই থেকে ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধে মিল থাকার কারণে বাংলাদেশের জনগণ ও মধ্যপ্রাচ্যের জনগণের মধ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদি আত্মিক সম্পর্ক বিদ্যমান। হজ ও ওমরাহর মতো ধর্মীয় যাত্রা, শিক্ষাবিনিময় এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এ সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ করেছে।
অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় আয়ের উৎস। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৬০ শতাংশ এসেছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও কুয়েত থেকে। কৃষিপণ্য, গার্মেন্ট, হ্যান্ডিক্রাফট এবং মৎস্য রপ্তানির ক্ষেত্রেও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো গুরুত্বপূর্ণ বাজার হিসাবে উঠে এসেছে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকেও বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। বিশেষত জ্বালানি, অবকাঠামো, বন্দর এবং নির্মাণ খাতে।
সামাজিক দিক থেকেও বাংলাদেশের অভিবাসীরা মধ্যপ্রাচ্যের সমাজে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছেন। তারা শুধু অর্থনৈতিক অবদান রাখছেন না, বরং দুই অঞ্চলের সংস্কৃতি ও সামাজিক মূল্যবোধকে একে অপরের কাছাকাছি আনছেন। ফলে বাংলাদেশ-মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্ক শুধু কূটনৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়, বরং জনগণ থেকে জনগণের স্তরেও এক অটুট বন্ধন তৈরি করছে।
২০২৫ সালের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি সংক্ষিপ্ত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র যুদ্ধ ও ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫; রিয়াদে স্বাক্ষরিত সৌদি-পাকিস্তান নিরাপত্তা চুক্তি পুরো মধ্যপ্রাচ্যের তথা মুসলিম বিশ্বের ভূরাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। পাশাপাশি চীন, ইরান ও তুরস্ক পাকিস্তানের মৈত্রী এবং মুসলিম বিশ্বে ইসরাইলের ফিলিস্তিনিদের গণহত্যার বিরুদ্ধে যে ঐক্য গড়ে উঠেছে, তা মাথায় রেখে মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য দেশ তথা বাংলাদেশকেও তাদের পররাষ্ট্র সম্পর্ক কৌশল নতুন করে নির্ধারণ করতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্য ঐতিহাসিকভাবে মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। ইসলামের জন্মভূমি হিসাবে মক্কা ও মদিনা অবস্থিত হওয়ায় এ অঞ্চলের সঙ্গে মুসলিম বিশ্বের আত্মিক বন্ধন গভীর। মুসলিম বিশ্বমুখী কূটনীতি গ্রহণ করলে শুধু ধর্মীয় ঐক্য নয়, বরং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুবিধাও অর্জন করা সম্ভব।
প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্য হলো বিশ্বের প্রধান জ্বালানি সরবরাহকারী অঞ্চল। মুসলিম বিশ্বমুখী সহযোগিতা জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক রাজনীতিতে মুসলিম দেশগুলো যদি ঐক্যবদ্ধ হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাদের কণ্ঠস্বর আরও শক্তিশালী হবে। তৃতীয়ত, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মাধ্যমে মুসলিম দেশগুলোর জনগণের মধ্যে বিশ্বাস ও সহমর্মিতা বাড়বে।
বাংলাদেশের জন্যও মুসলিম বিশ্বমুখী হওয়ার অর্থ হলো-প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নেওয়া, পাশাপাশি নতুন বাজার সৃষ্টি ও বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ সৃষ্টি করা। এর ফলে শুধু বাংলাদেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হবে না, বরং মুসলিম বিশ্বেও বাংলাদেশের অবস্থান মর্যাদাপূর্ণ হবে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, বাংলাদেশের বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে মুসলিম বিশ্বমুখী কূটনীতি একে অপরের পরিপূরক। চীন ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক যেমন জরুরি, তেমনই ঐতিহাসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা ও জোরদার করা বাংলাদেশের জন্য কৌশলগতভাবে অপরিহার্য।
ড. খান শরীফুজ্জামান : রিসার্চ ফেলো, নীতি গবেষণা কেন্দ্র, ঢাকা
ফারিযা আক্তার : রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, নীতি গবেষণা কেন্দ্র