মুক্ত বাণিজ্য জোট আরসেপে যোগ দিতে তৎপর বাংলাদেশ : নতুন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়েও চলছে আলোচনা

মুক্ত বাণিজ্য জোট আরসেপে যোগ দিতে তৎপর বাংলাদেশ : নতুন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়েও চলছে আলোচনা
সংবাদবাংলাদেশ

মুক্ত বাণিজ্য জোট আরসেপে যোগ দিতে তৎপর বাংলাদেশ : নতুন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়েও চলছে আলোচনা

১৪ আগস্ট, ২০২৬

[কালবেলা; ১৪ আগস্ট ২০২৬]

চীনের নেতৃত্বাধীন বিশ্বের অন্যতম বড় মুক্ত বাণিজ্য জোট রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপে (আরসেপ) যোগ দিতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে বাংলাদেশ। এই জোটের সদস্য পদের জন্য এরই মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রশ্নাবলির বিস্তারিত জবাব জমা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের কাঠামোকে আরসেপের উচ্চমানের বাণিজ্য শৃঙ্খলার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

 

 

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, বাংলাদেশের আরসেপে যোগ দেওয়ার বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত। এরই মধ্যে জোটভুক্ত সব দেশের সমর্থনের আশ্বাস পাওয়া গেছে। সর্বশেষ গতকাল সমর্থনের আশ্বাস দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া।

 

 

সংশ্লিষ্টদের মতে, আরসেপে যোগ দিলে বাংলাদেশ বিশ্বের বড় একটি বাণিজ্য ব্লকে ঢুকতে পারবে। এতে সদস্য দেশগুলোতে শুল্কমুক্ত রপ্তানির সুবিধা পাওয়া যাবে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তীকালে দেশের রপ্তানি বাড়াতে হলে নতুন বাজার দরকার। সে ক্ষেত্রে আরসেপ জোটে যুক্ত হতে পারলে রপ্তানিতে নতুন মাত্রা যোগ হবে এবং অনেক ক্ষেত্রেই সুবিধা বাড়বে।

 
 

আরসেপে যোগ দেওয়ার লক্ষ্যে আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর। ওই সময় এই জোটে বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করার অনুরোধ জানিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সম্মতিপত্র পাঠায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

জানা যায়, আরসেপে যোগ দিতে বাংলাদেশ ছাড়াও আবেদন করেছে শ্রীলঙ্কা, চিলি ও হংকং।

 

জানতে চাইলে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানরত বাণিজ্য সচিব আতাউর রহমান কালবেলাকে বলেন, কিছুদিন আগে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত ও অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এলে আরসেপে যোগ দিতে দেশ দুটির সমর্থন

 

চাওয়া হয়। উভয় দেশই সে সময় বাংলাদেশকে সমর্থনের আশ্বাস দেয়। অন্যদিকে, নিউজিল্যান্ডের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকে অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি আরসেপে যোগ দেওয়ার বিষয়ে সমর্থন চেয়েছি আমরা। তারা সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় আরসেপের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। সর্বশেষ গতকাল অস্ট্রেলিয়ার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকে আমরা তাদের সমর্থন চেয়েছি। তারাও আরসেপে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের সমর্থন দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।

 

 

আরসেপ কী: ২০২০ সালের নভেম্বরে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জোট আসিয়ানের সদস্য ১০টি দেশকে নিয়ে আরসেপ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে এই চুক্তি কার্যকর হয়। এই জোটের অর্থনৈতিক আয়তন বিশ্বের মোট জিডিপির ৩০ শতাংশ। এর ফলে এই চুক্তি বিশ্বের সবচেয়ে বড় অবাধ বাণিজ্য এলাকা তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মধ্যে যে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল রয়েছে, সেই অঞ্চল, এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নের চেয়েও এশিয়ার নতুন এই বাণিজ্য অঞ্চলের পরিধি বড়। আরসেপভুক্ত ১৫টি দেশের মোট জনসংখ্যা ২৩০ কোটি (বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ); বাজারের আকার ২৬ লাখ ৩০ হাজার কোটি ডলার। অনেকে আবার মনে করছেন, মুক্ত বাণিজ্যের এই চুক্তি এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের প্রভাব বিস্তারের পথে এক ধরনের অভ্যুত্থান।

 

 

এই চুক্তির ফলে আগামী ২০ বছরের মধ্যে জোটভুক্ত দেশগুলোকে একে একে অধিকাংশ আমদানিপণ্যের ওপর শুল্ক তুলে নিতে হবে। টেলিযোগাযোগ, মেধাস্বত্ব, ব্যাংক-বীমার মতো আর্থিক সেবা, ই-কমার্স ও পেশাদার সেবার মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোও এই চুক্তির আওতায় রয়েছে। চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘রুলস অব অরিজিন’ অর্থাৎ কোন দেশ থেকে পণ্য আসছে, তার নতুন সংজ্ঞা নির্ধারিত হয়েছে। সদস্য দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে অবাধ বাণিজ্য চুক্তি আছে; কিন্তু তাতে রুলস অব অরিজিন-সম্পর্কিত নানারকম বিধিনিষেধ রয়েছে। বাংলাদেশ চাইছে এই জোটের অন্তর্ভুক্ত হয়ে চুক্তি অনুসারে শুল্কমুক্ত সুবিধার ২০ বছরের সুবিধাটি পেতে।

 

 

সমর্থন আদায়ে তৎপরতা: বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় ও বহুমাত্রিক করার লক্ষ্যে ওয়েলিংটনে দেশটির পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের (এমএফএটি) সদর দপ্তরে সফররত প্রতিনিধিদলটির একটি নীতিনির্ধারণী বৈঠক হয়। বৈঠকে বাংলাদেশ আরসেপের সদস্যপদ লাভ, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির জন্য ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত অতিরিক্ত তিন বছর সময় এবং দুই দেশের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পাদনে নিউজিল্যান্ডের সক্রিয় সমর্থন চায়। বৈঠকে নিউজিল্যান্ডের পক্ষে নেতৃত্ব দেন দেশটির ট্রেড নেগোসিয়েশনস অ্যান্ড পলিসি ডিভিশনের ডিভিশনাল ম্যানেজার সারা মেম্যান্ড এবং ইউনিট ম্যানেজার জোনাস হোল্যান্ড।

 

 

বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আরসেপ সদস্যপদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশ্নাবলির বিস্তারিত জবাব এরই মধ্যে জমা দেওয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের কাঠামোকে আরসেপের উচ্চমানের বাণিজ্য শৃঙ্খলার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এসব সংস্কারের মধ্যে রয়েছে শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও উচ্চপ্রযুক্তির যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক কমানোর উদ্যোগ, টেলিযোগাযোগ, আর্থিক সেবা ও লজিস্টিকস খাতকে আরও উন্মুক্ত করতে ‘পজিটিভ লিস্ট’ থেকে ‘নেগেটিভ লিস্ট’ পদ্ধতিতে রূপান্তর এবং প্রতিযোগিতা, প্যাটেন্ট, কপিরাইট ও ডাটা সুরক্ষা বিষয়ে আধুনিক আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন।

 

 

আরসেপের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে নিউজিল্যান্ডের নীতিগত প্রভাবের বিষয়টি তুলে ধরে বাংলাদেশ দেশটির সক্রিয় সমর্থন কামনা করে। পাশাপাশি আরসেপের আওতায় সংবেদনশীল পণ্য ও শিল্প খাতের সুরক্ষায় আসিয়ানের এলডিসি সদস্যদের অনুরূপ ১৫ থেকে ২০ বছর মেয়াদি পর্যায়ক্রমিক শুল্ক নমনীয়তার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাবও উপস্থাপন করা হয়।

 

 

বৈঠকে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজনীয়তাও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশ ২০২৬ সালের নির্ধারিত সময়সীমার পরিবর্তে ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত উত্তরণকাল বাড়ানোর যে আবেদন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের কাছে করেছে, তার পক্ষে বিভিন্ন বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা তুলে ধরে নিউজিল্যান্ডের সমর্থন চাওয়া হয়। এর পাশাপাশি ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের চলমান আর্থসামাজিক রূপান্তর, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীলকরণ এবং প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়।

 

 

বাংলাদেশ ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পাদনের বিষয়টিও বৈঠকে বিশেষ গুরুত্ব পায়। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ১৪তম মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনের (এমসি-১৪) প্রাক্কালে দুই দেশের বাণিজ্যমন্ত্রীদের মধ্যে অনুষ্ঠিত আলোচনার ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ সরকার এফটিএ আলোচনার আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা বৈঠকে তুলে ধরে।

 

 

প্রস্তাবিত এফটিএ বাস্তবায়িত হলে নিউজিল্যান্ডের জন্য বাংলাদেশের প্রায় ১৭ কোটি মানুষের বিশাল ভোক্তা বাজারে দুগ্ধজাত পণ্য, কৃষি যন্ত্রপাতি ও ধাতব পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে। অন্যদিকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে এলডিসি-উত্তর সময়ে নিউজিল্যান্ডের বাজারে আরও স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে নিউজিল্যান্ড বাংলাদেশকে আরসেপ ও এলডিসি ইস্যুতে সমর্থন দেবে বলে জানায়।

 

 

যুগ্ম সচিব ফিরোজ উদ্দিন আহমেদ কালবেলাকে বলেন, আরসেপে যোগ দিতে আমাদের যা যা করার দরকার, সবই করা হয়েছে। চীনের সমর্থন আগে ছিল, এখন অস্ট্রেলিয়ারও সমর্থনের আশ্বাস দিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে জোটের সব দেশের সমর্থনের আশ্বাস পাওয়া গেছে। আগামী সেপ্টেম্বরে আরসেপের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে রয়েছে। সেখানে তারা আমাদের আবেদন পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে। এ ক্ষেত্রে সবার সমর্থন নিয়ে আমরা অনেক এগিয়ে রয়েছি। এ ছাড়া নিউজিল্যান্ড আগামী ৭ নভেম্বর তাদের জাতীয় নির্বাচনের পর এফটিএ নিয়ে নেগোসিয়েশন শুরু করতেও আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

ট্যাগ:BCSসংবাদবাংলাদেশ