মোদির চীন সফর: এশিয়ার নতুন ভবিষ্যৎ
ওয়াং হুয়াইও [সূত্র : সমকাল, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ]

সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফর বিশ্বের নজরে রয়েছে। এই সফর দুই প্রাচীন সভ্যতার মধ্যে নতুন যুগের এক ঐতিহাসিক সূচনার সুযোগ নিয়ে এসেছে, যেখানে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৫ শতাংশের বাস এবং দেশ দুটি বিশ্বের দ্বিতীয় ও সম্ভাব্য তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। সম্মেলনের প্রথম দিনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছেন, চীন ও ভারত পরস্পর সহযোগী; শত্রু নয়।
এই বছর চীনের সঙ্গে ভারতের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্কের ৭৫ বছর পূর্তি হচ্ছে। ১৯৫৯ সালে ভারত প্রথম অসমাজতান্ত্রিক দেশ হিসেবে চীনকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। সেই সম্পর্ক ধরে রাখার গুরুত্ব এখনকার মতো সম্ভবত আগে দেখা যায়নি। উভয় দেশই জনগণের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রায় একই ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। পৃথিবীর সর্বাধিক তারুণ্যের দেশ ভারতের অর্থনীতি দ্রুত বর্ধনশীল। সেখানকার ভোক্তাশ্রেণিকে কেন্দ্র করে অভিনব আবিষ্কারও বাড়ছে। চীনের গণনীতির মধ্য দিয়ে দেশটি অবকাঠামো, ম্যানুফ্যাকচার, ডিজিটাল গভর্ন্যান্স ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে প্রবৃদ্ধি ঘটাচ্ছে। উভয় দেশ একসঙ্গে কাজ করলে বিশাল সম্ভাবনার সৃষ্টি হবে।
চীন ও ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বৈশ্বিক সুশাসনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। উভয় দেশই ব্রিকস, গ্রুপ ২০ ও এসসিওর কেন্দ্রীয় সদস্য। এসব সংস্থায় তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের মাধ্যমে এমন সংস্কারের কথা বলতে পারে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ক্ষমতাবান করতে এবং বৈশ্বিক বাজার ও প্রতিষ্ঠানকে অস্থিতিশীল করার পদক্ষেপ রুখতে পারে।
বিশ্বে যখন ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়ছে, তখন এ ধরনের সহযোগিতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। অনিশ্চয়তাপূর্ণ যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশনীতি যার উদাহরণ। জ্বালানি খরচের বৈশ্বিক দাম এড়াতে ওয়াশিংটন এক সময় ভারতের নির্ধারিত মূল্যে রাশিয়ান তেল ক্রয়কে উৎসাহিত করেছিল। আর এখন সেগুলো ক্রয়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কের মুখে পড়েছে ভারত। ভালো বিষয় যে, চীন ও ভারতের ওপরই শুধু সেই শুল্ক আরোপ হয়নি, অন্যান্য দেশের ওপরও তা আরোপ করা হয়েছে এবং এশিয়া ক্রয়ক্ষমতা সমতার দিক থেকে বিশ্ব অর্থনীতির দুই-পঞ্চমাংশের প্রতিনিধিত্ব করছে।
ভারত যদি রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপে (আরসিইপি) যোগ হয়, তবে এটি কার্যকরভাবেই বৃহত্তর অর্থনৈতিক জোটের পক্ষে কাজ করবে এবং এতে আঞ্চলিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন মানুষের কল্পনার চেয়েও দ্রুত হবে। চীনের সমর্থনে ভারত তার দেওয়া শর্তসাপেক্ষেই এই পদক্ষেপ নিতে পারে। বিশ্বব্যবস্থায় অস্থিরতা এবং বিশ্ববাণিজ্য সংকট ভারতের সদস্যপদের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
১৯৫৫ সালের বান্দুং সম্মেলন আজকের প্রেক্ষাপটে আরও জোরালোভাবে সামনে আসছে। ইন্দোনেশিয়ার বান্দুংয়ে তখন এশিয়া ও আফ্রিকার নেতারা একত্রিত হয়েছিলেন। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, জোটনিরপেক্ষতা এবং শান্তিপূর্ণ উন্নয়নের ভিত্তিতে সহযোগিতার স্বপ্ন তারা দেখেছিলেন। সেই সম্মেলন থেকেই জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। বান্দুং সম্মেলনের সেই চেতনা পুনরুজ্জীবিত করার জন্য যেমন পারস্পরিক লক্ষ্য থাকবে, তেমনি বর্তমান চ্যালেঞ্জও মোকাবিলার বিষয় সামনে রাখতে হবে। দুর্ভাগ্যবশত, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন-ভারত সীমান্ত বিরোধ সংকট তৈরি করেছে। ষাট দশকের পর গালওয়ান উপত্যকায় অর্ধশতাব্দী এমন উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়নি, যা হয়েছে ২০২০ সালে। প্রশ্ন হলো, ভারত ও চীনের নতুন সীমান্ত চুক্তি কি হিমালয়ে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি আনবে? পারস্পরিক সহনশীল অবস্থানই এ ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত। উভয় পক্ষ যদি অংশীদারিত্বের অঙ্গীকার করে, সেটি হবে বান্দুং সম্মেলনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন। ভারত ও চীন এই ব্যাপারে সম্মত হয়েছে– তাদের মতদ্বৈধতা সংঘাতে রূপ নেবে না। ৫০ বছর ধরে যদি তারা শান্তি বজায় রাখতে পারে, এর পরও তা সম্ভব।
নরেন্দ্র মোদির এই সফর উভয় পক্ষের জন্য একটি যৌথ ইশতেহার কিংবা সহযোগিতার রোডম্যাপ তৈরির সুবর্ণ সুযোগ এনে দিয়েছে, যা আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতার বাস্তব ক্ষেত্র চিহ্নিত করতে পারে। পর্যটন, একাডেমিক প্রোগ্রাম, বিনিয়োগ চুক্তি, অবকাঠামো উন্নয়ন, সবুজায়নে রূপান্তর, পরিবেশ সুরক্ষা ও ডিজিটাল স্পেস এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো ক্ষেত্রে অগ্রগতির অনেক জায়গা রয়েছে। মোদি ও শি জিনপিংয়ের এ বছর আবার দেখা হলে বিষয়গুলোতে অগ্রগতি হতে পারে। চীন ও ভারত শুধু প্রাচীন জ্ঞানের উত্তরাধিকারীই নয়; ভবিষ্যতের সম্ভাবনারও রক্ষক। ড্রাগন ও হাতি একসঙ্গে কাজ করলে উভয় দেশ এশিয়া ও বিশ্বের সমৃদ্ধিতে ভূমিকা পালন করবে।
ওয়াং হুয়াইও: সেন্টার ফর চায়না অ্যান্ড গ্লোবালাইজেশনের প্রতিষ্ঠাতা; সাউথ চায়না
মর্নিং পোস্ট থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর
মাহফুজুর রহমান মানিক