কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে জর্দানের পাশ্চাত্যমুখী নীতি

ড. মো. মোরশেদুল আলম [প্রকাশিত: জনকণ্ঠ, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫]

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে জর্দানের পাশ্চাত্যমুখী নীতি

জর্দানের উত্তরে সিরিয়া, পূর্বে ইরাক, দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণে সৌদি আরব এবং পশ্চিমে ইসরাইল এবং জর্দান নদীর পশ্চিম তীরের অবস্থান; এই রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অবস্থিত জর্দান কার্যত একটি ‘বাফার জোন’। আকারে ছোট হলেও দেশটির ভূরাজনৈতিক ও ভূকৌশলগত অবস্থান ও গুরুত্ব এতটাই প্রবল যে, কোনো রাষ্ট্রই সরাসরি জর্দানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতে চায় না। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এগুলো হলো স্থিতিশীলতা, পশ্চিমা মিত্রতা, ইসরাইলের সঙ্গে শান্তিচুক্তি এবং আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষার ভূমিকা। জর্দানকে আক্রমণ করা মানেই মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার স্তম্ভ ভেঙে ফেলা। যে কোনো আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে জর্দানের ভারসাম্য বিনষ্ট হলে তা একটি ডোমিনো প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে।

 

 

১৯৪৮ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত পশ্চিম তীর জর্দান শাসন করলেও ১৯৬৭ সালে ইসরাইল অঞ্চলটি দখলে নেয়। প্রথম বিশ^যুদ্ধের পর জর্দান রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও ১৯৪৬ সালে দেশটি যুক্তরাজ্য থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৫৩ সালে বাদশাহ হোসেন ইরনে তালাল ক্ষমতাসীন হয়ে পাশ্চাত্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখার নীতি গ্রহণ করেন। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে চাপে থেকেও তিনি তা বজায় রেখে চলেন। জর্দান একটি উন্নয়নশীল দেশ হলেও মূলত বাইরের সাহায্যের ওপর দেশটি অধিক নির্ভরশীল। প্রথমদিকে যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক সাহায্যের ওপর রাষ্ট্রটি নির্ভরশীল ছিল। পরবর্তী সময়ে অর্থাৎ ১৯৬৪ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিকট থেকে সহযোগিতা পেয়ে আসছে। ১৯৬৭ সালে সংঘটিত আরব-ইসরাইল যুদ্ধের পর থেকে পাশ্চাত্যের অন্যান্য দেশসহ সৌদি আরব, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত জর্দানকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা দিয়ে আসছে। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় (১৯৮০-১৯৯০) জর্দানের বন্দর আকাবা ইরাকের জন্য সুবিধাজনক হওয়ায় এই সুযোগটি জর্দান গ্রহণ করে। আবার ইরাক কর্তৃক কুয়েত দখলের কারণে জাতিসংঘের প্রস্তাবে জর্দান ইরাকের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে। এতে করে জর্দানের অর্থনীতিতে বিপর্যয় নেমে এসেছিল। তিউনিসিয়ায় আরম্ভ হওয়া রাজনৈতিক আন্দোলন তথা আরব বসন্ত জর্দানেও প্রভাব বিস্তার করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২০১১ সালের ১৪ জানুয়ারি জর্দানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তেজনাকর হয়ে ওঠে। যদিও পরবর্তী সময়ে বিক্ষোভের তীব্রতা হ্রাস পায়।

 

 

জর্দানের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ ফিলিস্তিনি। ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর ফিলিস্তিনিরা ভূমিহীন হয়ে পড়লে জর্দানে গিয়ে আশ্রয় নেয়। ইসরাইলের সঙ্গে জর্দানের সম্পর্ক ভালো হয়ে আসার কারণে ১৯৭০ সালে জর্দান এসব ফিলিস্তিনিকে উৎখাতের প্রচেষ্টা চালায়। জর্দানের বাদশাহ হুসেইন বিন তালাল ওই সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সহযোগিতায় ১৫ হাজার ফিলিস্তিনকে হত্যা করে। জর্দানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্সের কয়েকটি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। সেখান থেকেই ইসরাইলকে সহায়তা করে থাকে রাষ্ট্রগুলো। একই সঙ্গে সিরিয়া, ইরাক, লেবানন ও ইরানে আড়িপাতার কাজ করে থাকে। ১৯৪৮ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত ইসরাইলের সঙ্গে জর্দানের ৪টি যুদ্ধ হয়। অবশেষে ১৯৯৪ সালে এক শান্তি চুক্তি হওয়ার পর থেকে রাষ্ট্র দুটির মধ্যে আর কোনো সংঘর্ষ হয়নি। দেশ দুটির মধ্যে কয়েকটি নিরাপত্তা চুক্তিও হয়েছে।

 

 

ইরান-ইসরাইলের মধ্যকার সাম্প্রতিক যুদ্ধে বেশির ভাগ আরব রাষ্ট্র যেখানে ইরানের পক্ষ নেয়, সেখানে জর্দান ইসরাইলের পক্ষ নেয়। মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিশালী দুটি রাষ্ট্র ইরান ও ইসরাইলের মধ্যকার এ সংঘাতকে কেন্দ্র করে জর্দান মহাবিপদে রয়েছে। রাষ্ট্র দুটির শত্রুতার জেরে আঞ্চলিক সংঘাত বৃদ্ধি পেলে জর্দানের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থার ওপর মারাত্মক আঘাত আসতে পারে। ইসরাইলের হামলার প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য ইরানের পাল্টা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় জর্দানের আকাশপথ দিয়ে যাওয়ার সময় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হয়। জর্দান সরকার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, আত্মরক্ষার জন্য তারা এমন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আর জর্দানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ইরানি হোক আর ইসরাইল, জর্দানের আকাশসীমায় প্রবেশ করা যে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন প্রতিহত করা হবে। এর ফলে জর্দানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়। জর্দানের এমন পদক্ষেপের কারণে ইরান জর্দানের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জর্দান যদি ইসরাইলের সঙ্গে হাত মেলায় তাহলে ইরানের পরবর্তী লক্ষ্য হবে জর্দান। জর্দানের এমন পদক্ষেপের কারণে সরকারবিরোধীরা নিন্দা জ্ঞাপন করেছে। তারা দাবি করেছে, ইসরাইলি যুদ্ধবিমান এর আগেও জর্দানের আকাশসীমায় প্রবেশ করেছে। বিশেষ করে সিরিয়ায় অভিযান পরিচালনার সময়। কিন্তু জর্দান কোনো বাধা প্রদান করেনি।

 

 

 

 

জর্দান দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক কূটনীতি ও নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। সিরিয়ার পুনর্গঠনে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি জানিয়েছে রাষ্ট্রটি। এই সম্পর্কের শক্তিশালীকরণ শুধু সিরিয়ার পুনর্গঠনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং নিরাপত্তা সহযোগিতার জন্যও আবশ্যক। জর্দানের বাদশাহ আবদুল্লাহ সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। সিরিয়ার প্রতি জর্দানের এমন সমর্থন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি জর্দানের বৃহত্তর কৌশলকে তুলে ধরে; যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সহায়ক হতে পারে। সিরিয়ার স্থায়ী স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তা প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে জর্দান ও তুরস্ক উভয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই সিরিয়ায় নতুন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্রটিকে পুনর্গঠনের জন্য তুরস্ক ও জর্দান একটি রোডম্যাপে সম্মত হয়েছে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেন, আমরা সিরীয় ভাইদের সাহায্য করার জন্য একটি রোডম্যাপের মাধ্যমে একসঙ্গে কাজ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। তুরস্ক ও জর্দান কর্তৃপক্ষ সিরিয়ার উন্নয়নে পরিবহন, জ্বালানি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং কৃষিসহ যৌথ প্রচেষ্টার সমন্বয় করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেছেন, তুরস্ক ও জর্দানের তৈরি প্ল্যাটফর্মটি অন্যান্য প্রতিবেশী রাষ্ট্র তথা ইরাক এবং লেবাননের জন্য উন্মুক্ত।

 

 

এতে সব আঞ্চলিক স্টেকহোল্ডাররা আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং স্থিতিশীলতা জোরদার করার জন্য সম্মিলিতভাব কাজ করতে পারবে। আর জর্দানের শীর্ষ কূটনীতিক সাফাদি বলেছেন, সিরিয়ার স্থিতিশীলতা জর্দান এবং তুরস্কের স্থিতিশীলতা। সিরীয় জনগণের স্বাধীনতা এবং নতুন প্রশাসনের প্রতি পূর্ণ সমর্থন রয়েছে বলে তিনি অভিহিত করেন। সিরিয়ার প্রায় ১৩ লাখ শরণার্থীকে জর্দান আশ্রয় দিয়েছে। জর্দান এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সিরিয়া সংকটের পরিণতি মোকাবিলা করেছে। জর্দানের সঙ্গে সিরিয়ার প্রায় ৩৭৫ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। এদিকে ইসরাইল ও সিরিয়ার মধ্যে চলমান উত্তেজনা কমাতে সংযুক্ত আরব আমিরাত আলোচনা চালাচ্ছে। ইসরাইল মাসের পর মাস সিরিয়ায় হামলা চালাচ্ছে এবং সিরিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি অংশ দখল করে রেখেছে। এদিকে জর্দানের বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যেন সিরিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারাকে হত্যা না করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেট সদস্য জিন শাহিনের একটি বক্তব্য থেকে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি বলেছিলেন, বাদশাহ আবদুল্লাহ আমাদের বলেছিলেন, এ ধরনের নেতৃত্বের পরিবর্তন সিরিয়ায় পুরোদমে গৃহযুদ্ধ বাধাতে পারে। আর তা এই মুহূর্তে দেশটিকে এগিয়ে নেওয়ার যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, তা ব্যাহত হবে।

 

 

 


এদিকে ইসরাইলের পার্লামেন্ট নেসেট গত ২৩ জুলাই জর্দান উপত্যকাসহ অধিকৃত পুরো পশ্চিম তীর ইসরাইলের সঙ্গে সংযুক্ত করার জন্য একটি প্রস্তাব পাস করেছে। জর্দান উপত্যকা ইসরাইলের অধিকৃত পশ্চিম তীরের পূর্ব অংশে অবস্থিত। এটি জর্দান নদীর পশ্চিম তীরে প্রসারিত একটি উর্বর ও কৌশলগত অঞ্চল। প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত এই অঞ্চলটি ভূরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ। ইসরাইল সরকারের প্রতি নেসেট আহ্বান জানিয়েছে, পশ্চিম তীর ও জর্দান উপত্যকায় অবস্থিত সব ইহুদি বসতিতে ইসরাইলের সার্বভৌমত্ব; তথা ইসরাইলের আইন, বিচার ও প্রশাসন সম্প্রসারিত করতে হবে। যাতে করে ইসরাইল রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় এবং ইহুদি জনগণের মাতৃভূমিতে শান্তি ও নিরাপত্তার মৌলিক অধিকার কোনোভাবেই ক্ষুণ্ণ না হয়। মধ্যপ্রাচ্যে বড় পরিসরে যুদ্ধ বাধলে জর্দানও এর শিকার হবে বলে টেম্পল বিশ^বিদ্যালয়ের সেন ইয়োম মনে করেন। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন, যুদ্ধ বাধলে দেশটির অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। এছাড়া পর্যটন খাতে আয় কমে গিয়ে অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিতে পারে। জর্দানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির কারণে দেশটির রাজতন্ত্রও চাপে রয়েছে। কোনো কোনো বিশ্লেষক মনে করেন, জর্দান প্রকৃতপক্ষে একটি ‘চিকন সুতার’ ওপর দিয়ে হাঁটছে। কারণ একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে তাদের কৌশলগত সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হচ্ছে। আবার ফিলিস্তিেিনর প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখতে হচ্ছে। কারণ জর্দানের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই ফিলিস্তিনি শরণার্থী।

 

 


লেখক : অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়