কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতে বাংলাদেশের ত্রিমুখী অর্থনৈতিক ধাক্কা

মোহাম্মদ কবির হাসান [প্রকাশ: বণিক বার্তা, ২৮ মার্চ ২০২৬]

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতে বাংলাদেশের ত্রিমুখী অর্থনৈতিক ধাক্কা

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মাধ্যমে যে সংঘাতের সূচনা হয়েছে, তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

 
 

এর অভিঘাত এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়ছে। আমদানি, রেমিট্যান্স ও রফতানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এমন ধাক্কা কতটা বিপজ্জনক হতে পারে, উন্নয়ন অর্থনীতিবিদরা বহুদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন। বাংলাদেশ এ তিনটিরই একটি ক্ল্যাসিক উদাহরণ।

এ সংকটের প্রভাব কোনো পূর্বাভাস নয়। এটি এরই মধ্যে দৃশ্যমান। জ্বালানি সরবরাহ, বাণিজ্য ও রেমিট্যান্স—এ তিন প্রধান চ্যানেলের মাধ্যমে এর অভিঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আঘাত করছে।

 
 

বাংলাদেশ নিজে এ ঝুঁকি তৈরি করেনি। দীর্ঘদিনের কাঠামোগত নির্ভরশীলতা—একটি নির্দিষ্ট জ্বালানি রুট, একটি প্রধান রফতানি খাত এবং একটি নির্দিষ্ট শ্রমবাজার অঞ্চলের ওপর—এ দুর্বলতা তৈরি করেছে। ইরান যুদ্ধ এ দুর্বলতাকে সৃষ্টি করেনি, বরং একে অনিবার্য বাস্তবতায় রূপ দিয়েছে।

 
 

জ্বালানি খাত: প্রথম আঘাত এখানেই

 

বাংলাদেশ তার মোট জ্বালানির প্রায় ৯৫ শতাংশ আমদানি করে, যার মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ আসে হরমুজ প্রণালি হয়ে। ২১ মাইল প্রশস্ত এ জলপথ এখন কার্যত অচল। এটি কোনো দূরবর্তী ভৌগোলিক সংকট নয়; এটি বাংলাদেশের শিল্প অর্থনীতির প্রাণরসের পথ।

 

এর প্রভাব তাৎক্ষণিক। এলএনজির দাম প্রায় তিন গুণ বেড়ে প্রতি এমএমবিটিইউ ১০-১২ ডলার থেকে ২১-২৮ ডলারে পৌঁছেছে। ডিজেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলার থেকে ১০০ ডলারের বেশি হয়েছে। বাংলাদেশ যেখানে বছরে প্রায় ১০-১১ বিলিয়ন ডলার জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় করে, সেখানে এ দাম দীর্ঘস্থায়ী হলে তা বেড়ে ১৭-১৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছতে পারে—অর্থাৎ অতিরিক্ত ৬-৭ বিলিয়ন ডলারের চাপ।

 

 

এ বাড়তি খরচ শুধু জ্বালানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন, শিল্প উৎপাদন হয়ে তা শেষ পর্যন্ত খাদ্য, ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে প্রতিফলিত হয়। সরকার তখন এক কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে পড়ে—ভর্তুকি বাড়িয়ে আর্থিক চাপ বাড়াবে, নাকি মূল্য বৃদ্ধি করে মুদ্রাস্ফীতি ত্বরান্বিত করবে।

 

 

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা পুনরুদ্ধার হয়ে ৩০ বিলিয়ন ডলারের ওপরে উঠেছিল, কিন্তু এ সংকট সে স্থিতিশীলতাকে আবারো হুমকির মুখে ফেলছে। সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শুধু জ্বালানি খাতের ধাক্কায় জিডিপি ১ দশমিক ২ শতাংশ কমতে পারে।

 

 

সরকার এরই মধ্যে জরুরি পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে—জ্বালানির ব্যবহার সীমিত করা, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখা, তেল ডিপোতে সেনা মোতায়েন, এমনকি বিকল্প উৎস থেকে ডিজেল আমদানির চেষ্টা। এটি একটি সংকট মোকাবেলার প্রতিফলন—স্থিতিশীল অর্থনীতির নয়।

 

 

বাণিজ্য খাত: রফতানি খাতের ওপর চাপ

 

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত মোট রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি জোগান দেয় এবং প্রায় ৪০ লাখ কর্মসংস্থান দেয়—যাদের বেশির ভাগই নারী। এ খাত নির্ভর করে সময়মতো ডেলিভারি, নির্ভরযোগ্য পরিবহন ও কম মুনাফার ওপর।

 

 

ইরান যুদ্ধ এ তিনটিকেই আঘাত করছে। সংঘাত শুরুর কয়েক দিনের মধ্যেই ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ছয়টি এয়ারলাইনস কার্গো ফ্লাইট স্থগিত করে। ফলে প্রায় ১ হাজার ২০০ টন পোশাক রফতানি আটকে পড়ে।

 

 

সমুদ্রপথেও সমস্যা তীব্র। জাহাজগুলো এখন কেপ অব গুড হোপ হয়ে ঘুরে যাচ্ছে, ফলে সময় ও খরচ বাড়ছে। বীমা প্রিমিয়াম ও জ্বালানি খরচও বেড়েছে। অনেক শিপিং লাইন ভারতীয় উপমহাদেশ ও উপসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে পরিবহন বন্ধ করে দিয়েছে।

 

 

ফলে কাঁচামাল আমদানি ব্যাহত হচ্ছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে সবজি রফতানিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

 

 

সানেমের হিসাব অনুযায়ী, পরিবহন খরচ ২৫ শতাংশ বাড়লে এবং রফতানি চাহিদা ৫ শতাংশ কমলে জিডিপি আরো ১ দশমিক ৪ শতাংশ কমে যেতে পারে। যেসব কারখানার লাভের হার মাত্র ৩-৫ শতাংশ, তাদের জন্য এটি অস্তিত্বের প্রশ্ন।

 

 

রেমিট্যান্স: সবচেয়ে মানবিক ক্ষতি

বাংলাদেশের ৮ মিলিয়নের বেশি শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত, যারা প্রতি মাসে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠান। মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৪৫ শতাংশই আসে এ অঞ্চল থেকে।

 

 

এ অর্থ শুধু অর্থনীতির সংখ্যা নয়—এটি লাখো পরিবারের জীবনযাত্রার ভিত্তি।

 

 

কিন্তু যুদ্ধের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলের শ্রমবাজারে চাপ তৈরি হচ্ছে। ব্যাপক হারে শ্রমিক ফেরত আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এতে গ্রামীণ অর্থনীতি ও পরিবারের আয়ে বড় ধাক্কা লাগতে পারে।

 

 

যদি মাসিক রেমিট্যান্স ৩ বিলিয়ন থেকে ২ দশমিক ৫ বিলিয়নে নেমে আসে, তাহলে বছরে ৫-৬ বিলিয়ন ডলার ঘাটতি তৈরি হবে।

 

 

সমন্বিত বিশ্লেষণে দেখা যায়—জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি, বাণিজ্য ব্যাঘাত ও রেমিট্যান্স কমে গেলে দুই বছরের মধ্যে জিডিপি প্রায় ৩ শতাংশ কমে যেতে পারে। বাস্তব আয় কমবে, দারিদ্র্য বাড়বে এবং অর্জিত উন্নয়ন পিছিয়ে যেতে পারে।

 

 

এখন কী করা উচিত

প্রথমত, জ্বালানি সরবরাহে বৈচিত্র্য আনতে হবে। ভারত ও চীনের সঙ্গে জরুরি সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রকল্প দ্রুত অনুমোদন করতে হবে।

 

 

দ্বিতীয়ত, রফতানি খাতে বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। ক্রেতাদের সঙ্গে সময়সীমা নিয়ে সমঝোতা করতে হবে এবং প্রয়োজন হলে অস্থায়ী ভর্তুকি দেয়া যেতে পারে।

 

 

তৃতীয়ত, রেমিট্যান্স প্রবাহ পর্যবেক্ষণ ও প্রবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে শ্রমবাজার বৈচিত্র্য—পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপে জোরদার করতে হবে।

 

 

যে বাস্তবতা আর এড়িয়ে যাওয়া যাবে না

 

 

বাংলাদেশ আগে বহু বৈশ্বিক সংকট মোকাবেলা করেছে। কিন্তু প্রতিবারই সংকট শেষে কাঠামোগত সংস্কার পিছিয়ে দেয়া হয়েছে।

 

 

জ্বালানিতে নির্ভরতা, একমুখী রফতানি এবং একটি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ রেমিট্যান্স—এ দুর্বলতাগুলো নতুন নয়।

 

 

ইরান যুদ্ধ শুধু একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে, এ সমস্যাগুলো আর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

 

 

বাংলাদেশ এ যুদ্ধ শুরু করেনি এবং এর সমাপ্তিও তার নিয়ন্ত্রণে নয়। কিন্তু কীভাবে এর মোকাবেলা করবে, সে সিদ্ধান্ত তার নিজের।

 

 

এ সংকটকে যদি কাঠামোগত সংস্কারের সুযোগ হিসেবে নেয়া না হয়, তাহলে এর মূল্য আরো বেশি দিতে হবে, যার হিসাব এরেই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে।

 

 

মোহাম্মদ কবির হাসান: মফেট চেয়ার অধ্যাপক, ফাইন্যান্স; লুইজিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটি, নিউ অরলিন্স, যুক্তরাষ্ট্র