মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ, শান্তিরক্ষা ও কূটনীতি
বদরুল হাসান [সূত্র : সমকাল, ১ এপ্রিল ২০২৬]

ইরানের ওপর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে শান্তি প্রচেষ্টার ক্ষীণ সম্ভাবনা উঁকি দিচ্ছে বেশ কয়েকটি দেশের তৎপরতায়। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থির ও অনিশ্চিত হলেও সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা শান্তির নতুন এক সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ওমানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে সমঝোতা আলোচনা চলাকালেই অপারেশন এপিক ফিউরি শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। ইরানও পাল্টা জবাব দিয়ে চলেছে। যে যুদ্ধ মার্কিন প্রেসিডেন্ট এক সপ্তাহে শেষ করবেন বলে দম্ভ দেখিয়েছিলেন, তা এখন মাস পেরিয়ে গেলেও থামার পরিবর্তে আরও বিধ্বংসী হয়ে উঠছে।
চরম নাটকীয় পরিস্থিতিতে মৌলিক কিছু প্রশ্ন জোরালোভাবে উঠছে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা ব্যবস্থাগুলোর অবস্থান আসলে কোথায়? তারা কি কেবল বিবৃতি ও আনুষ্ঠানিক উদ্বেগ প্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ? আরব ও মুসলিম রাষ্ট্রগুলো কিংবা পশ্চিমা শক্তিগুলো এই যুদ্ধের তীব্রতা কমিয়ে আনতে বাস্তবে কী উদ্যোগ নিচ্ছে?
বিদ্যমান জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম
ঐতিহাসিকভাবে জাতিসংঘের বেশ কয়েকটি শান্তি মিশন এখনও এ অঞ্চলে মোতায়েন রয়েছে, যারা দশকের পর দশক নীরবে পর্যবেক্ষণের কাজ করে যাচ্ছে। তবে বর্তমান এই ‘পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধ’ পরিস্থিতিতে পুরোনো প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা এখন পরীক্ষার মুখে। অস্থিতিশীল সীমান্তগুলোতে জাতিসংঘের দীর্ঘমেয়াদি মিশন এখনও কাজ করছে এবং সংঘাতের মধ্যেই নিরাপত্তা পরিষদে নিয়মিত রিপোর্ট জমা দিচ্ছে।
জাতিসংঘের প্রাচীনতম মিশন ‘ইউনাইটেড নেশনস ট্রুস সুপারভিশন অর্গানাইজেশন’ (ইউএনটিএসও) ১৯৪৮ সাল থেকে এ অঞ্চলে সামরিক পর্যবেক্ষক মোতায়েন করে আসছে। এটি নিরস্ত্র পর্যবেক্ষক মিশন; যুদ্ধ থামাতে বা সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে না। তাদের নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহ আন্তর্জাতিক কূটনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ইউএনটিএসও জাতিসংঘের ইউনাইটেড নেশনস ডিজএনগেজমেন্ট অবজারভার ফোর্স (ইউএনডিওএফ) এবং ইউনাইটেড নেশনস ইন্টেরিম ফোর্স ইন লেবাননকে (ইউএনআইএফআইএল) সহায়তা প্রদান করে থাকে। ইউএনডিওএফ ১৯৭৪ সাল থেকে গোলান মালভূমিতে ইসরায়েল ও সিরিয়ার মধ্যে যুদ্ধবিরতি তদারক করছে। আর ১৯৭৮ সাল থেকে লেবাননে নিয়োজিত ইউএনআইএফআইএল বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার শান্তিরক্ষী নিয়ে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন পর্যবেক্ষণ করছে এবং ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ও লেবাননের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে কৌশলগত যোগাযোগ বজায় রাখছে।
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মডেলের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত গাজা যুদ্ধে প্রাণহানি ঠেকাতে না পারা জাতিসংঘের ইতিহাসে আরেকটি ব্যর্থতার অধ্যায়। এই যুদ্ধে জাতিসংঘের ৩৯১ জন কর্মী নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ৩১০ জনই ফিলিস্তিন শরণার্থী সংস্থার (ইউএনআরডব্লিউএ) সদস্য এবং বাকি ৮১ জন ছিলেন বিভিন্ন সহযোগী সংস্থার কর্মী। এ ছাড়া লেবানন সীমান্তে নিয়োজিত ইউএনআইএফআইএল সরাসরি আক্রমণের শিকার হওয়ায় বেশ কয়েকজন শান্তিরক্ষী আহত এবং একাধিক তদারক কর্মকর্তা প্রাণ হারিয়েছেন।
তীব্র উত্তেজনার মুহূর্তে এসব মিশনের ভূমিকা প্রায়ই গৌণ বলে মনে হয়। কারণ শান্তিরক্ষা মডেলের কিছু সহজাত কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
সংকীর্ণ ম্যান্ডেট: এসব মিশন মূলত যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন পর্যবেক্ষণ ও রিপোর্ট করার জন্য তৈরি; যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার জন্য নয়। ইউএনআইএফআইএল ২০২৪ সালের শেষ থেকে এ পর্যন্ত ১০ হাজারের বেশি আকাশ ও স্থলপথের লঙ্ঘন নথিভুক্ত করেছে। কিন্তু লঙ্ঘন থামানোর সামরিক সক্ষমতা বা কর্তৃত্ব তাদের নেই।
সম্মতিভিত্তিক মডেল: জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম মূলত সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সম্মতির ওপর নির্ভরশীল। যখন যুদ্ধরত পক্ষগুলো নিরপেক্ষতার চেয়ে সামরিক উদ্দেশ্যকে বেশি গুরুত্ব দেয়, তখন শান্তিরক্ষীদের সরাসরি হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ে।
নিরাপত্তা পরিষদের রাজনীতি: শান্তিরক্ষীদের ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বড় শক্তিগুলোর ঐকমত্য প্রয়োজন। বর্তমান সংকটে নিরাপত্তা পরিষদ গভীরভাবে বিভক্ত। যেমন রেজল্যুশন ২৮১৭ সংঘাতের মূল কারণগুলো সমাধান করতে বা ভারসাম্যপূর্ণ যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব দিতে ব্যর্থ হওয়ায় সমালোচিত।
আধুনিক যুদ্ধের জটিলতা: প্রথাগত শান্তিরক্ষা মিশনগুলো মূলত রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্র যুদ্ধের জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সংঘাতগুলোতে রাষ্ট্রবহির্ভূত সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং বিকেন্দ্রীভূত প্রক্সি বাহিনীর আধিক্য থাকায় পর্যবেক্ষকদের কাজ অনেক জটিল হয়ে পড়েছে।
জোটগত কূটনৈতিক উদ্যোগ
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ থামাতে এবং উত্তেজনা প্রশমনে বিভিন্ন আঞ্চলিক সংস্থা ও আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলো ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে কাজ করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক জ্বালানি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সঙ্গে সমন্বয় করছে। অন্যদিকে অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন (ওআইসি) বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলার নিন্দা জানিয়ে তাদের সদস্য দেশগুলোর সার্বভৌমত্বের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
কাতার এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে সক্রিয় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে জিম্মি মুক্তি এবং সাময়িক যুদ্ধবিরতির জন্য ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে সরাসরি আলোচনার পথ তৈরি করেছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সংঘাত যেন পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য ইরান ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। অন্যদিকে ওআইসি বারবার জরুরি শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের মাধ্যমে ইসরায়েলি অভিযানের নিন্দা জানানো এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষার দাবির পক্ষে সংহতি জানিয়ে আসছে। সামরিক হস্তক্ষেপের বদলে তারা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্য মূলত মানবিক ত্রাণ এবং ‘দ্বিরাষ্ট্র সমাধান’-এর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন গাজায় মানবিক করিডোর তৈরির জন্য কয়েক মিলিয়ন ইউরো সহায়তা পাঠানোর পাশাপাশি লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘অ্যাসপাইডস’ নামে নৌ-মিশন পরিচালনা করছে। তবে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে মতভেদ থাকায় তারা ইসরায়েলের ওপর কোনো কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারেনি। স্পেন, আয়ারল্যান্ড ও নরওয়ে একটি শক্ত রাজনৈতিক শর্ত আরোপ করেছে– কোনো চুক্তি হওয়ার আগেই ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করা। তাদের মতে, ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে ফিলিস্তিনকে সমমর্যাদায় বসাতে হলে এ স্বীকৃতি অপরিহার্য।
যুক্তরাজ্য লোহিত সাগরে হুতিদের হামলা রুখতে সামরিক পদক্ষেপ নিলেও তারা গাজায় টেকসই যুদ্ধবিরতির কথা বলছে। তারা জর্ডান ও মিসরের মাধ্যমে আকাশপথে ত্রাণ বিতরণে অংশ নিয়েছে। যুক্তরাজ্য প্রস্তাবিত ‘ফাইভ পয়েন্ট প্ল্যান’ বা পাঁচ দফা পরিকল্পনার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো– হামাস ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর নেতৃত্বকে গাজা থেকে সরিয়ে নেওয়া এবং টেকনিক্যাল বা বিশেষজ্ঞচালিত সরকার গঠন করা, যারা যুদ্ধপরবর্তী গাজা পুনর্গঠনের কাজ করবে।
পশ্চিমা শক্তির বাইরে চীন, রাশিয়া, জাপানও শান্তি উদ্যোগে ভিন্নধর্মী ভূমিকা পালন করছে। চীন নিজেকে একজন নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে ফিলিস্তিনের বিভিন্ন রাজনৈতিক উপদলের মধ্যে ঐক্য তৈরির জন্য বেইজিংয়ে আলোচনার আয়োজন করেছে এবং ফিলিস্তিনকে জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্যপদ প্রদানের দাবি জানিয়েছে। রাশিয়া এই সংকটকে পশ্চিমা বিশ্বের ব্যর্থ নীতি হিসেবে বর্ণনা করে নিরাপত্তা পরিষদে বারবার যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব এনেছে এবং হামাস ও ইরানের নেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। জাপান মূলত ‘মানবিক কূটনীতি’র ওপর ভিত্তি করে ফিলিস্তিনিদের জন্য আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করেছে এবং জর্ডান ও মিসরের সঙ্গে মিলে আঞ্চলিক শান্তি কাঠামো তৈরির চেষ্টা করছে। তবে কাতার ও মিসরের মতো দেশগুলোর অনেক শান্তি উদ্যোগ ইতোপূর্বে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ কোনো পক্ষই তাদের মূল দাবি থেকে সরতে রাজি হয়নি।
রাশিয়ার শান্তি উদ্যোগের প্রধান শর্ত হলো মধ্যপ্রাচ্য সংকট সমাধানে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিপত্য খর্ব এবং ‘বহুপক্ষীয় মধ্যস্থতা’ কাঠামো তৈরি করা। রাশিয়া প্রস্তাব করেছে, কেবল যুক্তরাষ্ট্র নয়, বরং জাতিসংঘ, আরব লিগ এবং ওআইসি সঙ্গে নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন করতে হবে। তাদের শর্ত অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে কোনো স্থায়ী শান্তি সম্ভব নয় যদি না সেখানে ইরানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং লেবানন ও সিরিয়ার সার্বভৌমত্বকে সম্মান জানানো হয়। মস্কো বারবার নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব এনেছে, যেখানে ইসরায়েলি বাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এবং ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্তির বিষয়টি শর্তহীনভাবে যুক্ত।
জাপানের শান্তি পরিকল্পনার অনন্য দিক হলো তাদের ‘শান্তি ও সমৃদ্ধির করিডোর’ উদ্যোগ। জাপানের শর্ত হলো সামরিক সংঘাত থামানোর পাশাপাশি ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করা, যাতে তারা দীর্ঘ মেয়াদে স্বাবলম্বী হতে পারে। টোকিও প্রস্তাব করেছে যে, জাপান, জর্ডান, ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিন মিলে যৌথ কৃষি-শিল্প পার্ক তৈরি করবে, যা আঞ্চলিক সহযোগিতার একটি মডেল হবে। তাদের মতে, অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতা: ১৫ দফা বনাম ৫ দফা
সকল উদ্যোগ ছাপিয়ে বর্তমানে পাকিস্তানের সরাসরি ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে বার্তাবাহক হিসেবে তৎপরতা সামনে এসেছে। ইসরায়েল, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও লেবাননকে কেন্দ্র করে যখন যুদ্ধ ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ছে, তখন ইসলামাবাদ পর্দার আড়ালে এক গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত।
এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ১৫ দফা প্রস্তাব ইরানের কাছে পৌঁছে দিয়েছে; একইভাবে ইরানের পাঁচটি পাল্টা প্রস্তাবও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাঠিয়েছে। ইতোপূর্বে বিভিন্ন যুদ্ধ-প্রশমন উদ্যোগ মুখ থুবড়ে পড়লেও এ তৎপরতার ফলে যুদ্ধবিরতি বা শান্তি আলোচনা এখনও চলমান।
যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ দফা প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য হলো, এই যুদ্ধকে আঞ্চলিক মহাযুদ্ধে রূপ নেওয়া থেকে ঠেকানো। তাদের প্রস্তাবগুলোর কেন্দ্রে রয়েছে ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; হামাস ও হিজবুল্লাহর হাতে থাকা জিম্মিদের মুক্তি এবং ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর সামরিক সক্ষমতা কমিয়ে আনা। মূলত সামরিক স্থিতিশীলতা আনাই তাদের প্রধান লক্ষ্য।
অন্যদিকে ইরান পাঁচ দফা পাল্টা প্রস্তাবে সংকটকে কেবল সামরিক নয়, বরং রাজনৈতিক ও সার্বভৌমত্বের লড়াই হিসেবে দেখছে। তাদের পাল্টা প্রস্তাবের মধ্যে প্রধান হলো গাজা ও লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং ইরানের ওপর থেকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া। তারা স্পষ্ট করেছে– মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি চাইলে বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের এই সক্রিয়তার পেছনে আস্থার ভারসাম্য থাকাটা বড় কারণ। ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের দীর্ঘ সীমান্ত ও ধর্মীয় বন্ধন রয়েছে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রয়েছে কয়েক দশকের সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক। এই দ্বিমুখী অবস্থানই পাকিস্তানকে এক অনন্য ‘নিরপেক্ষ ভূমি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। তবে ইসরায়েল যদি এই প্রস্তাবগুলোর কোনোটিতে ভেটো দেয়; পাকিস্তানের এই প্রচেষ্টা হবে পণ্ডশ্রম।
যুদ্ধ প্রশমন থেকে বিরতি: অতঃপর সংকট নিরসন ও শান্তি প্রক্রিয়া
স্থায়ী মীমাংসার জন্য জাতিসংঘ এবং এর বিশেষায়িত সংস্থাগুলোর সমর্থনে শক্তিশালী আঞ্চলিক শান্তি অবকাঠামো গড়ে তোলা অপরিহার্য। শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ছাড়া সাময়িক যুদ্ধবিরতি দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা অর্জন সম্ভব নয়। চুক্তির প্রতিপালন পর্যবেক্ষণ, মানবিক কার্যক্রম সমন্বয় এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখতে হবে। শান্তি বিনির্মাণের ভাষায় একে ‘পোস্ট-কনফ্লিক্ট ইনস্টিটিউশনাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ বলা হয়, যা সংঘাত-পরবর্তী সময়ে স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করে।
সংলাপ ও যোগাযোগের পরিবেশ সৃষ্টি: বর্তমান পরিস্থিতিতে পর্যায়ক্রমিক কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উত্তেজনা প্রশমন করা বেশি জরুরি। পক্ষগুলোর মধ্যে আস্থার সংকট চরম পর্যায়ে। তাই শুরুতেই পূর্ণাঙ্গ কোনো চুক্তির আশা না করে প্রধান পক্ষগুলোকে আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসাই মূল লক্ষ্য। আনুষ্ঠানিক বা পর্দার আড়ালের গোপন কূটনৈতিক চ্যানেল ব্যবহার করে সরাসরি যোগাযোগ ফের শুরু করা অত্যন্ত প্রয়োজন। ভুল বোঝাবুঝি কমিয়ে যুদ্ধের ঝুঁকি হ্রাসে প্রাথমিক ধাপ হিসেবে এসব কাজ করবে।
কূটনৈতিক প্রস্তাব ও অভ্যন্তরীণ সমন্বয়: যে কোনো শান্তি উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রের সমান্তরালে ইসরায়েলের পূর্ণ অঙ্গীকার নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক। যে কোনো প্রস্তাব উত্থাপনের আগেই ইসরায়েলের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের হবে সেটির পূর্ণ সমন্বয় করে নিতে হবে। এই অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও স্বচ্ছতা ছাড়া কূটনৈতিক উদ্যোগগুলো বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ঝুঁকিতে থাকে।
উত্তেজনা প্রশমনের প্রায়োগিক শর্তাবলি: বৃহত্তর আলোচনায় যাওয়ার আগে সংঘাতের ক্ষেত্রগুলোতে সুনির্দিষ্ট ও প্রায়োগিক শর্ত নির্ধারণ করা প্রয়োজন। যেমন আন্তঃসীমান্ত হামলা স্থগিত রাখা, ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সীমা নির্ধারণ, বেসামরিক অবকাঠামো সুরক্ষা এবং দুর্ঘটনাবশত যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়া রোধে কার্যকর মেকানিজম গড়ে তোলা। এর ফলে গভীরতর আলোচনার জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষেত্র প্রস্তুত হবে।
গ্যারান্টি ও তদারকি ব্যবস্থা: শান্তি প্রক্রিয়া বা যুদ্ধবিরতির যে কোনো চুক্তিকে দীর্ঘস্থায়ী করতে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক গ্যারান্টার বা জামিনদারদের সম্পৃক্ত করা আবশ্যক। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, চীন, রাশিয়া এবং ওআইসির মতো আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সমন্বয়ে জোট গঠন করা যেতে পারে, যারা চুক্তির শর্ত পালনে নজরদারি করবে। এই বহুদেশীয় অংশগ্রহণ চুক্তির গ্রহণযোগ্যতা বাড়াবে এবং একতরফা চুক্তি থেকে সরে আসার ঝুঁকি কমিয়ে দেবে।
সমান্তরাল আলোচনা ও বিশেষজ্ঞ দল: পুরো শান্তি প্রক্রিয়াকে কয়েকটি সমান্তরাল ট্র্যাকে ভাগ করে পরিচালনা করা যেতে পারে। আলাদা ওয়ার্কিং গ্রুপ যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন, তদারক ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, মানবিক সহায়তা নিশ্চিতকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধানের মতো বিষয় নিয়ে কাজ করতে পারে।
জনসাধারণের অংশগ্রহণ ও জবাবদিহিতা: শান্তি প্রক্রিয়া কেবল কূটনীতির চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তাতে জন-অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো নিজেদের সংসদকে সম্পৃক্ত করতে পারে। সংসদীয় তদারক এবং প্রকাশ্য বিতর্ক যে কোনো চুক্তির স্থায়িত্ব বাড়াতে এবং কঠিন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রয়োজনীয় জনসমর্থন তৈরিতে সহায়তা করে।
শান্তি লভ্যাংশ তথা পিস ডিভিডেন্ডের প্রত্যাশা
দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস দূর করতে সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, যা ক্রমান্বয়ে তিন ধরনের শান্তি লভ্যাংশ বা ‘পিস ডিভিডেন্ড’ তৈরি করবে। প্রথমত, বৈরী আচরণের সাময়িক বিরতি এবং মানবিক করিডোর তৈরির মাধ্যমে প্রাথমিক ‘উত্তেজনা প্রশমন লভ্যাংশ’ তৈরি হবে, যা সাধারণ মানুষের কষ্ট লাঘব করবে। দ্বিতীয়ত, টেকসই ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতি অর্জিত হলে তা ‘যুদ্ধবিরতি লভ্যাংশ’ বয়ে আনবে। যার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর পুনর্গঠন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনার কাজ শুরু করা সম্ভব হবে।
এসব অর্জন দীর্ঘ মেয়াদে বৃহত্তর ‘শান্তি লভ্যাংশে’ রূপান্তরিত হবে, যা আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং স্থায়ী স্থিতিশীলতাকে উৎসাহিত করবে বলে আশা করা যেতে পারে।
বদরুল হাসান: উন্নয়ন ও মানবিক নীতি বিশেষজ্ঞ