মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে বাংলাদেশের অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ
সাঈদ বারী [সূত্র : আমাদের সময়, ০৫ এপ্রিল ২০২৬]

মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা নতুন কিছু নয়। কিন্তু ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত যখন যুদ্ধের রূপ নিতে শুরু করে, তখন তার অভিঘাত কেবল ওই অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার, বাণিজ্যপ্রবাহ থেকে শুরু করে ছোট ছোট উন্নয়নশীল দেশগুলোর দৈনন্দিন জীবন পর্যন্ত এর ঢেউ এসে লাগে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। ভৌগোলিকভাবে দূরে থাকলেও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় আমরা এই সংঘাতের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ধাক্কা আসে জ্বালানি খাতে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে দেশের ভেতরেও ডিজেল, পেট্রল ও অকটেনের মূল্য সমন্বয়ের চাপ তৈরি হয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে পরিবহন খাতে। বাস, ট্রাক, লঞ্চসহ সব ধরনের যানবাহনের ভাড়া বেড়ে যেতে পারে। ফলে উৎপাদন থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে খরচ বাড়তে থাকবে। এই অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত এসে পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও অস্থিরতা দেখা দেয়। চাল, ডাল, তেল, সবজি কিংবা মাছ সবই উৎপাদন, সংরক্ষণ ও পরিবহনের সঙ্গে জড়িত। ফলে পরিবহন খরচ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে মূল্যস্ফীতি অনিবার্য হয়ে ওঠে। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ে। তাদের আয় বাড়ে না, কিন্তু ব্যয় বেড়ে যায় প্রতিদিন।
শিল্প ও ব্যবসা খাতেও এই চাপ কম নয়। গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, সিরামিক কিংবা খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পÑ সবখানেই জ্বালানির ওপর নির্ভরতা রয়েছে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। রপ্তানিমুখী শিল্পগুলো তখন দোটানায় পড়ে যায়। একদিকে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে ক্রেতারা দাম বাড়াতে অনাগ্রহী। এর ফলে মুনাফা কমে, কখনও কখনও উৎপাদনও কমিয়ে দিতে হয়।
ডলার সংকটের বিষয়টিও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বেশি দামে জ্বালানি আমদানি করতে গেলে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা প্রয়োজন হয়। এতে দেশের রিজার্ভের ওপর চাপ পড়ে। টাকার মান দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। এর প্রভাব আবার আমদানিনির্ভর অন্যান্য খাতেও ছড়িয়ে পড়ে। এক ধরনের চক্র তৈরি হয়, যেখানে একটি খাতের চাপ অন্য খাতে ছড়িয়ে পড়ে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিকে দুর্বল করে।
বিদ্যুৎ খাতও এই সংকট থেকে মুক্ত নয়। বাংলাদেশের অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র জ্বালানিভিত্তিক। তেলের দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। সরকার ভর্তুকি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে তা টেকসই হয় না। ফলে লোডশেডিং বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়, অথবা বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হয়। এর ফলে আবার শিল্প ও সাধারণ ভোক্তা উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এর বাইরে আরও কয়েকটি খাত রয়েছে, যেগুলোতে এই যুদ্ধের প্রভাব ধীরে হলেও গভীরভাবে পড়তে পারে। প্রথমত, প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স খাত। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত। যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে এসব দেশে অর্থনৈতিক কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিতে পারে। নির্মাণ খাত, সেবা খাত কিংবা তেলনির্ভর অর্থনীতিতে সংকোচন দেখা দিলে বাংলাদেশি শ্রমিকদের চাকরি অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে। এতে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎসকে দুর্বল করে দিতে পারে।
দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও সরবরাহব্যবস্থা। মধ্যপ্রাচ্য দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ রয়েছে, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি। এ অঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি হলে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হতে পারে, বীমা খরচ বেড়ে যেতে পারে এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়তে পারে। ফলে আমদানি ও রপ্তানি উভয় ক্ষেত্রেই খরচ ও সময় বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশের পোশাকশিল্পসহ রপ্তানিনির্ভর খাতগুলোর জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তৃতীয়ত, কৃষি খাতও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সার, কীটনাশক, সেচব্যবস্থা এবং কৃষিযন্ত্র সবকিছুতেই জ্বালানির প্রভাব রয়েছে। তেলের দাম বাড়লে কৃষি উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, যা কৃষকদের লাভ কমিয়ে দেয় এবং কখনও কখনও উৎপাদন নিরুৎসাহিত করে। এর ফলে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হতে পারে এবং খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
চতুর্থত, বিনিয়োগ পরিবেশ। বৈশ্বিক অস্থিরতা বাড়লে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত সতর্ক অবস্থান নেন। তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারান কিংবা সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখেন। এতে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ প্রবাহ কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় বিনিয়োগকারীরাও ঝুঁকি নিতে অনাগ্রহী হয়ে ওঠেন, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ধীর করে দেয়।
পঞ্চমত, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতাও হুমকির মুখে পড়তে পারে। ব্যাংকিং খাতে ঋণের চাপ বাড়তে পারে, কারণ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো বাড়তি খরচ সামাল দিতে হিমশিম খায়। অনেক ক্ষেত্রে খেলাপি ঋণ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। পুঁজিবাজারেও অস্থিরতা দেখা দিতে পারে, কারণ বিনিয়োগকারীরা অনিশ্চয়তার সময়ে ঝুঁকি এড়িয়ে চলতে চান।
ষষ্ঠত, শিক্ষা ও মানবসম্পদ খাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে। অর্থনৈতিক চাপ বাড়লে অনেক পরিবার শিক্ষা ব্যয় কমাতে বাধ্য হয়। ফলে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার বাড়তে পারে। দীর্ঘ মেয়াদে এটি দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সপ্তমত, স্বাস্থ্য খাত। ওষুধ উৎপাদন ও আমদানির সঙ্গে জ্বালানি ও ডলারের সম্পর্ক রয়েছে। উৎপাদন খরচ বাড়লে ওষুধের দামও বাড়তে পারে। এতে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ ব্যাহত হতে পারে, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য।
সামাজিক প্রভাবের কথাও বিবেচনায় নিতে হবে। যখন মূল্যস্ফীতি বাড়ে, আয় কমে, কর্মসংস্থান অনিশ্চিত হয়, তখন সামাজিক অস্থিরতা বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। মানুষের জীবনযাত্রার মান নেমে আসে, অসন্তোষ বাড়ে। এটি দীর্ঘ মেয়াদে রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো আগাম প্রস্তুতি ও কার্যকর নীতিনির্ধারণ। জ্বালানির বিকল্প উৎস, যেমনÑ নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর কৌশল নিতে হবে। বৈদেশিক মুদ্রার সঠিক ব্যবস্থাপনা, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদার করাও সময়ের দাবি।
কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করাও প্রয়োজন, যাতে সংকট মোকাবিলায় যৌথ উদ্যোগ নেওয়া যায়।
মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তাপ আমাদের আবারও স্মরণ করিয়ে দেয়, বিশ্ব এখন আর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়। একটি অঞ্চলের সংঘাত অন্য অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রায় সরাসরি প্রভাব ফেলে। তাই এই আন্তঃসংযুক্ত বাস্তবতায় টিকে থাকতে হলে প্রয়োজন দূরদর্শিতা, দক্ষতা এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ যেমন বড়, তেমনি সঠিক পদক্ষেপ নিলে সম্ভাবনাও কম নয়।
সাঈদ বারী : প্রকাশক ও কলাম লেখক