কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

মার্কিন-বাংলাদেশ বাণিজ্য আলোচনা বাণিজ্যের গণ্ডি পেরিয়ে ভূরাজনৈতিক প্রসঙ্গ

ড. সাজ্জাদ মোহাম্মদ জসীমউদ্দীন [সূত্র : বর্ণিক বার্তা, ৩১ অক্টোবর ২০২৫]

মার্কিন-বাংলাদেশ বাণিজ্য আলোচনা বাণিজ্যের গণ্ডি পেরিয়ে ভূরাজনৈতিক প্রসঙ্গ

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘‌আমেরিকা ফার্স্ট’ বাণিজ্য এজেন্ডা অনুসরণ করেন, যার লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস করা। দীর্ঘমেয়াদে এ এজেন্ডার বাস্তবায়ন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে কিনা তা বিতর্কের বিষয়।

 

 

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘‌আমেরিকা ফার্স্ট’ বাণিজ্য এজেন্ডা অনুসরণ করেন, যার লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস করা। দীর্ঘমেয়াদে এ এজেন্ডার বাস্তবায়ন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে কিনা তা বিতর্কের বিষয়। তবে আমেরিকার বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর প্রেক্ষাপটে গত ২ এপ্রিল ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশসহ একাধিক বাণিজ্য অংশীদারের ওপর পারস্পরিক শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয়।

 

 

প্রকৃতপক্ষে, কম্বোডিয়া, বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড, ভারত, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইনসহ কয়েকটি দেশের রফতানির (বিশেষ করে পোশাক খাত) ওপর ৩৭-৫০ শতাংশ পর্যন্ত পারস্পরিক শুল্ক আরোপ করে। বাণিজ্য অংশীদার দেশগুলোর (বাংলাদেশসহ) প্রায় সব রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান চিঠি ও কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আলোচনার জন্য এক থেকে তিন মাস সময় বাড়ানোর আবেদন জানান। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ৯০ দিনের জন্য শুল্ক বাস্তবায়ন স্থগিত রাখে, যাতে পরবর্তী সময়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়। বাংলাদেশের রফতানির ওপর শুল্ক ৩৭ থেকে বেড়ে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারত, বিশেষত পোশাক রফতানির ক্ষেত্রে। অথচ বাংলাদেশ-মার্কিন আলোচনার আগে গড় শুল্কহার ছিল ১৫-১৬ শতাংশ।

 

 

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক বাধা কমানো, বাজার প্রবেশাধিকার উন্নত করা ও কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করতে বাণিজ্য আলোচনায় বসে। উভয় পক্ষই গঠনমূলক আলোচনার লক্ষ্য রাখলেও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও শ্রমিক অধিকারের মতো ইস্যুগুলো আলোচনাকে জটিল করে তোলে। এসব বাধা সত্ত্বেও সীমিত একটি বাণিজ্য চুক্তির সুযোগ তৈরি হয়, যা বিশেষ করে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি বাড়াতে পারে এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক ইস্যুগুলোও সমাধান করতে পারে।

 
 

কে কী পেয়েছে

শুল্ক আলোচনা ছিল একটি ‘‌পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি’ যেখানে উভয় দেশ বাণিজ্য ঘাটতি ও ভূরাজনৈতিক উদ্বেগ মোকাবেলায় ছাড় দেয়। আলোচনার ফলে প্রাপ্ত চুক্তিতে শুল্ক ও বাণিজ্য ছাড় ও যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য আমদানি অন্তর্ভুক্ত, যা মার্কিন বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস করবে। বাংলাদেশ সরকার মার্কিন পণ্যের (উদাহরণস্বরূপ গম, তুলা, সয়াবিন, বিমান ও এলএনজি জ্বালানি) শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিতে সম্মত হয়, বিনিময়ে শুল্কছাড় পায়।

ঢাকা পাঁচ বছরের জন্য প্রতি বছর সাত লাখ টন মার্কিন গম আমদানির জন্য সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে এবং প্রতিশ্রুতির প্রমাণ হিসেবে সঙ্গে সঙ্গেই ২ লাখ ২০ হাজার টন আমদানির চুক্তি অনুমোদন করে। এছাড়া বাংলাদেশ ২৫টি বোয়িং বিমান ক্রয়ের প্রতিশ্রুতি দেয়। যদিও এ মুহূর্তে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের এ বিমানগুলোর প্রয়োজনীয়তা প্রশ্নসাপেক্ষ, এ ধরনের প্রতিশ্রুতি যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতিসংক্রান্ত উদ্বেগ কমাতে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হয়।

 

 

 

বাংলাদেশ তার পোশাক রফতানির ওপর শুল্ক কমিয়ে ২০ শতাংশ করার জন্য আলোচনা করে, যা প্রাথমিকভাবে প্রস্তাবিত ৩৭-৫০ শতাংশ থেকে অনেক কম। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত তার মোট রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি এবং চার মিলিয়নেরও বেশি মানুষকে কর্মসংস্থান প্রদান করে। বাংলাদেশের পোশাকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা একটি মূল দুর্বলতা হিসেবে রয়ে গেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৮ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য আমদানি করে যা বাংলাদেশের মোট রফতানির প্রায় ১৮-২০ শতাংশ।

এ বাণিজ্য চুক্তি একটি ব্যাপক আলোচনার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে। বাংলাদেশের শুল্ক আলোচনা ছিল চাপপূর্ণ ও ভূরাজনৈতিক জটিলতায় ভরা। তবে শেষ পর্যন্ত পারস্পরিক ছাড় ও কূটনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের মাধ্যমে তা সমাধান করা হয়।

 

 

বাণিজ্যের গণ্ডি পেরিয়ে ভূরাজনৈতিক প্রসঙ্গ

যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে শুল্ক আলোচনা কেবল বাণিজ্য ঘাটতির বিষয় ছিল না। বরং ট্রাম্প প্রশাসন শুল্ক আলোচনাকে একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে একটি বৃহত্তর কৌশলগত এজেন্ডা এগিয়ে নেয়, যেখানে বাংলাদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পোশাক শিল্পের বাজার প্রবেশাধিকারকে ভূরাজনৈতিক ইস্যুতে ছাড় দেয়ার সঙ্গে জড়িত করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে (বাংলাদেশ, কম্বোডিয়াসহ) চীনের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। চুক্তির অংশ হিসেবে বাংলাদেশকে চীন থেকে আমদানি কমিয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়াতে বলা হতে পারে, যার মধ্যে মার্কিন সামরিক ও বেসামরিক বিমান, জ্বালানি ও কৃষিপণ্য ক্রয়ের প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত।

 

 

এছাড়া জেনারেল সিকিউরিটি অব মিলিটারি ইনফরমেশন এগ্রিমেন্ট (জিএসওএমআইএ) ও অ্যাকুইজিশন ক্রস সার্ভিসিং এগ্রিমেন্টে (এসিএসএ) স্বাক্ষর করতে বাংলাদেশের আগের অনীহা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে উত্তেজনার কারণ ছিল। যুক্তরাষ্ট্র এসব চুক্তিকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের জন্য অপরিহার্য মনে করে। যুক্তরাষ্ট্র এ চুক্তিগুলোকে (এক ধরনের সামরিক সহযোগিতা) অর্থনৈতিক সম্পর্ক শক্তিশালীকরণের জন্য অপরিহার্য হিসেবে দেখে। শুল্ক আলোচনার সময় ট্রাম্প প্রশাসন বর্তমান আলোচনাকে ভূরাজনৈতিক ইস্যুতে ছাড় আদায়ের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করে। এ প্রসঙ্গে আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট (এনডিএ)।

 

 

নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট হলো দুই পক্ষের মধ্যে একটি চুক্তি, যার মাধ্যমে সংবেদনশীল তথ্য (যেমন বাণিজ্যিক গোপনীয়তা বা আলোচনা) সুরক্ষিত থাকে ও প্রাপককে (বাংলাদেশ) আইনত অন্য কারো কাছে তা প্রকাশ করতে বাধা দেয়। কেবল বাংলাদেশসহ কয়েকটি বাণিজ্য অংশীদারকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিতে এনডিএ স্বাক্ষর করতে বলা হয়েছে। ফলে এ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে যে এনডিএর কারণে ভূরাজনৈতিক ইস্যুতে দেয়া ছাড়গুলো জনসমক্ষে আলোচনার সুযোগ পাবে না।

 

 

ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য বাংলাদেশের শিক্ষা-কৌশলগত সুপারিশ

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক শুল্ক আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাধাগুলোর সম্মুখীন হয়। এ আলোচনা থেকে পাওয়া শিক্ষাগুলো ভবিষ্যতে কেবল যুক্তরাষ্ট্র নয় বরং ইউরোপীয় ইউনিয়নের চাপ মোকাবেলায় বাংলাদেশকে দ্রুত ও সক্রিয়ভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে সাহায্য করবে। অন্য বাধাগুলোর মধ্যে দেরিতে আলোচনা শুরু করা, অপর্যাপ্ত প্রভাব, সীমিত স্টেকহোল্ডারের সম্পৃক্ততা—এগুলো শুল্ক আলোচনার প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের উদ্যোগের বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যদের সঙ্গে ভবিষ্যতে যেকোনো শুল্ক আলোচনায় নিজেদের অবস্থান উন্নত করতে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক আলোচনা থেকে বাংলাদেশ শিক্ষা নিতে পারে।

 

 

আগে থেকেই ও সক্রিয়ভাবে পদক্ষেপ নেয়া

সংকট প্রকাশ্যে আসার আগেই আলোচনা শুরু করা দরকার। বাংলাদেশ প্রায়ই কেবল হুমকিগুলো প্রকাশ্যে আসার পরই পদক্ষেপ নেয়। সংকট বৃদ্ধির আগে প্রতিক্রিয়া জানানো গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ ফিলিপাইন শুল্ক ঝুঁকির সৃষ্টি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ইউএস ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ ও মূল স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। একইভাবে ভারত দ্রুত আনুষ্ঠানিক অভিযোগের মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানায় এবং ইউএসটিআর ও ডব্লিউটিও উভয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে। মালয়েশিয়া দ্রুত পদক্ষেপ নেয় ও উত্তেজনা এড়াতে আইনি/কূটনৈতিক কৌশল ব্যবহার করে। আমাদের শুধু প্রতিক্রিয়া জানালে চলবে না, বরং আগাম প্রস্তুতি নিতে হবে। অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি এড়াতে আমাদের দ্রুত সম্পৃক্ত হতে হবে।

 

 

পণ্য ও বাজারবৈচিত্র্য আনা

তৈরি পোশাক খাতের ওপর বাংলাদেশের অতিনির্ভরতা একে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। মার্কিন ও বৈশ্বিক আলোচনায় এটি একটি বড় দুর্বলতা। বাংলাদেশের উচিত রফতানির ভিত্তি বৈচিত্র্য আনা, যাতে একক খাতের শুল্কের প্রভাব কমানো যায়। উদাহরণস্বরূপ ভিয়েতনামের ইলেকট্রনিকস, বস্ত্র এবং কৃষির মিশ্রণ এটিকে বৃহত্তর স্থিতিস্থাপকতা দিয়েছে। ফিলিপাইন ডিজিটাল বাণিজ্য, ও ইলেকট্রনিকসের ওপর মনোযোগ দিয়ে লাভবান হয়েছে। বাংলাদেশও পোশাকের বাইরে আইটি, ফার্মাসিউটিক্যালস ও কৃষিপণ্যের মতো খাতগুলো কৌশলগতভাবে উন্নয়ন করতে পারে যাতে অগ্রাধিকারমূলক শুল্কের জন্য যোগ্যতা অর্জন করা যায়। এছাড়া প্রতিযোগিতা বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প গড়ে তোলা প্রয়োজন।

যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে বাংলাদেশের আফ্রিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মধ্যপ্রাচ্যেও বাজার সম্প্রসারণ করা উচিত। বাংলাদেশের সম্ভাব্য বিস্তৃত পণ্য ও বাজারভিত্তি অবশ্যই এটিকে কেন্দ্রীভূত ঝুঁকি এড়াতে ও আলোচনার শক্তি বাড়াতে সাহায্য করবে।

 

 

বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করা

শুরু থেকেই সরকারি-বেসরকারি যৌথ ফোরাম গঠন করা উচিত ছিল। আলোচনা চলাকালে বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে অনুপস্থিত ছিল। ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমার মাত্র কয়েক মিনিট আগ পর্যন্ত তাদের অন্ধকারে রাখা হয়েছিল, যা সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা ও সমন্বয়কে ক্ষতিগ্রস্ত করে। শুল্ক কার্যকর হওয়ার মাত্র ১০ দিন আগে বাংলাদেশের রফতানি সমিতিগুলো (বিশেষ করে বিজিএমইএ) প্রচেষ্টা সমর্থন করার জন্য মার্কিন লবিং ফার্ম নিয়োগ শুরু করে। কিন্তু সময়ের অভাবে অগ্রগতি সীমিত ছিল। এ প্রসঙ্গে থাইল্যান্ড সমন্বিত মন্ত্রণালয় এবং বেসরকারি খাতের প্লাটফর্মের ওপর নির্ভর করেছিল; বাংলাদেশের প্রাথমিক যৌথ প্রচেষ্টার অভাব ছিল। বেসরকারি খাত অনেক দেরিতে মার্কিনভিত্তিক লবিস্ট (যেমন সিজিসিএন গ্রুপ, ব্যালার্ড) নিয়োগ করে, যা কার্যকারিতা সীমিত করে। বাংলাদেশের উচিত বাণিজ্য বিষয়ে সরকারি-বেসরকারি কৌশলগত ফোরামকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া। বাণিজ্য বিরোধে বাংলাদেশের উচিত এমন সরকারি-বেসরকারি জোটকে দ্রুত আনুষ্ঠানিক করা।

 

 

ভৌগোলিক অবস্থানকে কৌশলগতভাবে কাজে লাগানো

বাংলাদেশের উচিত কৌশলগত ভূগোলের সুবিধা নেয়া। এ প্রসঙ্গে ভিয়েতনাম নিজেকে এশিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদার হিসেবে উপস্থাপন করেছে। বাংলাদেশও একই ধরনের পথ অনুসরণ করতে পারে। থাইল্যান্ড নিজেকে একটি আসিয়ান লজিস্টিকস ও বিনিয়োগ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। বাংলাদেশও বঙ্গোপসাগর এবং দক্ষিণ এশিয়ায় তার প্রবেশাধিকারকে কাজে লাগাতে পারে। এছাড়া বাংলাদেশ নিজেকে দক্ষিণ এশিয়ায় পূর্ব ও পশ্চিম উভয়ের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য ভ্যালু-চেইন অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

 

 

মার্কিন নীতিনির্ধারক ও ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে কাজ করা

বাংলাদেশের উচিত মার্কিন নীতিনির্ধারক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করা। এছাড়া বাংলাদেশের উচিত মার্কিন আমদানিকারক, আইনপ্রণেতা এবং স্থানীয় লবিগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা। ভবিষ্যতে আরো ভালো শুল্ক শর্ত নিশ্চিত করার জন্য কৌশলগত কূটনীতি ও অভ্যন্তরীণ সংস্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।

 

 

প্রবাসীদের সম্পৃক্ত করা

প্রভাবশালী প্রবাসীরা মার্কিন আইনপ্রণেতাদের ওপর চাপ সৃষ্টিতে সাহায্য করতে পারে। বাণিজ্য বিষয়ে বাংলাদেশের প্রবাসীদের সম্ভাবনা এখনো অব্যবহৃত রয়ে গেছে। বাংলাদেশ প্রবাসী কূটনীতি, জাতিসংঘ সক্রিয়তা ও এলডিসি ফোরামের মাধ্যমে তার কণ্ঠস্বর বাড়াতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বৃহৎ রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ফিলিপিনো-আমেরিকান সম্প্রদায় জিএসপি সুবিধা রক্ষা করতে সাহায্য করেছিল, যা বাংলাদেশ এখনো কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারেনি। পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পেশাজীবী ও ব্যবসায়ী নেতাদের কাজে লাগিয়েছে; বাংলাদেশও একই ধরনের প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পারে। ইন্দোনেশিয়া তার ব্যবসায়ী সম্প্রদায় ও প্রবাসী নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তা ও থিংক ট্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। বাংলাদেশের মার্কিনভিত্তিক প্রভাবশালী প্রবাসী নেটওয়ার্ক কাজে লাগানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

 

 

মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে যুক্ত করা

বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে মার্কিন কোম্পানির সমর্থন অর্জন বাংলাদেশের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। ভিয়েতনাম সক্রিয়ভাবে মার্কিন কোম্পানিগুলোর সঙ্গে কাজ করেছে যাতে তারা ওয়াশিংটনে মিত্র হিসেবে কাজ করতে পারে। মালয়েশিয়া ইউএস-আসিয়ান বিজনেস কাউন্সিল ও বহুজাতিক বিনিয়োগকারীদের কাজে লাগিয়েছে। একইভাবে ইন্দোনেশিয়ার রফতানিকারক ও সরকারি সংস্থাগুলো সক্রিয়ভাবে সমন্বয় করেছে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদারদের সঙ্গে। বাংলাদেশের উচিত ওয়াশিংটনে একই ধরনের মার্কিন কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা।

আঞ্চলিক জোটগুলোর মাধ্যমে সুবিধা নেয়া

বাংলাদেশ আঞ্চলিক জোটগুলোকে কাজে লাগিয়ে তার আলোচনার সক্ষমতা বাড়াতে পারে। ইন্দোনেশিয়া নিজেকে একটি গঠনমূলক মার্কিন অংশীদার হিসেবে উপস্থাপন করতে আসিয়ান ও ইন্দো-প্যাসিফিকের অবস্থানকে ব্যবহার করেছে। একইভাবে চীন-মার্কিন চাপ থেকে বাঁচতে আসিয়ান এবং ব্রিকসকে ব্যবহার করেছে। বাংলাদেশ বিমসটেক, ওআইসি বা গ্লোবাল সাউথ জোটের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতে পারে।

 

 

 

অবশেষে বাংলাদেশ-মার্কিন শুল্ক আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাধাগুলোর সম্মুখীন হয়। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি বাড়িয়ে ঘাটতি কমানোর মাধ্যমে এবং ভূরাজনৈতিক গুরুত্বকে কাজে লাগিয়ে অনুকূল বাণিজ্য শর্ত বজায় রেখে ট্রাম্প যুগের বাণিজ্য চাপ মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়েছে।

 

 

এ শুল্ক আলোচনা এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদীয়মান বাণিজ্য অংশীদারত্বকে (অর্থাৎ বাংলাদেশকে) দৃঢ় করার একটি সুযোগ উপস্থাপন করে। শ্রম, ভর্তুকি এবং ভূরাজনীতির বিষয়ে মতপার্থক্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করলেও একটি সুষম চুক্তি থেকে উভয় দেশেরই লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশী পণ্যের ওপর নতুন ২০ শতাংশ শুল্ক গত ৭ আগস্ট থেকে কার্যকর হয়। এটি বলা যায় যে শুল্ক আলোচনা যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর কৌশলগত উদ্দেশ্য দ্বারা প্রভাবিত।

 

 

যেমন চীনের ওপর নির্ভরতা কমানো ও বাংলাদেশের কাছ থেকে ভূরাজনৈতিক সমর্থন আদায় করা।

প্রথমত, বাংলাদেশ মার্কিন পণ্য (যেমন উড়োজাহাজ, এলএনজি, কৃষিপণ্য) ক্রয় বাড়িয়ে বাণিজ্য সম্পর্ক ভারসাম্যপূর্ণ করার চেষ্টা করে। এটি ট্রাম্প প্রশাসনের চাপ কমাতে সাহায্য করে। এ পদ্ধতি বাংলাদেশকে তার রফতানিনির্ভর অর্থনীতি রক্ষা করতে ও একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন বাজারে প্রবেশাধিকার বজায় রাখতে সাহায্য করে।

 

 

 

দ্বিতীয়ত, একটি বৃহত্তর কৌশলগত এজেন্ডা এগিয়ে নেয়ার জন্য মার্কিন প্রশাসন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ পোশাক শিল্পের জন্য বাজার প্রবেশাধিকারকে ভূরাজনৈতিক বিষয়গুলোর সঙ্গে যুক্ত করে। নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট (এনডিএ) স্বাক্ষরের কারণে ভূরাজনৈতিক বিষয়ে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রকে যে ছাড়গুলো দিয়েছে, সে সম্পর্কে জনসাধারণের কাছে সীমিত তথ্য রয়েছে।

আশা করা যায়, বাংলাদেশ ভূরাজনৈতিক কৌশলকে ভারসাম্যপূর্ণ করতে সক্ষম। তবে বাংলাদেশের উচিত মার্কিন-চীন উত্তেজনাকে সতর্কতার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ করা। এতে করে বাংলাদেশ আঞ্চলিক জোটগুলোয় আরো সুষম পদ্ধতির মাধ্যমে উপকৃত হতে পারে।

 

 

ড. সাজ্জাদ মোহাম্মদ জসীমউদ্দীন: কেজ বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক ও জিওপলিটিকস স্ট্র্যাটেজি ল্যাবের (ফ্রান্স) প্রধান। এর আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও চীনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন