কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

লাদাখের সংগ্রাম এবং ভারতের ‘অধিকার সংকুচিত গণতন্ত্র’

ড. মাহফুজ পারভেজ [প্রকাশ: যুগান্তর, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫]

লাদাখের সংগ্রাম এবং ভারতের ‘অধিকার সংকুচিত গণতন্ত্র’

লাদাখ জ্বলছে আন্দোলনের তীব্রতায়। এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি ভারতে ‘অধিকার সংকুচিত গণতন্ত্র’-এর চেহারা স্পষ্ট করছে। ভারতে জনদাবি ও শাসনের মধ্যে সংলাপ ও সমঝোতার বদলে সরকারি নিপীড়নের একাধিক ঘটনা সেখানে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অবক্ষয়ের মাধ্যমে কর্তৃত্ববাদের শক্তি বৃদ্ধির আলামত প্রকাশ করছে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশভারত বিভাজিত হওয়ার পর থেকেই উত্তপ্ত লাদাখ। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কাশ্মীর নিয়ে সংঘাত শুরু হলে লাদাখও এ সংঘাতের অংশ হয়ে ওঠে। কারণ, লাদাখ বা ‘লা-দ্বাগস’ (উচ্চ পথের দেশ) বর্তমানে ভারতের একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হলেও এক সময় ছিল স্বাধীন রাজ্যের অংশ। রাজনৈতিক পালাবদলের নানা শাঠ্য ও ষড়যন্ত্রের কারণে লাদাখের নানা অংশ বর্তমানে ভারত, পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে বিভাজিত হয়ে অখণ্ডতা হারিয়েছে।

 
 

লাদাখের জনগণ গত ছয় বছর ধরে শান্তিপূর্ণ মিছিল ও অনশন করেছে ভারতের কাছ থেকে বৃহত্তর সাংবিধানিক সুরক্ষা এবং রাজ্যের অধিকার পাওয়ার দাবিতে। বারবার আন্দোলন করে চরম নিগ্রহের শিকার হয়ে অবশেষে সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে হিমালয়ের উঁচু শীতল মরুভূমি অঞ্চল লাদাখ জেন-জি তরুণদের নেতৃত্বে সহিংস বিক্ষোভে কেঁপে ওঠে। তরুণরা ভারতের শাসক দল বিজেপির আঞ্চলিক কার্যালয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। হতাহত ও রক্তপাতের ঘটনাও ঘটে। উত্তেজনা আপাতত প্রশমিত হলেও জনতার হৃদয়ে চলছে রক্তক্ষরণ ও আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার দামামা। জনতার স্পষ্ট দাবি, লাদাখকে সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের অন্তর্ভুক্ত করা এবং পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের মর্যাদা দেওয়া হোক। লাদাখের পার্শ্ববর্তী জম্মু ও কাশ্মীর অনুরূপ অধিকার ও দাবি আদায়ের আন্দোলনে উত্তপ্ত ও অস্থির।

 

 

২০১৯ সালে নরেন্দ্র মোদির বিজেপি সরকার ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের মাধ্যমে জম্মু-কাশ্মীর রাজ্যকে ভাগ করে লাদাখকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ঘোষণা করলে সেখানকার মানুষ প্রথমে উচ্ছ্বসিত হয়। কিন্তু ধীরে ধীরে রাজনৈতিক শূন্যতা ও হিন্দুত্ববাদী আগ্রাসন স্পষ্ট হতে থাকায় সংখ্যালঘু মানুষের রাজ্য লাদাখ অগ্নিগর্ভ হতে থাকে। রাজধানী লেহ-এর বৌদ্ধ এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর কার্গিলের মুসলিম সমাজ একত্রিত হয়ে রাজ্যের মর্যাদা ফিরে পাওয়ার আন্দোলনে নামেন। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় তরুণ-যুব সমাজের নেতৃত্বে শৈল-রাজ্য লাদাখে দেখা দিয়েছে রাজনৈতিক দাবানল।

 

 

লাদাখের বর্তমান আন্দোলনকে জানতে ইতিহাসের দিকে তাকাতে হয়। লাদাখের সবচেয়ে বড় শহর ও রাজধানী হলো লেহ। দ্বিতীয় বড় শহর পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী কার্গিল। লেহ জেলা সিন্ধু, শিওক এবং নুব্রা নদীর উপত্যকা নিয়ে গঠিত। কার্গিল জেলা সুরু, দ্রাস এবং জানস্কার নদীর উপত্যকা নিয়ে গঠিত। এখানকার প্রধান জনবসতিগুলো নদী উপত্যকায় অবস্থিত আর পাহাড়ের ঢালগুলোতে যাযাবরদের (চাংপাদের) বাসস্থান। এ অঞ্চলের প্রধান ধর্মীয় গোষ্ঠী মুসলিম (প্রধানত শিয়া) (৪৬ শতাংশ)। তারপর বৌদ্ধ (প্রধানত তিব্বতি বৌদ্ধ) (৪০ শতাংশ), হিন্দু (১২ শতাংশ) এবং অন্যান্য (২ শতাংশ)। তিব্বতি সংস্কৃতি দ্বারা লাদাখ প্রচণ্ডভাবে প্রভাবিত হওয়ায় ‘ক্ষুদ্র তিব্বত’ নামে পরিচিত।

 

 

লাদাখ হলো সবচেয়ে বড় এবং জনসংখ্যা অনুসারে দ্বিতীয় সর্বনিু জনবহুল কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল এবং ভারতের অহিন্দু-প্রধান এলাকা। ১৯৪৭ সালের আগে হিমালয়ের পাদদেশে রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ ছিল লাদাখ। লাদাখ, কাশ্মীর, জম্মু, গিলগিট, বাল্টিস্থান ইত্যাদি এলাকা দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশের সঙ্গে মহাচীন ও মধ্য এশিয়ার সংযোগস্থল হিসাবে পরিচিত ছিল। রাজনৈতিক বিভাজন এ বৃহত্তর অঞ্চলকে খণ্ডিত করায় সেই গৌরব এখন আর নেই। বিশেষত, ১৯৪৯ সালের পাক-ভারত যুদ্ধবিরতির পর লাদাখের দক্ষিণ-পূর্ব অংশ ভারতের নিয়ন্ত্রণে আসে। বাকি অংশ থেকে যায় পাকিস্তান এবং চীনের মধ্যে। এতে লাদাখ এবং কাশ্মীর, জম্মু, গিলগিট, বাল্টিস্থান বহুধাবিভক্ত এবং বিরোধপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। জনতার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হয়ে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখার ও সংগ্রাম করার পথও রুদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

 

 

লাদাখ অতীতে তিব্বতের অংশ ছিল এবং পরে ডোগরা শাসনাধীনে এসে ১৮৪৬ সালে জম্মু ও কাশ্মীরের সঙ্গে একীভূত হয়। বর্তমানে লাদাখের পূর্বে তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল, দক্ষিণে ভারতের হিমাচল রাজ্য, ভারতীয় কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল জম্মু ও কাশ্মীর এবং পশ্চিমে পাকিস্তানশাসিত গিলগিট-বাল্টিস্থান এবং চীনের জিনজিয়াং প্রদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম কোনটি অবস্থিত। প্রকৃত লাদাখ কারাকোরাম পাস, সিয়াচেন হিমবাহ হয়ে গ্রেট হিমালয় পর্যন্ত বিস্তৃত।

 

 

ঐতিহাসিককাল ধরে বাল্টিস্থান উপত্যকা, সিন্ধু নদ উপত্যকা, জাংস্কার, লাহুল ও স্পিটি, রুদোক ও গুজসহ আকসাই চীন (১৯৬৩ সাল থেকে চীনশাসিত কাশ্মীর অঞ্চল) এবং নুব্রা উপত্যকা লাদাখের অংশ ছিল। অতীতে লাদাখ গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ সিল্ক রুটের সংযোগস্থল ছিল। ১৯৪৭ সালে ঔপনিবেশিক বিভাজনে লাদাখ সংকুচিত হয়ে গুরুত্ব হারায়। ষাটের দশকে ভারতের সঙ্গে বিরোধের কারণে চীনা কর্তৃপক্ষ তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল এবং লাদাখের মধ্যে সীমান্ত বন্ধ করে দিলে লাদাখের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও যোগাযোগ গুরুত্ব আরও কমে যায়। আরেক পাশে পাকিস্তানও যোগাযোগ সীমিত করে দেয়। ফলে এখনকার লাদাখ ভারতীয় সামরিক স্থাপনার শক্তিশালী ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

 

 

লাদাখকে রাজ্যের মর্যাদা দেওয়ার দাবি এই প্রথম নয়। ২০১৯ সালে জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা লোপ এবং সাবেক রাজ্য ভাগের পরে আলাদা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছিল লাদাখ। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা পাওয়ার দাবি দানা বাঁধছে উত্তর ভারতের এ প্রান্তিক অঞ্চলে। গত কয়েক বছর ধরে এ নিয়ে ধারাবাহিক আন্দোলনও চলছে। জলবায়ু কর্মী সোনম এ আন্দোলনের অন্যতম মুখ। তার বক্তব্য, লাদাখকে সংবিধানের ষষ্ঠ তফশিলের আওতাভুক্ত করে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা দেওয়া হোক। পাশাপাশি, লাদাখের জন্য একটি পৃথক পাবলিক সার্ভিস কমিশন গঠন, লেহ এবং কার্গিল জেলার জন্য পৃথক লোকসভা আসন-এমনই নানা দাবি নিয়ে বারবার সরব হয়েছে জনতা। অতীতে বেশ কয়েকবার অনশনেও বসেছে লাদাখের মানুষ। গত বছরের মার্চ মাসে ২১ দিন অনশন করেছিলেন সোনম। ওই বছরেরই অক্টোবরে দিল্লির লাদাখ ভবনের সামনে ফের অনশনে বসেন তিনি। সেখান থেকে তাকে থানাতেও তুলে নিয়ে যায় দিল্লি পুলিশ। কিন্তু তাতে দমেননি তিনি। শেষমেশ কেন্দ্রের তরফে লাদাখের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মুখোমুখি আলোচনায় বসার প্রতিশ্রুতি পেয়ে তিনি অনশন ভাঙেন।

 

 

চলতি বছরের ১০ সেপ্টেম্বর লাদাখকে রাজ্যের মর্যাদার দাবিতে ফের অনশন শুরু করেন সোনম। যদিও ওই সময়ে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি (এইচপিসি), এইচপিসির সাব কমিটি এবং স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে কথা চলছিল কেন্দ্রের। লেহ অ্যাপেক্স বডি এবং কার্গিল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্সের সঙ্গেও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিল ভারত সরকার। কেন্দ্রের দাবি, ইতোমধ্যে আলোচনার মাধ্যমে নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। যেমন, লাদাখে তফশিলি উপজাতিদের জন্য সংরক্ষণ ৪৫ থেকে বাড়িয়ে ৮৪ শতাংশ করা হয়েছে। কাউন্সিলের মোট আসনের এক-তৃতীয়াংশ মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত করা হয়েছে। ভোটি এবং পুর্গিকে সরকারি ভাষা ঘোষণা করা হয়েছে। ইতোমধ্যে, ১,৮০০টি শূন্যপদে নিয়োগও শুরু হয়ে গিয়েছে। ৬ অক্টোবর আরেকটি এইচপিসি সভার দিনক্ষণ নির্ধারিত ছিল। ২৫ এবং ২৬ সেপ্টেম্বর লাদাখের নেতাদের সঙ্গেও অতিরিক্ত সভা করার কথা ছিল কেন্দ্রের। কিন্তু কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, এ পদক্ষেপগুলো সত্ত্বেও নাকি কিছু ব্যক্তি ‘রাজনৈতিক কারণে’ এইচপিসির অগ্রগতিতে অসন্তুষ্ট। তারা ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে’ গোটা আলোচনা বানচাল করার চেষ্টা করছেন। সে কারণেই ৬ অক্টোবরের বৈঠকের ঠিক আগে এভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হচ্ছে লাদাখে। কিন্তু আন্দোলনকারীরা দাবি করেছেন, ভারতের কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠীর অবহেলা ও বিমাতাসুলভ আচরণের শিকার লাদাখ। কেন্দ্র জম্মু, কাশ্মীর এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রান্তিক রাজ্যগুলোর মতো লাদাখেরও গলা টিপে ধরা হয়েছে। আমলাতান্ত্রিক নীতিতে আলোচনার নামে কালক্ষেপণ করা হচ্ছে, জনদাবি মানা হচ্ছে না।

 

 

 

গণমাধ্যমের মতে, লাদাখে ১৯৮৯ সালের পরে এত বড় সহিংসতা এই প্রথম দেখা গেল-২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে। সেখানকার প্রধান শহর লেহতে কারফিউ বাস্তবায়নে পুলিশের পাশাপাশি আধা সামরিক বাহিনী মোতায়েন হয়েছে। পরিস্থিতি সমাধানে লেহতে একজন ‘বিশেষ দূত’ পাঠিয়েছে নয়াদিল্লি। অন্যদিকে অঞ্চলের লেফটেন্যান্ট গভর্নর কোবিন্দর গুপ্তর সভাপতিত্বে একটি নিরাপত্তা পর্যালোচনা সভা হয়েছে, যেখানে শীর্ষ কর্তাব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। সমস্যার সমাধান আলোচনার টেবিলে হলে সবদিক থেকেই ভালো। কিন্তু আধিপত্য ও আগ্রাসনের মনোভাব থাকলে সেটা মোটেও সম্ভব হবে না। বিশেষত, ভারতের মূলধারার রাজনীতি সবসময়ই প্রান্তিক ও সংখ্যালঘু অঞ্চল ও জনগোষ্ঠীর দাবিকে দমন করেছে শক্তি দিয়ে। অতীতে পাঞ্জাবের আন্দোলনকে সহিংস পন্থায় রুদ্ধ করা হয়। কাশ্মীরে প্রতিদিন আহত-নিহত হচ্ছে আন্দোলনকারীরা। মনিপুর, নাগাল্যান্ড, আসাম, মিজোরাম, অরুণাচলে থেমে থেমে আন্দোলন চলছে।

 

 

ভারতীয় রাষ্ট্রব্যবস্থায় সংখ্যালঘু জাতি ও প্রান্তিক অঞ্চলের বঞ্চনা এসব আন্দোলনের প্রধান কারণ। রাষ্ট্র ও সরকার যদি বিশেষ ধর্ম, জাতি ও গোষ্ঠীর প্রতি মনোযোগী হয়ে অন্যদের অবজ্ঞা ও নিপীড়ন করে, তাহলে বিক্ষোভ ও আন্দোলন সঞ্চারিত হওয়াই স্বাভাবিক। লাদাখেও তেমনটিই হচ্ছে। সাংবিধানিক সুরক্ষা ও আলাদা রাজ্যের দাবি কোনো রাষ্ট্রদ্রোহিতা বা চরমপন্থার বিষয় নয়, গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্ন। রাষ্ট্র, সরকার, সংবিধান ও শাসন কাঠামো যদি এসব জনদাবি মানতেও অস্বীকৃতি জানায় এবং বলপ্রয়োগ করে, তাহলে গণতান্ত্রিক শাসনধারার কার্যকারিতা নিয়েই সন্দেহ দেখা দেয়। লাদাখ ও অন্যান্য অবদমিত অঞ্চল ও জাতিসত্তার জনদাবি যদি নিয়মতান্ত্রিক পথে মীমাংসা না করা হয়, তাহলে সেখানকার দাবানল আরও বিস্তৃত হবে এবং ভারতের গণতান্ত্রিক শাসন, মানবাধিকার, ন্যায়বিচার সম্পর্কে জোরালো প্রশ্ন উঠবে।

 

 

 

উল্লেখ্য, ভারতীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা সাংবিধানিকভাবে একটি ফেডারেল বা যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা, যেখানে গণতান্ত্রিকভাবেই বিভিন্ন ধর্ম, জাতি, ভাষা ও জাতিসত্তার সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও সুরক্ষা পাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে রাষ্ট্র ও সরকার বিশেষ কোনো ধর্ম, জাতি, অঞ্চলের বা গোষ্ঠীর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে অবদমিত করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যে কারণে ভারতের নানা প্রান্তে বিক্ষোভ ও প্রতিরোধ আন্দোলন জন্ম নিচ্ছে। লাদাখের বর্তমান আন্দোলন ও দাবিগুলো ভারতের বিদ্যমান ঐতিহাসিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। কেন্দ্রের পক্ষে শক্তি দিয়ে লাদাখের জনগণের আন্দোলন থামানোর ঘটনা নিন্দনীয় এবং গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের পরিপন্থি।

 

 

 

রাষ্ট্র ও সরকার যখন ন্যায়সংগত জনদাবিকে উপেক্ষা করে, বা বলপ্রয়োগ ও দমননীতির মাধ্যমে আন্দোলনকে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে, তখন গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে। বৈধতা (legitimacy) যে কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি-যদি জনগণ রাষ্ট্রকে ন্যায্য ও নিরপেক্ষ রূপে না দেখে, তবে তার প্রতি আনুগত্য দুর্বল হয়ে বৈধতা ও বিশ্বাসের পতন ঘটে। ভারতের লাদাখ ও অন্যান্য অবদমিত অঞ্চলের ক্ষেত্রে সেই বৈধতার সংকট সুস্পষ্ট।

 

 

যদিও যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন কাঠামোর বিধিমোতাবেক ভারতের সংবিধান কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেয়, তথাপি সাম্প্রতিক ঘটনাবলিতে দেখা যাচ্ছে, কেন্দ্রীয় সরকার ক্রমাগতভাবে রাজ্যগুলোর স্বায়ত্তশাসন হ্রাস করছে এবং একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। ২০১৯ সালে জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা (Article 370) বাতিল এবং লাদাখকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করা এর নিকৃষ্ট উদাহরণ। লাদাখবাসী কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রযন্ত্র কেবল শাসক নয়, এক ধরনের আধিপত্যবাদী শক্তি হিসাবে বিবেচনা করছে। জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ (UDHR, 1948) এবং আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার চুক্তি (ICCPR, 1966) অনুসারে প্রতিটি জনগোষ্ঠীর রয়েছে সমঅধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার অধিকার। লাদাখবাসীর দাবি এসব আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত মৌলিক অধিকারের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু ভারতীয় রাষ্ট্র এসব দাবি অস্বীকার করছে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তিকে প্রতিনিয়ত প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

 

 

যদি লাদাখ এবং ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের ন্যায়সংগত দাবিগুলো নিয়মতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক পথে সমাধান না করা হয়, তবে ক্ষোভের আগুন দাবানলের মতো সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে। ফলে কেবল লাদাখ নয়, ভারতের অন্যান্য জাতিসত্তা ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীও বিদ্রোহী হয়ে উঠতে পারে। এ পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত ভারতের গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার সম্পর্কে গভীর সন্দেহ সৃষ্টি করবে এবং ভারতের পরিচয় ‘বিশুদ্ধ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার’ পরিবর্তে ‘অধিকার সংকুচিত গণতন্ত্র’ (shrinking democracy) হিসাবে চিহ্নিত হবে।

 

 

প্রফেসর ড. মাহফুজ পারভেজ : চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়