কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বাংলাদেশের ক্ষুদ্র অর্থায়ন খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে

মোস্তফা কে. মুজেরী [প্রকাশ: বণিকবার্তা, ১ জানুয়ারি ২০২৬]

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বাংলাদেশের ক্ষুদ্র অর্থায়ন খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে

উন্নয়নশীল বিশ্বজুড়ে দরিদ্র ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর আর্থিক অন্তর্ভুক্তির জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে এআই আর্থিক পণ্য এবং পরিষেবাগুলো কীভাবে ডিজাইন ও সরবরাহ করা হয় তা পুনরায় সংজ্ঞায়িত করছে। এটি আর্থিক পরিষেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের, বিশেষ করে যারা ব্যাংকিং সুবিধার বাইরে তাদের চাহিদা পূরণের জন্য বিশেষভাবে সৃষ্ট আর্থিক পণ্য ও পরিষেবা ডিজাইন ও সরবরাহ করার সক্ষমতা প্রদান করে।

 
 

উপরোক্ত এবং অন্যান্য সুবিধার পরিপ্রেক্ষিতে দক্ষতা বৃদ্ধি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে এআই বাংলাদেশের ক্ষুদ্র অর্থায়ন খাতে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক রূপান্তর বাস্তবায়ন করতে পারে। এ ধরনের এআই ব্যবহার ক্ষুদ্র অর্থায়ন প্রতিষ্ঠানগুলোকে (এমএফআই) কার্যক্রম আরো কার্যকর করতে, পরিষেবাগুলোকে নির্দিষ্ট ক্লায়েন্টকেন্দ্রিক করতে এবং ব্যয় কমাতে সাহায্য করবে। কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হলে এআই বাংলাদেশের ক্ষুদ্র অর্থায়ন খাতের জন্য প্রধান রূপান্তরকারী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। বাস্তবে এমএফআইগুলো এআইয়ের সম্ভাবনাকে ব্যবহার করে ক্ষুদ্র অর্থায়ন পণ্য এবং পরিষেবাগুলোকে আরো দক্ষ ও সহজলভ্য এবং এমএফআই ক্লায়েন্টদের চাহিদার প্রতি আরো অধিক প্রতিক্রিয়াশীল করে তোলার ক্ষমতার বিকাশ করতে পারে। ক্ষুদ্র অর্থায়ন খাতের জন্য, সংযোগ বৃদ্ধির পাশাপাশি এমএফআইগুলোর মোবাইল অর্থের ব্যাপক ব্যবহারের মাধ্যমে এআইয়ের প্রযোজ্যতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে।

 
 
 
 
 
 
 
 
 
উদাহরণস্বরূপ, এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে, স্বয়ংক্রিয় ঋণ প্রক্রিয়াকরণ যেখানে এআই-চালিত সিস্টেম ঋণের আবেদন প্রক্রিয়াকরণ এবং যাচাই করতে পারে, অপটিক্যাল ক্যারেক্টার রিকগনিশন (ওসিআর) ব্যবহার করে নথি থেকে তথ্য আহরণ করতে পারে এবং প্রাথমিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ঋণ বিতরণের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করতে পারে। উপরন্তু, গ্রাহক পরিষেবা প্রদান সহজ করে তোলে, যেখানে এআই-চালিত চ্যাটবট ও ভার্চুয়াল সহকারীরা ২৪/৭ সর্বকালীন বহুভাষিক সহায়তা প্রদান করে, নিয়মিত প্রশ্নের উত্তর দেয় এবং ব্যবহারকারীদের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্দেশনা দেয়, যা পরিচালনা ব্যয় হ্রাস করে এবং গ্রাহক সন্তুষ্টি উন্নত করে। ডাটা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এআই ডাটা এন্ট্রি স্বয়ংক্রিয় করে, অ্যাকাউন্টগুলোর সমন্বয় সাধন এবং প্রতিবেদন তৈরি করে, ফলে মানবিক ত্রুটিগুলো হ্রাস করে এবং আর্থিক তথ্যের নির্ভুলতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করে। জালিয়াতি শনাক্তকরণ সহজ করে তোলে, যার অধীনে এআই অ্যালগরিদম রিয়েল টাইমে বিশাল ডাটাসেট বিশ্লেষণ করে প্রতারণামূলক কার্যকলাপ, অসংগতি এবং সন্দেহজনক ধরন শনাক্ত করে, যেমন পরিচয় জালিয়াতি বা অস্বাভাবিক লেনদেন। এটি আর্থিক ক্রিয়াকলাপের নিরাপত্তা বৃদ্ধি করে, গ্রাহকের আস্থা সৃষ্টি করে এবং আর্থিক ক্ষতি কমাতে সাহায্য করে। এছাড়া ব্যক্তিগতকৃত আর্থিক পরিষেবা প্রদান সহজসাধ্য হয়, কারণ গ্রাহকের আর্থিক আচরণ এবং ব্যয়ের ধরন বিশ্লেষণ করে এআই ব্যক্তিগত চাহিদা অনুসারে পণ্যের সুপারিশ, সঞ্চয় পরিকল্পনা এবং পরিশোধের সময়সূচি তৈরিতে সহায়তা করতে পারে।
 
 
 
 

উপরোক্ত আলোচনা থেকে বোঝা যায়, এআইয়ের প্রয়োগ বাংলাদেশে ক্ষুদ্র অর্থায়ন খাতের পুনর্গঠনের জন্য সুযোগের এক নতুন জানালা খুলে দিতে পারে। অ্যালগরিদমিক তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে পণ্যের ব্যক্তিগতকরণ বৃদ্ধির মাধ্যমে এমএফআইগুলোকে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তা এবং দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের ব্যক্তিদের জন্য আর্থিক পণ্য এবং পরিষেবা তৈরি করতে সক্ষম করা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, এআই সহায়তাপ্রাপ্ত পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনার মধ্যে গ্রাহক তথ্য এবং গ্রাহক ও এমএফআইগুলোর পছন্দের ওপর ভিত্তি করে ব্যক্তিগতকৃত বিনিয়োগ পরামর্শ তৈরি করা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। একইভাবে এমএফআইগুলো এআইয়ের মাধ্যমে ঝুঁকি আরো নির্ভরযোগ্যভাবে মূল্যায়ন করতে পারে, এমনকি ক্রেডিট ইতিহাসবিহীন গ্রাহকদের জন্যও।

 

 

 

উদাহরণস্বরূপ, এআই ক্রেডিট স্কোরিংয়ে বিকল্প ডাটা ব্যবহার সক্ষম করার জন্য ভবিষ্যদ্বাণীমূলক অ্যালগরিদম তৈরিতে সহায়তা করবে। ক্রেডিট মূল্যায়নের মতো কাজগুলো স্বয়ংক্রিয় করার ফলে সময় ও ব্যয় কমবে, একই সঙ্গে নির্ভুলতা বাড়বে। চ্যাটবট ব্যবহারের ফলে এমএফআইগুলো অনেক কম খরচে ২৪ ঘণ্টা গ্রাহক পরিষেবা প্রদান করতে সক্ষম হবে। অধিকন্তু এআই এমএফআইগুলোকে সন্দেহজনক লেনদেনের ক্রমাগত শনাক্তকরণ করতে সক্ষম করবে, যা আর্থিক কার্যক্রমের নিরাপত্তা বৃদ্ধি করবে।

 

 

 

তবু অর্থপূর্ণ রূপান্তরের জন্য, ক্ষুদ্র অর্থায়ন খাতে এআইয়ের মসৃণ একীকরণের পথে থাকা বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে ওঠা প্রয়োজন। এটি উপলব্ধি করা দরকার যে বিশাল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এমএফআই কার্যক্রমে এআইকে একীভূত করা চ্যালেঞ্জমুক্ত নয়। এ প্রেক্ষাপটে একটি প্রধান সমস্যা হলো মানসম্পন্ন ডাটার প্রাপ্যতা ও অ্যাকসেস। প্রায়ই এআই মডেলগুলোকে প্রশিক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় ডাটা খণ্ডিত বা অপর্যাপ্ত থাকে, যা এআইয়ের কার্যকারিতা সীমিত করতে পারে। তদুপরি অ্যালগরিদমিক পক্ষপাতও রয়েছে। যদি ব্যবহৃত ডাটায় পক্ষপাত থাকে, তাহলে উৎপন্ন ফলাফলগুলো বৈষম্য প্রতিফলিত বা বৃদ্ধি করার ঝুঁকিতে পড়বে। আরেকটি প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো আর্থিক তথ্য সুরক্ষা এবং গোপনীয়তা ও সম্মতির সমস্যা। এআই সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা (‘ব্ল্যাক বক্স’ সমস্যা) এবং সংবেদনশীল গ্রাহক ডাটার গোপনীয়তা রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক বিবেচনা, যার জন্য শক্তিশালী শাসন কাঠামো এবং মানব তত্ত্বাবধান প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করার সময়, এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি উচ্চ অগ্রাধিকার হয়ে ওঠে।

 

 

 

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এআইয়ের নীতিগত ও ফলদায়ক ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য এমএফআইগুলোর মধ্যে কার্যকর সহযোগিতার বিস্তার। এমএফআইয়ের কার্যক্রমে এআইয়ের প্রভাব সর্বাধিক করার জন্য গ্রাহকদের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে তাদের পণ্য ও পরিষেবাগুলোকে আধুনিকীকরণের জন্য এমএফআইগুলোর মধ্যে সহযোগিতামূলক প্রচেষ্টা প্রয়োজন। ব্যয় হ্রাস এবং কর্মসূচিতে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি নিশ্চিত করতে এমএফআইগুলোর ব্যবস্থাপনা কৌশল এবং পরিষেবা প্রদানের সঙ্গে এআইকে একীভূত করতে হবে। উদ্ভাবন ও প্রযুক্তির অগ্রভাগে থাকা এবং দক্ষ সমাধান বিকাশের ক্ষমতাসম্পন্ন ফিনটেকগুলোকে দেশের আর্থিক খাতের বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যে স্থানীয় প্রেক্ষাপট এবং বাংলাদেশের ক্ষুদ্র অর্থায়ন খাতের বৈশিষ্ট্যগুলোর সঙ্গে খাপ খাইয়ে ক্রমাগত উদ্ভাবন এবং কাঙ্ক্ষিত সমাধান গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া এমএফআই গ্রাহকদের সুরক্ষার পাশাপাশি উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করে এমন নিয়ন্ত্রণ কাঠামো সৃষ্টিতে নিয়ন্ত্রকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। এআইয়ের নৈতিক ব্যবহারের মান সুরক্ষার ক্ষেত্রেও তাদের সতর্ক থাকতে হবে।

 

 

 

 

প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে ক্ষুদ্র অর্থায়ন খাতে এআইয়ের কার্যকর ও দক্ষ ব্যবহার বিভিন্ন ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল অনুশীলনের ওপর নির্ভর করবে। যেমন: ১. পক্ষপাত (‘অ্যালগরিদম’ পক্ষপাত) এড়াতে এবং ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তা রক্ষা করতে ডাটার নৈতিক ব্যবহার; ২. এআই প্রদত্ত সুযোগগুলোকে সর্বাধিক করে তোলার জন্য এবং পরিবর্তন গ্রহণের ক্ষমতা বৃদ্ধি করার জন্য এমএফআই ব্যবস্থাপনা কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ; ৩. স্থানীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে তাদের চাহিদা অনুসারে সমাধান ডিজাইন। এ উদ্দেশ্যে পণ্য ও পরিষেবা নকশা সৃষ্টি প্রক্রিয়াকে গ্রাহকের চাহিদা ও পছন্দের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে, যাতে পণ্য ও পরিষেবাগুলোর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো যায়; ৪. আর্থিক পণ্য এবং পরিষেবাগুলোকে আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক করার জন্য এআইকে কাজে লাগানোর প্রয়োজন। অধিকন্তু অত্যাধুনিক এআই সিস্টেম স্থাপন বাস্তবে ব্যয়বহুল হতে পারে এবং অনেক এমএফআই সীমিত ইন্টারনেট সংযোগ এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামো বৈশিষ্ট্যযুক্ত এলাকায় কাজ করে। সুতরাং এমএফআইয়ের জন্য এআই প্রবর্তন ব্যয়বহুল হতে পারে, বিশেষ করে ছোট এমএফআইয়ের জন্য; যারা এআইতে বিশাল বিনিয়োগের দ্রুত রিটার্ন অর্জন করতে পারে না।

 

 

 

তা সত্ত্বেও এআইয়ের রূপান্তরমূলক ক্ষমতা দেখায় যে এটি ন্যায়সংগত এবং বৈষম্য হ্রাসকারী পরিবর্তনের একটি বাস্তব শক্তি হতে পারে, যা এমএফআই প্রদত্ত আর্থিক পণ্য ও পরিষেবাগুলোকে আরো সহজলভ্য এবং সবার জন্য উপকারী করে তুলতে সাহায্য করতে পারে। এআইয়ের সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণরূপে কাজে লাগানোর জন্য, এমএফআইগুলোর একে অন্যের সঙ্গে সহযোগিতা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; যাতে তারা ডাটা, স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তাসম্পর্কিত চ্যালেঞ্জগুলো যৌথভাবে মোকাবেলা করতে পারে; সেই সঙ্গে এটাও নিশ্চিত করতে পারে যে এআইয়ের ব্যবহার ন্যায়সংগত বিবেচনা ও মানবিক মর্যাদা দ্বারা পরিচালিত হয়। প্রকৃতপক্ষে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জনের জন্য ক্ষুদ্র অর্থায়ন খাতের সব অংশীদারের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন; যাতে নৈতিক এআই এমএফআইগুলোকে অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ‘কাউকে পেছনে না ফেলে’ এমন আর্থিক পণ্য ও পরিষেবা দিতে সক্ষম করে।

 

 

 

মোস্তফা কে মুজেরী: নির্বাহী পরিচালক, ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইএনএম)