কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

কৃষি অর্থনীতি : তরুণ প্রজন্মকে আকৃষ্ট করতে কৃষিকে ঢেলে সাজানোর প্রয়োজনীয়তা

ম্যাক্সিমো টোরেরো [প্রকাশ: বণিক বার্তা, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫]

কৃষি অর্থনীতি : তরুণ প্রজন্মকে আকৃষ্ট করতে কৃষিকে ঢেলে সাজানোর প্রয়োজনীয়তা

কৃষি মানুষের সবচেয়ে প্রাচীনতম পেশা হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বেশ ঝুঁকির মুখে রয়েছে খাতটি। বিশ্বজুড়ে কৃষকের গড় বয়স ক্রমে বাড়ছে। উন্নত দেশগুলোয় তা ৬০-এর কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। খাতটি বিশ্বব্যাপী প্রায় এক-চতুর্থাংশ কর্মসংস্থান সরবরাহ করে। যদি এ খাতে বিপুলসংখ্যক তরুণকে আকৃষ্ট করা না যায়, তাহলে এ খাত মারাত্মক সংকটে পড়বে।

 


আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ১৬ শতাংশ, অর্থাৎ ১২০ কোটি মানুষ ১৫-২৪ বছর বয়সী। এদের অনেকেই, বিশেষ করে উন্নয়নশীল বিশ্বে, চাকরির সংকটে ভুগছে। উদাহরণস্বরূপ, ২৫ বছরের কম বয়সীদের সংখ্যা আফ্রিকার জনসংখ্যার প্রায় ৬০ শতাংশ এবং ১৫-৩৫ বছর বয়সী এক-তৃতীয়াংশ আফ্রিকান বেকার।

 


কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। উন্নয়নশীল বিশ্বের তরুণরা এখনো উচ্চ বেতন ও সামাজিক মর্যাদাসম্পন্ন চাকরির খোঁজে গ্রাম ছেড়ে শহর বা বিদেশে চলে যাচ্ছেন। এ প্রবণতার কারণে কৃষি ও গ্রামীণ এলাকায় তরুণ কর্মীদের সংখ্যা কয়েক দশক ধরে কমছে।

কেনিয়ার কথা ধরা যাক, আফ্রিকার এ দেশে ১৯৯০ সালে যেখানে কৃষি খাতে তরুণদের কর্মসংস্থান ছিল ৫৮ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০২০ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৮ দশমিক ৫ শতাংশে। একইভাবে ২০২৫ সালে ইউরোপের মাত্র ১২ শতাংশ খামার ৪০ বছরের কম বয়সীরা পরিচালনা করছেন। লাতিন আমেরিকায় ২০৩০ সালের মধ্যে ১২ লাখ তরুণ কৃষি ছেড়ে দেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 

নতুন প্রজন্মকে কৃষিতে আকৃষ্ট করতে হলে এ খাতের পুরনো ধারণায় পরিবর্তন আনতে হবে। কৃষিকে তরুণদের কাছে ‘শেষ উপায়’ নয়, বরং অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি ‘প্রথম পছন্দ’ হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে। কারণ কৃষি শুধু ফসল ফলানো নয়, বরং এটি সরবরাহ চেইনের বিভিন্ন ধাপে—যেমন খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, পরিবহন, খুচরা বিক্রি এবং অন্যান্য সম্পর্কিত শিল্পেও—কর্মসংস্থান তৈরি করে।

 

কৃষি খাতের উন্নয়ন শুধু কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করে না, সামগ্রিক জীবনমানকেও উন্নত করে। নিম্ন আয়ের দেশগুলোয় কৃষিতে প্রবৃদ্ধি অন্য খাতের দুই-তিন গুণ বেশি কার্যকরভাবে দারিদ্র্য হ্রাস করে। একই সঙ্গে উন্নত কৃষি উৎপাদন পুষ্টি ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

 

 

কৃষির একটি বড় সমস্যা হলো এর নেতিবাচক ভাবমূর্তি। তরুণরা সাধারণত কৃষিকে নোংরা, প্রযুক্তিহীন, কম আয়ের এবং নিম্ন মর্যাদার কাজ হিসেবে দেখেন। যদি সরকার সত্যিই তরুণদের কৃষিতে আগ্রহী করতে চায়, তবে এর লাভজনকতা, ব্যাপ্তি এবং পরিধিকে তুলে ধরতে হবে। এজন্য ভূমি মালিকানা ব্যবস্থার সংস্কার, উচ্চ মজুরি নিশ্চিত করা এবং উদ্যোক্তাসহায়তা প্রদানের মতো নীতিগত পরিবর্তন আনা জরুরি।

 

 

প্রায়ই সরকারের নীতিগুলো কম লাভজনক কৃষিভিত্তিক কার্যক্রমের ওপর গুরুত্ব দেয়, যা আর্থিক স্থিতিশীলতা বা পেশাগত উন্নতির সুযোগ দেয় না। বরং তরুণদের কৃষি ক্ষেত্রের বাইরের কাজগুলোর দিকে উৎসাহিত করা উচিত যা শহরায়ণ, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত খাদ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, প্যাকেজিং, সংরক্ষণ ও বিতরণ। উদাহরণস্বরূপ, ঘানার ক্ষুদ্র কোকোচাষীদের সমবায় সংস্থা ‘কুয়াপা কোকো’ উৎপাদক ও শ্রমিকদের আয় বাড়াতে স্থানীয় প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রগুলোয় বিনিয়োগ করছে।

 

 

ভিয়েতনাম এখানে আমাদের সামনে উদাহরণ হিসেবে হাজির হতে পারে। দেশটির প্রধান ধান উৎপাদনকারী অঞ্চল মেকং ডেল্টাতেও খুব কম তরুণ কৃষি ক্ষেত্রে কাজ করতে আগ্রহী। বরং তারা কৃষি পরিষেবা, কৃষি গবেষণা এবং কৃষি ব্যবসাকে তাদের ভবিষ্যৎ পেশা হিসেবে দেখছেন। বাস্তবতা হলো, সেখানকার কৃষিপ্রযুক্তি স্টার্টআপগুলো (এগ্রি-টেক স্টার্টআপস) ক্ষুদ্র কৃষকদের অর্থায়ন এবং রফতানি বাজারে প্রবেশে সহায়তা করে সরবরাহ চেইনকে নতুনভাবে সাজাচ্ছে।

 

 

ক্ষুদ্র কৃষক ও খামারিদের সক্ষম ও শক্তিশালী করার পাশাপাশি শিল্পটিকে প্রসারিত করার জন্য ডিজিটাল সমাধান তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্রোয়েশিয়ায় বিশেষ সফটওয়্যার সরবরাহ ব্যবস্থা, পণ্য সংগ্রহ এবং হিসাবরক্ষণের কাজ স্বয়ংক্রিয় করে ছোট কৃষকদের খাদ্য উৎপাদনে মনোযোগ দিতে সাহায্য করছে। কলম্বিয়ায় একটি সাশ্রয়ী স্মার্টফোন অ্যাপ কমলা ও বাতাবি লেবুচাষীদের কৃষিবিদ এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যুক্ত করে ফসলের মান ও বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়াতে সহায়তা করছে। আফ্রিকার প্রেক্ষাপটে, ‘ফার্ম-টু-মার্কেট চেইন’-এর ৪০ শতাংশ এখন প্রক্রিয়াজাত ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনার অন্তর্ভুক্ত। বিষয়টি কৃষি খাতের ক্রমবর্ধমান আধুনিকতাকে নির্দেশ করে। এ ধারাকে কাজে লাগিয়ে যেসব ডিজিটাল প্লাটফর্ম কৃষকদের সরাসরি সরঞ্জাম সরবরাহকারী এবং ক্রেতাদের সঙ্গে যুক্ত করে, সেগুলো সেখানে দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করছে। এর ফলে ঐতিহ্যবাহী কৃষিকাজের বাইরেও নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে এবং তরুণরা এ আধুনিক কৃষি ব্যবস্থায় যুক্ত হতে উৎসাহিত হচ্ছেন।

 

 

এ খাতকে প্রসারিত করা সম্ভব হলে এটি গ্রামীণ ও শহুরে তরুণদের জন্য উচ্চ বেতন এবং দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থান তৈরি করবে। এতে প্রমাণ হবে যে কৃষি কেবল মাটিচাষ নয়, বরং তার চেয়েও অনেক বেশিকিছু। নীতিনির্ধারকদের উচিত, তরুণ প্রজন্মকে প্রয়োজনীয় সম্পদ ও দক্ষতা দিয়ে কৃষি এবং খাদ্য ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ ও টেকসই, উদ্ভাবনী কৃষি ব্যবসা গড়ে তুলতে সাহায্য করা। কারণ উন্নত কর্মসংস্থান তৈরি এবং বিশ্বের খাদ্য নিশ্চিত করার জন্য তরুণদের কৃষিতে সম্পৃক্ত করা এখন সময়ের দাবি।

 

স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

ম্যাক্সিমো টোরেরো: জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) মুখ্য অর্থনীতিবিদ