কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

কপ৩০ : জলবায়ু সংকটে গ্লোবাল সাউথ পথ দেখাচ্ছে

শশী থারুর [প্রকাশ : সমকাল, ২২ নভেম্বর ২০২৫]

কপ৩০ : জলবায়ু সংকটে গ্লোবাল সাউথ পথ দেখাচ্ছে

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি কার্বন শোষণকারী ব্রাজিলের বেলেম গ্রহের সবচেয়ে খারাপ পরিণতির জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করেছে। বেলেম আমাজনের প্রবেশদ্বার ও গ্রহের আশার কেন্দ্রস্থল। তবে এটি নিছক কোনো প্রতীকী বিষয় নয়। এটি কর্মফল ভোগ করারও মুহূর্ত, সবকিছু নতুন করে ভাবার সময়ও বলা যেতে পারে। গ্লোবাল সাউথ আবেদনকারী হিসেবে নয়, বরং একজন পথপ্রদর্শক হিসেবে এসেছে, যারা প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান, পর্যবেক্ষণ অবকাঠামো এবং সম্প্রদায় শাসন ব্যবস্থা-বিষয়ক জ্ঞানে সজ্জিত, যেগুলো যে কোনো বিশ্বাসযোগ্য জলবায়ু কৌশলের জন্য অপরিহার্য।

 

 

 

কপ৩০-এর মহাসচিব হিসেবে (গত বছর পর্যন্ত) ভারতে নিযুক্ত ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূত আন্দ্রে কোরিয়া দ্য লাগোকে নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত যথাযথ। কারণ ভারত কপ৩০-এ একটি কার্যকরী এজেন্ডা নিয়ে আসে। আমাদের শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞ অরুণাভ ঘোষ যেমন যুক্তি দিয়েছেন, ‘ডেলিভারি বা বাস্তবায়ন এখন বিশ্বাসের একমাত্র মুদ্রা।’ দক্ষিণ এখন আর নিছক প্রতিশ্রুতি ও অযৌক্তিকতা নিয়ে সন্তুষ্ট নয়। তারা ফলাফল দেখতে চায় এবং ক্রমবর্ধমানভাবে সেগুলো তৈরি করতে সক্ষম। আমাদের বন্ধু আর আন্দ্রে এমন এক মানুষ, যিনি কপ৩০কে অর্থ, অভিযোজন এবং ন্যায়সংগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ফলাফলের দিকে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত করবেন।

 

 


আমাজন ৯০ থেকে ১৪০ বিলিয়ন টন কার্বন শোষণ করে। তা নিছক কোনো শুভচিন্তার ফল নয়; বরং একটি গ্রহের প্রয়োজনীয়তা। এর সুরক্ষাও কোনো সদিচ্ছার বিষয় নয়; বরং যে কোনো বিশ্বাসযোগ্য বৈশ্বিক কার্বন বাজেট প্রণয়নের পূর্বশর্ত। ইতোমধ্যে এর যতটুকু পুনরুদ্ধার করা গেছে তা প্রমাণ করে– গ্লোবাল সাউথ নেতৃত্ব পেলে কাজ করে। স্বাস্থ্য খাতে জলবায়ু অভিযোজনের জন্য বেলেম স্বাস্থ্য কর্মপরিকল্পনা একটি সামষ্টিক ‘একক স্বাস্থ্য’ পদ্ধতির ওপর গুরুত্ব দেয়, যা প্রাণী, মানুষ ও বাস্তুতন্ত্রকে অন্তর্ভুক্ত করে।

 

 

অভিযোজন খাতের অর্থায়নে যে ঘাটতি রয়ে গেছে তা জলবায়ু কূটনীতির অব্যক্ত কেলেঙ্কারি। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী অভিযোজনের জন্য বার্ষিক ১৮৭ থেকে ৩৫৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন। তবুও প্রদত্ত তহবিলের একটি অংশ প্রায়ই শর্তযুক্ত থাকে এবং তা ধীরগতির ও স্থানীয়ভাবে নির্ধারিত অগ্রাধিকার থেকে বিচ্ছিন্ন। গত বছর ব্রাজিলের জি২০ সভাপতিত্বের পর কপ৩০ রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির একটি বিরল মুহূর্ত সামনে এনেছে। 

 

 


গ্লোবাল সাউথের দরকার ঋণমুক্ত অনুদান ও ক্ষতিপূরণ। বর্তমান অর্থায়ন মডেলগুলো ঋণের ওপর অত্যধিক নির্ভরশীল, যা ঋণের বোঝা আরও বাড়িয়ে তোলে। দক্ষিণকে কেবল আরও অর্থ নয়, বরং স্মার্ট মডেল দাবি করতে হবে। যেমন উত্তরের টেমপ্লেট বা ব্যবস্থাগুলো আমাদের ওপর চাপিয়ে না দিয়ে জৈব-অর্থনীতি, আদিবাসীর অধিকার, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর নেতৃত্বাধীন প্রাকৃতিক সংরক্ষণ ও সবুজায়নকে সমর্থন করে এমন অর্থায়ন প্রয়োজন। প্রযুক্তিগত সহায়তার ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য দরকার লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড এবং সান্তিয়াগো নেটওয়ার্কের মতো নতুন উপকরণগুলো এগিয়ে যাওয়ার পদক্ষেপ। তবে ন্যায্যতা, ফলাফলমুখী ও স্থানীয় এজেন্সির ওপর গুরুত্ব দিয়ে একটি সংস্কারকৃত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারলে এগুলো প্রতীকী হয়ে ওঠার ঝুঁকি রয়েছে। ইইউর কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম, যা কার্বনযুক্ত পণ্যের ওপর সীমান্ত কর আরোপ করে, যা দক্ষিণ বাণিজ্যের ওপর একটি অন্যায্য শুল্ক বোঝা চাপিয়ে দেয়।

 

 

বিশ্বে আরও সাহসী, আরও রূপান্তরধর্মী জাতীয় জলবায়ু কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন। বন উজাড় ও কার্বন মজুত চিহ্নিত করার জন্য যৌথ উপগ্রহ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা; সম্প্রদায়ভিত্তিক অভিযোজন এবং পুনরুদ্ধারের জন্য যৌথ প্রযুক্তিগত সহায়তা; টেকসই সাপ্লাই চেইন এবং সবুজ অবকাঠামোর জন্য একটি পারস্পরিক বিনিয়োগ বাহন; এর সঙ্গে অধিকার ও জীববৈচিত্র্যের জন্য শক্তিশালী সুরক্ষাসহ একটি দক্ষিণ-নেতৃত্বাধীন কার্বন ক্রেডিট কাঠামো দরকার।

 

 

এটি কোনো কাল্পনিক দৃষ্টিভঙ্গি নয়। দক্ষিণে ইতোমধ্যে মূল উপাদানগুলো বিদ্যমান। যেমন– ব্রাজিলের পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, ভারতের সৌর উদ্যান, ইন্দোনেশিয়ার পিটল্যান্ড পুনরুদ্ধার এবং নেপালের কমিউনিটি বনায়ন। মহাদেশজুড়ে এই বিন্দুগুলো সংযুক্ত করার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। 

 

 

দক্ষিণ এশিয়ার জলবায়ু কর্মসূচি কেবল কার্বন নির্গমন বিষয়ে আবদ্ধ নয়। এটি কর্মসংস্থান, ন্যায্যতা ও ক্ষমতায়নের প্রশ্ন। জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি ২৫ বছরের কম বয়সী হওয়ায় অঞ্চলটিতে জলবায়ু কর্মকাণ্ডকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্থিতিস্থাপকতা এবং পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের পথ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এখানেই গ্লোবাল উত্তরের রাজধানী অনুঘটকের ভূমিকা পালন করতে পারে; শর্ত নির্ধারণের মাধ্যমে নয়। বরং স্থানীয়ভাবে পরিচালিত পরিবর্তনের জন্য বিনিয়োগের মাধ্যমে। স্থানীয় অর্থনীতি এবং দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় যুক্ত কর্মসংস্থান কেবল নির্গমনের গতিপথকে নয়; সামাজিক ফলকেও রূপান্তরিত করতে পারে।

 

 

পুরাতন চুক্তিতে উত্তর অর্থ প্রদান করে এবং দক্ষিণ তা মেনে চলে, যা এখন ভেঙে পড়ছে। এর জায়গায় একটি নতুন চুক্তির আবির্ভাব ঘটছে, যেখানে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, পারস্পরিকভাবে উদ্ভাবন এবং যৌথ সমাধানের ওপর ভিত্তি করে কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। কপ৩০ অবশ্যই এমন একটি চুক্তি, যেখানে তা আনুষ্ঠানিকভাবে রূপায়িত হবে। আর এখানে বিলম্বের পরিবর্তে বাস্তবায়ন, সংকটের পাশাপাশি সক্ষমতার স্বীকৃতি থাকবে। আর দক্ষিণের সার্বভৌমত্ব কেবল স্বীকৃতিই পাবে না, বরং আরও প্রশস্ত হবে। আমাজন পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাতে পারলে আমাদের বাকিরাও তা করতে পারে, যদি আমরা গ্লোবাল দক্ষিণের নেতৃত্বাধীন পরিবর্তনের আওয়াজের শক্তিতে ভরসা রাখি, বিনিয়োগ করি এবং তাতে বিশ্বাস করি।

 

 

শশী থারুর: ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী; ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম