কপ ৩০ : জলবায়ু সম্মেলনে বিশ্বনেতাদের করণীয়
গর্ডন ব্রাউন [প্রকাশ : সমকাল, ০৩ নভেম্বর ২০২৫]

পুরোনো বিশ্ব ব্যবস্থার এক সময়ের পরিচিত খুঁটিগুলো ভেঙে পড়া এবং জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় মার্কিন তৎপরতা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বব্যাপী পরিবেশগত নেতৃত্বের দায়িত্ব অন্যদের ওপর গিয়ে পড়েছে। যেসব নেতা এর প্রয়োজনীয়তা বোঝেন, তাদের উচিত এই মাসে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিতব্য কপ৩০ সম্মেলনের সুযোগটি কাজে লাগানো। আর জলবায়ু পরিবর্তন অস্বীকারকারীদের ফিরিয়ে আনতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ দেশগুলো নিয়ে একটি জোট গঠন করা।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), নরওয়ে ও যুক্তরাজ্যই পশ্চিমা বিশ্বকে সবুজায়ন শিল্প নীতিমালা ধরে রাখার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছে এবং জাপানের সঙ্গে যারা গ্লোবাল সাউথে জলবায়ু অর্থায়নের প্রধান প্রধান দেশ। তবুও আজ ইইউকে অনিশ্চিত দেখাচ্ছে। তারা আজ জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা দুর্বল করার জন্য তদবিরকারী প্রধান খাতগুলোর চাপের মুখে এবং মহাদেশটি একসময়ের বহুদলীয় জোরালো ঐকমত্য থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়ার জন্য অতি-ডানপন্থি দলগুলোর চাপের মুখে।
এই সপ্তাহে জ্যামাইকায় তীব্র ঝড়ে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, যা বার্বাডোজের প্রধানমন্ত্রী মিয়া মোটলির নেতৃত্বে জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ রাজ্যগুলোর ক্রমবর্ধমান হতাশা আরও বাড়িয়ে তুলবে। তাই কেয়ার স্টারমারের কপ৩০-এ যোগদান এবং এড মিলিব্যান্ডের সঙ্গে নতুন নেতৃত্বের ভূমিকা গ্রহণের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এখন নতুনভাবে নেতৃত্ব দেওয়ার সময়। আর কেবল ক্রমবর্ধমান বন্যা, দাবানল ও খরা রোধে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে নীতি গ্রহণ করলে হবে না, বরং জীবন বাঁচাতে এবং উন্নত করার জন্য এগুলোর প্রভাব কমিয়ে আনা এবং অভিযোজনকে কেন্দ্র করে ভাবতে হবে।
এর মধ্যে রয়েছে হাজার হাজার একর শুষ্ক জমিতে খাদ্য উৎপাদনের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা; বর্তমানে অতিরিক্ত গরমের কারণে প্রতিবছর পাঁচ লাখ বার্ষিক মৃত্যু রোধ করা, যা দারিদ্র্য-সম্পর্কিত স্বাস্থ্য সমস্যাগুলো মোকাবিলা করে। উদাহরণস্বরূপ বন্যা ও পানিবাহিত রোগে স্বাস্থ্যঝুঁকি তীব্র হয়ে ওঠা, যা প্রতিবছর আট মিলিয়ন অকালমৃত্যুর কারণ।
আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে উচ্চ নির্গমনকারী প্রধান প্রধান শক্তি ২০৩৫ সালের জন্য তাদের জাতীয় জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করবে। এসব লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে রয়েছে ইইউ, ভারত ও সৌদি আরব। তবে এটি ইতোমধ্যে স্পষ্ট, ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যে একটি বিশাল ‘নির্গমন ব্যবধান’ রয়ে যাবে। যদিও প্যারিসে ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার একটি প্রক্রিয়া অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। দেশগুলো পাঁচ বছর অন্তর তাদের প্রতিশ্রুতি জোরদার করতে সম্মত। পরবর্তী হিসাব ও পুনর্নির্মাণ ২০২৮ সালের আগে নয়। আর তাই আমরা এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ ২.৩ থেকে ২.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণায়নের দিকে ধাবিত হচ্ছি।
সম্প্রতি বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা এখন দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত বিপর্যয় দেখা দিচ্ছে। নাসার উপগ্রহগুলোতে দেখা যাচ্ছে, ২০০৩ থেকে ২০২০ সময়ে রেকর্ড করা গড় ঘটনার চেয়ে এখন তীব্রতায় চরম আবহাওয়ার ঘটনা দ্বিগুণ ঘটছে। ২০২২ ও ’২৩ সালে ব্যবসা ও অবকাঠামোর আবহাওয়াজনিত ক্ষতির ফলে প্রায় অর্ধ ট্রিলিয়ন ডলার বা ৪৫১ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়েছে। অ্যালিয়ানজের গুন্থার থ্যালিঙ্গার সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, ‘সমস্ত অঞ্চল তীব্র ঝুঁকির কারণে বীমা অযোগ্য হয়ে উঠছে।’ কারণ মূল সম্পদের ‘বর্তমান অবস্থা’র অবনতি ঘটেছে। আফ্রিকায় ২০২৩ সালে দুই কোটি ৩০ লাখ মানুষের জন্য তীব্র ক্ষুধার চাহিদা তৈরি হয়েছিল, যা দেশটির ইতিহাসে একটি রেকর্ড। এর সঙ্গে ম্যালেরিয়া, ডায়রিয়া এবং বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য মৃত্যুও বিবেচনায় রাখা উচিত। কিন্তু দেশগুলো এখনও ক্ষতির পরিমাণ কমাতে পারেনি। প্যারিস চুক্তিতে জাতীয় জলবায়ু পরিকল্পনা, যাদের ‘জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান’ বলা হয় তাদের নিয়ে আলোচনা ও সংশোধন করার কোনো বিধান নেই।
চার বছর আগে গ্লাসগোতে কপ২৬-এ যখন পরিকল্পনার শেষ সেটটি অপর্যাপ্ত বলে ঘোষণা করা হয়েছিল, তখন দেশগুলো পরের বছর আরও শক্তিশালী পরিকল্পনা নিয়ে ফিরে আসতে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু মাত্র একটি দেশ তা বাস্তবায়ন করেছিল। চার বছর পরে ১৯৭টির মধ্যে মাত্র ৬৭টি দেশ পরিকল্পনা পাঠিয়েছে, যা নির্গমনে মাত্র ১০ শতাংশ কমিয়ে আনতে পেরেছে বলে উল্লেখ করেছে, যখন আমাদের ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকার জন্য ৬০ শতাংশ নিঃসরণ হ্রাস করা দরকার।
এ কারণে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভার বেলেমে কপ৩০ অনুষ্ঠিত হওয়ার আগে ৬ ও ৭ নভেম্বর দুই দিনব্যাপী নেতাদের শীর্ষ সম্মেলনটি গুরুত্বপূর্ণ হবে। অন্য নেতাদের এখন স্টারমারের উদাহরণ অনুসরণ করা উচিত এবং বর্তমানে যে ঘোষণাটি আলোচনায় রয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি উচ্চাকাঙ্ক্ষী বেলেম ঘোষণার ভিত্তি স্থাপন করা দরকার।
গর্ডন ব্রাউন: যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী; দ্য গার্ডিয়ান থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর