কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

কপ-৩০ : একটি পর্যালোচনা

বিধান চন্দ্র দাস [কালের কণ্ঠ, ২৮ নভেম্বর ২০২৫]

কপ-৩০ : একটি পর্যালোচনা

অবশেষে কপ-৩০-এ অংশগ্রহণকারী প্রতিনিধিরা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত একটি চুক্তি সম্পাদন করতে সমর্থ হলেন। তবে কপ-৩০-এর জন্য নির্ধারিত তারিখের (১০-২১ নভেম্বর ২০২৫) মধ্যে এটি করা সম্ভব হয়নি। অতীতেও কয়েকবার কপের জন্য নির্ধারিত সময়ের পরেই চুক্তি হয়েছিল। সে ক্ষেত্রে এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়।

 
 
এবার যে কারণগুলোর জন্য চুক্তি সম্পাদনে জটিলতা সৃষ্টি হয়ে সময়ের বাইরে গড়াল, সেগুলো হচ্ছে—১. খসড়া প্রস্তাবে জীবাশ্ম জ্বালানি পরিবর্তনের রোডম্যাপ না থাকা; ২. বিনিয়োগ ও অভিযোজন তহবিল নিয়ে মতবৈষম্য; ৩. মূল সম্মেলনস্থলে অগ্নিকাণ্ড এবং ৪. লবিং ও শিল্প প্রভাব ইত্যাদি।

 

 

তবে অনেক রশি টানাটানির পরও ‘বেলেম রাজনৈতিক প্যাকেজ’ নামে ২৯টি সিদ্ধান্তযুক্ত একটি প্যাকেজ পাস করা সম্ভব হয়েছে। প্যাকেজে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে ১. উষ্ণমণ্ডলীয় বন ও আদিবাসী অধিকারভিত্তিক বৈশ্বিক জলবায়ু সংহতি; ২. প্যারিস চুক্তির বাস্তবায়ন ত্বরান্বিতকরণ; ৩. অভিযোজন অর্থায়ন বৃদ্ধির অঙ্গীকার; ৪. স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির কাঠামো শক্তিশালীকরণ; ৫. জলবায়ুনীতিতে লিঙ্গসমতা পদক্ষেপ এবং ৬. জলবায়ুবান্ধব ন্যায্য বাণিজ্য ও সবুজ অর্থনীতির দিকে রূপান্তরের নীতি উল্লেখযোগ্য। প্যাকেজে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে আরো বেশি আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা নিঃসন্দেহে আশা-জাগানিয়া।

 

 
এর ফলে চরম আবহাওয়ার জন্য ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর পক্ষে প্রস্তুতি নেওয়া সহজ হবে। এই সহায়তার মূল লক্ষ্য হলো, অভিযোজন অর্থায়নকে তিন গুণ (১২০ বিলিয়ন ডলারের আশপাশে) করা। তবে এই লক্ষ্যের সময়সীমা ২০৩৫ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। চুক্তিতে সবুজ অর্থনীতির দিকে ন্যায্য পরিবর্তনের জন্য একটি ব্যবস্থা গ্রহণে সব দেশ একমত হয়েছে।

এই চুক্তির হতাশার দিক হলো, চূড়ান্ত চুক্তিতে জীবাশ্ম জ্বালানি পর্যায়ক্রমে বন্ধ করার বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট উল্লেখ নেই। মূল খসড়া চুক্তিতে রূপান্তরের কথা বলা হলেও শক্তিশালী তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো এবং অন্যান্য বড় নিঃসরণকারী দেশের তীব্র আপত্তির কারণে চূড়ান্ত পাঠ্যটিতে সেই ভাষাটিকে দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে পরিবেশবান্ধব জ্বালানিতে রূপান্তরপ্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট মানুষের ভাগ্য ও সময়সীমা নিয়ে নির্দিষ্ট রোডম্যাপ চুক্তিতে অনুপস্থিত। এটি মূলত জীবাশ্ম জ্বালানি শিল্পকে ঘিরে থাকা বিশাল প্রভাব এবং লবিংয়ের ফল। বন উজাড় সংক্রান্ত রোডম্যাপও বাদ পড়েছে।

 
 
 
জলবায়ু অর্থায়নের সময়সীমা নিয়েও অনেকে হতাশা প্রকাশ করেছেন। গার্ডিয়ান বলেছে, ‘দুর্বল ও আপসকামী চুক্তি বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে থাকা বাস্তুতন্ত্রের জন্য খুব সামান্যই কাজ করবে।’ রয়টার্স লিখেছে, ‘জীবাশ্ম জ্বালানিকে এড়িয়ে কপ-৩০-এ অস্বস্তিকর জলবায়ু চুক্তি অনুমোদিত।’ বিবিসি বলেছে, ‘কপ-৩০ চুক্তিতে জীবাশ্ম জ্বালানির উল্লেখ নেই।’

 

এবারের বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনের ৩০তম অধিবেশন (কপ-৩০) ব্রাজিলের উত্তরাঞ্চলের রাজ্য ‘পারা’-র রাজধানী ‘বেলেম’-এ গত ১০ থেকে ২১ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এবারের এই সম্মেলনটি অনেক কারণে ঘটনাবহুল সম্মেলন বলা যায়। বিশেষ করে এবারের এই সম্মেলনে প্রতিবাদ, বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ইত্যাদির মাত্রা; প্যাভিলিয়নে আগুন লাগা, নতুন প্রতিপাদ্য ও উদ্যোগ এবং এ ধরনের বৈশ্বিক সম্মেলনের জন্য বেলেমের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাসহ বেশ কিছু বিষয়ের বিবেচনায় কপ-৩০কে ব্যতিক্রমধর্মী বলে অভিহিত করা যায়।

 

 

এবার মূল সম্মেলনের বাইরে প্রায় ৭০ হাজার মানুষ (আদিবাসী, স্থানীয় সম্প্রদায়, কৃষক, শ্রমিক, সামাজিক ও পরিবেশ সংগঠন) একসঙ্গে হয়ে কথোপকথন, কর্মশালা ও প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে ‘পিপলস সামিট’ অর্থাৎ সিভিল সোসাইটি এবং সামাজিক জনগোষ্ঠীর সম্মেলন (১২-১৫ নভেম্বর ২০২৫) সম্পন্ন করেছে। এর জন্য নগর ও নদীর মধ্য দিয়ে গণমিছিল, অংশগ্রহণমূলক কার্যক্রম, নৌ শোভাযাত্রা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদি ব্যাপকভাবে আয়োজন করা হয়েছিল। তাদের মূল দাবি ছিল—জলবায়ু ন্যায্যতা, ভূমি  অধিকার, বন ও বন্যজীবন সংরক্ষণ, ন্যায্য রূপান্তর (কয়লা-গ্যাস সেক্টরে কাজ করা মানুষকে পরিবর্তিত কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত করা), জলবায়ু পরিবর্তনের মিথ্যা সমাধান (কার্বন বাজার ও প্রযুক্তিগত সমাধান) প্রত্যাখ্যান করা ইত্যাদি।

 

 

কপের ইতিহাসে এই প্রথমবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (বিশ্বের বৃহত্তম কার্বন নির্গমনকারী দেশ) কোনো সরকারি প্রতিনিধিদল কপ সম্মেলনে পাঠায়নি। এটিও একটি ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা, যদিও সে দেশ থেকে বেসরকারিভাবে কিছু ব্যক্তি ও সংস্থা সম্মেলনে যোগ দিয়েছিল। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই সম্মেলনের ৯ মাস আগে (১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫) কপ-৩০-এর প্রেসিডেন্ট মি. লাগো জনসমক্ষে দেওয়া এক বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘বেলেমে অনুষ্ঠেয় কপ-৩০ গতানুগতিক হতে পারে না—এটিকে অবশ্যই একটি ভিন্ন কপ হতে হবে।’ উপরোক্ত ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনাগুলোর সূত্র ধরে কেউ হয়তো কপ-৩০ ভিন্ন হয়েছে বলে ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করতেই পারেন। কিন্তু তার পরও কপ-৩০-এর মাধ্যমে কিছু ইতিবাচক বিষয় অবশ্যই অর্জিত হয়েছে, তা বলা যায়।

 

 

প্রথমত, কপ-৩০ সম্মেলন বেলেমে অনুষ্ঠিত হওয়ায় আমাজন ও প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে। সম্মেলনে উষ্ণমণ্ডলীয় বনাঞ্চলে (ব্রাজিল, কলম্বিয়া, কোস্টারিকা, ইকুয়েডর, ফিজি, ইন্দোনেশিয়া, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো) আদিবাসী ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের ভূমি অধিকারকে গুরুত্ব দিয়ে প্রায় ১৬০ মিলিয়ন হেক্টর জমির অধিকার স্বীকৃতির জন্য বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে ব্রাজিল সরকারের তত্ত্বাবধানে সে দেশের বন সংরক্ষণ ও বনভিত্তিক অর্থনীতির জন্য ২০২৭ সালের মধ্যে ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি তহবিল সংগ্রহের অঙ্গীকার করা হয়েছে, যা আগের লক্ষ্যের দ্বিগুণেরও বেশি। এ ছাড়া ট্রপিক্যাল ফরেস্ট ফরএভার ফ্যাসিলিটি (টিএফএফএফ) নামে নতুন একটি আর্থিক উদ্যোগ (ফান্ড) আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয়েছে। এই অর্থ মূলত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বন থাকা দেশগুলোকে বন উজাড় ও অবক্ষয় রোধে উৎসাহিত করতে ব্যয় করা হবে। এটি একটি ‘পে ফর পারফরম্যান্স’ মডেল এবং এটি স্যাটেলাইট ডেটার মাধ্যমে বন সংরক্ষণের ফলাফল পর্যবেক্ষণ করবে।

 

 

দ্বিতীয়ত, কপ-৩০-এ প্রতিশ্রুতির তুলনায় বাস্তবায়ন এবং কার্যকর অর্থায়নের দিকে জোর দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ক্লিন এনার্জি ও গ্রিড (স্মার্ট গ্রিড, নবায়যোগ্য জ্বালানি পরিকাঠামো এবং বিদ্যমান অবকাঠামোর আধুনিকীকরণ ও রক্ষণাবেক্ষণ) বিনিয়োগে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থাগুলোর যৌথ অঙ্গীকারে বিশ্বব্যাপী বিদ্যুৎ গ্রিড ও দূষণহীন শক্তিতে মোট এক ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়েছে। এটি অবশ্যই বাস্তবায়নমুখী রূপান্তরের সূচক। পাশাপাশি একটি বৈশ্বিক উদ্যোগের মাধ্যমে সুস্থায়ী জ্বালানি চার গুণ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতিও (বেলেম কমিটমেন্ট ফর সাসটেইনেবল ফিউয়েলস) গৃহীত হয়েছে। এ ছাড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জলবায়ু সহনশীল করতে ‘ক্লাইমেট প্রুফিং এসএমইএস ক্যাম্পেইন’ চালু করা হয়েছে। অর্থাৎ বলা যায় যে কপ-৩০ জলবায়ুনীতিকে কেবল আলোচনা নয়, বরং একে কার্যকরভাবে প্রয়োগ, অর্থায়ন এবং রূপান্তরমুখী শক্তি খাত উন্নয়নের বাস্তব ধারায় নিয়ে এসেছে।

 

 

তৃতীয়ত, কপ-৩০-এ মহাসাগর ও খাদ্যব্যবস্থাকে জলবায়ু আলোচনার মূলধারায় আনার ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা গেছে। ব্রাজিল ও ফ্রান্সের নেতৃত্বে নতুন ‘ওশান টাস্কফোর্স’ ঘোষণা করা হয়েছে এবং এর লক্ষ্য হলো সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র, সমুদ্রভিত্তিক সমাধান ও নীল অর্থনীতিকে জলবায়ু কর্মপরিকল্পনার সঙ্গে আরো সুসংহতভাবে যুক্ত করা। একই সঙ্গে কৃষি খাতের নির্গমন হ্রাস ও পুষ্টি-দক্ষতা বাড়াতে ‘বেলেম ডিক্লারেশন অন ফার্টিলাইজাসর্’ গৃহীত হয়েছে। এর ফলে বৈশ্বিক সার উৎপাদন ও ব্যবহারে নির্গমন কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে কপ-৩০ শুধু শক্তি খাত নয়, বরং সমুদ্র, কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থাকেও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার কৌশলগত অংশ হিসেবে বিবেচনায় এনেছে।

 

 

উপরোক্ত বিষয়গুলো অর্থাৎ চুক্তি এবং সংঘটিত ঘটনাগুলো বিবেচনায় নিয়ে বলা যায় যে কপ-৩০ বিশ্বকে আশা আর হতাশার মিশ্র এক চিত্র উপহার দিয়েছে। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকে এই বাস্তবতা মেনে নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়