কপ ৩০ : বেলেম সম্মেলন হোক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ভিত্তি
শফিকুল আলম [সূত্র : সমকাল, ১৩ নভেম্বর ২০২৫]

আমাজনের দুয়ারে দুটি বৈশ্বিক সম্মেলন; ব্যবধান তিন দশকের। ব্রাজিলেরই রিও শহরে ১৯৯২ সালে জাতিসংঘের পরিবেশ ও উন্নয়ন সম্মেলনে ১৭৯টি দেশের নীতিনির্ধারকরা মিলিত হয়েছিলেন, যা বিশ্ব ধরিত্রী সম্মেলন নামেই বেশি পরিচিত। এ সম্মেলনে উন্নয়নের ফলে পরিবেশগত যে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে তা মোকাবিলায় এবং টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিশ্বব্যাপী পরিবেশ রক্ষায় এ সম্মেলনকে অনেকটা ‘ব্লুপ্ৰিন্ট’ বিবেচনা করা হয়। এ সম্মেলন জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক শাখা ইউএনএফসিসিসির অনুসমর্থনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
আবার তিন দশকের বেশি সময় পর আমাজনের দুয়ারে বেলেম শহরে বিভিন্ন দেশের নীতিনির্ধারকরা ৩০তম বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলন কপ৩০-এ বসেছেন দু-সপ্তাহব্যাপী আলোচনায়। উদ্দেশ্য প্যারিস জলবায়ু চুক্তির লক্ষ্যমাত্রাগুলো রক্ষা করা।
পুরো পৃথিবীর দৃষ্টি এখন বেলেমের দিকে– বিভিন্ন দেশ কি এবার জ্বালানি রূপান্তর ও কার্বন নির্গমন হ্রাসে নীতিমালা বাস্তবায়নে আরও উদ্যোগী হবে? উন্নয়নশীল বিশ্বের চাহিদামতো পর্যাপ্ত জলবায়ু তহবিল তৈরিতে উন্নত বিশ্ব কি উৎসাহী হবে?
আকাঙ্ক্ষা ও বাস্তবায়নের সমন্বয়
৬ নভেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, ৭৯টি দেশ নতুন জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি) জমা দিয়েছে। ৬৪টি দেশের নতুন এনডিসিতে প্রদত্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে তৈরি করা ইউএনএফসিসিসির সমন্বিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, বৈশ্বিক কার্বন নির্গমন ২০১৯ সালের সাপেক্ষে ২০৩৫ সালে ১১ থেকে ২৪ শতাংশ কমতে পারে। অথচ প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে ২০৩৫ সাল নাগাদ ৫৫% কার্বন নির্গমন কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড সাময়িকভাবে হলেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে, তা নির্দ্বিধায় বলা যায়।
আশার কথা, ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে নতুন স্থাপিত সক্ষমতার রেকর্ড তৈরি হয়েছে, যার পরিমাণ ৫৮২ গিগাওয়াট। তথাপি প্যারিস জলবায়ু চুক্তির লক্ষ্যে পৌঁছতে ২০৩০ সাল নাগাদ নবায়নযোগ্য জ্বালানির স্থাপিত সক্ষমতা তিন গুণ করতে হলে প্রতিবছর ১,১২২ গিগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানির নতুন সক্ষমতা স্থাপন করতে হবে, যা ২০২৪ সালের চেয়ে ৯২.৭ শতাংশ বেশি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অনেকটা কঠিন।
আরও একটি আশঙ্কার বিষয়, বৈশ্বিক জ্বালানি দক্ষতা বাড়ার হার কমে যাওয়া। কার্বন নির্গমন হ্রাসে জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানোর অসীম গুরুত্ব অনুধাবন করে ২৮তম জলবায়ু সম্মেলনে বৈশ্বিক নেতারা জ্বালানি দক্ষতা বাড়ার বার্ষিক হার ২ শতাংশ থেকে ৪ শতাংশে বাড়াতে সম্মত হন। তবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) হিসাবে জ্বালানি দক্ষতা বাড়ার বার্ষিক হার বরং ২০২৪ সালে ১ শতাংশে নেমে এসেছে। কাজেই কার্বন নির্গমন হ্রাসে আকাঙ্ক্ষা যেমন বাড়াতে হবে, তেমনি সমানুপাতিক হারে বাস্তবায়নে উদ্যোগ নিতে হবে।
জলবায়ু অর্থায়ন
আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংস্থার (আইরিনা) প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্যারিস চুক্তির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে শুধু নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রযুক্তিতে ২০৩০ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করতে হবে। সঙ্গে জ্বালানি দক্ষতা বাড়ার হার দ্বিগুণ করতে বার্ষিক বিনিয়োগ প্রয়োজন প্রায় ২ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। আরও রয়েছে অভিযোজন ও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে বিনিয়োগের চাপ।
কপ২৯ সম্মেলনে ২০৩৫ সাল নাগাদ উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোর জন্য বার্ষিক ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার জলবায়ু অর্থায়নের লক্ষ্যমাত্রার কথা বলা হলেও উন্নত দেশগুলো সাকল্যে বার্ষিক ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের তহবিল তৈরিতে সম্মত হয়েছে। তবে প্যারিস জলবায়ু চুক্তি রক্ষা করতে হলে উন্নয়নশীল বিশ্বের আশু ও পর্যাপ্ত অর্থায়ন প্রয়োজন। উন্নত বিশ্বের উচিত হবে দ্রুতই তাদের অর্থায়নের অঙ্গীকার বাড়ানো এবং পর্যাপ্ত অর্থ ছাড়ে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া। এ ক্ষেত্রে জলবায়ু অর্থায়নে অনুদান ও স্বল্প সুদে ঋণের দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন, যাতে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত উন্নয়নশীল কোনো দেশের ঋণের বোঝা ভারি না হয়। আবার নানা শর্তের বেড়াজালে উন্নয়নশীল, স্বল্পোন্নত ও দরিদ্র দেশগুলো জলবায়ু অর্থায়ন পেতে যেন হিমশিম খেতে না হয়, সে জন্য পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
এর সঙ্গে বহুজাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর (এমডিবি) জ্বালানি রূপান্তরে অর্থায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। কম খরচে অর্থায়নের সঙ্গে এমডিবিগুলো কারিগরি সহায়তা প্রদান ও বিনিয়োগের ঝুঁকি প্রশমনে বিভিন্ন আর্থিক উপকরণ তৈরি করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের নানান প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। অর্থায়নের প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রযুক্তি আমদানিনির্ভর হওয়ায় ডলারের সাপেক্ষে টাকার অবমূল্যায়নের প্রভাব প্রকল্প বাস্তবায়নে গিয়ে পড়ে। উন্নয়নশীল বিভিন্ন দেশে অনুরূপ সমস্যা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে এমডিবিগুলো বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশকে ‘কারেন্সি হেজিং ফেসিলিটি’ বা বৈদেশিক বিনিময় ঝুঁকি রোধে কাঠামোগত আর্থিক কর্মসূচি তৈরিতে সহায়তা করতে পারে।
বেলেম হোক বাস্তবায়নের ভিত্তি
বেলেম জলবায়ু সম্মেলনে কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট ছয়টি মূল অক্ষের ওপর ভিত্তি করে একটি কর্মপরিকল্পনার ঘোষণা দিয়েছেন। ১. জ্বালানি, শিল্প ও পরিবহন খাতে কার্বন নির্গমন হ্রাসে রূপান্তর; ২. বন, মহাসাগর ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ; ৩. কৃষি ও খাদ্য ব্যবস্থার রূপান্তর; ৪. শহর, অবকাঠামো ও পানির জন্য স্থিতিস্থাপকতা তৈরি; ৫. মানবিক ও সামাজিক উন্নয়নকে উৎসাহিত করা; ৬. অর্থ, প্রযুক্তি ও সক্ষমতা বৃদ্ধি।
ব্রাজিলের নেওয়া এ কর্মপরিকল্পনা জলবায়ু সম্মেলনকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে, এমনটি ধরে নেওয়া যায়। তবে সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোকে জলবায়ু চুক্তির লক্ষ্য অর্জনে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়া জরুরি।
জলবায়ু পরিবর্তনের মতো সমস্যার সমাধান যেহেতু একক কোনো দেশের পক্ষে সম্ভব নয়; বৈশ্বিক নেতারা যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত কারণেই বহুপাক্ষিকতার ওপর ভরসা করছেন। এ ক্ষেত্রে বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য-উপাত্ত আমাদের জানাচ্ছে, লক্ষ্যমাত্রা থেকে আমরা কতটা দূরে এবং কী করতে হবে। প্যারিস জলবায়ু চুক্তির প্রায় এক দশক পরে এটি পরিষ্কার– বহুপাক্ষিকতাকে আরও কার্যকর করতে হবে। ন্যায্যতার ভিত্তিতে জলবায়ু পরিবর্তন সমস্যার সমাধান করতে হলে বিভিন্ন দেশের মাঝে সহযোগিতা বাড়াতে হবে। উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যেও সহযোগিতা বাড়ানো দরকার।
শফিকুল আলম : ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) বাংলাদেশের জ্বালানি খাতবিষয়ক
প্রধান বিশ্লেষক