কোন পথে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের সমাপ্তি?
এম এ হোসাইন [প্রকাশ : দেশ রূপান্তর, ২৬ মার্চ ২০২৬]

মানুষ প্রায়ই মনে করে, যুদ্ধের জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয় যুদ্ধক্ষেত্রে। সেনাবাহিনী অগ্রসর হয়, শত্রুপক্ষ পিছু হটে এবং শেষ পর্যন্ত এক পক্ষ বিজয় অর্জন করে। কিন্তু আধুনিক যুদ্ধ খুব কমই এভাবে শেষ হয়। এগুলো শেষ হয় তখনই, যখন একসঙ্গে তিনটি বিষয় ভেঙে পড়ে। যা হচ্ছে অস্ত্রভাণ্ডার, বাজার এবং রাজনৈতিক সময়সীমা। এই তিনটি বিষয়ই নির্ধারণ করে, যুদ্ধ কতদিন স্থায়ী হবে এবং কীভাবে তা শেষ হবে। ইরানকে ঘিরে বর্তমান সংঘাতও একই পথ অনুসরণ করবে। এটি কোনো নাটকীয় আত্মসমর্পণ বা যুদ্ধক্ষেত্রে সম্পূর্ণ পতনের মাধ্যমে শেষ হবে না।
বরং এটি শেষ হবে তখন, যখন তিনটি আলাদা চাপ একত্রিত হতে শুরু করবে। বিশেষ করে, যখন অস্ত্রভাণ্ডার ফুরিয়ে আসবে, বাজার অস্থির হয়ে উঠবে এবং রাজনৈতিক ধৈর্য শেষ হয়ে যাবে। হয়তো একসঙ্গে নয়, কিন্তু এতটাই কাছাকাছি যে, নেতারা বাধ্য হবেন নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে, যা পরে তারা কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবে ব্যাখ্যা করবেন, যদিও বাস্তবে তা হবে প্রয়োজনের তাগিদে নেওয়া পদক্ষেপ। প্রথমেই আসা যাক অস্ত্রের প্রসঙ্গে। আধুনিক যুদ্ধ প্রায়ই এমন একটি ধারণা তৈরি করে, যেন সামরিক সক্ষমতা অসীম। নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র, স্যাটেলাইট নজরদারি, বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা সবকিছুই এমন এক প্রযুক্তিগত স্থায়িত্বের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে উন্নত সামরিক শক্তি দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চমাত্রার যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে। বাস্তবে তা সম্ভব নয়, কখনোই ছিল না।
সমস্যা উদ্ভাবনে নয়, উৎপাদনে। আধুনিক প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র কেবল একটি অস্ত্র নয়; এটি একটি জটিল, বিশেষায়িত ব্যবস্থা, যা সীমিত সরবরাহ চেইনের ওপর নির্ভরশীল। মাইক্রোইলেকট্রনিক্স, দুর্লভ উপাদান, নিখুঁত প্রকৌশল এসব কোনো কিছুই রাতারাতি বাড়ানো যায় না, এমনকি এক বছরের মধ্যেও নয়। এগুলোর জন্য প্রয়োজন চুক্তি, দক্ষ শ্রমিক এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সময়। আর যুদ্ধ যে জিনিসটি সবচেয়ে দ্রুত গ্রাস করে, তা হলো সময়। মাত্র একটি রাতের তীব্র ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কয়েক মাসের উৎপাদনকে শেষ করে দিতে পারে। যখন মজুদ একটি নির্দিষ্ট সীমার নিচে নেমে যায়, তখন কৌশল পরিবর্তন হয় নীতির কারণে নয়, বরং গাণিতিক বাস্তবতার কারণে। এই সীমাবদ্ধতা উভয় পক্ষের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, যদিও ভিন্নভাবে। যুক্তরাষ্ট্র নির্ভর করে অত্যাধুনিক, ব্যয়বহুল এবং সীমিত সংখ্যক অস্ত্র ব্যবস্থার ওপর, যা প্রতিস্থাপন করা ধীরগতির।
অন্যদিকে ইরান নির্ভর করে পরিমাণ ও অসম কৌশলের ওপর। সস্তা ড্রোন, সহজ ক্ষেপণাস্ত্র যেগুলো সরাসরি জয়ের জন্য নয়, বরং প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত, চাপ সৃষ্টি এবং ব্যয় বাড়াতে ব্যবহৃত হয়। এটি এমন এক ধরনের প্রতিযোগিতা, যা হলো নির্ভুলতা বনাম স্থায়িত্ব, গুণমান বনাম পরিমাণ। ইতিহাস দেখায়, এমন প্রতিযোগিতায় কোনো পক্ষই একচেটিয়া সাফল্য পায় না।
১৯৪৪ সালে জার্মানি তা উপলব্ধি করেছিল, যখন মিত্রশক্তির শিল্প উৎপাদন তাদের কৌশলগত দক্ষতাকে ছাপিয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রও ভিয়েতনাম এবং পরে ইরাকে একই ধরনের বাস্তবতা উপলব্ধি করেছিল, যেখানে প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধের সামনে দুর্বল হয়ে পড়ে। এখানে সময় হলো গোপন নিয়ামক। যে পক্ষ সময়কে ভালোভাবে পরিচালনা করতে পারে, সাধারণত তারাই টিকে থাকে। অথবা অন্তত বিজয়ের সংজ্ঞা পরিবর্তন করার মতো সময় পায়। এরপর আসে বাজার। বাজার সেনাবাহিনীর চেয়েও দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং কৌশলগত গল্পে খুব কমই আগ্রহী।
বিনিয়োগকারীরা কোনো অঞ্চল কার নিয়ন্ত্রণে, তা নিয়ে মাথা ঘামায় না। তারা চায় স্থিতিশীলতা, পূর্বানুমান যোগ্যতা এবং ঝুঁকি কম থাকা। এগুলো যখন নষ্ট হতে থাকে, তখন পুঁজি সরে যেতে শুরু করে প্রথমে ধীরে, তারপর হঠাৎ করে। জ্বালানি এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক। পারস্য উপসাগরে কোনো বিঘœ ঘটলে, সেই পরিস্থিতি দ্রুত বিশ্বব্যাপী প্রভাব ফেলে। তেলের দাম বাড়ে, জাহাজ চলাচলের পথ পরিবর্তিত হয়, বীমার খরচ বেড়ে যায়। কিন্তু এর দ্বিতীয় প্রভাব আরও গভীর। এর ফলে সারের দাম বাড়ে এবং কয়েক মাস পর খাদ্যের দামও বাড়ে। নিয়ন্ত্রিত মুদ্রাস্ফীতি আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। আধুনিক অর্থনীতি একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত। জ্বালানির মতো একটি খাতে টান পড়লে পুরো ব্যবস্থাই নড়বড়ে হয়ে যায়।
বিমান চলাচলের গতিপথ বদলে যায়, সরবরাহ শৃঙ্খল দীর্ঘ হয় এবং উৎপাদন ধীর হয়ে যায় এবং পৃথিবীর কোনো এক কোণে একজন ভোক্তা হঠাৎ করে রুটি বা বিদ্যুতের জন্য বেশি মূল্য দিতে শুরু করে, কারণটি না জেনেই। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এই বিষয়টি বেশ ভালো করে বুঝেতে পেরেছে। তাই, ইরান শুধু সামরিক লক্ষ্যবস্তু নয়, বরং সেই অর্থনৈতিক স্নায়ুতন্ত্রকে লক্ষ্য করছে, যা সামরিক শক্তিকে টিকিয়ে রাখে। যুক্তি সহজ যদি একটি পরাশক্তির অর্থনৈতিক পরিবেশকে জটিল করে তোলা যায়, তবে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালানো তার জন্য অসম্ভব হয়ে উঠবে। এই অর্থে বাজার এক ধরনের অদৃশ্য বিচারকের মতো কাজ করে। তারা যুদ্ধ থামাতে পারে না, কিন্তু এর খরচ এত বাড়িয়ে দিতে পারে যে, রাজনৈতিক নেতারা বিজয়ের নয়, বরং বেরিয়ে আসার পথ খুঁজতে শুরু করেন। এবার আসা যাক রাজনীতির কথায়। যা সবচেয়ে অবমূল্যায়িত, অথচ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধ সাধারণত ঐক্যের মধ্য দিয়ে শুরু হয়। জনগণ পতাকার চারপাশে একত্রিত হয়, বিরোধিতা সাময়িকভাবে স্তিমিত হয়, এবং নেতারা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পান। কিন্তু এই ঐক্য স্থায়ী নয়। খরচ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এবং লক্ষ্য অস্পষ্ট হয়ে পড়লে এটি ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে।
গণতান্ত্রিক দেশে সময়সীমা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন নির্ধারিত সময়ে অনুষ্ঠিত হবেই, যুদ্ধ শেষ হোক বা না হোক। আর এই নির্বাচনই পররাষ্ট্রনীতিকে অভ্যন্তরীণ সমস্যায় পরিণত করে। জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি তখন আর একটি বিমূর্ত বিষয় থাকে না; এটি হয়ে ওঠে নির্বাচনী ইস্যু। সরবরাহ শৃঙ্খলের সমস্যা রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। আর যদি হতাহতের সংখ্যা বাড়ে, তবে তা প্রতীক হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রও এমন একটি সময়সীমার মুখোমুখি। মধ্যবর্তী নির্বাচন একটি অনিবার্য বাস্তবতা, যা রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশকে বদলে দেয়। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনের আইনপ্রণেতারা তখন প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন, এই যুদ্ধ কত দিন চলবে? কত খরচ হবে? এর উদ্দেশ্য কী? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জেনারেলরা দিতে পারেন না।
এগুলো এমন প্রশ্ন, যা রাজনীতিবিদদের এড়ানোর উপায় নেই। ইতিহাস এখানে আবারও পথ দেখায়। ভিয়েতনাম যুদ্ধ সামরিক বিকল্পের অভাবে শেষ হয়নি; এটি শেষ হয়েছিল কারণ অভ্যন্তরীণ সমর্থন ভেঙে পড়েছিল। ইরাক যুদ্ধও একই ধরনের পথ অনুসরণ করেছিল, যদিও কম নাটকীয়ভাবে। উভয় ক্ষেত্রেই যুদ্ধক্ষেত্র গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু রাজনৈতিক সহনশীলতা ছিল আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের কৌশলও মনে হয়, এই বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। দ্রুত জয়লাভ নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী চাপ সৃষ্টি করা। এর ফলে সামরিক, অর্থনৈতিক এবং মানসিক যতক্ষণ না প্রতিপক্ষের জোট নিজের ভেতরেই দুর্বল হয়ে পড়ে। এটাই হলো ‘অস্ত্র, বাজার এবং রাজনৈতিক সময়সীমা’র সারকথা। এটি কোনো সেøাগান নয়; এটি একটি কাঠামো, যেখানে প্রতিটি উপাদান অন্যটিকে শক্তিশালী করে। অস্ত্রের ঘাটতি সামরিক বিকল্পকে সীমিত করে, বাজারের অস্থিরতা অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ বাড়ায় আর রাজনৈতিক চাপ দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালানোর ইচ্ছাকে দুর্বল করে। এই চক্রের ভেতরেই যুদ্ধের সংজ্ঞা বদলে যায়।
সম্ভবত এভাবেই এই যুদ্ধ শেষ হবে, কোনো একক সিদ্ধান্তমূলক আঘাতের মাধ্যমে নয়, বরং বিভিন্ন চাপের একত্রিত হওয়ার মাধ্যমে। স্পষ্টতার মাধ্যমে নয়, বরং এমন এক অস্পষ্টতার মাধ্যমে, যাকে দক্ষতার সঙ্গে সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করা হবে। এখানে একটি বিদ্রুপ রয়েছে। যুদ্ধ প্রায়ই শুরু হয় সর্বোচ্চ লক্ষ্য নিয়ে শত্রুকে পরাজিত করা, অঞ্চল পুনর্গঠন এবং আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য। কিন্তু শেষ হয় অনেক বেশি সীমিত ফলাফলে নিয়ন্ত্রণ, প্রতিরোধ এবং প্রায় আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া, যদিও অনেক বেশি খরচ ও কম ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে। ইরান এ ধরনটি বোঝে এবং এর সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রও তা বোঝে, যদিও তা স্বীকার করতে সময় নেয়। পার্থক্য জ্ঞানে নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তাকে সহ্য করার রাজনৈতিক সক্ষমতায়। শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধগুলো হবে না সেগুলো, যা মানুষ টেলিভিশনে দেখে। এগুলো ঘটবে উৎপাদন প্রতিবেদন, বাজার সূচক এবং জনমত জরিপে। কম নাটকীয়, কিন্তু অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর যখন এই তিনটি ফাটলরেখা অস্ত্র, বাজার এবং রাজনৈতিক সময়সীমা একত্রিত হবে, তখন ফলাফল ঘোষণার প্রয়োজন হবে না। তা সেই সময়ের মধ্যেই নির্ধারিত হয়ে যাবে।
লেখক: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক