কমেছে দেশীয় জ্বালানির জোগান

কমেছে দেশীয় জ্বালানির জোগান
সংবাদবাংলাদেশ

কমেছে দেশীয় জ্বালানির জোগান

১২ জুলাই, ২০২৬

জিন্নাতুন নূর [আপডেট : বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১১ মে ২০২৬]

হবিগঞ্জের রশিদপুর কনডেনসেট ফ্র্যাকশনেশন প্ল্যান্ট (আরসিএফপি) দেশীয়ভাবে মোট জ্বালানির একটি অংশের চাহিদা মেটাচ্ছে। কিন্তু প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়ায় এখন দেশীয় এই জ্বালানির জোগানও কমে গেছে। এক যুগের বেশি সময়ে কনডেনসেট উৎপাদন অর্ধেকে নেমে গেলেও এই সময়ে জ্বালানির চাহিদা বেড়েছে ৩ গুণেরও বেশি। দেশীয় উৎপাদন বজায় রেখে প্ল্যান্টটি বছরে ২ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা সাশ্রয় করছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরাক যুদ্ধের কারণে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশকে জ্বালানি সংকটে হিমশিম খেতে হয়েছে। দেশের জ্বালানির উল্লেখযোগ্য অংশই আমদানি করতে হয়।

 

 

সরেজমিন আরসিএফপি পরিদর্শনে দেখা যায়, বিশাল জায়গায় ওপর স্থাপিত প্ল্যান্টটিতে আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে অকটেন, পেট্রোল, এলপিজি, মোটর স্পিরিট, কেরোসিন এবং ডিজেল উৎপাদন করা হয়, যা দেশের জ্বালানি সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড (এসজিএফএল)-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা আরসিএফপি। এটি হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল উপজেলার রশিদপুরে অবস্থিত। এই প্ল্যান্টে এসজিএফএল এবং শেভরন বাংলাদেশ লিমিটেডের বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রাপ্ত হেভি কনডেনসেট কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। উৎপাদিত পণ্যসমূহ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)-এর অধীন পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড, মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড এবং যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের বিভিন্ন ডিপোতে সরবরাহ করা হয়। এভাবে সারা দেশে জ্বালানি বিতরণ নিশ্চিত করা হয়।

 

 

এই প্ল্যান্টের কর্মকর্তারা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, বর্তমানে এখানে ৪ হাজার ৩৫০ ব্যারেল কনডেনসেট বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ থেকে ৮৫০ ব্যারেল অকটেন এবং ৩ হাজার ১০০ ব্যারেল পেট্রোল, ৩০০ ব্যারেল কেরোসিন ও ডিজেল এবং ১৫ থেকে ২০ ব্যারেল এলপিজি উৎপাদিত হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে এই প্ল্যান্ট থেকে সারা দেশে মোট চাহিদার ৮ থেকে ৯ শতাংশ অকটেন সরবরাহ করা হচ্ছে। আর পেট্রোলের ৩২ থেকে ৩৫ শতাংশ চাহিদা পূরণ করা হচ্ছে। গত অর্থবছরে পেট্রোলের ২৫ থেকে ২৬ শতাংশ আর অকটেনের ৩০ শতাংশ চাহিদা পূরণ করা হয়। জানা যায়, আরসিএফপির কনডেনসেট ফ্র্যাকশনেশন সক্ষমতা ৭ হাজার ৭৫০ ব্যারেল। তবে কনডেনসেট রিটার্ন ইউনিট (সিআরইউ)-এর সক্ষমতা ৩ হাজার ব্যারেল। এখানে সাড়ে ৪ থেকে ৫ হাজার ব্যারেল পর্যন্ত কনডেনসেট ফ্র্যাকশনেশন করা যাবে।

 

 

যেহেতু এখানকার সিআরইউর সক্ষমতা কম, এজন্য ৫ হাজার ব্যারেলের বেশি কনডেনসেট ফ্র্যাকশনেট করা যাবে না। সরকারি এই প্ল্যান্টের বাইরে বেসরকারিভাবে আরও চারটি প্ল্যান্ট আমদানীকৃত কনডেনসেট দিয়ে দেশে জ্বালানি উৎপাদন করছে। পাঁচ থেকে ছয় বছর আগেও দেশে দৈনিক সাড়ে ১০ হাজার ব্যারেল কনডেনসেট উৎপাদিত হতো। এখন দেশে দৈনিক ৬ হাজার ২০০ ব্যারেল কনডেনসেট উৎপাদন হচ্ছে। আগে বিবিয়ানায় শেভরন গ্যাসক্ষেত্রে ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হতো, এখন তা ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নেমে এসেছে।

 

 

এই গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদিত গ্যাসই ছিল এই প্ল্যান্টের কনডেনসেটের মূল উৎস। আগে গ্যাসক্ষেত্রটি সাড়ে ৭ হাজার ব্যারেল কনডেনসেট উৎপাদন করত। আর এখন ৪ হাজার ৩০০ ব্যারেল উৎপাদন করছে। ফলে গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় এখন সামগ্রিকভাবে দেশে কনডেনসেটের উৎপাদনও কমে গিয়েছে।  এসজিএফএল সূত্রে জানা যায়, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে দেশে অকটেনের চাহিদা ছিল ৭০ থেকে ৮০ হাজার মেট্রিন টন। পেট্রোলের চাহিদা ছিল ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার মেট্রিক টন। গত অর্থবছরে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)-এর জ্বালানি বিক্রির তথ্য বলছে, অকটেন বিক্রি হয়েছে ৪ লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টন। আর পেট্রোল বিক্রি করেছে ৪ লাখ ৬২ হাজার মেট্রিক টন। অর্থাৎ এ সময়ে অকটেন-পেট্রোলের বিক্রি বেড়েছে ৩ গুণের বেশি। কিন্তু কনডেনসেটের উৎপাদন কমে অর্ধেকে নেমেছে।

 

 

সিলেট গ্যাস ফিল্ডের মহাব্যবস্থাপক (এলপিএম) প্রকৌশলী জীবন শান্তি সরকার বলেন, এই প্ল্যান্ট থেকে ৪ হাজার ৩০০ ব্যারেল কনডেনসেট থেকে প্রাপ্ত জ্বালানির প্রতি ব্যারেল ১২০ ডলার হিসেবে ধরা হয়। তাহলে দিনে ৫ লাখ ২২ হাজার ডলার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে। আর বছরে ২ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা সাশ্রয় করছে। আমাদের পেট্রোলিয়াম পণ্যের দাম একটু বাড়ালে এর বাড়তি টাকা দিয়ে গ্যাস উত্তোলনের মতো নতুন প্রকল্প গ্রহণ করা যাবে। তিনি বলেন, ‘সিলেট গ্যাস ফিল্ড কর্তৃপক্ষ নতুন প্রকল্প হাতে নিয়ে নতুন গ্যাসকূপ খনন করে গ্যাস উৎপাদনের চেষ্টা করছে।

 

 

 আর গ্যাস উৎপাদনের সঙ্গে কনডেনসেটও আসবে। গ্যাস উৎপাদন কমে গেলে বিদেশ থেকে কনডেনসেট এনে জ্বালানি উৎপাদন করতে গেলে অনেকগুলো সমস্যায় পড়তে হবে। সাগরে মাদার ভেসেল থেকে আবার লাইটার জাহাজে করে কনডেনসেট আনতে হবে। এটি ভৈরব থেকে ট্যাংকলরি বা পাইপলাইনে এখানে আনতে হবে। এতে জ্বালানি উপাদান খরচ আরও বেড়ে যাবে। আমরা তাই সিলেট অঞ্চলে গ্যাস উৎপাদনের মাধ্যমে কনডেনসেটের উৎপাদন বৃদ্ধির চেষ্টা করছি। এজন্য ছাতক গ্যাসক্ষেত্র বাপেক্সের মাধ্যমে উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর একটি অংশ সিলেট গ্যাস ফিল্ড লিমিটেডকে দেওয়ার কথা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে রশিদপুর প্ল্যান্টটি পরিচালনার জন্য যে কনডেনসেট দরকার হবে, তা ছাতক গ্যাসক্ষেত্র থেকেই পাওয়া যাবে।’

ট্যাগ:BCSসংবাদবাংলাদেশ