খাদ্যনিরাপত্তা : খাদ্য মূল্যস্ফীতির চোখ রাঙানি এবং দারিদ্র্য ও বৈষম্যের সংযোগ
ড. জাহাঙ্গীর আলম [আপডেট : বণিক বার্তা, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫]

বাংলাদেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার খুবই ধীরগতিতে কমছে। কখনো দুই মাস কমে তো পরের দুই মাস বাড়ে। কৃষি উৎপাদনের মৌসুম পরিবর্তন ও বাজারে পণ্য সরবরাহের তারতম্যের কারণে এমনটি ঘটে। আবহাওয়ার বৈপরীত্য তথা বন্যা ও খরার কারণে কৃষির উৎপাদন প্রায়ই বিঘ্নিত হয়। তখন বৃদ্ধি পায় খাদ্য মূল্যস্ফীতি। আবার সুদিন এলে ভালো ফসল হয়। হ্রাস পায় খাদ্য মূল্যস্ফীতি। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার ছিল সর্বাধিক ১৪ দশমিক ১০ শতাংশ। এর পর তা হ্রাস পায়। নভেম্বরে তা আবার বেড়ে ১৩ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়ায়। এর পর পুনরায় তা হ্রাস পেতে থাকে। গত জুনে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ। জুলাইয়ে চাল ও শাকসবজির মূল্যবৃদ্ধির কারণে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা বেড়ে ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশে দাঁড়ায়। আগস্টে তা আরো বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৬০ শতাংশে। তাতে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পায়। তাদের কষ্ট বেড়ে যায়।
খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার বিবেচনায় ২০২১ সালের জুন থেকে বিশ্বব্যাংকের লাল তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান। যেসব দেশের খাদ্যপণ্যের মূল্য প্রতি মাসে গড়ে ৫-৩০ শতাংশের মধ্যে বৃদ্ধি পায়, সেগুলোকে লাল তালিকাভুক্ত করে বিশ্বব্যাংক। অন্যদিকে যেসব দেশের খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার প্রতি মাসে গড়ে ২ শতাংশের কম বাড়ে, ওইসব দেশকে সবুজ তালিকায় রাখা হয়। তাদের কোনো ঝুঁকি নেই। যেসব দেশের প্রতি মাসে গড় মূল্যস্ফীতির হার ২-৫ শতাংশের মধ্যে থাকে সেগুলো হলুদ তালিকাভুক্ত। অর্থাৎ তারা ঝুঁকির দিকে যাচ্ছে। যাদের খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার প্রতি মাসে গড়ে ৩০ শতাংশের বেশি, তারা পিঙ্গল বর্ণের তালিকার অন্তর্ভুক্ত। তারা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তাদের বেশি কমিশন গুনতে হয়। বৈদেশিক ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে তাদের দিতে হয় বাড়তি গ্যারান্টি ফি। ২০২১ সালের মে মাসে বাংলাদেশের খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ। এর পর থেকে এ হার ক্রমাগতভাবে ৫ শতাংশের ওপরে রয়েছে। এবারো তার ব্যতিক্রম নয়। অতি সম্প্রতি চাল, পেঁয়াজ, ডিম, মাছ ও শাকসবজির দাম বাড়ার কারণে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার বাড়ছে। আগামী নভেম্বর পর্যন্ত তা কমার সম্ভাবনা কম। অর্থাৎ বিশ্বব্যাংকের লাল তালিকা থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন। তাতে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হতে পারে।
খাদ্য মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির কারণে মানুষের দারিদ্র্য বৃদ্ধি পায়। দুর্ভোগ সীমা ছাড়িয়ে যায়। আর্থিক অনটন নিম্ন আয়ের মানুষের পেরেশানি ও দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দেয়। তারা অপুষ্টিতে ভোগে ও রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে। সাধারণভাবে পারিবারিক গড় ব্যয়ের প্রায় ৫৫ শতাংশ অর্থই খরচ হয় খাদ্য কেনার জন্য। নিম্ন আয়ের পরিবারের ক্ষেত্রে এর হার প্রায় ৬৫ শতাংশ। অর্থাৎ খাদ্য মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির কারণে সরাসরি বেড়ে যায় নিরঙ্কুশ দারিদ্র্য। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বিভাগ থেকে প্রকাশিত হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভে (এইচআইইএস) ২০২২-এর তথ্য অনুসারে দেশে নিরঙ্কুশ দারিদ্র্যের হার ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। গ্রামে এ হার ২০ দশমিক ৫ শতাংশ, শহরে ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০০০ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪৮ দশমিক ৯ শতাংশ। গ্রামে ৫২ দশমিক ৩ শতাংশ এবং শহরে ৩৪ দশমিক ৩ শতাংশ। মানুষের মৌলিক প্রয়োজন যেমন খাদ্য, চিকিৎসা, বাসস্থান ইত্যাদির খরচ মেটানোর ভিত্তিতে জনপ্রতি মাসিক আয় ৩ হাজার ৮৩২ টাকায় নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০২২ সালের দারিদ্র্যসীমা। এতে আমলে নেয়া হয়েছিল খাদ্য ও খাদ্য-বহির্ভূত মৌলিক প্রয়োজনগুলো মেটানোর জন্য ন্যূনতম খরচ। তাতে সমীক্ষার অন্তর্গত ওই ২২ বছর দারিদ্র্যসীমা হ্রাসের একটি ধারাবাহিক চিত্র পাওয়া যায়। চরম দারিদ্র্য গণনায়ও একই পরিচ্ছন্ন চিত্র ফুটে ওঠে। সাধারণ দারিদ্র্র্যসীমার মধ্যে কেবল খাদ্য দারিদ্র্যের সীমার কাছাকাছি নির্ধারণ করা হয় চরম দারিদ্র্যসীমা। ওই সীমারেখা (২০২২ সালে ২ হাজার ৭৫৫ টাকা) অনুযায়ী ২০২২ সালে চরম দারিদ্র্যের হার কমে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৫ শতাংশে, ২০০০ সালে সে হার ছিল ৩৪ দশমিক ৩ শতাংশ। গ্রামের চরম দারিদ্র্যের হার হ্রাস পায় ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে এবং শহরে ১৩ দশমিক ৭ থেকে ৩ দশমিক ৮ শতাংশে। সম্প্রতি ওই ক্রমহ্রাসের প্রবণতায় ছেদ পড়েছে। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক হিসাব থেকে ধারণা করা যায় যে দারিদ্র্যের হার বর্তমানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর প্রধান কারণ খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার বৃদ্ধি। বিশ্বব্যাংকের হিসাব মতে ২০২৫ সালে নিরঙ্কুশ দারিদ্র্যের হার ২২ দশমিক ৯ শতাংশ এবং চরম দারিদ্র্যের হার ৯ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। বিশ্বব্যাংক বর্তমানে জনপ্রতি দৈনিক ৩ দশমিক ৬৫ ডলার আয়কে দারিদ্র্যসীমা হিসেবে চিহ্নিত করে থাকে। চরম দারিদ্র্যসীমা হলো ২ দশমিক ১৫ ডলার।
বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধির অতি সাম্প্রতিক তথ্য পাওয়া যায় ‘পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার’ (পিপিআরসি) পরিচালিত সমীক্ষা থেকে। তাতে প্রতীয়মান হয় যে দেশে বর্তমানে প্রতি বছর প্রায় ৩ শতাংশ হারে দারিদ্র্য বাড়ছে। তিন বছরে দেশে মোট দারিদ্র্যের হার বেড়েছে ১০ শতাংশ। ২০২২ সালে নিরঙ্কুশ দারিদ্র্যের হার যেখানে ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ, চলতি বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশে। একই সঙ্গে অতি দারিদ্র্যের হার ৫ দশমিক ৬ থেকে বৃদ্ধি পেয়েছে ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশে। তাছাড়া দেশের প্রায় ১৮ শতাংশ পরিবার দারিদ্র্যসীমার খুবই কাছাকাছি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। তারা যেকোনো সময় আয়ের পরিমাণ হারিয়ে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যেতে পারে। সাম্প্রতিক দারিদ্র্য হারে এ অবনতির জন্য চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি তথা দীর্ঘস্থায়ী খাদ্য মূল্যস্ফীতি প্রধানত দায়ী। এর সঙ্গে আছে করোনা মহামারীর অভিঘাত এবং কর্মসংস্থানের তীব্র অভাব। এক বছরে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দারুণ খরা যাচ্ছে। তাতে নতুন উদ্যোগ স্তিমিত হয়ে পড়েছে। ফলে হ্রাস পেয়েছে কর্মসংস্থান। মানুষের আয়ের প্রবৃদ্ধির হার অবদমিত হয়েছে।
দারিদ্র্যের আর একটি রূপ আপেক্ষিক দারিদ্র্য। প্রচলিত অর্থে আয় বৈষম্য। এটি একটি দেশের ব্যক্তি, পরিবার বা গোষ্ঠীর মধ্যে আয়ের পার্থক্য বোঝায়। সহজ কথায় ধনী-দরিদ্রের মধ্যে অসমতা। এটি পরিমাপের জন্য সাধারণত গিনি সূচক ব্যবহার করা হয়। এর মান শূন্য থেকে ১-এর মধ্যে থাকে। শূন্য (০) মানে সবার আয় সমান, নিখুঁত সমতা। ১ মানে সর্বোচ্চ অসমতা, একজন ব্যক্তির হাতে সব আয় পুঞ্জীভূত। সূচকের মান দশমিক ৩-এর নিচে হলে নিম্ন মাত্রার অসমতা বোঝায়। এর মান দশমিক ৫-এর নিচে হলে মাঝারি মাত্রার বৈষম্য বোঝায়। যখন তা দশমিক ৫ অতিক্রম করে তখন উচ্চমাত্রার অসমতা ধরে নেয়া হয়। বাংলাদেশে এখন আয় বৈষম্য প্রকট। সময় গড়িয়ে যাওয়ার সঙ্গে তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৬ সালে গিনি সূচকে আয় বৈষম্যের পরিমাণ ছিল দশমিক ৪৮। গ্রামে দশমিক ৪৫ এবং শহরে দশমিক ৫। ২০২২ সালে তা বেড়ে জাতীয়ভাবে দশমিক ৫-এ উপনীত হয়। গ্রামে এর পরিমাণ দাঁড়ায় দশমিক ৪৫ এবং শহরে দশমিক ৫৪। তিন বছরে এর মাত্রা বেড়েছে। তার একটি প্রতিফলন রয়েছে পিপিআরসির সমীক্ষা প্রতিবেদনে। তাতে দেখা যায়, ২০২২ সালে যেখানে খরচের বৈষম্য ছিল গিনি সূচকে দশমিক ৩৩৪, সেখানে ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় দশমিক ৪৩৬। পারিবারিক খরচ আয়ের ওপর নির্ভরশীল। তাই খরচের বৈষম্য বৃদ্ধি আয় বৈষম্য বৃদ্ধিরই নামান্তর।
আয় বৈষম্যের উদ্ভব ঘটে প্রধানত সম্পদের বৈষম্য থেকে। বাংলাদেশে সম্পদের মালিকানা অতি মাত্রায় পুঞ্জীভূত। সময়ের ব্যবধানে তা ঘনীভূত হচ্ছে। ২০১৬ সালে জাতীয়ভাবে সম্পদের পুঞ্জীভূত মাত্রা ছিল দশমিক ৮২ গিনি সূচক। গ্রামে এর মাত্রা ছিল দশমিক ৭৫ ও শহরে দশমিক ৮৫। ২০২২ সালে তা বৃদ্ধি পেয়েছে দশমিক ৮৪ গিনি সূচকে। গ্রামে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে দশমিক ৮১ এবং শহরে কিছুটা কমে হয়েছে দশমিক ৮৪। গ্রাম ও শহরে সম্পদ বণ্টনে এ অসমতার একটি অন্যতম কারণ উত্তরাধিকার প্রথা। অধিক সম্পদশালী পরিবারগুলো তাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে সম্পদের দায়িত্ব রেখে যায়। শিক্ষার অসমতা, লিঙ্গ অসমতা, দুর্বৃত্তায়ন, আর্থিক কর্মকাণ্ডে অভিগম্যতার অসমতা এবং আয়ের অসমতা সম্পদের অসমতাকে ত্বরান্বিত করে।
সম্পদের পুঞ্জীভবন ও আয়ের অসমতা দারিদ্র্যের মাত্রা বাড়ায়। দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য মূল্যস্ফীতিও দারিদ্র্য বাড়ায়। তাতে মানুষের দুর্ভোগ বাড়ে। সমাজে অস্থিরতার সৃষ্টি হয়। এ চক্র থেকে উত্তরণ প্রয়োজন। খাদ্য মূল্যস্ফীতি হ্রাস করতে হলে সবার আগে কৃষির উৎপাদন বাড়াতে হবে এবং তা স্থিতিশীল রাখতে হবে। ঘাটতির সময় দ্রুত খাদ্যপণ্য আমদানি করতে হবে। যথাযথভাবে মুদ্রা ও রাজস্বনীতি বাস্তবায়ন করতে হবে। অপরদিকে আয় বৈষম্য হ্রাস করার জন্য দরকার অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও অর্থায়ন। দুর্বৃত্তায়ন প্রশমন ও প্রগতিশীল হারে আয়কর আদায়ের বিধান বাস্তবায়ন করতে হবে। গরিব পরিবারের মাঝে আয় স্থানান্তরের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে হবে। লিঙ্গ, ধর্ম, বর্ণ ও গোষ্ঠীভিত্তিক অসমতা দূর করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে সবার জন্য সমান সুযোগ সম্প্রসারিত করতে হবে। সৎ ব্যবসা ও বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে হবে। তাতে মানুষের আয় বৃদ্ধির সঙ্গে বৈষম্য হ্রাস পাবে। কমে আসবে সম্পদের অসমতা।
ড. জাহাঙ্গীর আলম: একুশে পদকপ্রাপ্ত ও কৃষি অর্থনীতিবিদ; সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট ও সাবেক উপাচার্য, ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ