কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

খাদ্য নিরাপত্তা : চ্যালেঞ্জ, সম্ভাবনা ও সেনাবাহিনীর ভূমিকা

মেজর মো. শাহরিয়ার হাসান, পিএসসি [প্রকাশিত: জনকণ্ঠ, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫]

খাদ্য নিরাপত্তা : চ্যালেঞ্জ, সম্ভাবনা ও সেনাবাহিনীর ভূমিকা

খাদ্যের পর্যাপ্ততা ও নিরাপত্তা কোনো জাতির অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হলেও, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা এবং পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের কারণে খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তাছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন, অবকাঠামোর অভাব, এবং কৃষিক্ষেত্রে প্রযুক্তির অপ্রতুলতা বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য একটি বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। খাদ্য নিরাপত্তা বলতে একটি দেশের সকল জনগণের জন্য পর্যাপ্ত, নিরাপদ এবং পুষ্টিকর খাদ্যের প্রাপ্যতা বোঝায়, যা সক্রিয় ও সুস্থ জীবনের জন্য প্রয়োজনীয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এফএও খাদ্য নিরাপত্তাকে চারটি মূল নীতির ওপর ভিত্তি করে সংজ্ঞায়িত করেছে- প্রাপ্যতা, প্রবেশযোগ্যতা, ব্যবহার এবং স্থিতিশীলতা। এই চারটি উপাদান বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

 

 

বাংলাদেশ একটি কৃষিভিত্তিক দেশ, যেখানে কৃষি খাত জাতীয় অর্থনীতির প্রাণশক্তি হিসেবে বিবেচিত। তবু জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, সীমিত কৃষিজমি, বাজারব্যবস্থার দুর্বলতা এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে খাদ্য নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারি সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি সংস্থা এবং সামরিক বাহিনী বিশেষ করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। সেনাবাহিনী দুর্যোগকালে ত্রাণ ও পুনর্বাসন, কৃষি সহায়তা, অবকাঠামো উন্নয়ন, লজিস্টিক সহায়তা এবং সংকটকালীন খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থায় কার্যকর ভূমিকা রাখে।

 

 


গত কয়েক দশকে কৃষি উৎপাদনে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। ধান, গম, ভুট্টা এবং বিভিন্ন ধরনের সবজি উৎপাদনে দেশটি স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। তবে, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো হুমকির মুখে। বিশেষ করে পুষ্টিকর খাদ্যের প্রাপ্যতা এবং সামগ্রিক খাদ্য ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। দেশের অনেক এলাকায় এখনো পুষ্টিহীনতার সমস্যা বিদ্যমান এবং খাদ্যের সুষম বণ্টনের অভাবও একটি বড় সমস্যা।

 

 


বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যে সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়, সেগুলো আলোচনা করা প্রয়োজন। প্রথমত, জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের কৃষিক্ষেত্রে বিশাল প্রভাব ফেলছে। বন্যা, খরা, সাইক্লোন এবং লবণাক্ততার মতো সমস্যা খাদ্য উৎপাদনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। বন্যার কারণে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয় এবং লবণাক্ততার কারণে কৃষিজমির উর্বরতা হ্রাস পায়। ২০২৪ সালে বন্যা এবং ঘূর্ণিঝড় রেমালের কারণে ৬৯৬৮.৯৫ কোটি টাকা ক্ষতি হয়। বিশেষ করে দেশের পূর্বাঞ্চলে বন্যার কারণে আউশ ও আমন ধানের উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। ২০২৩ সালে তিনটি বড় বিপর্যয়ের কারণে ৪২.৪৫ মিলিয়ন ইউএস ডলারের ফসলের ক্ষতি হয়েছে।

 

 


দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা কৃষিজমির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। বাড়িঘর, শিল্পায়ন এবং অবকাঠামো উন্নয়নের কারণে কৃষিজমি ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। ১৯৭৬ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ১৩,৪১২ হেক্টর কৃষিজমি হারিয়ে গেছে। পরবর্তী সময়ে ২০০০ থেকে ২০১০ পর্যন্ত মাত্র দশ বছরে ৩০,০০০ হেক্টরের বেশি কৃষিজমি হারিয়ে গেছে। বাংলাদেশের কৃষিজমি প্রতি বছর গড়ে ৬৬ হাজার একর কমেছে, যা মোট কৃষিজমির ০.২৯ শতাংশ। ফলে খাদ্য উৎপাদনের সম্ভাবনাও কমে যাচ্ছে, যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

 

 


তৃতীয়ত, বাংলাদেশের কৃষিক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি এবং গবেষণার অভাব রয়েছে। এক সমীক্ষা অনুযায়ী এখনো বাংলাদেশের প্রায় ৪৫.৬% কৃষক প্রথাগত পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে, যা উৎপাদনশীলতা কমায়। পরিসংখ্যান দেখায় যে, বাংলাদেশের ৮০ শতাংশ কৃষকের বিভিন্ন কৃষি-সম্পর্কিত চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে জ্ঞান নেই। তাছাড়া, কৃষিক্ষেত্রে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ এবং গবেষণা কার্যক্রমের অভাব রয়েছে, যা আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির প্রয়োগকে বাধাগ্রস্ত করে।

 

 


এছাড়া, দারিদ্র্য বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের ১৮.৭% জনগোষ্ঠী দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে, যা তাদের খাদ্যের প্রতি প্রবেশাধিকারকে সীমিত করে। ২০২৩ সালে দেশে প্রতি দিন গড়ে ২.১৫ ইউএস ডলার ক্রয়ক্ষমতার নিচে বাস করা জনসংখ্যার অনুপাত ছিল ৫.৮%। বাংলাদেশে গত ১০ বছরে গড় ভোক্তা মূল্যস্ফীতি ছিল ৬.২%। এটি এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের গড় থেকে বেশি, যা ছিল ২.১%। ২০২২ সালে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৭.৭%। বর্তমানে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতির হার ৯.০২%। অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং মুদ্রাস্ফীতি খাদ্যের মূল্য বৃদ্ধি করে, যা খাদ্যের প্রাপ্যতাকে কঠিন করে তোলে।
নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, খাদ্য পরিবহন এবং সংরক্ষণে অবকাঠামোর অভাবও বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলে। সঠিক সংরক্ষণ এবং পরিবহনের অভাবে প্রচুর খাদ্য নষ্ট হয়। এক সমীক্ষা অনুযায়ী উৎপাদিত পণ্যের প্রায় ৩৫%-৪০% রাস্তা ও বাজারে নষ্ট হয়। ঢাকার সবচেয়ে বড় বাজার কারওয়ানবাজারের ব্যবসায়ী ও ট্রাক চালকরা জানান, পরিবহন থেকে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ফসল ভেদে ভিন্ন হয়। আলুর জন্য পরিবহনের সময় ক্ষতি প্রতি ৬০ কেজি বস্তায় ১২ কেজি পর্যন্ত। পেঁয়াজের জন্য এটি প্রতি মণ ১৫ কেজি হতে পারে। 

 

 


বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং উন্নয়নের সম্ভাবনাও রয়েছে। প্রথমত, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কৃষি খাতের জন্য ৪৩.৭০০ কোটি টাকা বাজেট অনুমোদন করা হয়, যা মোট বাজেটের ৫.৭%। বাংলাদেশে কৃষি গবেষণা ও উন্নয়নের বাজেট দেশের মোট গবেষণা ও উন্নয়নের ব্যয়ের অংশ, যা বিশ্বব্যাপী সর্বনিম্ন। বাংলাদেশে কৃষি গবেষণার ক্ষেত্রে আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন। হাইব্রিড ফসলের উন্নয়ন, জৈব প্রযুক্তির প্রয়োগ এবং উর্বরতা বৃদ্ধির কৌশলগুলো খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইঅজও) এবং অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে কৃষিক্ষেত্রে নতুন প্রযুক্তি এবং উন্নত ফসল উৎপাদন করা সম্ভব।

 

 


দ্বিতীয়ত, সাম্প্রতিক সময়ে কৃষকদের মধ্যে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের নতুন আগ্রহ পরিলক্ষিত হচ্ছে। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি যেমন- সেচ ব্যবস্থা, কৃষি যন্ত্রপাতি এবং উন্নত বীজের ব্যবহার খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। কৃষকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা সম্ভব। উন্নত দেশগুলো কৃষিতে স্মার্ট প্রযুক্তি যুক্ত করছে। বাংলাদেশেও স্মার্ট প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে। দেশের দুগ্ধ ও প্রাণিসম্পদ খামারে এখন আইওটির ব্যবহার শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে, গ্রামীণফোনের সহায়তায় ডিজি গাভী এবং সূর্যমুখী প্রাণিসেবা গবাদি পশুর খামারগুলোতে আইওটি (ইন্টারনেট অব থিংস) পরিসেবা সরবরাহ করা শুরু করেছে। 

 

 


তৃতীয়ত, সরকারি উদ্যোগে খাদ্য সহায়তা কার্যক্রম এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কার্যক্রম খাদ্য নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে। খাদ্য বণ্টন ব্যবস্থার উন্নতির মাধ্যমে দেশের সকল অঞ্চলে সমানভাবে খাদ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা যায়। প্রধানত শস্য স্থানান্তর হ্রাসের কারণে বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের অধীনে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সরকারের খাদ্য বন্টন কর্মসূচি  প্রথম ত্রৈমাসিকে ১৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। স্থানীয় কৃষকদের সহায়তা এবং কৃষি বাজারের উন্নতি খাদ্য সরবরাহের শৃঙ্খলকে স্থিতিশীল করতে পারে। 

 


এছাড়া, বাংলাদেশে কৃষিভিত্তিক শিল্পের উন্নয়ন খাদ্য নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে। কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, যেমন- খাদ্য সংরক্ষণ, প্যাকেজিং, এবং প্রক্রিয়াজাতকরণে বিনিয়োগ খাদ্য নষ্ট হওয়া রোধ করতে পারে এবং কৃষকদের জন্য নতুন আয়ের উৎস তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশ কৃষি অবকাঠামো উন্নয়ন কর্মসূচি (বিএআইডিপি) যেটি বাংলাদেশে প্রথম সরকার থেকে সরকারি প্রকল্প, যেটিতে এলজিইডি ও ইউএসএআইডিবি, এআইডিপির ব্যানারে মার্কেট সেন্টার, কালেকশন সেন্টার, এক্সেস রোড এবং খামার পর্যায়ে ছোট সেচ ও নিষ্কাশন কার্যক্রমের উন্নয়ন করবে। যেখানে ইউএসএআইডির বিনিয়োগ ১,৫০,০০০০০ ইউএস ডলার এবং দেশের বিনিয়োগ  ১,৫০,০০০ ইউএস ডলার (১০ শতাংশ)।

 


বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কেবল যুদ্ধক্ষেত্রেই নয়, বরং কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতেও অনন্য অবদান রেখে চলেছে। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা বা খরার সময় সেনাবাহিনী জরুরি খাদ্য বিতরণ ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করে। আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন ও ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী দক্ষতার সঙ্গে ভূমিকা পালন করে আসছে। সড়ক, ব্রিজ, খাদ্য গুদাম নির্মাণে সেনাবাহিনী উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে। সেচব্যবস্থা ও বাঁধ নির্মাণেও সেনাবাহিনী সহযোগিতা করে, যা কৃষি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ। সেনাবাহিনীর নিজস্ব পরিবহন, যোগাযোগ ও লজিস্টিক ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত খাদ্য পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। প্রয়োজনে সেনাবাহিনী প্রশাসনের সঙ্গে খাদ্য বাজার তদারকি করে যাতে কেউ কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে না পারে। অনেক সময় সেনা সদস্যরা ভ্রাম্যমাণ আদালত বা বাজার মনিটরিং কার্যক্রমে প্রশাসনকে সহায়তা করে। সেনা নিয়ন্ত্রিত ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বজায় থাকে। খাদ্য সংকটের কারণে যাতে বিশৃঙ্খলা না ঘটে, সেনাবাহিনী সেটিরও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। দুর্যোগকালে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহে ওয়াটার পিউরিফিকেশন প্ল্যান্ট স্থাপন করে। এছাড়াও ইঞ্জিনিয়ার কোর কৃষি অবকাঠামো, বাঁধ ও সেচ ব্যবস্থা উন্নয়নে সহায়তা করে। সিগন্যাল কোর দুর্যোগকালে  যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখতে সহায়তা করে। মেডিকেল কোর দুর্যোগকালে চিকিৎসা সেবা প্রদান ও পুষ্টি সহায়তা প্রদান করে। এএসসি কোর প্রয়োজনে খাদ্য বিতরণ ও রসদ পরিচালনায় মুখ্য ভূমিকা পালন করে।

 

 


বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কিছু সম্ভাব্য সমাধান গ্রহণ করা যেতে পারে- কৃষিক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি এবং উন্নত কৃষি পদ্ধতি ব্যবহার করে খাদ্য উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধি করা সম্ভব। জিনগতভাবে উন্নত বীজ, জলবায়ু সহনশীল শস্য এবং কার্যকরী সেচ ব্যবস্থার প্রচলন করতে হবে।
খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় দুর্বলতা দূর করতে হবে। খাদ্য সংরক্ষণ ও পরিবহণের ক্ষেত্রে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে খাদ্য নষ্ট হওয়ার হার কমাতে সম্ভব।
ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য আর্থিক সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। এর ফলে তারা খাদ্য উৎপাদনে আরও বেশি অবদান রাখতে পারবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে উপযুক্ত শস্য নির্বাচন এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি পদ্ধতির প্রচলন করতে হবে। লবণাক্ততা সহনশীল শস্য এবং সেচের উন্নত পদ্ধতি প্রয়োগ করতে হবে।

 

 


পুষ্টি নিরাপত্তার উন্নয়নের জন্য দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সুষম এবং পুষ্টিকর খাদ্য সহজলভ্য করতে হবে। পুষ্টির সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পুষ্টি শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-র সমীক্ষা অনুযায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং চালের দাম দ্রুত বৃদ্ধি ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ ২০২০ এর মধ্যে দারিদ্র্যকে ৮.৫ শতাংশ (১২.১ মিলিয়ন) বাড়িয়েছে। গ্রহণযোগ্য সীমার মধ্যে মৌসুমি মূল্যের ওঠানামা নিয়ন্ত্রণ করতে যে নীতিমালা ব্যবহার করা হয় তা হলো-১। গার্হস্থ্য ক্রয় কর্মসূচি, যেখানে কৃষকদের জন্য ফ্লোর মূল্য বজায় রাখার জন্য খোলা বাজার থেকে শস্য ক্রয় করা হয় (যার নিচে বাজারের দাম পড়বে না), ২। মূল্য বৃদ্ধির সময় খাদ্যশস্যের দাম কমানোর জন্য খোলা বাজারে বিক্রয় (ঙগঝ) প্রোগ্রাম। ৩। উৎপাদন খরচ কমানোর লক্ষ্যে কৃষি উপকরণে ভর্তুকি বাড়ানো। এসব নীতিমালা এবং উদ্যোগ খাদ্য নিরাপত্তা বিধানে জরুরি সহায়ক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। তাই এ ধরনের আরও উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

 

 


সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি ক্রমাগত পরিবর্তনশীল এবং চ্যালেঞ্জপূর্ণ হলেও, এটি মোকাবিলায় গৃহীত পদক্ষেপগুলো ইতিবাচক ফল দিচ্ছে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, প্রযুক্তি ব্যবহারে উদ্ভাবন এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্য নিরাপত্তা শুধু খাদ্য উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং এটি একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া- যেখানে উৎপাদন, সংরক্ষণ, বিতরণ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা সমানভাবে জরুরি। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দিকে এগিয়েছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে এই অর্জন রয়েছে ঝুঁকির মধ্যে। দুর্যোগকালীন সহায়তা, কৃষি উৎপাদন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং খাদ্য বিতরণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যে অবদান রাখছে, তা জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য। ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার সঙ্গে সেনাবাহিনীর কার্যকর অংশগ্রহণ বাংলাদেশকে একটি টেকসই খাদ্য নিরাপদ রাষ্ট্রে পরিণত করবে।