কেবল স্বাধীনতা নয়, লক্ষ্য ছিল সার্বিক মুক্তি
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী [সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৮ অক্টোবর ২০২৫]

একাত্তরের যুদ্ধ কেবল স্বাধীনতার জন্য ছিল না, ছিল সার্বিক মুক্তির জন্যই। যুদ্ধের মুক্তিযুদ্ধ নামকরণে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না, ছিল পূর্ণ স্বাভাবিকতা। সে জন্য এই যুদ্ধ প্রচলিত ধরনের ছিল না, পরিণত হয়েছিল জনযুদ্ধে। জাতীয়তাবাদী অনুপ্রেরণা অবশ্যই কার্যকর ছিল।
এবং সেটিই যে ছিল প্রাথমিক সত্য, সে ব্যাপারেও কোনো সন্দেহ নেই। পাকিস্তানি শাসকরা যে একটি অভ্যন্তরীণ ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র কায়েম এবং কৃত্রিম পাকিস্তানি জাতি গঠনের নির্মম উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তাকে প্রত্যাখ্যান করেই মুক্তির ওই সংগ্রাম এগিয়েছে।
যাত্রাটি শুরু হয় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ভেতর দিয়ে। ওই আন্দোলন উর্দু ভাষার বিরুদ্ধে ছিল না, ছিল উর্দু ভাষাকে পূর্ববঙ্গবাসীর কাঁধে চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে।
ভারতবর্ষ যে এক জাতির নয়, বহুজাতিক দেশ—এই সত্যটি রাজনৈতিকভাবে সর্বপ্রথম তুলে ধরেন কমিউনিস্টরাই, কিন্তু তাঁদের কণ্ঠে তো তেমন জোর ছিল না, তাঁদের সংগঠনও ছিল দুর্বল। তা ছাড়া ব্যাপারটিকে যতটা গুরুত্ব দেওয়া আবশ্যক ছিল, ততটা গুরুত্ব তাঁরা দেনওনি। পূর্ববঙ্গে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সূত্রপাতকালেও তাঁরা তাঁদের বক্তব্যে উল্লেখ করেছিলেন যে পাকিস্তানে কোনো একটি ভাষার নয়, সব ভাষারই সমান মর্যাদা দিতে হবে। কিন্তু বিদ্যমান পরিস্থিতিতে পূর্ববঙ্গের মানুষের সঙ্গে পাকিস্তানি শাসকদের দ্বন্দ্বটিই প্রধান হয়ে ওঠার দরুন সব ভাষার সমান মর্যাদার দাবিটি স্বভাবতই চাপা পড়ে গেল।
পরবর্তী সময়ে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে বামপন্থীরা যখন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠন করেন, তখন তাঁরা পাকিস্তানের ভিন্ন ভিন্ন জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার সম্বন্ধে সচেতন ছিলেন এবং সেই অধিকার প্রতিষ্ঠা ছিল তাঁদের অন্যতম দাবি।
কেবল স্বাধীনতা নয়, লক্ষ্য ছিল সার্বিক মুক্তিভাষা জিনিসটি মানুষের কেমন প্রিয়, তা শুধু আমাদের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সময়েই নয়, একাত্তরের যুদ্ধের পরেও ভিন্নভাবে হলেও দেখা গেছে বৈকি। একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। ঢাকা শহরের কাপ্তান বাজার এলাকায় বিহার থেকে আগত উর্দুভাষী মোহাজেররা বসবাস করত। তারা বরাবরই ছিল ঘোরতর ভারতবিদ্বেষী, কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে যে যুদ্ধশেষে ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি দল যখন ওই এলাকা দিয়ে যাচ্ছিল, তখন বিহারি বলে চিনতে পেরে মোহাজেররা তাদের গাড়ি থেকে সাদরে নামিয়ে কোলাকুলি করেছে; নিজেদের মাতৃভাষায় পরস্পরের মঙ্গল কামনা, ফেলে আসা মাতৃভূমির অবস্থা বিষয়ে খবর নেওয়া, চা-নাশতা খাওয়ানোর জন্য জোরাজুরি ইত্যাদি অনেক কিছুই করেছে, যেন আত্মীয়দের পুনর্মিলন।
এবং এমনও শুনেছি যে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে শত্রু-মিত্র ভেদাভেদ মুছে ফেলে পাকিস্তানি ও ভারতীয় সেনাধ্যক্ষদের ভেতর পাঞ্জাবি ভাষায় কথাবার্তা, হাসিঠাট্টা ইয়ার-দোস্তালি চলেছে। ওই ব্যাপারে পরাজিত পাকিস্তানি ‘বীর’ সেনাকর্তাদের আগ্রহটাই ছিল অধিক; তবে বিপরীত পক্ষ যে সাড়া দেয়নি, এমন নয়।
যুদ্ধটা তো ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে পূর্ববঙ্গবাসীর। একদিকে পাকিস্তানি, অন্যদিকে বাঙালি। ভারত যে এই যুদ্ধে যুক্ত হয় তার একটি কারণ ছিল মানবিক, অর্থাৎ ভারতে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর আবশ্যকতা, কিন্তু আরেকটি কারণ এবং সেটিই প্রধান—অবশ্যই ছিল। সেটি রাজনৈতিক।
জাতীয়তাবাদী ভারতের আকাঙ্ক্ষা ছিল জাতীয়তাবাদী পাকিস্তানকে জব্দ করা। ওদিকে পাকিস্তানি বাহিনী যখন নিশ্চিত হয়ে গেছে যে বাঙালিদের সঙ্গে ওই যুদ্ধে তাদের জয়ের কোনো সম্ভাবনাই নেই, এখন তাদের স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত এটিই দাঁড়িয়েছিল যে ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ বাধিয়ে দিয়ে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতিতে যাবে, যাতে বাঙালিদের হাতে পরাজয়ের গ্লানিটা এড়ানো যায় এবং যুদ্ধবন্দি হিসেবে ভারতে গিয়ে পাকিস্তানে ফেরার বন্দোবস্ত করা সম্ভব হয়।
ভারতও চেয়েছে মুক্তিবাহিনী নয়, তারাই পাকিস্তানকে হারিয়ে দিয়েছে, বিজয়ের এই গৌরব এবং পাকিস্তানকে ভেঙে ফেলার সন্তুষ্টিটা লাভ করতে। পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের দলিলে যৌথ বাহিনীর কথা উল্লেখ ছিল ঠিকই, কিন্তু মুক্তিবাহিনীর প্রধান এম এ জি ওসমানী যাতে আত্মসমর্পণের অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত থাকেন তার ব্যবস্থা ভারতের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো দৈব ঘটনায় ঘটেনি। ওসমানীর অনুপস্থিতিতে পাকিস্তানিরা মুক্তিবাহিনীর কাছে হেরে গিয়ে আত্মসমর্পণের গ্লানির হাত থেকে রক্ষা পায়। মুক্তিবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের শঙ্কাটা তো তাদের কাছে আত্মহননের চেয়ে কম ভয়ংকর ছিল না।
ভারত ও পাকিস্তান উভয় পক্ষের কাছেই তাই মুক্তিযুদ্ধে পূর্ববঙ্গের বিজয় পরিণত হলো ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে বড় রাষ্ট্র ভারতের কাছে ছোট রাষ্ট্র পাকিস্তানের পরাজয়ে। মুক্তিবাহিনীর লড়াইটাই যে হানাদারদের পরাজয়ের মূল কারণ, সেটা আড়াল করার ব্যাপারে পাকিস্তানিরা অবশ্যই উৎসাহী ছিল, তবে ভারতের যে অসম্মতি ছিল, তা মোটেই নয়। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব যদি সমাজতন্ত্রীদের হাতে থাকত, তাহলে ঘটনার চিত্রটা অবশ্যই ভিন্ন রকমের হতো। কিন্তু সমাজতন্ত্রীরা তো নেতৃত্ব দিতে পারেননি, তাঁরা লড়াইয়ে ছিলেন, কিন্তু নেতৃত্বে ছিলেন না।
স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হলো এবং বুর্জোয়া শাসনকর্তারা যেভাবে চাইলেন, রাষ্ট্র ঠিক সেভাবেই পরিচালিত হতে থাকল। মেহনতি মানুষ যুদ্ধ করেছে, প্রাণ দিয়েছে, কিন্তু তাদের ভাগ্যে কোনো পরিবর্তন এলো না। আগে লুণ্ঠন করত পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদীরা, এবার ওই একই কাজ শুরু করল বাঙালি জাতীয়তাবাদী নামধারীরা। মুক্তির ওই সর্বাত্মক সংগ্রামে মওলানা ভাসানীই ছিলেন মূল নেতা, কিন্তু শেখ মুজিবের শাসনাধীনে আওয়ামী লীগের চেষ্টা ছিল ভাসানীর ভূমিকা তো বটেই, তাঁর নামটিও ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার। অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন ঘোষণা দিয়েছিলেন, বাংলাদেশ সরকার মার্কিন সাহায্য নেবে না; দেশে ফিরে মুজিব বললেন, সাহায্য নেবেন, তবে সেটি শর্তহীন হতে হবে। সেই যে ‘শর্তহীন’ সাহায্যদাতা তাদের আনুকূল্যেই তিনি তাঁর নিজের তুলনায়ও অধিকতর জাতীয়তাবাদী বলে স্বঘোষিতদের হাতে সপরিবারে নিহত হলেন। স্বাভাবিক প্রবণতাতেই ওই ঘাতকরা ছিল পুরোমাত্রায় পুঁজিবাদে দীক্ষিত।
ইংরেজ শাসনের সূচনা ও অবসান দুটিই ঘটেছে বাংলায় মহামন্বন্তর ঘটিয়ে; পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার সময়েও পূর্ববঙ্গে দুর্ভিক্ষাবস্থা দেখা দিয়েছিল; বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও কিন্তু একই ঘটনা ঘটল। দুর্ভিক্ষ দেখা দিল। ১৯৭৪ সালের সেই বিপর্যয়ে কমপক্ষে পাঁচ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। রাষ্ট্র তার দুষ্কর্মের ধারা অব্যাহতই রেখেছে। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসও লুণ্ঠনেরই ইতিহাস বৈকি। লুণ্ঠন ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে; তার সঙ্গে সংগতি রেখে সম্পদপাচারও থেকেছে বাড়তির দিকেই। রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, আমলা—সবারই স্থির লক্ষ্য এক ও অভিন্ন; সেটি হলো ন্যায়-অন্যায় যেভাবে সম্ভব ধনী হওয়া।
চূড়ান্ত বিচারে জাতীয়তাবাদ একটি অনুভূতি বৈকি, তবে এটি যে একটি শক্তিশালী অনুভূতি, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এবং অন্য সবকিছুর মতোই জাতীয়তাবাদেরও একটি সীমা আছে। আসলে জাতীয়তাবাদী অনুভূতি এক প্রকারের নয়, মোটাদাগে তারা দুই প্রকারের; একটি আগ্রাসী, অপরটি প্রতিরোধী। আমরা বাংলাদেশের মানুষ উভয় প্রকার জাতীয়তাবাদের তৎপরতাই দেখেছি। ভারতবর্ষে যে ইংরেজরা উপনিবেশ স্থাপন করেছিল, তারাও জাতীয়তাবাদী চেতনা ধারণ করত। তাদের জাতীয়তাবাদটা ছিল আগ্রাসী; আর তাদের বিতাড়িত করার জন্য যে সংগ্রামটা পরাধীন ভারতবর্ষে গড়ে উঠেছিল, সেটা ছিল প্রতিরোধের। বলা যায় আত্মরক্ষারও। ঔপনিবেশিক জাতীয়তাবাদীরা প্রথমে আসে বাণিজ্য করবে বলে; পরে তারা পরিণত হয় দখলদারে। ব্যবসা তো রইলই, পাশাপাশি শুরু করল রাজস্ব সংগ্রহ এবং বিনিয়োগ; বিনিয়োগও এসেছে লুণ্ঠনে সংগৃহীত অর্থ থেকেই। সব পদ্ধতিরই লক্ষ্যটা ছিল অভিন্ন—সেটা হলো লুণ্ঠন। লুণ্ঠনলব্ধ সম্পদ তারা নিজেদের দেশে পাচার করেছে। ফলে একদিকে শোষণের বিশেষ ক্ষেত্র বাংলাদেশ যেমন নিঃস্ব হতে থাকে, অপরদিকে ইংল্যান্ডে তেমনি শিল্প বিপ্লব ঘটে।
এটি অবশ্যই তাৎপর্যবিহীন নয় যে ইংরেজদের ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির শাসন যখন চালু হয় তখন, সূচনাকালেই, বাংলায় একটি মহামন্বন্তর ঘটে, যাতে বাংলার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ প্রাণ হারায়; আবার তাদের প্রস্থানের কালেও আরেকটি ভয়াবহ মন্বন্তর দেখা দেয়, যাতে কমপক্ষে ৩৫ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। তাদের শাসন-শোষণ ছিল এই মাত্রারই মনুষ্যত্ববিরোধী।
বিগত সরকারের শাসনামলে সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণ করা হবে দেশের বৃহত্তম জলাভূমি চলনবিল এলাকায়; ওই সরকারের পতন ঘটেছে, কিন্তু চলনবিলে ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নাকি বদল হয়নি। রবীন্দ্রনাথ জীবিত থাকলে তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের এই তৎপরতার কথা শুনলে নিশ্চয়ই শিউরে উঠতেন এবং প্রবলভাবে প্রতিবাদ করতেন। কিন্তু এখন তো আমরা আর বিংশ শতাব্দীতে নেই, নতুন শতাব্দীতে আগের তুলনায় অনেক প্রচণ্ড বেগে ও আবেগে উন্নত হচ্ছি। কিন্তু আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার ধারাটি অভিন্ন; আমরা পুঁজিবাদী ধারার ভেতরেই রয়েছি।
লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়