কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

কার্বনের বাজারে মানবসভ্যতা

খন্দকার আপন হোসাইন [প্রকাশ : দেশ রূপান্তর, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬]

কার্বনের বাজারে মানবসভ্যতা

আগামী দশ বছরে, পৃথিবীর তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করলে দায় কার? শিল্পবিপ্লবের ধোঁয়া, নাকি নীতিনির্ধারকদের দ্বিধা? সমুদ্রের উষ্ণতা, নাকি আমাদের অর্থনীতির শীতল হিসাব? প্রশ্নগুলো একই সঙ্গে বৈজ্ঞানিক ও রাজনৈতিক। কারণ জলবায়ু হচ্ছে, পরিবেশের প্রান্তিক ইস্যু ও বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রস্থল। বিগত তিন দশকে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা প্রায় ১.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। ইন্টারন্যাশনাল প্যানেল ওন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি)-এর সতর্কবার্তাটি হলো, বর্তমান নির্গমন প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের আগেই ১.৫ ডিগ্রির সীমা অতিক্রম হতে পারে। এই সতর্কবার্তা সভ্যতা রক্ষায় এক রাজনৈতিক আল্টিমেটাম।

 

 

আল্টিমেটামের মুখে কে নেতৃত্ব নেবে? কে বলবে কার্বনেরও মূল্য আছে, দায়বদ্ধতারও সীমা আছে? এই প্রশ্নের উত্তরে দৃশ্যপটে উঠে এসেছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন। একক রাষ্ট্র নয়, বরং নীতিগত জোট হিসেবে তারা জলবায়ু প্রশ্নকে অর্থনীতি ও কূটনীতির কেন্দ্রে স্থাপন করেছে। তাদের সম্মিলিত নির্গমন বৈশ্বিক হিসেবে মাত্র ৭-৮ শতাংশ। তবু উচ্চাকাক্সক্ষায় তারা অগ্রগণ্য। কারণ দেশগুলো জানে, নীতির ধারাবাহিকতাতেই নেতৃত্বের আসল শক্তি। এখান থেকেই শুরু হয় নতুন অধ্যায়। যেখানে রাসায়নিক উপাদান কার্বন বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার প্রধান মুদ্রা। সেখানে সীমান্ত শুল্ক বাণিজ্য নীতি ও জলবায়ু কূটনীতির অস্ত্র। যেখানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিন্তাশক্তি আজকের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানায়। বিশ্ব রাজনীতির সাম্প্রতিক ইতিহাসে জলবায়ুর প্রশ্ন এক অনিবার্য বাস্তবতা হয়ে উঠেছে।

 

ইউরোপীয় জলবায়ু নীতির কেন্দ্রস্থলে রয়েছে বাজারভিত্তিক কার্বন মূল্য নির্ধারণ। ২০০৫ সালে চালু হওয়া ইইউ মিশন ট্রেডিং সিস্টেম আজ বিশ্বের বৃহত্তম কার্বন বাজার। প্রায় ১০ হাজারের বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান এই ব্যবস্থার আওতায়। নির্গমন কোটার সীমা প্রতি বছর সংকুচিত হয়। ফলে কার্বনের মূল্য ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়। ২০২৩ সালে এই বাজারে কার্বনের দাম টন প্রতি ৮০ থেকে ১০০ ইউরোর মধ্যে ওঠানামা করেছে। ইউরোপীয় শিল্প কার্বনের জন্য মূল্য পরিশোধ করলে, বহিরাগত উৎপাদকদেরও সমতুল্য দায় বহন করতে হবে।

 

 

অন্যথায় ‘কার্বন লিকেজ’ ঘটবে। অর্থাৎ উৎপাদন সস্তা হওয়ায় দূষণকারী দেশে তা স্থানান্তরিত হবে। ইউরোপীয় কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, এই ব্যবস্থায় বার্ষিক কয়েক বিলিয়ন ইউরো রাজস্ব অর্জিত হতে পারে। একই সঙ্গে বৈশি^ক নির্গমন হ্রাসে কাঠামোগত প্রভাব পড়বে। হার্ভার্ড ও ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির যৌথ গবেষণায় দেখানো হয়েছে, ভারী শিল্প খাতে ‘সমন্বিত কার্বন মূল্য নির্ধারণ জোট’ গড়ে উঠলে ২০৩৫ সালের মধ্যে শত কোটি টন নির্গমন কমানো সম্ভব। ইউরোপের এই সীমান্ত সমন্বয় নীতি, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। ইউনাইটেড কিংডম ২০২৭ সাল থেকে অনুরূপ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। অস্ট্রেলিয়া তাদের কার্বন লিকেজ পর্যালোচনায় সীমান্ত সমন্বয়ের সুপারিশ করেছে। চীন ইতোমধ্যে বিশ্বের বৃহত্তম জাতীয় কার্বন বাজার চালু করেছে, যদিও এর মূল্য এখনো অনেক কম।

 

ভারত ও ব্রাজিলও কার্বন মূল্য নির্ধারণ কাঠামো সম্প্রসারণের পথে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে ৭০টিরও বেশি কার্বন মূল্য নির্ধারণ উদ্যোগ বিশ্বে কার্যকর। এগুলো বৈশ্বিক নির্গমনের প্রায় ২৩ শতাংশ আচ্ছাদিত করে। এক দশক আগে এই হার ছিল মাত্র ১২ শতাংশ। এই বৃদ্ধির পেছনে ইউরোপীয় প্রভাব অনস্বীকার্য। তবে ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা জটিল। যুক্তরাষ্ট্র এখনো ফেডারেল পর্যায়ে সমন্বিত কার্বন মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা চালু করেনি। অতীতে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন পরিবেশ সুরক্ষা নীতির বেশ কিছু ভিত্তি দুর্বল করার উদ্যোগ নিয়েছিল। ‘এন্ডেঞ্জারমেন্ট ফাইন্ডিং’ নিয়ে বিতর্ক তারই অংশ। যদিও পরবর্তী প্রশাসন পুনরায় জলবায়ু প্রতিশ্রুতি জোরদার করেছিল।  এরপরও কংগ্রেসীয় সমর্থনের অভাব নীতিগত অস্থিরতা সৃষ্টি করে। যুক্তরাষ্ট্রে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলেও, জাতীয় কার্বন মূল্য নির্ধারণ এখনো রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর। বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলো ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশের শর্ত পূরণে প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে সীমান্ত সমন্বয় নীতি পরোক্ষভাবে মার্কিন শিল্পনীতিতেও প্রভাব ফেলছে।

 
 
 
 
নীতিগত অগ্রযাত্রার মধ্যেই ইউরোপে অভ্যন্তরীণ বিতর্কও জোরদার হয়েছে। জার্মান নেতৃত্বের কিছু বক্তব্যে শিল্প প্রতিযোগিতা সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে। কার্বনের উচ্চমূল্য যদি উৎপাদন ব্যয় বাড়ায়, তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এমন যুক্তিও সামনে এসেছে। কিন্তু গবেষণা বলছে, দীর্ঘমেয়াদে সবুজ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ কর্মসংস্থান ও উদ্ভাবন বাড়ায়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে নবায়নযোগ্য খাতে বৈশি^ক বিনিয়োগ ৫৭০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। ইউরোপ সেখানে উল্লেখযোগ্য অংশীদার।
 
 
 
 
 পরিচ্ছন্ন ইস্পাত ও সবুজ হাইড্রোজেন প্রযুক্তিতে তারা অগ্রণী অবস্থানে। কার্বন মূল্য সংকেত এই রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করছে। অপরদিকে সীমান্ত সমন্বয় অন্য দেশকে নিজস্ব কার্বন মূল্য নির্ধারণে উৎসাহিত করে। এতে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র সমতাভিত্তিক হয়। একই সঙ্গে নির্গমন হ্রাসে সমন্বিত চাপ সৃষ্টি হয়। যদি অধিকাংশ প্রধান অর্থনীতি কার্বনের মূল্য নির্ধারণে সম্মত হয় তবে সীমান্ত শুল্কের প্রয়োজনীয়তাই ক্ষীণ হয়ে আসবে। প্রত্যেক দেশ নিজ নিজ শিল্পকে নির্গমনের জন্য দায়বদ্ধ করবে। তখন জলবায়ু নীতি হবে বৈশ্বিক নিয়ম। বিশ্ব উষ্ণায়নের অভিঘাত ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান।
 
 
 
 
ইউরোপে ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তাপপ্রবাহে কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। ইউরোপীয় অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে দৃঢ় নীতিগত সংকল্প, বাজারভিত্তিক প্রণোদনা এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন একসঙ্গে কাজ করলে পরিবর্তন সম্ভব। এই রূপান্তর সহজ নয়, কিন্তু বিলম্বের মূল্য আরও বেশি। ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে জলবায়ু নেতৃত্ব কূটনৈতিক অবস্থান ও সভ্যতার টিকে থাকার প্রশ্নে অতি গুরুত্বপূর্ণ। কার্বনের ছায়া সরিয়ে দায়বদ্ধতার আলো জ্বালালেই আসবে মানবসভ্যতার নতুন ভোর। অন্যথায় নীরবতার দীর্ঘ ছায়া গ্রাস করবে মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ।

লেখক: শিক্ষক,  গবেষক ও সংগঠক