কার্বন-নেগেটিভ উদ্যোগে ভুটান যেভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছে
শেরিং তোবগা শেরিং তোবগা [প্রকাশ : সমকাল, ২০ নভেম্বর ২০২৫ ]

বিশ্বের প্রথম কার্বন-নেগেটিভ দেশ হলো ভুটান। জলবায়ু সংকটের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী ধনী পশ্চিমা দেশগুলো। পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দিয়ে তারা নিজেদের নাগরিকদের স্বাস্থ্য ও সুখের অগ্রগতি করবে।
হিমালয়ের পূর্বাংশে উঁচুতে অবস্থিত বৌদ্ধ গণতান্ত্রিক রাজতন্ত্র এবং জীববৈচিত্র্যের কেন্দ্রবিন্দু হলো ভুটান। বিশ্বের সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী জলবায়ু নেতৃত্বের মধ্যে এ দেশ একটি। কারণ এর জনগণের প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ এবং কেবল জিডিপির পরিবর্তে মোট জাতীয় সুখের অগ্রগতির ওপর সুদৃঢ় রাজনৈতিক মনোযোগ রয়েছে।
আমাদের সীমিত সম্পদ এবং বিশাল ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও আমরা জলবায়ু কর্মকাণ্ড, সামাজিক অগ্রগতি, সাংস্কৃতিক এবং পরিবেশ সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার দিতে সক্ষম হয়েছি। কারণ জনগণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুখ ও কল্যাণ আমাদের উন্নয়ন এজেন্ডার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। যদি আমরা এটি করে দেখাতে পারি, তাহলে বিপুল সম্পদ ও রাজস্বওয়ালা উন্নত ধনী দেশগুলো নিজেদের নির্গমন কমাতে এবং জলবায়ু সংকটের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পাশাপাশি অবশ্য আরও বহু কিছু করতে হবে।
জাতিসংঘের জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলন যখন কয়েকদিনের মধ্যে শেষ হতে যাচ্ছে, তখন ভুটানের জলবায়ু প্রতিশ্রুতি অর্থনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রেই সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী তৎপরতার মধ্যে একটি হিসেবে উঠে এসেছে। এই প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে জল, সৌর, বায়ু, বিতরণকৃত জ্বালানি সম্পদ ব্যবস্থা থেকে জ্বালানি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সবুজ হাইড্রোজেন পরীক্ষামূলক চালু করা। সেই সঙ্গে পরিবহন, ভবন এবং কৃষিক্ষেত্রে দক্ষতা ও নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো।
ভারত ও চীনের মাঝখানে অবস্থিত একটি স্থলবেষ্টিত দেশ ভুটান, যার জনসংখ্যা ৮ লাখের কাছাকাছি। বসবাসকারীদের প্রায় অর্ধেকই জীবিকা নির্বাহকারী কৃষক। গণতন্ত্রে রূপান্তরের পর দারিদ্র্য হ্রাস, শিক্ষা ও আয়ুষ্কালের মতো ক্ষেত্রগুলোতে গত তিন দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে। এ কারণে ২০২৩ সালে এটি জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) ক্যাটেগরি থেকে উত্তীর্ণ হয়ে মাত্র সপ্তম দেশ হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে উৎসাহিত করার জন্য পরিবেশগত নিয়মকানুন লঙ্ঘন করেনি তারা, বরং মানদণ্ড কঠোর করে এবং বায়ু, জল ও ভূমির গুণগত মান অগ্রাধিকার দিয়ে এটি সম্ভব করেছে। আমাদের লক্ষ্য হলো সামষ্টিকভাবে জাতীয় সুখ অর্জন করা। অন্যদিকে জিডিপি কেবল একটি হাতিয়ার, আর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আমাদের জনগণের সুখ ও সুস্থতার ক্ষেত্রে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে না।
কিন্তু স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) র্যাঙ্কিং থেকে নিজেকে তুলে ধরা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ছিল। এতে আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন, সাহায্য এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার ক্ষেত্রে সুযোগ কমে এসেছিল। এমনকি বন্যা, খরা এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের মতো জলবায়ু ধাক্কা বাড়ার পরও।
বৈশ্বিক উষ্ণায়নে ভুটানের প্রভাব নগণ্য। দেশটির ৭২ শতাংশ ভূখণ্ড বনভূমিতে পরিপূর্ণ, যা কার্বন নিঃসরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ক্লাইমেট অ্যাকশন ট্র্যাকারের মতে, এটি এমন কয়েকটি দেশের মধ্যে অন্যতম, যারা প্যারিস চুক্তির লক্ষ্য সামনে রেখে সম্পূর্ণরূপে কিংবা প্রায় পুরোপরি একমত হয়ে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন শিল্প-পূর্ব স্তরের চেয়ে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমাবদ্ধ রাখতে কাজ করছে।
পরিবেশ ও জলবায়ু সুরক্ষার ওপর ভুটানের মনোযোগ কেবল জাতিসংঘের জলবায়ু প্রক্রিয়ার প্রতি তাদের অঙ্গীকার দ্বারা পরিচালিত হয় না। ভুটানের মানুষ বিশ্বাস করে যে, তাদের দেবতারা প্রাকৃতিক পরিবেশের সর্বাংশে বাস করেন, যার অর্থ বন ও কিছু জলাশয় অবাধ নয় এবং পর্বতারোহণ নিষিদ্ধ। ভুটানে সর্বোচ্চ পর্বত গাংখার পুয়েনসুম রয়েছে, যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৭ হাজার ৫০০ মিটারেরও বেশি উঁচুতে অবস্থিত।
তরুণ এ গণতন্ত্রের সংবিধানের একটি সম্পূর্ণ অনুচ্ছেদ পরিবেশ রক্ষার জন্য নিবেদিত, যার মধ্যে দেশের কমপক্ষে ৬০ শতাংশ বনভূমি থাকা বাধ্যতামূলক বলে ঘোষণা রয়েছে। এটি সরকার এবং প্রত্যেক নাগরিককে প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা, সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং সব ধরনের পরিবেশগত অবক্ষয় প্রতিরোধে অবদান রাখার নির্দেশ দেয়।
আমরা যে পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত করি, তার প্রায় পাঁচ গুণ পরিমাণে আমরা জমা করছি। আমরা আমাদের জীববৈচিত্র্য ও বনের যত্ন নিচ্ছি। আমরা প্রকৃতির প্রতি ইতিবাচক, কার্বনের ব্যাপারে নেতিবাচক। যেহেতু আমরা একটি স্থলবেষ্টিত পাহাড়ি দেশে বাস করি, সে কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের চাপ আমাদের বহন করতে হচ্ছে।
বিশ্বের গড় তুলনায় পর্বতমালা দ্রুত গরম হয়ে পড়ছে। ফলে ভুটানের হিমবাহ গলে যাচ্ছে এবং হ্রদ উপচে পড়ছে। বন্যা ইতোমধ্যে কৃষক সম্প্রদায়কে বাস্তুচ্যুত করেছে এবং রাস্তা রক্ষণাবেক্ষণ খরচ দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।
উন্নত বিশ্বকে তাদের নৈতিক ও আইনি বাধ্যবাধকতা পূরণের জন্য আরও বেশি কিছু করতে হবে। তাদের অবশ্যই উন্নয়নশীল বিশ্বকে অর্থায়ন, সম্পদ ও প্রযুক্তি স্থানান্তর প্রদানের মাধ্যমে নির্গমন কমাতে এবং অভিযোজনে সহায়তা করতে হবে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তাদের নিজস্ব নির্গমন কমাতে হবে।
ভুটানের মতো ছোট দেশগুলোতে আমরা আসলে আমাদের ন্যায্য অংশের চেয়ে অনেক বেশি করছি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিপর্যয়কর। এমনকি এ বিপর্যয় ধনী দেশগুলোরও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
গত বছর কপ২৯-এ ভুটান পানামা, সুরিনাম ও মাদাগাস্কার– তিনটি কার্বন-নেগেটিভ বা কার্বন-নিরপেক্ষ দেশের সঙ্গে একটি জোটের সূচনা করেছিল, যার লক্ষ্য ছিল বিশ্বব্যাপী জলবায়ু কর্মকাণ্ডে তাদের বিশাল অবদানের জন্য জাতিসংঘের জলবায়ু আলোচনায় বৃহত্তর স্বীকৃতি ও প্রভাব অর্জন করা।
জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত সব ধরনের আলোচনায় প্রকৃত ফলাফলের ওপর জোর না দিয়ে ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। আমরা চাই আমাদের অবদান এবং হারিয়ে যাওয়া সুযোগগুলোকে স্বীকৃতি ও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হোক। এটি অন্যান্য দেশকে কেবল কার্বন শূন্যের জন্য আকাঙ্ক্ষা করে না, বরং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাস্তবে কাজ করতে উৎসাহিত করবে। প্রায়ই খারাপ আচরণকে স্বীকৃতি দেওয়া ও পুরস্কৃত করা হয় এবং ভালো আচরণ দেখা যায় না, বরং তা স্বাভাবিকভাবেই নেওয়া হয়। আমাদের এটি পাল্টে দিতে হবে।
সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনকালে তথাকথিত জি-জিরো দেশগুলোর নেতারা আলোচনায় বসেছিলেন। তারা জলবায়ু সমাধানগুলো তুলে ধরা, পরস্পরকে জানানো এবং পিছিয়ে থাকা উন্নত বিশ্বকে একটি বার্তা দিতে আগামী বছর ভুটানে একটি উদ্বোধনী শীর্ষ সম্মেলনে সম্মত হন।
তাহলে আপনি হয়তো শিল্পোন্নত দেশের অন্তর্ভুক্ত, আপনি পুরস্কার পেয়েছেন এবং বিশ্বজুড়ে শিল্পায়নের সুবিধা ছড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু এখন সময় এসেছে আমরা কোথায় আছি তা পর্যালোচনা করার। শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে মুখোমুখি করার দরকার নেই, বরং দুটোই টেকসই করতে হবে।
জিডিপি কীসের জন্য? কার্বন নিঃসরণ কমানোর উদ্দেশ্য কী? এটা আপনার জনগণের সুখ ও কল্যাণের জন্য হতে হবে। আমরা যা-ই করি না কেন, পৃথিবী টিকে থাকবে। বিশ্ব উষ্ণায়ন নিয়ন্ত্রণ, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই করার তাগিদ বর্তমান মানুষের এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দরকার। আমরা জনগণের যত্ন নিচ্ছি, অর্থনীতি ক্রমবর্ধমান হচ্ছে, একই সঙ্গে আমরা পরিবেশের যত্ন নিতে সক্ষম হয়েছি। যদি এত ক্ষুদ্র উন্নয়নশীল দেশগুলো এটি করতে পারে, তাহলে বৃহত্তর দেশগুলো বড় ভূমিকা পালন করতে পারে না– এমন কোনো অজুহাত নেই। সর্বোপরি তারাই বিশ্বের নেতা।
শেরিং তোবগা: ভুটানের প্রধানমন্ত্রী; দ্য গার্ডিয়ান থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম