জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি : বিশ্বমন্দা ও খাদ্যসংকট কি অনিবার্য
ড. মো. ফখরুল ইসলাম [সূত্র : কালের কণ্ঠ, ০৫ এপ্রিল ২০২৬]

বিশ্ব অর্থনীতি এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে অনিশ্চয়তাই যেন একমাত্র স্থির বাস্তবতা। ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতা, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কঠোর মুদ্রানীতি—সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক পরিবেশ ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। এই প্রেক্ষাপটে বিশ্বের বৃহত্তম সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাকরকের কর্ণধার ল্যারি ফিংক সতর্ক করে বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম যদি ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারে পৌঁছে, তাহলে তা বিশ্ব অর্থনীতিকে নতুন এক মন্দার দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাঁর এই বক্তব্য একটি নেতিবাচক অনুমান হলেও বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার গভীর বিশ্লেষণ।
তেলের গুরুত্ব নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। আধুনিক অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি খাত; যেমন—পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প-কারখানা, কৃষি উৎপাদন—সবই কোনো না কোনোভাবে জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে তেলের দামের উল্লম্ফন সরাসরি উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, তেলের বাজারের অস্থিরতা প্রায়ই বড় অর্থনৈতিক সংকটের পূর্বাভাস হয়ে উঠেছে।
১৯৭০-এর দশকের তেলসংকট বিশ্ব অর্থনীতিকে স্থবির করে দিয়েছিল। একইভাবে ২০০৮ সালের ‘গ্লোবাল ফিন্যানশিয়াল ক্রাইসিস’-এর সময়ও তেলের উচ্চমূল্য অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছিল। যদিও ওই সংকটের মূল কারণ ছিল আর্থিক খাতের দুর্বলতা, তবু জ্বালানির উচ্চব্যয় পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছিল।
ল্যারি ফিংকের আশঙ্কা, এই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে।
বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতি এমনিতেই দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। অনেক দেশ এখনো মহামারির ধাক্কা পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মতো সংঘাত, যা জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়িয়েছে। যদি এই পরিস্থিতিতে তেলের দাম ১৫০ ডলারে পৌঁছে যায়, তাহলে তা অর্থনীতির ওপর বহুমাত্রিক চাপ সৃষ্টি করবে।
এর প্রভাবে নানা বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে।
যেমন—প্রথমত, তেলের উচ্চমূল্য সরাসরি মূল্যস্ফীতি বাড়াবে। পরিবহন ব্যয় বাড়লে খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়বে। এতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে, যা ভোক্তা ব্যয় হ্রাস করবে। আর ভোক্তা ব্যয় কমে গেলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে পড়বে।
দ্বিতীয়ত, শিল্প উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পায়। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়। এতে কর্মসংস্থান কমে যেতে পারে, যা আবার অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
তৃতীয়ত, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়ে উঠবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তারা সুদহার বাড়াতে পারে, কিন্তু এতে বিনিয়োগ ও ঋণ গ্রহণ কমে যায়। ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরো ধীর হয়ে পড়ে। এই দ্বৈত সংকট উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও কম প্রবৃদ্ধি বা স্ট্যাগফ্লেশনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
চতুর্থত, উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য তেলের মূল্যবৃদ্ধি মানে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ। এতে রিজার্ভ কমে যায়, মুদ্রার মান পড়ে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়। একই সঙ্গে জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে সরকারকে ভর্তুকি বাড়াতে হয়, যা বাজেট ঘাটতি বাড়াবে।
পঞ্চমত, বৈশ্বিক বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়বে। বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি এড়াতে নিরাপদ খাতে বিনিয়োগ করতে শুরু করবেন। ফলে শেয়ারবাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ পরিবহন ব্যয় বাড়লে পণ্যের দাম প্রতিযোগিতামূলক থাকবে না।
তবে এই সংকট থেকে উত্তরণের পথও রয়েছে। প্রথমত, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। সৌর, বায়ু ও জল বিদ্যুৎ—এই উৎসগুলোতে বিনিয়োগ বাড়ালে তেলের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব। দ্বিতীয়ত, জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে, যাতে উৎপাদন খরচ কমানো যায়।
তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য। তেলের বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে উৎপাদক ও ভোক্তা দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। চতুর্থত, অর্থনৈতিক নীতিতে ভারসাম্য আনতে হবে, যাতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি প্রবৃদ্ধিও বজায় থাকে।
ল্যারি ফিংকের বক্তব্যকে তাই শুধু সতর্কবার্তা হিসেবে ভাবলে ভুল হবে। এটি নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি ‘ওয়েক-আপ কল’। তিনি মূলত বলতে চেয়েছেন, বিশ্ব অর্থনীতি এখন এতটাই সংবেদনশীল যে একটি বড় জ্বালানি ধাক্কা সহজেই মন্দার জন্ম দিতে পারে।
সব শেষে বলা যায়, তেলের দাম ১৫০ ডলারে পৌঁছানো মানে শুধু জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এমন নয়। এটি একটি চেইন রি-অ্যাকশন তৈরি করবে, যা পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিতে পারে। এই বাস্তবতায় বিশ্বনেতাদের উচিত আগাম প্রস্তুতি নেওয়া, যাতে সম্ভাব্য সংকটের প্রভাব কমানো যায়। অন্যথায় ইতিহাস আবারও নিজেকে পুনরাবৃত্তি করতে পারে। আর সেই পুনরাবৃত্তি হবে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
ল্যারি ফিংকের ধারণা বৈশ্বিক মন্দার পরিপ্রেক্ষিতে করা হলেও আমাদের দেশের মতো অনেক উন্নয়নশীল দেশে এই ধাক্কা আরো কঠিন হতে পারে।
তেলের দাম যদি সত্যি ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারে পৌঁছে, তাহলে এটি শুধু বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য হুমকি, তা ভাবা উচিত নয়। এটি বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশের জন্য তা সরাসরি জীবনযাত্রার ওপর আঘাত হানবে। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়, যা খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে জনগণের ক্রয়ক্ষমতাকে সীমিত করবে। বাংলাদেশের মতো দেশ যেখানে খাদ্য উৎপাদন ও বিতরণে জ্বালানির ওপর ব্যাপক নির্ভরতা, সেখানে এই প্রভাব আরো গভীর। কৃষকরা ইন্ধন খরচ বহন করতে পারবেন না, ফসলের দাম বেড়ে যাবে এবং ভোক্তা পর্যায়ে খাদ্য অপ্রাপ্য ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে।
সার্বিকভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের উল্লম্ফন এবং অভ্যন্তরীণ খাদ্য ও জ্বালানি নীতির দুর্বলতা একসঙ্গে কাজ করলে দেশ নতুন ধরনের খাদ্যসংকটের মুখোমুখি হবে। এর ফলে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ল্যারি ফিংকের সতর্কবার্তা যেমন বৈশ্বিক অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগের কারণ, তেমনি বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য মারাত্মক অশনিসংকেত।
এ ছাড়া ইরান-মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে আমাদের শ্রমিকরা কুয়েত যুদ্ধের সময়ের মতো দলে দলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে দেশে ফিরতে থাকলে কী পরিস্থিতি হবে, তা অনেকটা আগেভাগেই অনুমান করা যায়। এ ছাড়া সম্প্রতি খবরে জানা যাচ্ছে, স্কিমের জমিতে তেলের অভাবে সেচের পানি সরবরাহ করা কঠিন হয়ে উঠছে। মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমিক সংকট ও কৃষিতে সেচের অভাব আমাদের দেশে উচ্চ অর্থনৈতিক মন্দা সূচনা করতে পারে। তাই নতুন গণতান্ত্রিক সরকারকে জনকল্যাণে সামাজিক নিরাপত্তা বলয় অটুট রাখার জন্য জরুরি ভিত্তিতে খাদ্য মজুদের বিষয়টিকে আরো বেশি গুরুত্ব দিয়ে ভাবা উচিত বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়