কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

জ্বালানি সংকট কাটাতে বিশ্ব ও বাংলাদেশের কৌশল

ড. মো. আনোয়ার হোসেন [প্রকাশ : সময়ের আলো, ৯ এপ্রিল ২০২৬]

জ্বালানি সংকট কাটাতে বিশ্ব ও বাংলাদেশের কৌশল
বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে মধ্যপ্রাচ্য বরাবরই একটি বারুদঠাসা গুদাম, আর সাম্প্রতিক ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ সেই গুদামে আগুনের স্ফুলিঙ্গ ছুড়ে দিয়েছে। বর্তমানে ২০২৬ সালের এপ্রিলে দাঁড়িয়ে বিশ্ব অর্থনীতি এক অভূতপূর্ব জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি, যেখানে স্ট্রেইট অফ হরমুজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক তেলের সরবরাহ প্রায় ২০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
 
 
 
মুদ্রাস্ফীতির পারদ আকাশচুম্বী আর বাজারের অস্থিরতা সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস তুলছে, যা প্রতিটি রাষ্ট্রের জন্য অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। আধুনিক সভ্যতার চাকা যেহেতু খনিজ তেলের ওপর নির্ভরশীল, তাই এই সরবরাহ ঘাটতি কেবল একটি অর্থনৈতিক মন্দা নয়, বরং একটি বৈজ্ঞানিক ও কৌশলগত সংকটে রূপ নিয়েছে।
 
 
 
বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি ও বিভিন্ন দেশের কৌশলের দিকের নজর রাখা যাক : 
ইরানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধাবস্থার কারণে পারস্য উপসাগরের তেল রফতানি রুদ্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এই সংকট সামাল দিতে দেশগুলো তেল সাশ্রয়, বিকল্প শক্তি এবং কঠোর রেশনিং ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে।
 
 
 
 
 
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল বাজারে ছাড়ছে যাতে অভ্যন্তরীণ জ্বালানি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
 
 
 
চীন তাদের বিশাল লজিস্টিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে রাশিয়ার কাছ থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে পাইকারি দরে তেল আমদানি বাড়িয়ে দিয়েছে এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার পথে হাঁটছে।
 
 
 
ভারত সরকার নিজস্ব স্ট্র্যাটেজিক এনার্জি রিজার্ভ খুলে দিয়েছে এবং সংকট মোকাবিলায় প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ‘জ্বালানি বিনিময়’ বা বার্টার সিস্টেম চালুর পরিকল্পনা করছে। পাকিস্তান বর্তমানে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য ৪ দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করেছে এবং সরকারি খাতে জ্বালানি বরাদ্দ ৫০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে। শ্রীলঙ্কা কিউআর-কোডভিত্তিক জাতীয় ফুয়েল পাস ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যক্তিগত যানবাহনের জন্য সপ্তাহে মাত্র ১৫ লিটার পেট্রোল বরাদ্দ সীমিত করেছে।
 
 
 
নেপাল রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার অর্ধেক ভর্তি করে বাজারজাত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যাতে সাধারণ মানুষ অন্তত কিছু পরিমাণ গ্যাস পায়। ভুটান জেরিকেনে তেল বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে এবং জরুরি সেবা ছাড়া সব ক্ষেত্রে জ্বালানি রেশনিং চালু করেছে। মালদ্বীপ তাদের পর্যটন দ্বীপগুলোতে ডিজেলচালিত জেনারেটরের বদলে সৌর বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীলতা দ্বিগুণ করার জন্য জরুরি তহবিল ঘোষণা করেছে। 
 
 
 
আফগানিস্তান তাদের মধ্যএশীয় প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সরাসরি বাণিজ্যের মাধ্যমে তেল সংগ্রহের চেষ্টা চালাচ্ছে যদিও সরবরাহ ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক। জাপান বর্তমানে জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারি অফিসে লিফট ব্যবহার সীমিত করেছে এবং নাগরিকদের সাধারণ পোশাক পরে অফিসে আসার পরামর্শ দিয়েছে যাতে এসি কম লাগে।
 
 
 
 
দক্ষিণ কোরিয়া সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ‘পাঁচ দিনের যানবাহন চলাচল’ নীতি চালু করেছে যেখানে সপ্তাহে এক দিন গাড়ি চালানো নিষিদ্ধ। ভিয়েতনাম জাতীয় তেল স্থিতিশীলকরণ তহবিল ব্যবহার করছে। থাইল্যান্ড সরকারি কর্মকর্তাদের সব ধরনের বিদেশ সফর বাতিল করেছে এবং এসির তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রির ওপরে রাখা বাধ্যতামূলক করেছে। ফিলিপাইন ইতিমধ্যে ‘জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করেছে এবং সিভিল সার্ভিসে ৪ দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করেছে।
 
 
 
ইন্দোনেশিয়া সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত গাড়িতে যাতায়াত নিষিদ্ধ করেছে এবং বাজেট সাশ্রয়ে জ্বালানি ভর্তুকি কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মিয়ানমারে জ্বালানি তেলের জন্য ‘জোড়-বিজোড়’ পদ্ধতিতে গাড়ি চালানোর নিয়ম চালু করা হয়েছে। সিঙ্গাপুর সাধারণ মানুষকে জ্বালানি সাশ্রয়ী ইলেকট্রনিক্স ব্যবহারে উৎসাহিত করতে এবং এসির তাপমাত্রা বাড়ানোর জন্য বিশেষ প্রচার চালাচ্ছে। 
 
 
 
মালয়েশিয়া তাদের তেল উৎপাদনকারী দেশ হওয়ার সুবিধা পেলেও অভ্যন্তরীণ বাজারে অপচয় রুখতে কঠোর নজরদারি শুরু করেছে। জার্মানি জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় গণপরিবহন ব্যবহারের খরচ কমিয়ে মাত্র ৯ ইউরোর মাসিক টিকেট ব্যবস্থা পুনরায় চালু করার কথা ভাবছে।
 
 
 
ফ্রান্স সরকার নিম্নআয়ের পরিবারগুলোকে জ্বালানি বিল পরিশোধে সহায়তা করতে বিশেষ ‘এনার্জি ভাউচার’ প্রদান করছে। যুক্তরাজ্য মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়িয়েছে এবং উত্তর সাগরের তেল উত্তোলন বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। ইতালি তাদের শিল্প-কারখানায় গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আয়ু বাড়ানোর কথা ভাবছে। তুরস্ক উৎপাদন খরচ কমাতে এবং জ্বালানি ঘাটতি সামাল দিতে এলএনজি আমদানির নতুন রুট খুঁজছে।
 
 
 
ইথিওপিয়া জ্বালানি বরাদ্দের ক্ষেত্রে একটি অগ্রাধিকার তালিকা তৈরি করেছে যেখানে কৃষি ও জনপরিবহন সবার ওপরে রয়েছে। ব্রাজিল বায়োফুয়েল বা ইথানলমিশ্রিত পেট্রোলের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য বড় বিনিয়োগ ঘোষণা করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকা বিদ্যুৎ বিভ্রাট কমাতে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ জ্বালানি কর হ্রাসের কথা ভাবছে। 
 
 
 
অস্ট্রেলিয়া প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ রফতানির চেয়ে অভ্যন্তরীণ বাজারে বেশি ব্যবহারের জন্য কঠোর আইনি কাঠামো তৈরি করছে। কানাডা তাদের তেল বালু থেকে উত্তোলন বাড়িয়ে বিশ্ববাজারের শূন্যস্থান পূরণের চেষ্টা করছে। রাশিয়া পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও তাদের তেল মিত্র দেশগুলোর কাছে ছাড়ে বিক্রি করে সরবরাহ চেইন সচল রাখার চেষ্টা করছে।
 
 
 
ইরান যুদ্ধের মধ্যে থেকেও তাদের নিজস্ব শোধনাগার রক্ষা করতে সামরিক প্রহরা জোরদার করেছে। ইসরাইল তাদের নিজস্ব অফশোর গ্যাস ফিল্ড থেকে উৎপাদন বাড়িয়ে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের গতি ত্বরান্বিত করেছে।
 
 
 
জ্বালানি সমস্যায় বাংলাদেশ ঘটন অঘটন পটীয়সী দেশে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশে বিরাজমান কয়েকটি অদ্ভুত ঘটনা এখানে আলোকপাত করছি- ঢাকার মগবাজারের এক সিএনজি স্টেশনে দেখা গেছে এক ব্যক্তি তেলের লাইনে দাঁড়াতে নিজের জায়গার বদলে একটি পুরোনো খাট রেখে গেছেন, যাতে রাতে সেখানে ঘুমিয়ে থাকতে পারেন। 
 
 
 
রাজশাহীতে এক মজুদদার তার বাড়ির পানির ট্যাঙ্ক খালি করে সেখানে হাজার লিটার অকটেন জমা করে রেখেছিলেন, যা পরে পানির বদলে তেলের গন্ধে ধরা পড়ে। ১ এপ্রিল ‘এপ্রিল ফুল’ উপলক্ষে অনেকে সামাজিকমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে দেন যে তেলের দাম অর্ধেক হয়ে গেছে, ফলে শত শত বাইকার পাম্পে গিয়ে ভিড় জমায়। 
 
 
 
 
চট্টগ্রামের এক বিয়ের অনুষ্ঠানে বরযাত্রীদের জন্য আপ্যায়নের চেয়েও বেশি আকর্ষণ ছিল যারা মোটরসাইকেলে এসেছেন তাদের জন্য এক লিটার ফ্রি তেলের কুপন। পাম্পে তেলের লাইনে সিরিয়াল নিয়ে মারামারি এড়াতে এক পাম্প মালিক টোকেন সিস্টেম চালু করেছেন, যেখানে সিরিয়াল পেতেও আলাদা লাইন দিতে হচ্ছে। এক সরকারি অফিসের বড় কর্মকর্তা তার এসির তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি করার প্রতিবাদে অফিসেই হাতপাখা ব্যবহার শুরু করেছেন, যা নিয়ে অন্য সহকর্মীরা হাসাহাসি করছেন।
 
 
 
কিছু অসাধু লোক পানির বোতলে চা বা রঙিন পানীয়ের বদলে ভেজাল তেল মিশিয়ে গ্রামেগঞ্জে দ্বিগুণ দামে বিক্রি করার চেষ্টা করছে যা বৈজ্ঞানিকভাবেই ইঞ্জিনের জন্য ক্ষতিকর। এক দম্পতি তাদের বিয়েবার্ষিকীর গিফট হিসেবে ডায়মন্ডের আংটির বদলে ৫০ লিটারের এক ড্রাম ডিজেল দাবি করে সামাজিকমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন।
 
 
 
তেলের সংকটের কারণে ঢাকার রাস্তায় সাইকেলের চাহিদা এত বেড়েছে যে পুরোনো সাইকেলের দাম নতুনের চেয়েও বেশি হওয়ার উপক্রম হয়েছে। অনেক পাম্পে লেখা রয়েছে ‘তেল নেই’, অথচ গভীর রাতে পেছনের দরজা দিয়ে পরিচিত লোকেদের কাছে অতিরিক্ত দামে তেল পাচারের ঘটনা গোয়েন্দা নজরদারিতে উঠে এসেছে।
 
 
 
এ অবস্থায় বাংলাদেশ সরকারের পদক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হলো : 
বাংলাদেশ সরকার বর্তমানে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় অত্যন্ত কৌশলী ও মিতব্যয়ী পথ অবলম্বন করছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে এপ্রিল মাসের জন্য তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখার ঘোষণা দিয়েছে যাতে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ না পড়ে। এলাকাভিত্তিক লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা হচ্ছে। সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা ও বিজিবি সারা দেশে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে গত কয়েক দিনে প্রায় ২.৮ লাখ লিটার অবৈধভাবে মজুদকৃত তেল উদ্ধার করেছে।
 
 
 
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হিসেবে সরকার জ্বালানি আমদানিতে একক দেশের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা হয়েছে এবং অফশোর ড্রিলিংয়ের জন্য আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে নতুন চুক্তি স্বাক্ষরের পরিকল্পনা রয়েছে।
 
 
 
দীর্ঘমেয়াদে সরকার জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প হিসেবে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে বিশেষ নজর দিচ্ছে। সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুবিদ্যুতের মেগা প্রকল্পগুলোর পাশাপাশি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করে জাতীয় গ্রিডে বড় ধরনের লোড শেয়ার করার পরিকল্পনা রয়েছে।
 
 
 
জ্বালানি সংকট কেবল একটি সাময়িক অসুবিধা নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের ধৈর্য ও বুদ্ধিমত্তার পরীক্ষা। বিশ্ব যখন যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে, তখন বাংলাদেশ তার সীমিত সম্পদ দিয়ে যে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে জ্বালানি সাশ্রয় এবং সরকারের ভবিষ্যৎমুখী পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এই আঁধার কেটে যাবে। আমরা যদি প্রত্যেকে নিজ নিজ জায়গা থেকে অপচয় রোধ করি এবং সংকটে আতঙ্কিত না হয়ে ধৈর্য ধরি, তবে এই জ্বালানি মহাপ্রলয় শেষে বাংলাদেশ ও বিশ্ব আবারও সমৃদ্ধির পথে ঘুরে দাঁড়াবে।
 
 
 
লেখক : প্রাবন্ধিক