জ্বালানি ও সবজির বাজারে ঊর্ধ্বমুখিতায় বেড়েছে মূল্যস্ফীতি

জ্বালানি ও সবজির বাজারে ঊর্ধ্বমুখিতায় বেড়েছে মূল্যস্ফীতি
সংবাদবাংলাদেশ

জ্বালানি ও সবজির বাজারে ঊর্ধ্বমুখিতায় বেড়েছে মূল্যস্ফীতি

৩ আগস্ট, ২০২৬

২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিক নিজস্ব প্রতিবেদক [প্রকাশ: বণিক বার্তা, ৩ আগস্ট ২০২৬]

দেশে চার বছর ধরেই জেঁকে বসেছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি। দফায় দফায় নীতি সুদহার বাড়িয়েও তা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।

 
 

সাম্প্রতিক কয়েক মাস ধরে মূল্যস্ফীতি কমার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছিল, জ্বালানি ও সবজির বাজারের ঊর্ধ্বমুখিতায় সেটিও ফিকে হয়ে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) আগের প্রান্তিকের তুলনায় দেশের গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ২১ শতাংশে। মূলত জ্বালানি তেল ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি সবজির মূল্যবৃদ্ধি এ সময়ে মূল্যস্ফীতিকে বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির তুলনায় মজুরি বৃদ্ধির গতি কম হওয়ার কারণে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ আরো বেড়েছে।

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা বিভাগের প্রকাশিত ‘ইনফ্লেশন ডাইনামিকস ইন বাংলাদেশ: এপ্রিল-জুন ২০২৬’ শীর্ষক ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে গড় সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ২১ শতাংশে দাঁড়ায়, যা আগের প্রান্তিকে ছিল ৮ দশমিক ৮ শতাংশ। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ, খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ দশমিক ৬ ও কোর মূল্যস্ফীতি ৮ থেকে বেড়ে ৮ দশমিক ৪ শতাংশে উন্নীত হয়।

 
 
 

খাদ্য মূল্যস্ফীতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, আলোচ্য সময়ে সবচেয়ে বেশি চাপ সৃষ্টি করেছে সবজির দাম। খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে সবজির অবদান আগের প্রান্তিকের ২২ দশমিক ৭ থেকে বেড়ে ৩৭ শতাংশে দাঁড়ায়। তবে সামগ্রিক খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে সবচেয়ে বেশি অবদান এখনো আমিষজাতীয় খাদ্যপণ্যের। মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ডালসহ এ শ্রেণীর পণ্যের অবদান প্রায় ৪৬ শতাংশ। অন্যদিকে চাল, ভোজ্যতেল, মসলা ও রান্নার উপকরণের মূল্যচাপ কিছুটা কমেছে।

 

সবজিসহ খাদ্যপণ্যের বাজারে দামের অস্থিরতা বর্তমানেও অব্যাহত রয়েছে। অধিকাংশ সবজির দামই বর্তমানে ১০০ টাকা ছাড়িয়েছে। কাঁচামরিচের কেজি উঠেছে ৪০০ টাকায়। সেই সঙ্গে দেশী পেঁয়াজ ও ফার্মের মুরগির ডিমের দাম বেড়েছে। এছাড়া পাঙাশ, তেলাপিয়া, রুই, পাবদা, চিংড়ি, দেশী কইসহ অধিকাংশ মাছের দামও নতুন করে বাড়তে দেখা গেছে। মাংস বিক্রি হচ্ছে আগের মতো চড়া দামেই।

 

 

মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে শুধু খাদ্যপণ্য নয়, বিভিন্ন সেবা খাতেও মূল্যচাপ অব্যাহত রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে দেশের কোর মূল্যস্ফীতির মূল চালিকাশক্তি ছিল পরিবহন ও যোগাযোগসেবা, বিশেষ করে ইন্টারনেট ব্যয়। এছাড়া স্বাস্থ্যসেবা, ব্যক্তিগত পরিচর্যা ও শিক্ষাসংক্রান্ত ব্যয়ও এ সময়ে বেড়েছে।

 

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তফা কে. মুজেরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির পেছনে একদিকে মৌসুমি, অন্যদিকে কাঠামোগত—দুই ধরনের কারণই কাজ করেছে। জ্বালানি নিরাপত্তা সংকট এখনো পুরোপুরি কাটেনি। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়ায় শিল্প, কৃষি ও সেবা খাতের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। একই সময়ে ফ্ল্যাশ ফ্লাড ও বন্যার কারণে বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় শাকসবজি, ধানসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য সরবরাহেও চাপ তৈরি হয়েছে।’

 

 

তিনি বলেন, ‘মূল্যস্ফীতির পেছনে চাহিদাজনিত চাপও রয়ে গেছে। প্রবাসী আয় বৃদ্ধির ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে তারল্য বেড়েছে। তবে বর্তমান মূল্যস্ফীতির বড় অংশই সরবরাহ ব্যবস্থা, জ্বালানি সংকট, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার মতো নন-মনিটারি কারণে সৃষ্টি হচ্ছে। তাই শুধু নীতিসুদ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, বাজার তদারকি জোরদার করা, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করা এবং বাণিজ্য ও কৃষিনীতিতে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। তাহলেই মূল্যস্ফীতিকে টেকসইভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।’

 

 

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে মূল্যস্ফীতির বিস্তার বা ডিফিউশন ইনডেক্সের বিশ্লেষণে দেখা যায়, জুনে ভোক্তা মূল্যসূচকের ৩৮২টি পণ্যের মধ্যে ২৬১টির দাম আগের মাসের তুলনায় বেড়েছে। মাত্র ২২টি পণ্যের দাম কমেছে এবং ৯৯টি পণ্যের দাম অপরিবর্তিত ছিল। অর্থাৎ মূল্যবৃদ্ধি এখন আর কয়েকটি পণ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে দুই বছর ধরেই মূল্যস্ফীতি মজুরি বৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। যদিও জুনে এ ব্যবধান সামান্য কমেছে, সেটি মূলত মূল্যস্ফীতি কিছুটা শ্লথ হওয়ার কারণে; মজুরি বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। এতে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ অব্যাহত রয়েছে।

 

 

দেশে ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকেই মূল্যস্ফীতির গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী। আলোচ্য অর্থবছরের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। এর পরের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৭৩ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা আরো বেড়ে ১০ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশে দাঁড়ায়। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও তা এখনো ৮ শতাংশের ওপরে (৮.৬৮) রয়েছে।

 

 

একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত হওয়ায় সামগ্রিক ভোগব্যয় কমেছে। এর প্রভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যেও স্থবির ভাব দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি সুদহার বাড়ানোর কারণে ব্যাংক ঋণের সুদহারও বেড়ে গেছে। ২০২২ সালের পর থেকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে নীতি সুদহার বাড়িয়ে ৫ থেকে ১০ শতাংশে উন্নীত করে। এর প্রভাবে অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণের সুদহার ১৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। তবে এত কঠোর মুদ্রানীতির পরও মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশিত মাত্রায় কমেনি। গত জুনে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে, যা বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে স্থবিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে নীতি সুদহার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে সাড়ে ৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

 

 

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মূল্যস্ফীতির উচ্চচাপ এখনো দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির দুর্বলতার প্রতিফলন। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও ঋণ প্রবৃদ্ধির ধীরগতি, জ্বালানির মূল্য ও সরবরাহ সংকট এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষিপণ্যের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় মূল্যস্ফীতি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নামছে না।’

 

 

তিনি বলেন, ‘শুধু সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির মাধ্যমে এ পরিস্থিতির সমাধান সম্ভব নয়। সরবরাহ পক্ষের সংস্কার, বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, সময়মতো আমদানিনির্ভর পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সরবরাহ শৃঙ্খলের ব্যয় কমাতে হবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগবান্ধব রাজস্বনীতির কার্যকর বাস্তবায়ন, সিঙ্গেল উইন্ডো সেবা, লজিস্টিকস ব্যবস্থার উন্নয়ন, বন্দরে পণ্য খালাসের সময় কমানো এবং বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধার কার্যকারিতা বাড়াতে হবে।’ পাশাপাশি ওএমএস ও ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির মতো সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম জোরদারের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতির পাশাপাশি বিনিয়োগে গতি আনা, জ্বালানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।

ট্যাগ:BCSসংবাদবাংলাদেশ