জুলাই সনদের সাংবিধানিক বৈধতা দেওয়া কি সম্ভব
বহুল আলোচিত জুলাই সনদকে সাংবিধানিক বৈধতা দেওয়া নিয়ে আলোচনা চলছে। কিন্তু সংবিধানে কোনো বড় পরিবর্তনের জন্য দরকার দীর্ঘমেয়াদি ঐকমত্য। সংবিধান পরিবর্তন ও জুলাই সনদ নিয়ে বিতর্কের কারণগুলো বিশ্লেষণ করেছেন সিনথিয়া ফরিদ [সূত্র : প্রথম আলো, ০৫ অক্টোবর ২০২৫]

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের গণতন্ত্রের লড়াইয়ে নিঃসন্দেহে একটি মাইলফলক। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব আর স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিবাদ—সবকিছু মিলে এটা আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় যোগ করেছে। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় তৈরি হচ্ছে জুলাই সনদ।
এই সনদ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের স্মৃতি ও নৈতিক শক্তিকে ধারণ করবে; ভালো শাসনব্যবস্থা, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার রক্ষায় এবং দুর্নীতির অবসানে ভূমিকা রাখবে—এটাই প্রত্যাশিত। এগুলো জনগণের দীর্ঘদিনের দাবি। লক্ষণীয় হলো, ১৯৭২ সালের সংবিধানেও এসব প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু বাস্তবে প্রতিটি সরকারই বিভিন্ন সময়ে প্রতিশ্রুতিগুলো বিভিন্ন মাত্রায় লঙ্ঘন করেছে।
২.
এ সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক আলাপ হচ্ছে, কীভাবে জুলাই সনদকে যথাযথ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া যায়। কেউ কেউ বলছেন, এটাকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এ প্রসঙ্গে পরে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। এখানে বলা জরুরি যে সংবিধানে স্থান পাওয়া যেকোনো বিষয় সাধারণত একেবারে স্থায়ী কিছু না হলেও সেটাকে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এ কারণেই যেকোনো দেশেই সংবিধান পরিবর্তনের পন্থা বা পদ্ধতিগুলো বেশ কঠিন; জনগণ সম্মত হলেই সেটি একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় সংসদের মাধ্যমে পরিবর্তন হয়। তাই যেকোনো সাংবিধানিক পরিবর্তন কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়ের দাবি বা আবেগ বা প্রতিক্রিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য নয়। আমাদের চিন্তাভাবনা করতে হবে, জুলাই সনদ কি ভবিষ্যতের জন্য একটি টেকসই রাজনৈতিক রোডম্যাপ, নাকি কেবল বর্তমানের সময়ের একটি রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া?
জুলাই সনদ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এটা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঐকমত্য কমিশনের শেষ পর্যায়ের কথাবার্তা চলছে। যে খসড়া প্রকাশিত হয়েছে, তাতে মনে হতে পারে, জুলাই সনদের বড় অংশই বিগত আওয়ামী লীগ শাসনামলের দুর্নীতি-লুটপাট, অন্যায়-অত্যাচার, নির্যাতন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে একটি প্রতিক্রিয়া।
বিগত আওয়ামী লীগ আমলের প্রতিটি অন্যায়ের প্রতিকার এবং অপরাধের বিচার হওয়া জরুরি; গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ‘জেন-জি’ প্রজন্মের অনেকের কাছেই হয়তো এটাই অগ্রাধিকার, কিন্তু তাদের আগের বা পরের প্রজন্মের বেশির ভাগ মানুষ এই রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াকে একইভাবে ধারণ করবে, সেটার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
জুলাই সনদের একটি সীমাবদ্ধতা হলো এখানে কেবল গত ১৫ বছরের অপরাধের বিচার দাবি করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্রে অন্যায়-অত্যাচার-সহিংসতার উৎপত্তি হয়েছে ১৯৭২ সালের পর থেকেই। মাত্রাগত পার্থক্য হয়তো ছিল, কিন্তু প্রতিটি সরকারের আমলেই এটা অব্যাহত থেকেছে।
সংবিধানের মূল কাজ হলো রাষ্ট্রের বলপ্রয়োগের ক্ষমতাকে সীমিত করে নাগরিকদের অধিকার রক্ষা করা। তাই কোনো একটি নির্দিষ্ট দলের বিরুদ্ধে নয়, বরং রাষ্ট্রের সামগ্রিক জবাবদিহি নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত সংবিধানের মূল লক্ষ্য।
আমরা এরই মধ্যে দেখেছি, রাজনৈতিক কারণে ইতিহাসের ন্যারেটিভ বা বয়ানকে কীভাবে বিকৃত করা হয়েছে। হাসিনার শাসনামলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে দলীয় মালিকানাধীন করে ফেলা হয়েছিল। এর প্রতিক্রিয়ায় রাজপথে ‘আমরা সবাই রাজাকার’—এ রকম প্রহসনমূলক স্লোগানও শোনা গিয়েছিল।
ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক গণতান্ত্রিক সমাজে খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু ক্ষমতার দাপটে জনগণের ওপর ইতিহাস চাপিয়ে দেওয়া একটি অগণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ড। দুর্ভাগ্যবশত, বাংলাদেশে প্রতিটি সরকারের আমলে পাঠ্যপুস্তক নিয়ন্ত্রণের মতো কর্মকাণ্ডই হয়েছে কর্তৃত্ববাদী শাসনের প্রথম পদক্ষেপ।
৩.
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন পন্থা বা পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা চলছে। কেউ কেউ মনে করেন, এই সনদকে সংবিধানের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া উচিত। তাঁদের মতে, এ ক্ষেত্রে সংবিধান পরিবর্তন করতে হবে এবং এটা প্রেসিডেনশিয়াল অর্ডার বা রাষ্ট্রপতির আদেশ দিয়ে বাস্তবায়ন সম্ভব।
কিন্তু সাংবিধানিক ও টেকনিক্যাল দিক থেকে এটার কোনো বৈধতা নেই। পৃথিবীর কোথাও প্রেসিডেন্ট একতরফাভাবে সংবিধান পরিবর্তন করতে পারেন না। আমাদের সংবিধানও স্পষ্টভাবে বলেছে, সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা সংসদের, রাষ্ট্রপতির নয়।
ইতিহাসে অবশ্য একটি নজির আছে। ১৯৭০ সালে ইয়াহিয়া খানের লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার পাকিস্তানের গণপরিষদ নির্বাচনের জন্য কাঠামো নির্ধারণ করে দিয়েছিল। কিন্তু সেই অগণতান্ত্রিক পথেই গণতন্ত্র ধ্বংসের দিকে গিয়েছিল। নির্বাচনের ফল পূর্বনির্ধারিত ধারণার বাইরে চলে গেলে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী তা মেনে নেয়নি; এর পরিণতি ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিকদের ওপর ভয়াবহ সামরিক অভিযান।
জুলাই সনদ নিয়ে অন্য একটি প্রস্তাব হলো এই সনদকে নতুন সংবিধানের সূচনা বা ঘোষণাপত্র হিসেবে দেখা। সে ক্ষেত্রে আগামী নির্বাচনে জনগণকে এমন এক গণপরিষদের জন্য ভোট দিতে হতে পারে, যারা নতুন সংবিধান প্রণয়ন করবে।
এ পদ্ধতি তুলনামূলকভাবে বেশি গ্রহণযোগ্য মনে হলেও এখানেও বড় ঝুঁকি আছে। ঐকমত্য কমিশন থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক দলগুলো এখনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি। গণপরিষদেও যদি এমন অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়, তাহলে নতুন সংবিধান তৈরি হওয়া তো দূর, গণপরিষদই হয়তো অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে।
নেপালের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, নতুন সংবিধান তৈরি করতে তাদের ৯ বছর সময় লেগেছে। এই ৯ বছরে দুটি সংবিধানের খসড়া তৈরি হয়েছিল। ঐকমত্য না হওয়ায় প্রথমটি বাতিল হয়। অনেক চরাই-উতরাই পেরিয়ে দ্বিতীয় খসড়াটি গণপরিষদে পাস হয়েছিল।
সম্প্রতি নেপালেও গণ-অভ্যুত্থানে সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে। সেখানেও সংস্কার এবং দুর্নীতি প্রতিরোধের অনেক কথাবার্তা চলছে। কিন্তু নতুন সংবিধান তৈরি নিয়ে নেপালিরা আর বিতর্ক করছেন না। কারণ, তাঁরা বুঝে গেছেন, সংবিধান একধরনের ভিত্তিকাঠামো; একবার দাঁড়ালে তার ওপর নতুন কিছু নির্মাণ করা সহজ। কিন্তু সেটি ভেঙে শূন্য থেকে শুরু করা অত্যন্ত কঠিন এবং এটা এক অনিশ্চিত যাত্রা।
নেপালিরা হয়তো এটাও বুঝেছেন যে সংবিধান নিয়ে বিতর্ক নতুন করে বিভ্রান্তি তৈরি করবে। কারণ, তাঁদের মূল লড়াই দুর্নীতি, অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে। তাঁরা অবশ্যই কিছু ক্ষেত্রে সাংবিধানিক পরিবর্তন চান, তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলে যে সংবিধান নিয়ে অহেতুক বিতর্ক তাঁদের মূল দাবিগুলো ধামাচাপা পড়ে যাবে।
আমাদের দেশে ‘সংবিধান ফেলে দেওয়ার’ দাবি সবচেয়ে উচ্চ স্বরে বিশেষ যে গোষ্ঠীগুলো থেকে আসছে, পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তারা নিজেদের রাজনৈতিক ক্ষমতার ক্ষেত্র সম্প্রসারণ করতে চাইছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। এ জন্য কেউ কেউ আবার অগণতান্ত্রিক পন্থা অবলম্বন করারও পরামর্শ দিচ্ছেন।
আলোচনায় রেফারেন্ডাম বা গণভোটের কথাও এসেছে। ধারণাটি হলো একটি প্রেসিডেনশিয়াল অর্ডার বা সনদের মূলনীতি সামনে রেখে জনগণ ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিয়ে প্রক্রিয়াটিকে বৈধতা দেবে। কিন্তু এখানেও বিপদ রয়েছে।
রেফারেন্ডাম জটিল সাংবিধানিক প্রশ্নকে সরল ‘হ্যাঁ-না’ ভোটে নামিয়ে আনে, যা ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে পারে। আর যদি রেফারেন্ডাম ব্যর্থ হয়, তবে পুরো প্রক্রিয়াই ভেঙে পড়তে পারে। ২০২২- ২৩ সালে লাতিন আমেরিকার দেশ চিলির অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে—দুই দফা রেফারেন্ডামের পরও নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা সম্ভব হয়নি।
এর পাশাপাশি আরও একটি বাস্তব প্রশ্ন আছে—নির্বাচন কি আলাদা হবে? একবার রেফারেন্ডাম, তারপর আবার গণপরিষদ ও সংসদ নির্বাচন, নাকি একই সঙ্গে সবকিছু হবে? মিসর ও তিউনিসিয়ার অভিজ্ঞতা বলে, একাধিক নির্বাচনের কারণে ভোটার উপস্থিতি ক্রমেই কমে যায়। এতে বৈধতার সংকট তৈরি হয়।
সর্বোপরি পুরো প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্তি নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ রয়েছে। নারী ও সংখ্যালঘুদের অংশগ্রহণ এখনো ঐকমত্য কমিশন ও জনপরিসরে প্রায় অনুপস্থিত। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে; আবার কোনো কোনো পক্ষ জাতীয় পার্টির বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞার দাবি তুলছে। গত আমলের অপরাধের জন্য আমাদের অনেকের কাছেই হয়তো এ দলগুলো অগ্রহণযোগ্য। কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই যে এরা এখনো একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে।
এ রকম অবস্থায় এতগুলো পক্ষকে যখন বাইরে রাখা হচ্ছে, তখন সেই সাংবিধানিক সংস্কারের প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ এবং সর্বজনগ্রাহ্য না হওয়ার সম্ভাবনাই অনেক বেশি।
৪.
আমাদের সংবিধানে একটি মৌলিক নীতি রয়েছে। সেটা হচ্ছে সংবিধানের প্রাধান্য (সুপ্রিমেসি)। এর অর্থ হলো, রাষ্ট্রের কোনো আইন, দলিল বা সিদ্ধান্ত সংবিধানের ঊর্ধ্বে যেতে পারবে না। অন্তর্বর্তী সরকার বিদ্যমান সংবিধানের অধীনেই শপথ নিয়েছে। তাই এখন তারা এটা বলতে পারেন না যে অন্য কোনো দলিল বা সনদ সংবিধানের ওপর স্থান পাবে।
এখনকার বাস্তবতা হলো, সবকিছু চলছে অর্ডিন্যান্স বা অধ্যাদেশ দিয়ে। অর্ডিন্যান্স আসলে ‘অস্থায়ী আইন’, যা পরবর্তী সংসদ গঠিত হওয়ার পর প্রথম অধিবেশনের ৩০ দিনের মধ্যে অনুমোদন দিতে হবে। সংসদের অনুমোদন না পেলে অধ্যাদেশগুলো বাতিল হয়ে যাবে। অর্থাৎ অধ্যাদেশগুলো ‘টেকসই’ নয়। নতুন সংসদ যদি এগুলো বাতিল করে দেয়, তবে জুলাই সনদের ভিত্তিতে নেওয়া সব সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। আদালতে চ্যালেঞ্জ হলে পুরো প্রক্রিয়াও ভেস্তে পড়তে পারে।
সময়োপযোগিতার প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। যদি গণ-অভ্যুত্থানের পরপরই প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় ঘোষণা আসত, তখন আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের আবেগ সরাসরি আনুষ্ঠানিক রূপ নিতে পারত। কিন্তু এক বছর পর পরিস্থিতি অনেকখানি পাল্টে গেছে; শিক্ষার্থীরা নিজেরাই বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন; আর যাঁরা সরকারে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন, তাঁরা নিজেরা কতটা জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করেন, এখন সেই প্রশ্নটিও সামনে এসেছে।
এভাবে রাজনীতিকে অরাজনৈতিকীকরণ বা ‘ডিপলিটিসাইজ’ করা হয়েছে। অর্থাৎ আন্দোলনের দাবিগুলোকে ভেঙে খণ্ডিত করা হয়েছে। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়নি। এর ফলে এক বছর আগের অবস্থার বিবেচনায় সাংবিধান পরিবর্তনের জন্য জনগণের সর্বজনীন সম্মতি রয়েছে—এমনটা দাবি করা এখন কতটা গ্রহণযোগ্য?
সংবিধানে কোনো বড় পরিবর্তনের জন্য দরকার দীর্ঘমেয়াদি ঐকমত্য ও সক্রিয় অংশগ্রহণ। এ জন্য জুলাই সনদের সাংবিধানিক বৈধতা দেওয়ার একমাত্র সঠিক ফোরাম হচ্ছে নির্বাচিত সংসদ, যা জনগণের পূর্ণ প্রতিনিধিত্ব ধারণ করবে।
৫.
জুলাই সনদ নিঃসন্দেহে আমাদের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হবে। কিন্তু এটা তখনই তাৎপর্যপূর্ণ হবে, যদি তা আমাদের গণতান্ত্রিক উত্তরণে সহায়তা করে। কিন্তু আমরা কি এমন গণতন্ত্র চাই, যেখানে নিয়মকানুন সবার জন্য সমান থাকবে; নাকি তখনই গণতন্ত্র চাই, যখন সেটি শুধু আমাদের অনুকূলে কাজ করবে?
চলমান সংস্কারের আলোচনায় এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, ক্ষমতার পালাবদলের কথা কিংবা কোন দল নির্বাচনে অংশ নেবে আর কোন দল নিষিদ্ধ হবে—সেসব প্রশ্ন। কিন্তু সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ কীভাবে বাড়ানো হবে, রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের ভেতরে কী পরিবর্তন আনবে কিংবা গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে কোন ধরনের নতুন প্রতিশ্রুতি দেওয়া হবে—এসব প্রশ্নে নীরবতা বিরাজ করছে। ভুলে গেলে চলবে না, গণতন্ত্র ধ্বংস হয় তখনই, যখন ক্ষমতার নিয়মগুলো সবার জন্য সমান থাকে না।
বিশ্বজুড়ে সাংবিধানিক অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, কোনো সংবিধানই ত্রুটিমুক্ত এবং লঙ্ঘনমুক্ত নয়। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশেও এখন সাংবিধানিক সংকট স্পষ্ট। সংবিধান রাষ্ট্রের বলপ্রয়োগের ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ এবং নাগরিকের অধিকার রক্ষার একটি কাঠামো; কিন্তু সেটার কার্যকারিতা টিকে থাকে রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে একধরনের সামাজিক চুক্তির মধ্য দিয়ে। রাজনৈতিক দলগুলোকে সেই চুক্তির ভেতর থেকেই কাজ করতে হবে, রাষ্ট্রকে রাজনৈতিক দলের অধীন করে নয়। নাগরিকদেরও প্রত্যাশা করা উচিত যে দলগুলো কেবল ক্ষমতার জন্য নয়, বরং জনগণের সেবা করার অঙ্গীকার নিয়ে কাজ করবে।
গণতন্ত্র শুধু একটি নির্বাচনের বিষয় নয়; এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যেখানে দল, রাষ্ট্র ও নাগরিক সবাইকে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে হয়। যদি আমরা সত্যিই নতুন সূচনা চাই, তবে আমাদের বেছে নিতে হবে অন্তর্ভুক্তি, জবাবদিহি ও অংশগ্রহণের রাজনীতি—যেখানে সংবিধান হবে সবার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এটিকে নিজেদের উত্তরাধিকার হিসেবে গ্রহণ করতে পারবে।
ড. সিনথিয়া ফরিদ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী; আইন ও সংবিধানবিশেষজ্ঞ।