কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

জলবায়ু শরণার্থী ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ

আরিফুল ইসলাম রাফি [প্রকাশিত : জনকণ্ঠ, ১৬ নভেম্বর ২০২৫]

জলবায়ু শরণার্থী ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ

‘বাংলাদেশ’ শব্দটার মধ্যেই যেন মাটি, পানি, গন্ধ, নদী আর মানুষের প্রাণ মিশে আছে। এই ভূখণ্ডের ইতিহাস মানেই প্রকৃতির সঙ্গে লড়াইয়ের ইতিহাস। কখনো ঘূর্ণিঝড়, কখনো বন্যা, কখনো নদীভাঙন। তবু মানুষ টিকে থেকেছে। কারণ তারা জানে, এই মাটিই তাদের জীবন। কিন্তু আজ সেই মাটি, নদী, প্রকৃতি সবকিছু যেন প্রতিশোধ নিতে শুরু করেছে। তাপমাত্রা বাড়ছে, বৃষ্টি অস্বাভাবিক, মাটিতে লবণ ঢুকছে, নদী ভাঙল গ্রাস করছে গ্রামের পর গ্রাম। এই পরিবর্তনের শিকার হচ্ছেন কোটি কোটি মানুষ, যাদের নতুন নাম ‘জলবায়ু শরণার্থী’। ‘শরণার্থী’ শব্দটি শুনলেই চোখে ভেসে ওঠে যুদ্ধ, রক্ত, সীমান্ত পার হওয়া মানুষের দুর্দশক্লিষ্ট ছবি। কিন্তু জলবায়ু শরণার্থীরা কোনো যুদ্ধের কারণে ঘর হারান না। তাদের শত্রু হলো জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ। তারা সেই মানুষ, যারা কোনো একদিন সকালে জেগে দেখেন, নদী গ্রাস করেছে তাদের ঘর বা ফসলি জমি। কিংবা ঘূর্ণিঝড়ের পর এক রাতেই তাদের গ্রামই আর মানচিত্রে নেই।

 

 


জাতিসংঘের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ২ কোটি মানুষ জলবায়ুজনিত কারণে বাস্তুচ্যুত হবে। অর্থাৎ, প্রতি তিনজনে একজনের জীবনে আসবে একবার করে স্থানচ্যুতি বা জীবিকা হারানোর ভয়। বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। দেশের প্রায় ৪০% কর্মসংস্থান সরাসরি কৃষিতে এবং আরও প্রায় ৩০% মানুষ কোনো না কোনোভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। ধান, পাট, গম, আলু, চা- এসব শুধু ফসল নয়, এগুলো আমাদের সংস্কৃতি, ইতিহাস, আত্মপরিচয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের প্রায় ১৭ থেকে ২০ শতাংশ এলাকা সমুদ্রে তলিয়ে যেতে পারে। এই কারণে প্রায় দুই কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে এবং দেশের ৩০ শতাংশ কৃষিজমি হারাতে পারে।

 

 

 


সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ১৭ থেকে ২০ শতাংশ এলাকা পানির নিচে চলে যেতে পারে। এই সময়ে প্রায় ৩০ শতাংশ কৃষিজমি হারানো যেতে পারে, যা খাদ্য উৎপাদনে মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের এই অভিঘাতে কৃষিভিত্তিক ব্যবস্থা ভয়াবহ সংকটে। দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা বেড়ে চলেছে মারাত্মকভাবে। সেই সঙ্গে দেখা দিচ্ছে বরেন্দ্র অঞ্চলে খরা, হাওড়াঞ্চলে অকাল বন্যা। ফলে একদিকে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে বাড়ছে কৃষকের ব্যয়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (ইঅজঈ) হিসাব অনুযায়ী, যদি গড় তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়ে, তাহলে ধান উৎপাদন ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। আর যদি ২ ডিগ্রি বাড়ে, তাহলে সেই ক্ষতি দ্বিগুণ হতে পারে। ফলে খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ অর্থনীতি, এমনকি জাতীয় প্রবৃদ্ধিও এর প্রভাবে বিপর্যস্ত হবে।

 

 

 


প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে চলে একজন কৃষকের জীবন। কখনো  অতিবৃষ্টি, কখনো অনাবৃষ্টি, কখনো ঝড়ে ফসলে ক্ষতি, কখনো পোকার আক্রমন- সবকিছুর সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকতে হয় কৃষকদের। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি এতটাই অস্থির যে কৃষকরা বুঝে উঠতে পারছেন না, কীভাবে টিকে থাকবেন তারা। যখন একজন কৃষক জমি হারান, তখন তিনি সেই জমির সঙ্গে হারান নিজের পরিচয়, স্বপ্ন এবং মর্যাদাও। সর্বস্ব হারিয়ে হয়ে ওঠেন জলবায়ু শরণার্থী। বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় প্রায় ৩০ লাখ হেক্টর জমি বর্তমানে লবণাক্ত পানির প্রভাবে আক্রান্ত। শত শত খাল শুকিয়ে গেছে, নদীর পানিও মিঠা নেই। খালের পানি দিয়ে ধান চাষ করা যায় না, পশু পানি খেতে পারে না। অন্যদিকে, জোয়ার-ভাটার প্রভাবে লবণ আরও ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। 

 

 


তারপরও আশার আলো একেবারে নিভে যায়নি। বাংলাদেশের কৃষি বিজ্ঞানী ও তরুণ উদ্যোক্তারা এখন নতুন পথ খুঁজছেন। লবণাক্ততা সহিষ্ণু ধান, খরা প্রতিরোধী শস্য, উঁচু বিছানায় সবজি চাষ; এসব উদ্ভাবন ইতোমধ্যেই প্রমাণ করছে যে, আশা এখনো বেঁচে আছে। যখন একজন কৃষক বা জেলে তার গ্রাম হারান, তখন তিনি কোথায় যান? উত্তর একটাই- শহরে। ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, নারায়ণগঞ্জ- এই শহরগুলোয় প্রায় প্রতিদিন পাচ্ছে হাজার হাজার জলবায়ু শরণার্থী। তারা এসব শহরে আসেন নতুন করে জীবিকা নির্বাহ করে বাঁচার আশায়। কিন্তু এসব শহরে টিকে থাকা তাদের জন্য হয়ে ওঠে সবচেয়ে কঠিন কাজ। ঝুঁকিপূর্ণ বস্তিতে, নোংরা ড্রেনের পাশে, একরুমে সাত-আটজন মিলে থাকতে হয় তাদের। কাজ পেলে খাবার জোটে, না পেলে উপোস থাকতে হয়।

 

 


একটা কথা স্পষ্ট যে, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী নয়। বিশ্বে মোট কার্বন নির্গমনের আমাদের অংশ মাত্র ০.৪%। অথচ ক্ষতির ভাগ সবচেয়ে বেশি আমাদের কাঁধে। এটা শুধু অন্যায় ও অনৈতিকতা। উন্নত দেশগুলো, যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শিল্পায়নের নামে পরিবেশ ধ্বংস করেছে, তাদেরই উচিত ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা করা।

 

 


কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রতিশ্রুত ‘Loss and Damage Fund’ এখনো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রতিশ্রুতিই রয়ে গেছে। এজন্য আন্তর্জাতিক পরিসরে আমাদের কণ্ঠস্বর আরও জোরালো হতে হবে। জলবায়ু শরণার্থীদের জন্য আইনি স্বীকৃতি ও পুনর্বাসন নীতি চাই। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করতে হলে এখনই দরকার সমন্বিত নীতি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। এক্ষেত্রে উপকূলীয় বাঁধ ও মিঠাপানি সংরক্ষণ প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়ানো  যেতে পারে। প্রয়োজন কৃষি পুনর্বাসন তহবিল গঠন করা, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা নতুন করে চাষ শুরু করতে পারেন। এছাড়া নগর পরিকল্পনায় জলবায়ু শরণার্থীদের অন্তর্ভুক্ত এবং পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও বিকল্প জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে। গবেষণা ও উদ্ভাবন তহবিল বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে দেশীয় বিজ্ঞানীরা নতুন সমাধান বের করতে পারেন। বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে কৃষি শুধু জীবিকার মাধ্যম নয়, এটি জীবনবোধ। ধান কাটা, নবান্ন, বর্ষা, পিঠা, পাটের মাঠ- এসব আমাদের গান, কবিতা, উৎসবের অংশ। এই কৃষি যদি একদিন হারিয়ে যায়, তাহলে শুধু অর্থনীতি নয়, হারিয়ে যাবে আমাদের সংস্কৃতির প্রাণ। তাই কৃষিকে বাঁচানো মানে শুধু খাদ্য বাঁচানো নয়, একইসঙ্গে দেশের আত্মাকে বাঁচানোও বোঝায়। 

 

 


জলবায়ু পরিবর্তন এখন নতুন কথা নয়। আমরা এর মধ্যেই আছি। বাংলাদেশের তরুণরা আজ উদ্ভাবনী, তারা প্রযুক্তি জানে, তারা মাটি ভালোবাসে। যদি রাষ্ট্র, সমাজ, বিজ্ঞান ও ব্যবসা একসঙ্গে আসে, তাহলে আমরা প্রমাণ করতে পারব ছোট একটি দেশও বড় উদাহরণ হতে পারে টেকসই ভবিষ্যতের। তখন হয়তো একদিন সেইসব কৃষক, যারা নদী ভাঙনে সর্বস্বান্ত তারা আবার হাসবেন। জলবায়ু শরণার্থী শুধু একটি মানবিক সংকট নয়, এটি আমাদের কৃষি, অর্থনীতি ও সভ্যতার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তোলে। আমরা যদি কৃষিকে নতুনভাবে গড়ে তুলি; টেকসই, বিজ্ঞানভিত্তিক, মানবিকভাবে তাহলে বাংলাদেশ আবার দাঁড়াবে নিজের পায়ে, মাটির গন্ধে, ফসলের গানে। কারণ, বাংলাদেশ বাঁচে কৃষিতে, কৃষি বাঁচে প্রকৃতিতে, আর প্রকৃতি বাঁচে মানুষে। এই তিনের বন্ধন ভাঙলে হারাবে অস্তিত্ব। আর এই বন্ধন টিকিয়ে রাখাই আমাদের আগামী প্রজন্মের প্রতি নৈতিক দায়িত্ব।