জলবায়ু পরিবর্তন : পানি খাদ্য পরিবেশ সংকটে যুদ্ধের সম্ভাবনা
ড. জাহাঙ্গীর আলম সরকার [প্রকাশিত: জনকণ্ঠ, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫]

একবিংশ শতাব্দীর আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকছে না। বরং এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির কাঠামোতে বহুমাত্রিক ও জটিল প্রভাব ফেলছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট পানি ও খাদ্য সংকট, উষ্ণায়নজনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং পরিবেশগত অস্থিরতা শুধু মানবিক সমস্যার সীমা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক শক্তি রাজনীতিতে তৈরি করছে নতুন ধরনের দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের সম্ভাবনা। পানি সংকট বিশেষ করে সীমান্তবর্তী নদী ও জলাধারের ওপর নির্ভরশীল রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে জলবায়ুভিত্তিক উত্তেজনা এবং রাজনীতিক সংঘাতের সম্ভাবনা বৃদ্ধি করছে। নদী জলাধারের ব্যবহার, পানির ঘাটতি, চরম আবহাওয়াজনিত বন্যা ও খরার ফলে উৎপন্ন সামাজিক অস্থিরতা কখনো কখনো আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। একইভাবে খাদ্য নিরাপত্তা হ্রাস পেলে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা, জনগোষ্ঠীর সামাজিক সমন্বয় এবং রাজনৈতিক স্থিতি ঝুঁকির মুখে পড়ে, যা সীমান্তবিভাজন ও সম্পদ নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক বা আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ায়।
পরিবেশগত অস্থিরতা-যেমন ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, খরা এবং সমুদ্রস্তরের উত্থান- শুধুই মানুষের জীবন ও জীবিকা বিপন্ন করছে না, বরং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোকে করছে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলে রাষ্ট্রগুলোর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পুনর্বাসন এবং মানবিক সহায়তা প্রদানের সক্ষমতা প্রভাবিত হচ্ছে, যা জিওস্ট্র্যাটেজিক অবস্থান ও কৌশলগত পরিকল্পনাকে পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা তৈরি করছে। এই সমস্ত প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক জিয়োপলিটিক্সে তৈরি করছে এক নতুন ধরনের নিরাপত্তা ও সংঘাতের বাস্তবতা- যেখানে জলবায়ু পরিবর্তন শুধু মানবিক সমস্যা নয়, বরং শক্তি, সম্পদ এবং সার্বভৌমত্ব কেন্দ্রিক রাজনীতিতে একটি নির্দিষ্ট চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। রাষ্ট্রগুলোকে কূটনৈতিক সমঝোতা, আন্তর্জাতিক আইন ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে বাধ্য করছে। অন্যথায় আঞ্চলিক ও বৈশ্বিকভাবে নতুন ধরনের সংঘাত এবং উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়।
পরিস্থিতি বিবেচনায় বলা যায়, জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশগত বা মানবিক সংকট নয়; এটি আধুনিক আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, শক্তি ভারসাম্য এবং রাষ্ট্রীয় কৌশলগত পরিকল্পনার অপরিহার্য উপাদান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পানি, খাদ্য ও পরিবেশসংকটের সমন্বিত প্রভাব ভবিষ্যতের জিয়োপলিটিক্সে সংঘাতের সম্ভাবনা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির নতুন বাস্তবতা নির্মাণে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করবে।
পানি সংকট এবং আন্তর্জাতিক উত্তেজনা : বিশ্বব্যাপী নদী, জলাশয় ও ভূগর্ভস্থ জলের ওপর চরম চাপে থাকা দেশগুলোতে পানি সরবরাহ সংক্রান্ত বিরোধ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে সীমান্তসংলগ্ন নদী ব্যবস্থাপনা ও জলাধিকার নিয়ন্ত্রণে থাকা রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে টেকসই সমঝোতা না থাকলে পানিভিত্তিক সংঘাতের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। নীলনদ, জর্ডান নদী, ইন্দো-গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রাঞ্চলসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ইতোমধ্যেই এই ধরনের উত্তেজনা পর্যবেক্ষণযোগ্য।
খাদ্য নিরাপত্তা এবং সংঘাতের সম্ভাবনা : জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষিজমি ক্ষয়, উৎপাদন হ্রাস এবং খাদ্য মূল্যের ঊর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতি জাতীয় ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ক্ষুধা, সামাজিক অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ বিতর্ক রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ শক্তি ভারসাম্যকে প্রভাবিত করে, যা কখনো কখনো সীমান্ত সংক্রান্ত উত্তেজনা ও সশস্ত্র সংঘাতের দিকে পরিচালিত হতে পারে।
পরিবেশগত অস্থিরতা এবং অস্ত্রপূর্ণ কৌশলগত প্রতিক্রিয়া : উষ্ণায়নজনিত দুর্যোগ, যেমন- ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা এবং সমুদ্রস্তরের উত্থান আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও কূটনীতি ক্ষেত্রে নতুন চাপ সৃষ্টি করছে। দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলগুলোতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পুনর্বাসন এবং মানবিক সহায়তা যথাযথ না হলে রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর সক্ষমতা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে পড়ে। ফলে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নিরাপত্তা হুমকি এবং শক্তির পুনর্বিন্যাসের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।
জিয়োপলিটিক্সে জলবায়ুর প্রভাব : জলবায়ু পরিবর্তন শুধু মানবিক বা অর্থনৈতিক সমস্যা নয়। এটি আধুনিক জিয়োপলিটিক্সের এক নতুন চালিকাশক্তি। পানি ও খাদ্য সংকট, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং পরিবেশগত অস্থিরতার সমন্বয়ে তৈরি পরিস্থিতি রাষ্ট্রগুলোকে কূটনৈতিক সমঝোতা, সংবিধানগত উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করছে। একই সঙ্গে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর জন্য এটি নৈতিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্তের জটিলতা তৈরি করছে।
জলবায়ু পরিবর্তন আজ শুধু একটি পরিবেশগত বা প্রাকৃতিক সংকট হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। এটি আধুনিক বিশ্বরাজনীতির নিরাপত্তা কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্যকে গভীরভাবে প্রভাবিতকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা। সমুদ্রস্তরের উত্থান, জলবায়ুভিত্তিক দুর্যোগ, পানি ও খাদ্য সংকট এবং পরিবেশগত অস্থিরতা শুধু মানুষের জীবনযাত্রাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে না, বরং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত পরিকল্পনাকে সরাসরি প্রভাবিত করে। এই সংকটগুলো রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে এবং কখনো কখনো সীমান্ত-সংক্রান্ত সংঘাত, সম্পদ বিভাজন ও মানবিক উত্তেজনার দিকে পরিচালিত করছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্টি হওয়া পানি ও খাদ্য সংকট আন্তর্জাতিক কূটনীতির প্রক্রিয়াকেও পুনর্গঠন করছে। সীমান্তবর্তী জলাধার, নদী ব্যবস্থাপনা ও কৃষি উৎপাদনের ওপর ভুক্তভোগী রাষ্ট্রগুলোর ওপর চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে আঞ্চলিক শক্তি ভারসাম্য ও রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা কৌশলকে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে জলবায়ু শরণার্থী সমস্যা, যা মানবিক এবং রাজনৈতিক দুই ক্ষেত্রে বিরাট চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন করছে। শরণার্থীদের পুনর্বাসন, নাগরিকত্বের স্বীকৃতি এবং মানবিক সহায়তা প্রদান শুধু আন্তর্জাতিক নৈতিকতার বিষয় নয়, বরং বিবেচিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রীয় কৌশলগত সিদ্ধান্তের একটি জটিল ক্ষেত্র হিসেবে।
এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব শুধু প্রতিশ্রুতি ও সহানুভূতিশীল ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। এটি প্রয়োজন বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক আইনগত কাঠামো, কার্যকর নীতি নির্ধারণ এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতামূলক উদ্যোগ, যার মাধ্যমে ঝুঁকিপ্রবণ রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা সম্ভব। উন্নত ও শিল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলোর ঐতিহাসিক দায় স্বীকার, ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্রগুলোর জন্য পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও মানবিক সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক শক্তি ভারসাম্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা- এসবই দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার মূল ভিত্তি।
জলবায়ু পরিবর্তন শুধু মানবিক চ্যালেঞ্জ নয়। এটি আধুনিক জিয়োপলিটিক্সের কাঠামো, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কৌশল এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে এক অপরিহার্য পরীক্ষাক্ষেত্র। এর সফল সমাধান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সহযোগিতা, বৈশ্বিক দায়িত্বশীলতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি নির্ধারণের মাধ্যমে সম্ভব, যা নিশ্চিত করবে যে জলবায়ুর বলি রাষ্ট্রগুলো ইতিহাসের মানচিত্র থেকে নিশ্চিহ্ন না হয়ে আন্তর্জাতিক সমাজে পূর্ণ মর্যাদাসম্পন্ন অংশ হিসেবে টিকে থাকতে পারে।
লেখক : আইনজীবী ও গবেষক