জলবায়ু পরিবর্তন দারিদ্র্যের ঘূর্ণিপাক
এস. এম তসলিম রেজা [প্রকাশ : দেশ রূপান্তর, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬]

ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, অস্বাভাবিক আবহাওয়া, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, লবণাক্ততা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি আর ভবিষ্যতের শঙ্কা নয় এসব বর্তমানের বাস্তবতা। জলবায়ু পরিবর্তনে কেবল পরিবেশগত সংকট নয়; এটি দারিদ্র্য, খাদ্যনিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও সামাজিক ন্যায্যতার গভীর সংকটে রূপ নিয়েছে। বৈশ্বিক পরিসংখ্যান বলছে, পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হচ্ছে। World Bank-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বে প্রায় ১৩০-১৩২ মিলিয়ন মানুষ চরম দারিদ্র্যের মুখে পড়তে পারে।
অন্যদিকে Intergovernmental Panel on Climate Change (IPCC) সতর্ক করেছে, কার্যকর অভিযোজন ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বার্ষিক জিডিপির প্রায় ৯ শতাংশ পর্যন্ত হারাতে পারে এবং প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণ জলবায়ু অভিবাসীতে পরিণত হবে। এই তথ্য প্রমাণ করে জলবায়ু পরিবর্তন ও দারিদ্র্য অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। World Bank-এর বিশ্লেষণ বলছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী প্রায় ৫২০ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং প্রায় ২৬ মিলিয়ন মানুষ দারিদ্র্যের মুখে পতিত হয়। নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে এই ক্ষতি জিডিপির তুলনায় বহু গুণ বেশি, কারণ সেখানে অবকাঠামো দুর্বল, বীমা কভারেজ সীমিত এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত।
United Nations Development Programme (UNDP)-এর তথ্য অনুযায়ী, জলবায়ু ঝুঁকির কারণে বৈশ্বিক মানব উন্নয়ন সূচকে (HDI) গত এক দশকের অগ্রগতি হুমকির মুখে পড়েছে। জলবায়ু-সংবেদনশীল খাতে বিশেষত কৃষি, মৎস্য ও অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে কর্মরত জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা অনুমান করছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও কর্মঘণ্টা হ্রাসের ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে প্রায় ৮০ মিলিয়ন পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ উৎপাদনশীলতা হারাতে পারে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও স্পষ্ট।
দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ শ্রমশক্তি কৃষিনির্ভর; অথচ ঘূর্ণিঝড় ও বন্যায় প্রতিবছর হাজার হাজার হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার বিস্তারের ফলে কৃষি ও পানীয় জলের সংকট তীব্র হচ্ছে। গবেষণা বলছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১ মিটার বাড়লে দেশের প্রায় ১৭ শতাংশ ভূমি প্লাবিত হতে পারে যা সরাসরি কয়েক কোটি মানুষের জীবিকা ও বাসস্থানকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো জলবায়ু পরিবর্তন বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। ধনী দেশগুলো অভিযোজন ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে পারলেও, দরিদ্র দেশগুলো ঋণনির্ভর পুনর্গঠনে বাধ্য হচ্ছে। ফলে দারিদ্র্য ও ঋণের দ্বৈত ফাঁদ তৈরি হচ্ছে। অতএব, জলবায়ু অর্থায়ন, ন্যায্য ক্ষতিপূরণ (loss and damage) এবং টেকসই উন্নয়ন কৌশল ছাড়া বৈশ্বিক দারিদ্র্য হ্রাসের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। জলবায়ু পরিবর্তন নতুন করে দারিদ্র্য সৃষ্টি না করলেও, বিদ্যমান দারিদ্র্যকে বহুগুণে বাড়িয়ে তোলে।
বড় ধরনের বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ঘরবাড়ি, গবাদিপশু, ফসল, রাস্তা ও বাজারব্যবস্থা। সঞ্চয় ও বীমাহীন পরিবারগুলো ঋণের ফাঁদে পড়ে। আয় কমে যায়, শিশুরা স্কুল ছাড়তে বাধ্য হয়, খাদ্য গ্রহণ কমে যায়। World Food Programme-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ক্ষুধার্ত মানুষের ৬০ শতাংশেরও বেশি জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশে বাস করে। একই সময়ে Food and Agriculture Organization জানায়, ২০২৩ সালে বিশ্বে প্রায় ৭৩৫ মিলিয়ন মানুষ দীর্ঘস্থায়ী ক্ষুধায় ভুগেছে। ২০২২ সালে জলবায়ুজনিত দুর্যোগে কৃষি খাতে প্রায় ৯৬ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে। অর্থাৎ জলবায়ু আঘাত সরাসরি খাদ্য উৎপাদন, মূল্য ও প্রাপ্যতাকে প্রভাবিত করছে যার প্রধান শিকার নিম্নআয়ের পরিবারগুলো। World Health Organization-এর অনুমান অনুযায়ী, ২০৩০ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রতিবছর অতিরিক্ত প্রায় ২,৫০,০০০ মানুষের মৃত্যু ঘটতে পারে।
এর প্রধান কারণ হবে তাপপ্রবাহ, অপুষ্টি, ম্যালেরিয়া ও ডায়রিয়া। বিখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞান সাময়িকী The Lancet-এ প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, গত দুই দশকে ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে তাপজনিত মৃত্যু ৭০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় চরম তাপপ্রবাহ এখন শিল্প-পূর্ব সময়ের তুলনায় প্রায় ৩০ গুণ বেশি সম্ভাবনাময়। ডেঙ্গুর প্রকোপ ২০০০ সালের পর থেকে বিশ্বব্যাপী প্রায় আটগুণ বেড়েছে।
বন্যা-পরবর্তী পানিবাহিত রোগের বিস্তারও উদ্বেগজনক। অসুস্থতা মানে আয়হানি, চিকিৎসা ব্যয় ও দীর্ঘমেয়াদি দারিদ্র্য। ওচঈঈ-এর তথ্যমতে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেলে গমের উৎপাদন প্রায় ৬ শতাংশ এবং ভুট্টার উৎপাদন প্রায় ৭ শতাংশ কমে যেতে পারে। সমুদ্র উষ্ণায়নের ফলে ১৯৩০ সাল থেকে বৈশ্বিক সামুদ্রিক মাছের মজুদ প্রায় ৪ শতাংশ কমেছে; উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলে এই হার ১৫-৩৫ শতাংশ পর্যন্ত। উপকূলীয় বাংলাদেশে লবণাক্ততার কারণে ধান উৎপাদন ইতিমধ্যেই ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রায় ১০ লাখ হেক্টরের বেশি জমি লবণাক্ততার প্রভাবে আক্রান্ত। ফলে কৃষিনির্ভর প্রায় ৪০ শতাংশ শ্রমশক্তি সরাসরি ঝুঁকিতে। পুষ্টিমানও হ্রাস পাচ্ছে।
বায়ুমণ্ডলে CO₂ বৃদ্ধির ফলে ফসলে প্রোটিন, জিঙ্ক ও আয়রনের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। গবেষণা সতর্ক করছে, ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ১৫ কোটি মানুষ প্রোটিন ঘাটতিতে এবং প্রায় ১ বিলিয়ন নারী ও শিশু জিঙ্কের ঘাটতির ঝুঁকিতে পড়তে পারে।IPCC-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ১৪৮ মিলিয়ন শিশু বৃদ্ধি স্থবিরতায় এবং ৪৫ মিলিয়ন শিশু তীব্র অপচয়ে ভুগছে।
এ বয়সী শিশুদের প্রায় ৪৫ শতাংশ মৃত্যুর পেছনে অপুষ্টি ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে দরিদ্র পরিবারগুলো তাদের আয়ের ৫০-৭০ শতাংশ খাদ্যে ব্যয় করে। খাদ্যমূল্যের সামান্য বৃদ্ধি তাদের খাদ্যতালিকাগত বৈচিত্র্য কমিয়ে দেয়। নদীভাঙন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ জলবায়ুজনিত কারণে অভ্যন্তরীণ অভিবাসী হতে পারে। এই মানুষগুলো শহরের বস্তিতে গিয়ে অস্থায়ী কাজ, নিম্ন মজুরি ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করতে বাধ্য হয়। ফলে গ্রামীণ দারিদ্র্য শহুরে দারিদ্র্যে রূপ নেয় কিন্তু সংকটের গভীরতা কমে না।
লেখক : জলবায়ুকর্মী ও লেখক