কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

জলাশয় : পরিবেশ পর্যটন অর্থনীতির প্রাণশক্তি

ড. রাধেশ্যাম সরকার [সূত্র : দেশ রূপান্তর, ২৭ আগস্ট ২০২৫]

জলাশয় : পরিবেশ পর্যটন অর্থনীতির প্রাণশক্তি

 

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হিসেবে পরিচিত। এখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য হ্রদ, দিঘি, জলাশয় ও কৃত্রিম জলাধার। যা দেশের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, কৃষি, মৎস্যসম্পদ, পর্যটন এবং সংস্কৃতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, শুধু পাবলিক জলাশয়ের সংখ্যা প্রায় ১৩ লক্ষাধিক। আর এসব জলাশয়ে বছরে প্রায় ৫০ লাখ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হয়, যা জাতীয় মাছের মোট উৎপাদনের প্রায় ৫৭ শতাংশ। হ্রদ শুধু খাদ্যনিরাপত্তা নয়, বরং পানিনিরাপত্তা ও পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্যও অপরিহার্য সম্পদ। এ সত্যকে স্মরণ করিয়ে দিতেই পালিত হয় ‘বিশ্ব হ্রদ দিবস’। ১৯৯৭ সালে মরক্কোর মারাকেশে (COP-3) প্রথমবার এ দিবস পালনের প্রস্তাব গৃহীত হয়। যা দীর্ঘদিন অক্টোবর মাসের শেষ রবিবার ‘World Lakes Day’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়ে ২৭ আগস্টকে ‘World Lakes Day’ হিসেবে নির্ধারণ করেছে এবং ২০২৩ সাল থেকে এটি  বৈশ্বিকভাবে পালিত হচ্ছে। এ দিবসের উদ্দেশ্য হলো,  হ্রদ ও জলাধারের গুরুত্ব সম্পর্কে বৈশ্বিক সচেতনতা বৃদ্ধি, দূষণ, দখল ও অব্যবস্থাপনা থেকে রক্ষা করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টেকসই পানিসম্পদ নিশ্চিত করা। ফলে পৃথিবীর পরিবেশ ও মানবজীবনের টেকসই ভবিষ্যৎ রক্ষায় হ্রদ সংরক্ষণ এখন বৈশ্বিক এজেন্ডায় পরিণত হয়েছে। তাই বিশ্ব হ্রদ দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিক উদযাপন নয়, বরং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জলসম্পদ রক্ষার নতুন প্রতিশ্রুতি ঘোষণার তাৎপর্যময় দিন।

 

 

 হ্রদ মানবজীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত এক অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ। এটি কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের উৎস নয়, বরং জীবনধারণের অপরিহার্য ভরসাস্থল। পৃথিবীর মোট মিঠাপানির প্রায় ২০ শতাংশই হ্রদে সংরক্ষিত। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই হ্রদগুলো কৃষি সেচ, মাছ চাষ, গৃহস্থালি কাজ এবং শিল্পকারখানার পানির চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। শুধু পানি সংরক্ষণ নয়, জীববৈচিত্র্য রক্ষাতেও হ্রদ অপরিহার্য। উদাহরণস্বরূপ, কাপ্তাই হ্রদে প্রায় ৭০টিরও বেশি মাছের প্রজাতি পাওয়া যায়, আর দিনাজপুরের রামসাগর দিঘি শীতকালে পরিযায়ী পাখির অন্যতম আশ্রয়স্থল। কাপ্তাই হ্রদ থেকে বছরে প্রায় ১০ হাজার টন মাছ আহরিত হয়, যা প্রায় ৫০ হাজার জেলে পরিবারের জীবিকা। পর্যটন ক্ষেত্রেও হ্রদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। রাঙ্গামাটি ও কাপ্তাই হ্রদে বছরে ৪০-৫০ কোটি টাকার মতো আয় হয়। চট্টগ্রামের ফয়’স লেক, ঢাকার হাতিরঝিল ও ধানমন্ডি লেক নগরবাসীর বিনোদনের অন্যতম কেন্দ্র। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ২৫০টিরও বেশি প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম হ্রদ রয়েছে, যা স্থানীয় অর্থনীতি ও পর্যটনের জন্য অপরিহার্য। প্রতি বছর গড়ে ১৫-২০ লাখ মানুষ হ্রদভিত্তিক পর্যটনে ভ্রমণ করে। পাশাপাশি হ্রদ পানি সংরক্ষণ, বন্যার ঝুঁকি হ্রাস, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনরুদ্ধার এবং স্থানীয় আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণে প্রাকৃতিক বাফারের মতো কাজ করে। এভাবে হ্রদ আমাদের জীবন, জীবিকা, প্রকৃতি ও ভবিষ্যতের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে নদী, খাল, বিল ও হ্রদ সমৃদ্ধ দেশ।

 

 এর ভেতরে বিস্তৃত অসংখ্য প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম হ্রদ শুধু স্থানীয় জনগণের জীবনযাত্রাকে সমৃদ্ধ করছে না, বরং জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। দেশের সবচেয়ে পরিচিত হ্রদগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো, রাঙ্গামাটির কাপ্তাই হ্রদ। এটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ কৃত্রিম হ্রদ, যার আয়তন প্রায় ৬৮ হাজার হেক্টর। এই হ্রদ বিদ্যুৎ উৎপাদন, কৃষি সেচ, মৎস্য আহরণ ও পর্যটনের জন্য অপরিসীম গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবছর এখান থেকে গড়ে প্রায় ১০ হাজার টনের বেশি মাছ আহরিত হয় এবং লাখো পর্যটক ভ্রমণে আসেন। দিনাজপুরের ঐতিহাসিক রামসাগর দিঘি দেশের সবচেয়ে বড় দিঘি (৪৩ হেক্টর), বর্তমানে এটি জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষিত এবং শীতকালে পরিযায়ী পাখির আশ্রয়স্থল হিসেবে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছে। চট্টগ্রামের ফয়’স লেক পাহাড়ি পরিবেশে গড়ে ওঠা একটি অনন্য বিনোদনকেন্দ্র, যা প্রতিবছর হাজার হাজার পর্যটককে আকর্ষণ করে। ঢাকার হাতিরঝিল ও ধানমন্ডি লেক নগরজীবনে পানি সংরক্ষণ, নান্দনিক সৌন্দর্য এবং বিনোদনের এক বিশেষ ভরসাস্থল। এছাড়া সিলেট, যশোর, বগুড়া ও কুমিল্লার অসংখ্য দিঘি স্থানীয় জনগণের পানির চাহিদা পূরণ ও মৎস্যসম্পদে অমূল্য অবদান রেখে চলেছে। গবেষণা অনুযায়ী, দেশে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় লক্ষাধিক দিঘি ও জলাশয় এখনো বিদ্যমান, যা প্রায় ৭০ শতাংশ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর নিত্যজীবনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। এভাবে বাংলাদেশের হ্রদ ও দিঘিগুলো প্রকৃতি, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতির সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক বহন করছে। বাংলাদেশের হ্রদগুলো বর্তমানে এক জটিল সংকটময় পরিস্থিতির মুখোমুখি, যা কেবল পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যকেই নয়, মানুষের জীবনযাত্রাকেও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় প্রতিদিন গড়ে ৬,৫০০ টনেরও বেশি কঠিন বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সরাসরি কিংবা পরোক্ষভাবে হ্রদ ও খালে জমা হয়ে পানির স্বচ্ছতা নষ্ট করে এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য ভেঙে দেয়।

 

 

 এর সঙ্গে শিল্পবর্জ্য, নর্দমার ময়লা, প্লাস্টিক ও ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থের অবাধ প্রবাহ যোগ হয়ে হ্রদের পানিকে মারাত্মকভাবে দূষিত করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার লেকগুলোতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা প্রায়শই জীববৈচিত্র্যের জন্য প্রয়োজনীয় মানের নিচে নেমে যায়। ফলে মাছ ও জলজ প্রাণীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। দূষণের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রা বৃদ্ধিও হ্রদের বাস্তুসংস্থানে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। এভাবে অব্যাহত দখল, দূষণ ও অব্যবস্থাপনা বাংলাদেশের হ্রদসমূহকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিচ্ছে।

 

 

 এর পাশাপাশি জীববৈচিত্র্যের ওপর এই সংকটের প্রভাব আরও সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান। এক সময় কাপ্তাই হ্রদে প্রচুর প্রজাতির দেশীয় মাছ পাওয়া যেত, কিন্তু অতিরিক্ত মাছ ধরা, প্রজনন মৌসুমে অনিয়ন্ত্রিত আহরণ এবং অবৈধ জাল ব্যবহারের কারণে বর্তমানে মাছের সংখ্যা ও প্রজাতির বৈচিত্র্য উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুসারে, গত দুই দশকে হ্রদ ও দিঘির অন্তত ৩০ শতাংশ দেশীয় মাছের প্রজাতি বিলুপ্তির পথে রয়েছে, যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও গুরুতর হুমকি। অপরিকল্পিত নগরায়ণ হ্রদের আরেকটি বড় সংকট। রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীর মতো শহরে হ্রদের চারপাশে স্থাপনা নির্মাণ প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে, ফলে জলাবদ্ধতা ও হঠাৎ বন্যার ঝুঁকি ক্রমশ বেড়েই চলেছে। খরা মৌসুমে হ্রদের পানির স্তর অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়, আবার বর্ষায় অতিবৃষ্টির কারণে পানির স্তর ওঠানামা করে যা মাছ, পাখি এবং জলজ উদ্ভিদের প্রজনন চক্রকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। অন্যদিকে, ঐতিহাসিক দিঘি ও হ্রদগুলোর অনেকই বছরের পর বছর অবহেলিত অবস্থায় পড়ে আছে। নিয়মিত পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এগুলো ধীরে ধীরে ভরাট হয়ে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, গত ৫০ বছরে দেশের অন্তত ৪০ শতাংশ ঐতিহাসিক দিঘি বিলীন হয়েছে। ফলে শুধু পরিবেশ নয়, আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের সামাজিক ইতিহাসও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। হ্রদসমূহ রক্ষায় টেকসই সমাধানের জন্য সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।

 

 


প্রথমত :  হ্রদ দখল, ভরাট ও দূষণের বিরুদ্ধে কঠোর আইন বাস্তবায়ন করতে হবে এবং প্রতিটি হ্রদকে জনসম্পদ হিসেবে ঘোষণা করা প্রয়োজন।  যাতে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কোনোভাবেই এ সম্পদ ক্ষতির মুখে না ফেলতে পারে। দ্বিতীয়ত : কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা জরুরি। শিল্পবর্জ্য ও নর্দমার পানি সরাসরি হ্রদে ফেলা বন্ধ করতে প্রতিটি শিল্পাঞ্চলে বাধ্যতামূলকভাবে বর্জ্য পরিশোধনাগার (ঊঞচ) স্থাপন ও তার নিয়মিত কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত : মাছ আহরণে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ অপরিহার্য। প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ রাখা, ছোট জাল ব্যবহার নিষিদ্ধ করা, আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক মাছ চাষ সম্প্রসারণ এবং প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র পুনরুদ্ধার করা দরকার। পাশাপাশি হ্রদভিত্তিক পর্যটনের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য। অতিরিক্ত বাণিজ্যিক কার্যক্রম, শব্দদূষণ ও প্লাস্টিক ব্যবহার সীমিত করতে হবে। জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই সংরক্ষণ কখনোই সম্ভব নয়। তাই বৃক্ষরোপণ, বর্জ্য না ফেলা এবং নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে জনগণকে যুক্ত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে হ্রদকেন্দ্রিক গবেষণা জোরদার করার পাশাপাশি স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রমে হ্রদ সংরক্ষণ অন্তর্ভুক্ত করা উচিত, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ছোটবেলা থেকেই এ বিষয়ে সচেতন হয়। ইতিমধ্যে সরকার হাতিরঝিল ও গুলশান-বনানী লেক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে, তবে ঐতিহাসিক দিঘি সংরক্ষণে আলাদা বাজেট বরাদ্দ এবং দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করাও অপরিহার্য।

 

 

বাংলাদেশের হ্রদ কেবল প্রাকৃতিক জলাধার নয় বরং আমাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, জীববৈচিত্র্য ও অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত এক অমূল্য সম্পদ। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, গত দুই দশকে শুধু রাজধানী ঢাকা শহরেই প্রায় ৫০টিরও বেশি প্রাচীন দিঘি ও হ্রদ দখল ও ভরাটের কারণে বিলীন হয়েছে। শিল্পবর্জ্য, প্লাস্টিক ও নর্দমার দূষণে অসংখ্য হ্রদের পানি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এমন বাস্তবতায় ২৭ আগস্টের ‘বিশ্ব হ্রদ দিবস’ কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয় বরং জলসম্পদ সংরক্ষণে কার্যকর পরিকল্পনা, কঠোর আইন বাস্তবায়ন ও জনসচেতনতার প্রতি নতুন অঙ্গীকার। মনে রাখতে হবে  হ্রদ রক্ষা করা মানেই জীবন, পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করারই নিশ্চয়তা।

 

 

লেখক : সিনিয়র কৃষিবিদ অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন

rssarker69@gmail.com