কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

জিয়াউর রহমানের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি- ড. শহীদুজ্জামান

[সূত্র : ইত্তেফাক, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৫] আজ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির ৪৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। দিবসটি উপলক্ষ্যে দলটির প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে, বিশেষ করে ভারত, চীন, পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র ও মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে জিয়ার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আলোচনার অবকাশ রয়েছে।

জিয়াউর রহমানের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি- ড. শহীদুজ্জামান

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ভারত সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। ১৯৭৯ সালের এক সেমিনারে তৎকালীন রাষ্ট্রদূত রাশেদ আহমেদ চৌধুরী বলেছিলেন যে, ভারতের ভাঙনই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা। যদিও জিয়াউর রহমান ভারতের প্রশ্নে 'তিন পা এগোলে দুই পা পেছানো'র মতো কঠিন বাস্তবতা স্বীকার করেন, যা ভারতের দিক থেকে বাংলাদেশের অস্তিত্বের প্রতি সর্বোচ্চ হুমকির ইঙ্গিত বহন করে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস, জয়শঙ্করের বর্তমান বক্তব্য (বাংলাদেশের সৃষ্টি ভারতের বড় ভুল ছিল এবং এটি উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করছে) জিয়ার এই ধারণাকে সমর্থন করে।

 


জিয়াউর রহমান সার্কের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি চীনকেও সার্কের অংশীদার করতে চেয়েছিলেন, যা ভারতের আপত্তির কারণে সম্ভব হয়নি। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সত্যিকারের কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু হয়। তিনি চীনের আস্থা অর্জনে সচেষ্ট ছিলেন এবং ভারতের সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় চীনের সঙ্গে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।

 

 


পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হকের সঙ্গেও জিয়াউর রহমানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ, ব্যক্তিগত ও বিশ্বাসযোগ্য সম্পর্ক ছিল, যা বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারে সহায়ক হয়েছিল। তিনি ইসলামী বিশ্বে বাংলাদেশের নেতৃত্ব গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। ইরান-ইরাক যুদ্ধে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ওআইসি তাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়েছিল, যেখানে তিনি অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে ভূমিকা পালন করেন। যদিও আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় তার গভীর নিবিষ্টতা তাকে অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র থেকে সৃষ্ট হুমকি মোকাবিলায় উদাসীন করে তোলে, যা শেষ পর্যন্ত তার জীবনহানির কারণ হয়।

 


জিয়াউর রহমান মিয়ানমার ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সম্পর্ক উন্নয়নে সচেষ্ট ছিলেন। মিয়ানমারের সঙ্গে তার নীতি ছিল শক্তিশালী ও সম্মানজনক; দেশের সামান্য আঁচড় লাগলেই তিনি সামরিক শক্তি ব্যবহারে দ্বিধা করতেন না। যুক্তরাষ্ট্রের একজন রাষ্ট্রদূত জিয়ার মৃত্যুতে আক্ষেপ করে বলেছিলেন যে, জিয়া বেঁচে থাকলে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইসরাইলের সমতুল্য হয়ে যেত। জিয়াউর রহমান তার পররাষ্ট্র সচিবসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতেন, যাতে তার স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়িত হয়।

 


বর্তমান বিএনপি নেতৃত্ব কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভারতের আগ্রাসী মনোভাব (যেমন ভারতীয় সেনাবাহিনীর বাংলাদেশে বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী জিয়াউর রহমানের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি প্রবেশ ও ছাত্র হত্যার ঘটনা) সত্ত্বেও ভারতের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখার পক্ষে আপসকামিতা দেখাচ্ছেন, যা জিয়ার নীতির পরিপন্থি বলে মনে করি। বর্তমান নেতৃত্বে ভারতের প্রতি সহানুভূতিশীল ব্যক্তিদের অপ্রয়োজনীয় প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে, যা দলের যোগ্য ও দেশপ্রেমিক নেতাদের অবজ্ঞা করছে। পাকিস্তানের কাছে ক্ষমা চাওয়ার মতো বক্তব্য দিয়ে কেউ কেউ জিয়ার ভারতবিরোধী ও পাকিস্তানপন্থি পররাষ্ট্রনীতির সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান নিয়েছেন, যা মিথ্যাচার এবং বিএনপির গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে বলে অনেকে মনে করেন।

 


বর্তমান বিএনপি নেতৃত্ব আমেরিকা ও চীনের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে এবং চীনের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা (যেমন লালমনিরহাটে বিমান ঘাঁটি নির্মাণ) বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে উদাসীনতা দেখাচ্ছে। তাই এই মুহূর্তে খালেদা জিয়ার সরাসরি নেতৃত্ব অপরিহার্য বলে দেশপ্রেমিক জনগণ মনে করে। বিএনপির তরুণ ও দেশপ্রেমিক নেতৃত্বের উচিত বেগম খালেদা জিয়াকে সরাসরি দলের কর্তৃত্ব গ্রহণ করার অনুরোধ জানানো। এতে শারীরিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও (যেমন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের উদাহরণ), সমমনা ও ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে ভূমিকা পালনকারী দলগুলোর কাছে বিএনপির প্রতি শ্রদ্ধা বাড়াবে। তবে দুঃখজনকভাবে বর্তমানে কিছু 'সুযোগসন্ধানী' তাকে দূরে সরিয়ে রাখছে, যা তাকে দলের অভ্যন্তরীণ সমস্যা মোকাবিলায় বাধা দিচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয়।

 


খালেদা জিয়ার উদ্যোগে পাকিস্তান ও অন্যান্য দেশগুলোকে সঙ্গে নিয়ে সার্ক পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। যদি ভারত সার্কে যোগ দিতে না চায়, তবে তাকে বাদ দিয়েই চীনকে সার্কে আমন্ত্রণ জানাতে হবে। নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ এই প্রচেষ্টাকে সমর্থন করছে। এই পদক্ষেপ ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে বাধ্য করবে এবং বাংলাদেশের শর্তে সার্কে আসতে চাইবে। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বেই পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সম্পর্ক এবং চীনের সঙ্গে সরাসরি সামরিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরো গভীর করা সম্ভব। তারেক রহমানকেও খালেদা জিয়ার নিয়ন্ত্রণ ও নির্দেশনা অনুযায়ী দলের এবং দেশের (যদি ক্ষমতায় আসে) পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে। বিএনপিকে জিয়াউর রহমানের স্বাধীন, শক্তিশালী ও সম্মানজনক পররাষ্ট্রনীতির পথে ফিরে আসতে হবে। এটি বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীর শক্তি সঞ্চয়েও সহায়তা করবে। বিএনপির মধ্যে যারা প্রগতিশীল, ইসলামিক শক্তি এবং ভারতের হুমকি সম্পর্কে সচেতন, তাদের এগিয়ে এসে খালেদা জিয়াকে সামনে নিয়ে আসতে হবে। খালেদা জিয়াকে নিষ্ক্রিয় রাখা হলে বিএনপি ধ্বংসের পথে যাবে।

 


প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ছিল বাংলাদেশের অস্তিত্বের প্রতি ভারতের হুমকির বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন এবং চীন, পাকিস্তান, ইসলামী বিশ্ব ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের ওপর ভিত্তি করে। বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বকে এই পথ থেকে সরে এসে আপসকামিতা পরিহার করতে হবে এবং বেগম খালেদা জিয়ার সরাসরি নেতৃত্বে জিয়ার আদর্শের ভিত্তিতে একটি শক্তিশালী, স্বাধীন ও সম্মানজনক পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করতে হবে।

 


লেখক: সাবেক অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক
বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়