কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উত্তরণে ব্রাজিলের বাজি

আদনান আরিফ সালিম [সূত্র : আমাদের সময়, ২৫ নভেম্বর ২০২৫]

জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উত্তরণে ব্রাজিলের বাজি

বিশ্ব এখন দ্রুত বদলে যাওয়া জ্বালানি বাস্তবতার মুখোমুখি। এই সময়ে ব্রাজিল অভূতপূর্ব এক রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক দ্বৈত পরীক্ষার মুখোমুখি। ঈঙচ৩০-কে সামনে রেখে তারা ঘোষণা করেছে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো হবে। এই নির্ভরশীলতা কমানোর উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা কেবল তাদের পরিবেশগত বাধ্যবাধকতার কারণে নয়, বরং টেকসই উন্নয়ন ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার কৌশল হিসেবেও নেওয়া হয়ে থাকতে পারে। তবে তেল আয়ের একটি অংশ সবুজ অর্থনীতিতে বিনিয়োগে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে নবায়নযোগ্য শক্তি খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।

 

 

ব্রাজিলের এই উদ্যোগ একদিকে জলবায়ু নেতৃত্বকে শক্তিশালী করছে, অন্যদিকে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জটিল বাস্তবতাকেও সামনে আনছে। জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উত্তরণের এই পথরেখায় সাফল্যের সম্ভাবনা ব্রাজিলের জন্য দুঃসাহসী বাজি, তেমনি বৈশ্বিক জ্বালানির প্রচলিত ধারা থেকে রূপান্তরের আলোচনায় নতুন দৃষ্টান্তও স্থাপন করেছে।

 

 

দীর্ঘদিন ধরে জলবায়ু কূটনীতি জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে অনেকেই রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর বলে এর থেকে পাশ কাটিয়ে এসেছে। কিন্তু ব্রাজিল সেই কঠিন বিষয়টির মুখোমুখি হয়েছে এবার। ঈঙচ৩০-কে কেন্দ্র করে দেশটি উৎপাদক রাষ্ট্রগুলোকে বাধ্য করছে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে স্বীকার করে ন্যায়সঙ্গত ও পরিকল্পিত বৈচিত্র্যকরণের পথরেখা দাঁড় করাতে। তারা জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানোর পক্ষে তাদের আহ্বানগুলো তীব্র করেছে।

 

 

ব্রাজিলের এই দাবি এতটাই যৌক্তিক হয়ে উঠছে, তা আর উপেক্ষা করা যাচ্ছে না। ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনে (ঈঙচ৩০) প্রধান উৎপাদক দেশগুলোর ওপর এতে করে চাপ বাড়ছে। তারা যাতে তেল, গ্যাস ও কয়লার ধাপে ধাপে, ন্যায়সঙ্গত ও শৃঙ্খলাপূর্ণ অবসানের পরিকল্পনা শুরু করে সেদিকে সুস্পষ্ট আহ্বান জানানো হয়েছে এখানে।

 

 

দশকের পর দশক ধরে জলবায়ু আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হ্রাসের প্রতিশ্রুতি ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানির লক্ষ্য। কিন্তু কোন দেশ কত দ্রুত জীবাশ্ম জ্বালানির উৎপাদন কমাবে সেই মৌলিক প্রশ্নটি ছিল নিষিদ্ধ-আলোচনার মতো। যদিও ঈঙচ২৮ প্রথমবারের মতো ‘জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উত্তরণ’ কথাটি আলোচনায় স্থান দিয়েছিল, বাস্তব অগ্রগতি এখনও শ্লথ ও বিচ্ছিন্ন। ঈঙচ৩০-এ এসে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা সুর বদলে দিয়েছেন।

 

 

লুলা ঘোষণা করেছেন, ‘পৃথিবী আর জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যাপক ব্যবহারের বোঝা বহন করতে পারছে না’ এবং এগুলোকে পর্যায়ক্রমে অবসানের জন্য স্পষ্ট একটি পরিকল্পনা তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে তেল-গ্যাস উৎপাদনকারী দেশ ও জ্বালানি কোম্পানিগুলোর প্রতিরোধ বরাবরই ছিল শক্তিশালী। তবে সামাজিক ন্যায়বিচারের দাবি থাকা অনেক দেশ নিজে থেকে এই পরিবর্তনের পক্ষে এগিয়ে যেতে অনিচ্ছুক। তারা আশঙ্কা করে যে, এতে অসমতা কমানো ও জনকল্যাণমূলক সেবার অর্থায়ন ব্যাহত হতে পারে। এখানে ব্রাজিলও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হতে পারে। দেশটি একদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিরাট সম্ভাবনাময় উদীয়মান শক্তি, অন্যদিকে গভীর দারিদ্র্য ও সমৃদ্ধ অফশোর তেলক্ষেত্রের দ্বৈত বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছে। যখন প্রেসিডেন্ট লুলা বললেন যে, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ‘পরিকল্পিত ও ন্যায্য’ প্রক্রিয়ায় শেষ করতে হবে। ঠিক তখনই তিনি ইঙ্গিত দেন যে, শৃঙ্খলাবদ্ধ এই পরিবেশ দূষণের অবসান করতে চাইলে সদিচ্ছা জরুরি, আগ্রহী দেশের চলমান উন্নয়নকে ক্ষতিগ্রস্ত না করেও পরিবেশ রক্ষায় কাজ করা সম্ভব হবে।

 

 

ব্রাজিলের লক্ষ্য এখন তার বৈশ্বিক অবস্থান শক্তিশালী করা, একই সঙ্গে নিজেদের জ্বালানি রূপান্তরকে সাফল্যমণ্ডিত করা। তেল বিক্রি থেকে তাদের আয়ের একটি অংশ সবুজ রূপান্তরে ব্যয় করতে লুলার প্রস্তাবিত জাতীয় তহবিল এই ভারসাম্যেরই প্রতিফলন। তারা পুরনো অর্থনীতির রেন্ট ব্যবহার করে নতুন অর্থনীতির ভিত গড়ার চেষ্টা করছে। তাতে করে শ্রমিক শ্রেণির মানুষ ও আর্থিকভাবে দুর্বল জনগোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত হবে না বলে ব্রাজিলের দাবি। তবে ব্রাজিলের এমন দৃষ্টান্ত আগেও ছিল না, তা নয়।

 

 

নরওয়ের সার্বভৌম তহবিলও দশকের পর দশক তেলনির্ভর আয় থেকে গড়া। তারা বিশ্বজুড়ে নিম্ন-কার্বন খাতে বিনিয়োগ করে এবং অ্যামাজন ফান্ডের মতো উদ্যোগকে সমর্থন দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ওদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পূর্ব তিমুরও তেল ও গ্যাসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তারা নিজস্ব সম্পদ আয়ে বৈচিত্র্যকরণের পদ্ধতি ও কৌশল পরিচালনা করেছে।

 

 

এই ধরনের পদক্ষেপগুলো প্রমাণ করে যে, জীবাশ্ম জ্বালানি আয়কেও সবুজ রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় কাজে সহজেই বিনিয়োগ করা যায়। এটা ক্ষেত্রবিশেষে অপরিহার্যও বটে। দীর্ঘদিন ধরে জলবায়ু কূটনীতিবিদরা আশঙ্কা করেছেন যে, তেলনির্ভর আয়ের কথা উঠলেই যেন তা উত্তোলনকে বৈধতা দেয়। কিন্তু এক্ষেত্রে পরিকল্পনাগুলোকেও এড়িয়ে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে তেলসম্পদনির্ভর দেশগুলোকে একসময় নিঃসঙ্গ করে রাখার প্রচেষ্টামাত্র। ফলে যখন তাদের আয় কমে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয় তখন তারা রূপান্তরের জন্য অর্থের প্রয়োজন দেখিয়ে আবার জ্বালানি তথা তেলনির্ভর অর্থনীতিতে ফিরে যেতে চেষ্টা করে।

 

 

বৃহত্তর এক পরিবর্তনের ইঙ্গিত নিঃসন্দেহে এখন দৃশ্যমান। কারণ এক দশক আগেও অধিকাংশ সরকার তাদের জীবাশ্ম জ্বালানিহীন ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারত না। তবে অর্থনৈতিক বাস্তবতা পাল্টে গিয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন প্রতিযোগিতামূলক, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তিতে পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলো ক্রমেই শক্তির রূপান্তরকে উৎপাদনশীলতা, স্থিতিস্থাপকতা, প্রতিযোগিতা এবং সার্বভৌমত্ব বৃদ্ধির পথ হিসেবে দেখছে। আর সেদিক থেকে চিন্তা করতে গেলে ব্রাজিলের অভিজ্ঞতা এই বিরামহীন পরিবর্তনের ধারা স্পষ্ট করে তোলে।

 

 

উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতোই ব্রাজিল দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক কর্মসূচি ও অবকাঠামো নির্মাণে তেল-ভাড়ার ওপর নির্ভর করে চলছে। ২০১১ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত ফেডারেল রয়্যালটির মাত্র অতিসামান্য অংশ গিয়েছে এর প্রধান জলবায়ু তহবিলে। তবু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্রাজিল তার জৈবজ্বালানিশিল্প বিস্তৃত করেছে। তারা তাদের পক্ষ থেকে টেকসই বিমান জ্বালানির উন্নয়ন শুরু করেছে। অন্যদিকে তারা নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি করেছে। ফলে ব্রাজিলের অঞ্চলগুলোতেও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, যেগুলো ঐতিহাসিকভাবে কেবল তেল উত্তোলননির্ভর অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। নতুন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর ব্রাজিল দেখিয়ে দিচ্ছে যে, জ্বালানি রূপান্তর কোনো দেশের উন্নয়ন-এজেন্ডাকে প্রতিস্থাপন করে না; বরং আরও মজবুত করে।

 

 

 

সাম্প্রতিক ঝুঁকি ব্রাজিলের জন্য বিশেষভাবে তীব্র। কারণ দেশটি গভীর সমুদ্রতলের তেল অনুসন্ধানে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। ঈঙচ৩০-এর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে, ব্রাজিলের পরিবেশ সংস্থা আমাজন নদীর মোহনায় একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল পরিবেশগত অঞ্চলে খননকাজের অনুমতি দিয়েছে পেট্রোব্রাসকে। কোম্পানিটি এবং সরকারের কিছু অংশ মনে করে জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য এ অনুসন্ধান প্রয়োজনীয়। তবে পরিবেশবাদীদের মতে, এই সিদ্ধান্ত ব্রাজিলের জলবায়ু নেতৃত্বকে দুর্বল করে দিতে পারে। তাই তারা যেভাবে আয় বণ্টনের রূপরেখা পরিষ্কার করে উপযুক্ত প্রশাসনিক কাঠামো গড়তে চেষ্টা করেছে তা সফলতার দিকে ধাবিত হচ্ছে সহজে। তারা তাদের পরিবেশগত রূপান্তর পরিকল্পনার সঙ্গে একীভূত করেছে অনেকগুলো বিষয়। ফলে টেকসই জ্বালানি, নবায়নযোগ্য শক্তি, সবুজ শিল্প এবং জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামোর মতো কর্মসংস্থানসৃষ্টিকারী খাতেও তাদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। এর মধ্য দিয়ে অর্থনীতিকে সক্রিয় ও কার্যকরভাবে প্রবাহিত করা যেতে পারে।

 

 

ব্রাজিলের সফলতা হচ্ছে- তারা জীবাশ্ম জ্বালানির অবসানকে জলবায়ু আলোচনার কেন্দ্রে স্থান দিতে চেষ্টা করেছে। তাদের এই প্রচেষ্টা স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে, বহুপাক্ষিকতা এখনও কার্যকর। বিভিন্ন দেশ চাইলে রাজনৈতিক পরিসরে সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়ও সম্মিলিতভাবে মোকাবিলা করতে পারে। তবে সবুজ রূপান্তরের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে জীবাশ্ম জ্বালানি আয়ের প্রশ্নটিকে সরাসরি মোকাবিলা করার ওপর। অন্যথায় জলবায়ু উদ্যোগকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য করা অসম্ভব। ঈঙচ৩০-এ এই প্রশ্নটি সামনে এনে এবং রূপান্তরকে কেবল পরিবেশগত বাধ্যবাধকতা হিসেবে নয়, এক সামাজিক-অর্থনৈতিক সুযোগ হিসেবে উপস্থাপন করে ব্রাজিল একটি সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছে। জীবাশ্ম জ্বালানির ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্রাজিল যে বাজি ধরেছে তা কতটুকু সফলতার মুখ দেখে সেটা সময় বলে দেবে। কারণ সবাই মনে করেন, ঈঙচ৩০-এ উত্থাপিত উচ্চাকাক্সক্ষা তখনই বাস্তব রূপ পাবে, যখন রূপান্তরের তহবিল স্বচ্ছভাবে পরিচালিত হবে, নাগরিক সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে এবং টেকসই খাতে বিনিয়োগের সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে পৌঁছাবে।

 

 

ড. মো. আদনান আরিফ সালিম : গবেষক ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর, সহযোগী অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়