জাতিসংঘের সংকট ও বিশ্বশক্তির রাজনীতি
ড. আজিজুল আম্বিয়া [সূত্র : দৈনিক বাংলা, ৩১ অক্টোবর ২০২৫]

António Guterres ২০২৬ সালের শেষ দিন (৩১ ডিসেম্বর ২০২৬) তার দ্বিতীয় পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ করবেন।
জেনারেল অ্যাসেম্বলি ও নিরাপত্তা পরিষদে নতুন রুল-বিধি গৃহীত হয়েছে মহাসচিব নির্বাচন প্রক্রিয়ায় — উদাহরণস্বরূপ, প্রার্থীদের অবশ্যই তাদের ফান্ডিং উৎস প্রকাশ করতে হবে, নির্বাচনী সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে, এবং “নারীর সম্ভাব্যতা” উদ্দিষ্ট করা হয়েছে।
ইতোমধ্যে কয়েকজন প্রার্থী নাম ঘোষণা করেছে:
- Michelle Bachelet (চিলি) – দেশটি ঘোষণা করেছে তাকে মহাসচিবের জন্য মনোনয়ন দেবে।
- Rebeca Grynspan (কোস্টা রিকা) – দেশ ঘোষণা করেছে তাকে মনোনীত করার জন্য।
- Rafael Mariano Grossi (আর্জেন্টিনা) – তিনি নিজে ঘোষণা করেছেন এই পদের জন্য প্রার্থী হিসেবে।
Latin America অঞ্চলের দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে যে এবার এই জায়গাটি তাদের পালা, কারণ গত কয়েকবার হয় অন্যান্য অঞ্চলের নাগরিকই হয়েছে মহাসচিব।
যুক্তরাষ্ট্র জানিয়ে দিয়েছে তারা ‘বিশ্বব্যাপী’ প্রার্থীর খোঁজে, শুধুই নির্দিষ্ট অঞ্চলের নয় — তবে এই বক্তব্যকে ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলো ‘আমাদের পালা’ দাবি হিসেবে দেখছে। সংক্ষেপে বিশ্লেষণ করার চেস্টা করছি,
- নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়ানোর প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে — আগের তুলনায় বেশ কিছু নতুন রুল বাতলে দেওয়া হয়েছে।
- নারী নেতার সম্ভাবনার দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে কারণ এই পদে এখনো কোনো নারী অধিষ্ঠিত হননি।
- যেহেতু ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলো মনোনয়ন ঘোষণা করছে, ভবিষ্যতে এই অঞ্চল থেকে মহাসচিব হওয়া সম্ভাবনা বেড়ে গেছে।
- বড় শক্তিধর দেশ ও নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের (ভেটোধারী দেশগুলো) অনুমোদন না পেলেই পদ কখনও নিশ্চিত হবেনা — তাই প্রার্থীর জন্য বিশ্বরাজনীতি এবং শক্তিধর
দেশগুলোর বিন্যাস বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ
- বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বড় সুযোগ রয়েছে এই পরিবর্তন প্রক্রিয়ায় নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও কণ্ঠস্বর বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার। যদি নতুন মহাসচিব নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ‘উন্নয়নশীল দেশ’ এবং ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর সঙ্গে সংহতি বাড়ে, তাহলে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সুযোগ বাড়তে পারে।
- বাংলাদেশ যেহেতু বিশ্ব শান্তি, উন্নয়ন ও মানবাধিকার ইস্যুতে সক্রিয় ভূমিকা রাখে, তাই নির্বাচিত মহাসচিবের মনোনীত নীতির সঙ্গে অভিযোজিত হয়ে নিজস্ব নেতৃত্ব বাড়াতে পারে।
- তবে বিশ্ব রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন সাধারণত সময় সাপেক্ষ — তাই সংস্থাভিত্তিক কাঠামো, শক্তি বাণিজ্য ও রাজনৈতিক ভারসাম্য সবকিছুর প্রভাব থাকবে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের পর মানবসভ্যতা যখন টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছিল, তখনই ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় জাতিসংঘ— মানবতার শান্তি ও ন্যায়ের পতাকা হাতে। উদ্দেশ্য ছিল, ভবিষ্যতে যেন আর কোনো বিশ্বযুদ্ধ না ঘটে, যেন আলোচনা ও সহযোগিতার মাধ্যমে রাষ্ট্রগুলো পার্থক্য মিটিয়ে নিতে পারে। কিন্তু আট দশক পার হয়ে আজ বিশ্ববাসীর মুখে একটাই প্রশ্ন— জাতিসংঘ আসলেই কি সেই নিরপেক্ষ ন্যায়বিচারের মঞ্চ, নাকি এটি পরিণত হয়েছে বিশ্বশক্তির স্বার্থরক্ষার একটি কূটনৈতিক পর্দায়?
🔹 নিরাপত্তা পরিষদ: ভেটোর ফাঁদে ন্যায়বিচার
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ (UNSC) হলো সংস্থাটির সবচেয়ে ক্ষমতাধর অঙ্গ। এখানে পাঁচ স্থায়ী সদস্য— যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, চীন ও ফ্রান্স— এককভাবে প্রস্তাব ভেটো করতে পারে। এই এক ‘ভেটো’ শব্দটাই আজ জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় সংকটের প্রতীক।
কোনো যুদ্ধবিরতি, মানবাধিকার তদন্ত, কিংবা অস্ত্রবিরোধী প্রস্তাব— এসব কিছুই প্রায়ই আটকে যায় এই পাঁচ দেশের রাজনৈতিক স্বার্থে।
সিরিয়া যুদ্ধ, ইউক্রেন সংঘাত কিংবা গাজা উপত্যকার গণহত্যা— প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব শক্তিধরদের ভেটোতে থমকে গেছে। রাশিয়া যেমন ইউক্রেন প্রসঙ্গে নিজের অবস্থান রক্ষায় ভেটো দিয়েছে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েল ইস্যুতে বহুবার ভেটো ব্যবহার করেছে।
ফলাফল— নিরীহ মানুষের মৃত্যু, ধ্বংস আর নির্বিকার জাতিসংঘ।
🔹 সাধারণ পরিষদের সীমাবদ্ধতা
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের সমান ভোটাধিকার থাকলেও, এখানকার সিদ্ধান্তগুলো বাধ্যতামূলক নয়। তাই বাস্তব প্রভাব খুব সীমিত।
উদাহরণস্বরূপ, গাজা যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব সাধারণ পরিষদে পাস হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি, কারণ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়া কোনো পদক্ষেপ নেওয়া যায় না।
এভাবে ছোট দেশগুলোর কণ্ঠস্বর প্রায়ই হারিয়ে যায় বড় শক্তির স্বার্থের কাছে।
জাতিসংঘের মূল মঞ্চে ‘সবার সমান অধিকার’ থাকলেও বাস্তবে ক্ষমতা নিয়ন্ত্রিত থাকে কিছু রাষ্ট্রের হাতে।
🔹 মহাসচিব নির্বাচন: নেপথ্যের কূটনীতি
জাতিসংঘের মহাসচিবকে বলা হয় ‘বিশ্বের নৈতিক নেতা’। কিন্তু এই পদটিও রাজনীতির জটিল হিসাবের বাইরে নয়। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের অনুমোদন ছাড়া কেউ মহাসচিব হতে পারেন না।
অতএব, প্রার্থীকে হতে হয় কূটনৈতিকভাবে ‘নিরাপদ’— এমনভাবে কথা বলতে হয় যেন কোনো বড় শক্তি ক্ষুব্ধ না হয়।
আগামী মহাসচিব নির্বাচনের আলোচনাতেই এটি স্পষ্ট। চিলির মিশেল ব্যাচেলেট, আর্জেন্টিনার রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসি, বুলগেরিয়ার ইরিনা বোকোভা, এবং লাইবেরিয়ার এলেন জনসন স্যারলিফ— এদের প্রত্যেকেই আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য, কিন্তু কাউকেই ‘অতি নিরপেক্ষ’ বলা যায় না।
কারণ, একেকজনের পেছনে একেকটি ব্লকের সমর্থন রয়েছে। ফলে যিনি নির্বাচিত হবেন, তাকেও সেই ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে— মানবতার জন্য নয়, বরং রাজনীতির ভারসাম্যের জন্য।
🔹 উন্নয়ন ও অনুদানের রাজনীতি
জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা যেমন UNDP, WHO, UNESCO, UNICEF— এসবই মানবিক উন্নয়নের প্রতীক। কিন্তু বাস্তবে এসব তহবিলের বড় অংশ আসে ধনী দেশগুলোর অনুদান থেকে। ফলে অনুদানদাতা দেশের রাজনৈতিক অগ্রাধিকারই অনেক সময় নির্ধারণ করে কোন অঞ্চলে প্রকল্প হবে, কোথায় হবে না।
আফ্রিকার দারিদ্র্য, ইয়েমেনের দুর্ভিক্ষ, কিংবা রোহিঙ্গা সংকট— অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সাহায্যের প্রতিশ্রুতি থাকলেও কার্যকর সহায়তা আসে না।
এভাবেই মানবিকতার চেয়ে রাজনীতি বড় হয়ে দাঁড়ায়, এবং জাতিসংঘের নৈতিক অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
🔹 যুদ্ধ বন্ধে জাতিসংঘের ভূমিকা: আশার চেয়ে হতাশা বেশি
বর্তমানে ইউক্রেন ও গাজা— এই দুই যুদ্ধই জাতিসংঘের সক্ষমতার কঠিন পরীক্ষা।
ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর একাধিক প্রস্তাব আনা হলেও রাশিয়ার ভেটো ব্যবহারে সব থেমে যায়। অপরদিকে গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের বোমা হামলায় হাজারো বেসামরিক নিহত হলেও নিরাপত্তা পরিষদ কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি।
সাধারণ পরিষদের বিবৃতিতে যুদ্ধবিরতির আহ্বান এসেছে, কিন্তু তা বাস্তবে প্রভাব ফেলেনি।
বিশ্ববাসী তাই এখন প্রশ্ন করছে— জাতিসংঘ কি কেবল বিবৃতি দেয়ার সংস্থা?
যদি যুদ্ধ থামাতে না পারে, যদি মানবতা রক্ষা করতে না পারে, তবে এই সংস্থার প্রয়োজনীয়তা কোথায়?
এক জরিপে দেখা গেছে, ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার মাত্র ৪৫ শতাংশ মানুষ জাতিসংঘের প্রতি ‘পূর্ণ আস্থা’ রাখে। আফ্রিকায় এই হার কিছুটা বেশি, প্রায় ৬০ শতাংশ। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় আস্থার হার নেমে এসেছে ৩০ শতাংশে। অর্থাৎ, জাতিসংঘের নৈতিক অবস্থান ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে।
🔹 বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে জাতিসংঘ
বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য হয় ১৯৭৪ সালে। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই শান্তি, উন্নয়ন ও মানবতার পক্ষে জাতিসংঘে সক্রিয় ভূমিকা রেখে আসছে।
বাংলাদেশ জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে অন্যতম শীর্ষ অবদানকারী দেশ। বর্তমানে প্রায় ৭,০০০ বাংলাদেশি সেনা ও পুলিশ সদস্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শান্তিরক্ষায় নিয়োজিত।
এটি শুধু বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বাড়ায়নি, বরং জাতিসংঘে দেশের কণ্ঠস্বরকে জোরালো করেছে।
তবে বাংলাদেশের জন্য জাতিসংঘের ভূমিকা অনেক সময় হতাশাজনকও হয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকটে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিষ্ক্রিয়তা, জলবায়ু অর্থায়নের বিলম্ব, কিংবা গাজা যুদ্ধের নীরবতা— এসবই জাতিসংঘের সীমাবদ্ধতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়।
বাংলাদেশ চায়, জাতিসংঘ যেন উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রকৃত কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে, শুধুমাত্র বড় শক্তির মঞ্চ না থাকে।
🔹 সংস্কারের দাবি ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ
বিশ্ব এখন বহুমেরুকেন্দ্রিক— শুধু পশ্চিমা দুনিয়া নয়, চীন, ভারত, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা প্রভৃতি দেশও বৈশ্বিক প্রভাবশালী শক্তি।
তাই জাতিসংঘের কাঠামোতে পরিবর্তন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে। আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে বলছে— নিরাপত্তা পরিষদে নতুন স্থায়ী সদস্য যুক্ত করতে হবে, ভেটো ক্ষমতা সীমিত করতে হবে, এবং সংস্থার নেতৃত্বে বৈচিত্র্য আনতে হবে।
এই সংস্কার ছাড়া জাতিসংঘ আর বিশ্ববাসীর আস্থা ফেরাতে পারবে না।
🔹 জাতিসংঘের সামনে পথচলা
জাতিসংঘের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তিনটি বিষয়ের ওপর—
- মানবিক সংকটে দ্রুত পদক্ষেপ,
- বড় শক্তির প্রভাবমুক্ত নিরপেক্ষ নেতৃত্ব,
- সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ন্যায়ভিত্তিক সহযোগিতা।
যদি এই তিনটি ক্ষেত্রে জাতিসংঘ কার্যকর হতে না পারে, তাহলে সংস্থাটির অস্তিত্ব শুধু নামমাত্র হয়ে যাবে। বিশ্বকে তখন নতুন কোনো সমন্বিত কাঠামোর প্রয়োজন পড়বে, যেমনটা জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার আগের যুগে দেখা গিয়েছিল।
জাতিসংঘের রাজনীতি আজ ন্যায়বিচার ও বাস্তবতার সংঘাতে দাঁড়িয়ে। একদিকে বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, শরণার্থী সংকট, জলবায়ু বিপর্যয়; অন্যদিকে ভেটো আর কূটনীতির দেয়াল।
তবুও জাতিসংঘ ছাড়া মানবজাতির বিকল্প কোনো বৈশ্বিক কাঠামো এখনো নেই।
বিশ্ববাসী তাই আশা ছাড়তে চায় না— একদিন হয়তো জাতিসংঘ সত্যিই তার মূল প্রতিশ্রুতির জায়গায় ফিরে যাবে।
যুদ্ধ নয়, আলোচনাই সমাধান— এই মূলমন্ত্র যদি আবার সক্রিয়ভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে জাতিসংঘ আবার হতে পারে ন্যায় ও মানবতার প্রকৃত আশ্রয়স্থল।
আর যদি তা না হয়, তবে শান্তির প্রতীক এই সংস্থাই একদিন হয়ে উঠবে শক্তির প্রতীক— ইতিহাস তখন সেটাকেই কঠিনভাবে বিচার করবে।
লেখক: ড. আজিজুল আম্বিয়া, কলাম লেখক ও গবেষক।