কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

জাতিসংঘের সাদা ঘুঘুতে কালো ছায়ার ক্ষতচিহ্ন

[সূত্র : দেশ রূপান্তর, ১১ নভেম্বর ২০২৫]

জাতিসংঘের সাদা ঘুঘুতে কালো ছায়ার ক্ষতচিহ্ন

১৯৪৫ সালের এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে বিশ্ব যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে, ঠিক তখনই জন্ম নিয়েছিল এক মহৎ স্বপ্ন। যে স্বপ্ন দেখেছিল হানাহানি, সংঘাত ও ধ্বংসের বদলে এক শান্তিময়, ন্যায়ভিত্তিক পৃথিবীর। সেই স্বপ্নটিই মূর্ত হয়েছিল, ‘জাতিসংঘ’ নামক আন্তর্জাতিক সংস্থায়। বিশ্বশান্তি রক্ষার প্রতীক হিসেবে, একটি সাদা ঘুঘু উড়তে দেখা গিয়েছিল এর জন্মলগ্নে। কিন্তু  প্রায় আট দশক পর বিশ্ব যখন ইউক্রেন, গাজা, সুদান কিংবা ইয়েমেনের মতো একাধিক ভয়াবহ সংঘাতে জর্জরিত, তখন প্রশ্ন জাগে জাতিসংঘ কি আজও সেই শান্তির ‘সাদা ঘুঘু’ হয়েই আছে, নাকি কেবল গুটিকয়েক পরাশক্তির স্বার্থ ও ক্ষমতার ‘কালো ছায়া’য় ঢাকা। জাতিসংঘের মূল লক্ষ্য ছিল, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা করা। কিন্তু সেই লক্ষ্য এবং বাস্তবতায় বিস্তর ফারাক। এ ব্যবধান তৈরির প্রধান কারণ নিহিত রয়েছে সংস্থার সাংগঠনিক কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দু নিরাপত্তা পরিষদে।

 

 


নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচটি স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, রাশিয়া এবং ফ্রান্স, তাদের ভেটো ক্ষমতার মাধ্যমে বিশ্বের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তকে থামিয়ে দেওয়ার নিরঙ্কুশ ক্ষমতা রাখে। এ ক্ষমতা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ী শক্তিগুলোর জন্য একটি ‘সুরক্ষার ঢাল’, যা আজ বিশ^শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে প্রধান অন্তরায়।  সাম্প্রতিক ইতিহাসে ভেটোর অপব্যবহার জাতিসংঘের কার্যকারিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। যখন ইউক্রেনে রাশিয়া আগ্রাসন চালায়, তখন নিরাপত্তা পরিষদে এর বিরুদ্ধে আনা যেকোনো প্রস্তাব রাশিয়া তার ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করে আটকে দেয়। একইভাবে, যখন গাজায় ইসরায়েলি হামলায় হাজার হাজার নিরপরাধ নারী-শিশু নিহত হচ্ছে, তখন আগ্রাসন বন্ধের প্রস্তাবগুলোতে ধারাবাহিক ভেটো দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।  ফলস্বরূপ, বিশ্বের বৃহৎ শক্তিগুলো আন্তর্জাতিক আইন বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য কার্যত দায়মুক্তি পাচ্ছে। অন্যদিকে দুর্বল বা উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর যেকোনো ছোটখাটো সমস্যার জন্য জাতিসংঘ দ্রুত হস্তক্ষেপ করে। এ দ্বৈত নীতি স্পষ্ট করে যে, জাতিসংঘ মূলত ন্যায় ও সমতার ভিত্তিতে নয়, বরং বিশ্বশক্তির ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের একটি মঞ্চে পরিণত হয়েছে। এই ভেটো ক্ষমতাই হলো সেই ‘কালো ছায়া’, যা শান্তির সাদা ঘুঘুর ডানাগুলোকে অবশ করেছে। ভেটো রাজনীতি ও রাজনৈতিক স্বার্থের সংঘাত জাতিসংঘের নিষ্ক্রিয়তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

 


ইউক্রেন যুদ্ধ : ২০২২ সাল থেকে রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসনের পর নিরাপত্তা পরিষদে একাধিক প্রস্তাব আনা হলেও রাশিয়ার ভেটো বাধায় কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়নি। জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে ১৪০টিরও বেশি দেশ রাশিয়ার আগ্রাসনের নিন্দা জানালেও নিরাপত্তা পরিষদের অচলাবস্থায় যুদ্ধ থামানোর বাস্তব উদ্যোগ নেওয়া যায়নি।

 

 


গাজা সংঘর্ষ : ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েল-হামাস সংঘাতে নিহত হয়েছে ৬৭,১৭৩ জন, যার মধ্যে প্রায় ২০,১৭৯ জন শিশু। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ বারবার মানবিক যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানালেও, নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো ব্যবস্থার কারণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়নি।

 

 

জলবায়ু পরিবর্তন : জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনগুলোতে উন্নত দেশগুলো নিঃসরণ হ্রাস ও ক্ষতিপূরণ তহবিলের প্রতিশ্রুতি দিলেও শিল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক স্বার্থ ও তেল লবির প্রভাবে কার্যকর চুক্তি বাস্তবায়ন এখনো অধরাই থেকে গেছে। এসব উদাহরণ দেখায়, কখনো জাতিসংঘের সাদা ঘুঘু উড়েছে, কিন্তু তার ছায়ার নিচে ক্রমেই ঘন হয়ে উঠছে কালো দাগ।

 

 

সাদা ঘুঘুর সামান্য অস্তিত্ব : তবে কেবল ব্যর্থতার কাঁটা দিয়েই জাতিসংঘের সামগ্রিক চিত্র আঁকা যায় না। এর কিছু অঙ্গসংস্থা আজও বিশ্ব জুড়ে শান্তির ‘সাদা ঘুঘু’র ভূমিকা পালন করছে। প্রথমত, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন। বিশ্বের সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে (যেমন কঙ্গো, সাউথ সুদান, লেবানন ইত্যাদি) বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো তাদের সামরিক ও বেসামরিক কর্মীদের পাঠিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এসব মিশনে কর্মরত হাজার হাজার শান্তিরক্ষী নিজেদের জীবন বিপন্ন করে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় অবদান রাখছেন।

 

দ্বিতীয়ত, মানবিক উন্নয়ন কার্যক্রম। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা যেমন : UNICEF  (ইউনিসেফ) : বিশ্ব জুড়ে শিশুদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। WHO (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা) : মহামারী মোকাবিলা এবং জনস্বাস্থ্যের উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। UNESCO  (ইউনেস্কো) : শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি প্রসারে সহায়তা করছে। ​UNDP (জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি) : বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়নে সাহায্য করছে। এই সংস্থাগুলো ভেটো-রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের মৌলিক অধিকার ও জীবনমানের উন্নয়নে যে বিশাল অবদান রাখছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য বিমোচন ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাতিসংঘই একমাত্র সর্বজনীন প্ল্যাটফর্ম। এসব ক্ষেত্রেই জাতিসংঘের ‘সাদা ঘুঘু’ রূপটি আজও উজ্জ্বল।

 

 


 বর্তমানে ইউক্রেন বা গাজার মতো চরম পরিস্থিতিতে যখন বিশ্ব মানবতা ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে, তখন শান্তিরক্ষা ও উন্নয়নমূলক কাজের সাফল্যগুলো  ম্লান হয়ে যায়। যখন দেখা যায়, একটি দেশ আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (ICJ) রায় বা সাধারণ পরিষদের বিপুল সমর্থিত প্রস্তাব উপেক্ষা করেও নির্বিচারে আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে, তখন জাতিসংঘ শুধু একটি বিবৃতি-সংস্থায় পরিণত হয়। এই পরিস্থিতি বিশ্বকে বাধ্য করছে, জাতিসংঘের কাঠামোগত সংস্কার নিয়ে ভাবতে। জাতিসংঘকে যদি কার্যকর হতে হয়, তবে ক্ষমতার দাসত্ব থেকে মুক্ত করে কাঠামোগত সংস্কার আনতে হবে। তা না হলে, জাতিসংঘ শুধু এক ব্যর্থ স্বপ্নের স্মারক হিসেবে টিকে থাকবে।

লেখক : প্রভাষক, অর্থনীতি বিভাগ, জয়পুরা এসআরএমএস স্কুল অ্যান্ড কলেজ রামগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর