জাতিসংঘে প্রধান উপদেষ্টার ভাষণ : নতুন বাংলাদেশ গড়ার রূপরেখা
শাহেদ শফিক [প্রকাশিত : জনকণ্ঠ, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫]

অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনে যে ভাষণ দিয়েছেন, তা কেবল প্রোটোকল মেনে দেওয়া কোনো বক্তব্য নয়; বরং এক নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা। এতে তিনি সংকট-উত্তর রাষ্ট্রের পুনর্গঠন, বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে নতুন প্রাণসঞ্চার এবং নাগরিক অংশগ্রহণের অপরিহার্যতা তুলে ধরেছেন। ভাষণে উঠে এসেছে সংস্কার, মানবাধিকার, অর্থনীতি, জলবায়ু, আঞ্চলিক সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকট, গাজা ইস্যু থেকে নারীর ক্ষমতায়ন- সব মিলিয়ে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রদর্শন বা নতুন বাংলাদেশ গড়ার রূপরেখা।
ভাষণের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বোঝা জরুরি। গত বছর ইউনূস এই মঞ্চে দাঁড়িয়েছিলেন সদ্য গণ-অভ্যুত্থান-উত্তর এক দেশের আশা-আকাক্সক্ষার কথা বলতে। এবার তিনি বললেন সেই রূপান্তরের পথে কতটা এগোনো গেছে। প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়ন- এটাই বক্তৃতার মূল সুর। নির্বাহী আদেশের সহজ পথ এড়িয়ে তিনি বেছে নিয়েছেন কঠিন পথ। ১১টি স্বাধীন সংস্কার কমিশন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এবং অবশেষে ‘জুলাই ঘোষণা’ই এর প্রমাণ। এর ফলে এটা এখন স্পষ্ট যে, গণতন্ত্র কেবল একটি ভোটের তারিখ নয়; প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে ক্ষমতার ভারসাম্য, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাচন সংস্কার ও দুর্নীতি দমনের কাজও জরুরি। এটি উচ্চাভিলাষী পথ, তবে ঝুঁকিপূর্ণও। কারণ কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের শক্তি নির্ভর করবে প্রশাসনিক সক্ষমতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর।
মানবাধিকার প্রসঙ্গে বক্তৃতা ছিল আত্মসমালোচনামূলক ও সাহসী। গুমবিরোধী কনভেনশন, নির্যাতনবিরোধী প্রোটোকল, জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনারের তিন বছরের মিশন- এসব উদ্যোগে রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক নজরদারিকে স্বাগত জানিয়েছে। অনেক দেশ সার্বভৌমত্বের অজুহাতে এমন তদারকি এড়িয়ে যায়, কিন্তু বাংলাদেশ তা গ্রহণ করেছে। এতে আস্থা বাড়লেও মূল চ্যালেঞ্জ হলো- স্বাধীন বিচারপ্রক্রিয়া, সাক্ষী সুরক্ষা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
অর্থনীতি অংশে ড. ইউনূস দিয়েছেন কঠিন বার্তা। রাজস্ব আহরণে সংস্কার, বাজারভিত্তিক মুদ্রা বিনিময়, ব্যাংক খাতে অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ, ব্যাংক রেজোলিউশন ও ডিপোজিট প্রোটেকশন আইন- এসব উদ্যোগ আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর প্রতিশ্রুতি। সরকারি ক্রয়ে ডিজিটাল টেন্ডার বাধ্যতামূলক এবং স্বার্থের সংঘাত প্রকাশযোগ্য করা জবাবদিহির নতুন মাত্রা। তবে অর্থনীতির সামনে দুই টানাপোড়েন- দ্রুত স্থিতিশীলতা আনা ও সামাজিক ব্যয় সুরক্ষা। বক্তৃতায় স্থিতিশীলতার সংকেত জোরালো হলেও সামাজিক সুরক্ষার বিষয়ও এসেছে শ্রম অধিকার ও নারীর অবৈতনিক কাজের স্বীকৃতিতে। অবৈধ অর্থপাচার রোধে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস সরাসরি বলেছেন, যেসব দেশ বা প্রতিষ্ঠান পাচারকৃত সম্পদ গচ্ছিত রাখে তারা যেন ‘অপরাধে শরিক’ না হয়। উন্নয়নশীল দেশ থেকে সম্পদ পাচার রোধে কঠোর বৈশ্বিক নীতি প্রণয়নের আহ্বান দিয়েছেন তিনি। এটি সাহসী উচ্চারণ। যদিও বাস্তবে তা নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও উন্নত বিশ্বের সদিচ্ছার ওপর।
প্রবাসী আয়ের প্রসঙ্গ এসেছে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে। রেমিট্যান্স সংকট-উত্তর অর্থনীতির অক্সিজেন। তবে ইউনূস কেবল কৃতজ্ঞতায় থামেননি; বলেছেন, উন্নত দেশগুলোতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে শ্রমের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। আর বাংলাদেশের তরুণরা সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারে। এজন্য নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসন দরকার। শ্রম আইন সংস্কার, ট্রেড ইউনিয়ন সহজীকরণ, মাতৃত্বকালীন ছুটি বৃদ্ধি, অনলাইন নিবন্ধন-এসব অভ্যন্তরীণ সংস্কার দেশের ভাবমূর্তিকে উন্নত করবে। তবে নিয়োগ ব্যয় কমানো ও দালালচক্র দমনে বাস্তব পদক্ষেপ জরুরি।
তরুণদের প্রসঙ্গে এই রাষ্ট্রপ্রধানের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল আলাদা। প্রযুক্তির যুগে শুধু টেকনোলজি নয়, দরকার সামাজিক উদ্ভাবন। ক্ষুদ্রঋণ যেভাবে দরিদ্র নারীদের উদ্যোক্তা করেছে, সামাজিক ব্যবসা মডেল সেভাবে বাজার ও কল্যাণকে একসঙ্গে যুক্ত করছে। তরুণদের চাকরি খোঁজার মানসিকতা থেকে চাকরি সৃষ্টির মানসিকতায় রূপান্তরিত করার এটাই পথ। তবে ক্ষুদ্রঋণের সুদহার, ঋণচক্র, সামাজিক ব্যবসার গভর্ন্যান্স-এসব নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তাই স্কেল-আপ করতে হলে শক্ত নিয়মকানুন ও ভোক্তা সুরক্ষা দরকার। বক্তৃতায় রাষ্ট্র-জাতিসংঘ-তরুণ সংলাপের প্ল্যাটফর্ম তৈরির ঘোষণা এ প্রক্রিয়াকে সহায়তা করতে পারে।
জলবায়ু প্রসঙ্গে ইউনূসের ভাষণ ছিল দৃঢ়। বলেছেন, ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি লক্ষ্য হাতছাড়া, ১০০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি। বরাদ্দের অঙ্ক বাড়ানো হলেও বাস্তবে নয়। তিনি আরও জানিয়েছেন, বাংলাদেশ স্থানীয় নেতৃত্বাধীন অভিযোজন নীতি নিয়েছে- ম্যানগ্রোভ রক্ষা, জলাভূমি পুনরুদ্ধারকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। বৈশ্বিক তহবিল সহজলভ্য ও স্বচ্ছ না হলে এ প্রচেষ্টা ঝুঁকিতে পড়বে।
বাণিজ্যে সংরক্ষণবাদ নিয়ে তিনি সতর্ক করেছেন। বিশ্বায়ন শত কোটি মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করেছে ঠিক, কিন্তু উল্টো পথে হাঁটলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বঞ্চিত হবে। সমাধান হলো উন্মুক্ত, ন্যায়সঙ্গত বাণিজ্য বজায় রাখা এবং বাণিজ্যের ভেতরে সামাজিক ব্যবসার প্রসার ঘটানো। এটি একটি নতুন চিন্তা- যেখানে লাভ-ক্ষতির খেলায়ও জনকল্যাণকে যুক্ত করা যায়।
রোহিঙ্গা সংকটে তার বক্তব্য ছিল স্পষ্ট। আট বছরেও সমাধান নেই, বরং সংকট বাড়ছে। মিয়ানমারের বৈষম্যমূলক নীতি অব্যাহত থাকায় রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও সমঅধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। তহবিল ঘাটতির কারণে ক্যাম্পে ন্যূনতম জীবনধারা ভেঙে পড়ছে। রেশন কমে গেলে নিরাপত্তা ঝুঁকি বহুগুণ বাড়বে। তিনি দাতাদের বাড়তি সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক রোডম্যাপের আহ্বান জানিয়েছেন।
গাজা প্রসঙ্গে তিনি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেছেন, এটি নির্বিচার গণহত্যা। সমাধান একটাই- দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান, ১৯৬৭ সালের সীমারেখা ও পূর্ব জেরুজালেম রাজধানী। ছোট দেশের কূটনৈতিক ঝুঁকি থাকলেও নৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করার মাধ্যমে বাংলাদেশ সফট পাওয়ার বাড়াতে পারে।
নারীর ক্ষমতায়নে ইউনূস বলেছেন, অবৈতনিক গৃহস্থালি কাজের ৮৫ শতাংশ নারী করে, যার অর্থমূল্য জিডিপির ১৬ শতাংশ। এটি স্বীকার করাই একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তিনি চারটি প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করেছেন- যৌন হয়রানি প্রতিরোধ আইন, অবৈতনিক কাজের স্বীকৃতি, নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, জেন্ডার-সেন্সিটিভ বাজেটিং। এগুলো বাস্তবায়ন হলে জেন্ডার সমতা আরও সুদৃঢ় হবে।
আঞ্চলিক সহযোগিতায় তিনি বিআইএমএসটিইসি (বঙ্গোপসাগর উদ্যোগের জন্য বহুখাতভিত্তিক প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা), বিবিআইএন (বাংলাদেশ-ভুটান-ভারত-নেপাল উদ্যোগ), এসএএসইসি (দক্ষিণ এশীয় উপ-আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা) এএসইএএন দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর সংস্থার কথা বলেছেন এবং সার্ক পুনরুজ্জীবনের আহ্বান জানিয়েছেন। সীমান্ত পেরানো নদী নিয়ে জাতিসংঘের পানি কনভেনশনে যোগ দেওয়াও সাহসী পদক্ষেপ। বহুপাক্ষিকতা বৈশ্বিক স্তরে দুর্বল হলে আঞ্চলিক স্তরে সহযোগিতার নতুন দ্বীপ তৈরি অপরিহার্য।
জাতিসংঘ সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি ভারসাম্যপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন। মহাসচিবের উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও বলেছেন, উন্নয়নশীল দেশের কণ্ঠস্বর যেন উপেক্ষিত না হয়। সংস্কারের লক্ষ্য হওয়া উচিত মাঠপর্যায়ে বাস্তব পরিবর্তন আনা, কেবল ক্ষমতার পুনর্বণ্টন নয়। সবশেষে তিনি উপস্থাপন করেছেন ‘তিন শূন্য’র ভিশন-শূন্য কার্বন, শূন্য সম্পদ-কেন্দ্রীভবন, শূন্য বেকারত্ব। আসলে এটি কোনো স্লোগান নয়; বরং অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই অর্থনীতির রূপরেখা।
ইউনূসের ভাষণের শক্তি হলো নীতিগত স্পষ্টতা ও নৈতিক উচ্চারণ। বহুপাক্ষিকতায় বিশ্বাস, মানবাধিকার ও জবাবদিহি, অর্থনৈতিক সংস্কার, তরুণ-নারী-শ্রমে বিনিয়োগ, জলবায়ুতে ন্যায়চেতনা, আঞ্চলিক সহযোগিতায় বাস্তববাদ এবং সংঘাত বিষয়ে নৈতিক অবস্থান-সব মিলিয়ে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রদর্শন। সীমাবদ্ধতাও আছে- প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, বাজেটের অগ্রাধিকার ও আইনি সংস্কারের টাইমলাইন এখনো অস্পষ্ট। কিন্তু জাতিসংঘের মঞ্চে একটি সংকট-উত্তর রাষ্ট্রের এ ধরনের উচ্চারণ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে আস্থার বার্তা দেবে। এই ভাষণ আশার বাণী শোনায়, তবে অন্ধ আশাবাদে নয়। ড. ইউনূস সতর্ক করেছেন চরম জাতীয়তাবাদ, বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা ও নির্মম ভূরাজনীতি থেকে। বলেছেন, বহুপাক্ষিক কূটনীতি আমাদের ‘শেষ ও সর্বোত্তম ভরসা।’ তাই এই ভাষণকে বলা যায় রাষ্ট্রীয় রূপান্তরের কম্পাস- যার উত্তরদিক হলো অন্তর্ভুক্তি, জবাবদিহি ও সাহস। এখন কাজ হলো, এই কথাগুলো আইনে, বাজেটে ও মানুষের জীবনে রূপান্তর করা। কারণ, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত বক্তৃতায় নয়, বাস্তবতায় লেখা হয়।
ড. ইউনূসের জাতিসংঘ ভাষণে প্রতিটি দিক রাজনৈতিক সংস্কার, মানবাধিকার, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, শ্রম ও অভিবাসন, তরুণদের উদ্যোক্তা মানসিকতা, জলবায়ু সংকট, আঞ্চলিক সহযোগিতা, রোহিঙ্গা ও গাজা প্রসঙ্গ, নারীর ক্ষমতায়ন-সবই অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। রয়েছে ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিও। শুধু প্রশংসা নয়, সীমাবদ্ধতার কথাও বলেছে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। সার্বিকভাবে বলা যায়, ভাষণটি গভীর ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন। যা প্রমাণ করে ড. ইউনূসের ভাষণ শুধু কূটনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার এক অনন্য দলিল। ভাষণে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ কেমন হবে, সেই রূপরেখা লুকিয়ে আছে।
লেখক : সাংবাদিক লন্ডন, যুক্তরাজ্য