জাতিসংঘ মঞ্চে সম্ভাবনার রূপরেখা
রাজু আলীম [প্রকাশ : দেশ রূপান্তর, ০১ অক্টোবর ২০২৫]

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ভাষণ ছিল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান ও ভবিষ্যতের পথরেখা তুলে ধরার এক সাহসী প্রয়াস। তার দীর্ঘ ও বিস্তৃত বক্তব্যে তিনি শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের কথাই বলেননি, বরং রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ইস্যুতেও বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। এই ভাষণটি শুধু একটি প্রথাগত বক্তৃতা ছিল না, বরং তা ছিল একটি নতুন বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর, যা দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থার পর বিশ্বমঞ্চে তার নতুন পরিচয় প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ভাষণের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল বাংলাদেশের অভ্যন্তরে চলমান ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রমের বিস্তারিত বর্ণনা। তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’-এর পর ক্ষমতা গ্রহণের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভেঙে পড়া রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে পুনর্গঠিত করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ভারসাম্যপূর্ণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এই লক্ষ্যে গঠিত ১১টি স্বাধীন সংস্কার কমিশনের কথা তিনি তুলে ধরেছেন যা শাসনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, নির্বাচন, দুর্নীতি দমন এবং মানবাধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে পরিবর্তনের সুপারিশ করেছে।
উদ্যোগগুলো জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন এবং আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে এই সংস্কারগুলো টেকসইভাবে বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি জাতীয় ঐকমত্য তৈরির প্রক্রিয়াও তিনি তুলে ধরেছেন। এর মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আশ^স্ত করতে চেয়েছেন যে, বাংলাদেশ একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে, তিনি মানবাধিকার সুরক্ষায় বাংলাদেশের অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন, বিশেষ করে গুম ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপগুলো উল্লেখ করে। তার বক্তব্যে নারী নেতৃত্ব এবং সমতার প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকারকে প্রতিফলিত করে। তিনি বলেন, গত বছর তিনি যখন জাতিসংঘে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন তিনি একটি সদ্য গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত দেশের রূপান্তরের আকাক্সক্ষা নিয়ে এসেছিলেন। আজ তিনি সেই রূপান্তরের অগ্রগতির কথা বলতে এসেছেন। বাংলাদেশের ইতিহাস বর্ণনা করে তিনি বলেছেন যে, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের দাবিতে এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে দেশটি জন্ম লাভ করেছিল। কিন্তু গত পাঁচ দশকে সেই অধিকার বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এ বছর উদযাপিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’-এর প্রথম বার্ষিকী প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই অভ্যুত্থান তরুণ সমাজের নেতৃত্বে হয়েছিল এবং এর মাধ্যমে বৈষম্যমুক্ত ও ন্যায়বিচারভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের নতুন যাত্রা শুরু হয়েছে। এ যাত্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য সহজ পথ ছিল নির্বাহী আদেশে সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করা। কিন্তু তারা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই পথ বেছে নিয়েছেন। ১১টি স্বাধীন সংস্কার কমিশন জনমত যাচাই ও গভীর পর্যালোচনা করে বিস্তারিত সুপারিশমালা দিয়েছে। এর ভিত্তিতে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশন রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে আলোচনা করে একটি টেকসই সামাজিক অঙ্গীকার তৈরি করেছে, যা ‘জুলাই ঘোষণা’ নামে পরিচিত। এর ফলে আগামী নির্বাচনে যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, এই সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে কোনো অনিশ্চয়তা থাকবে না। আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং সরকার স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও আইনের শাসন নিশ্চিত করতে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে।
মানবাধিকার সুরক্ষায় বাংলাদেশের পদক্ষেপগুলোর মধ্যে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, সরকার দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারকে দেশে আমন্ত্রণ জানায়। তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে দেওয়া সুপারিশমালা জাতীয় সংস্কার কার্যক্রমে যুক্ত করা হয়েছে। সরকার গুম সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক কনভেনশনে যোগ দিয়েছে এবং নির্যাতনবিরোধী কনভেনশনের ঐচ্ছিক প্রটোকলে স্বাক্ষর করেছে। এ ছাড়াও বাংলাদেশে তিন বছর মেয়াদে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের একটি মিশন পরিচালনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই পদক্ষেপগুলো নিবর্তনমূলক স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা হতে একটি মানবাধিকার সুরক্ষাকারী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সরকারের আন্তরিকতা প্রমাণ করে। তার ভাষণে ‘সামাজিক ব্যবসা’র ধারণাটি বিশেষভাবে উঠে এসেছে। তিনি বলেন, এটি এমন একটি ব্যবসা, যার সম্পূর্ণ মুনাফা সামাজিক কল্যাণেই পুনর্বিনিয়োগ করা হয়। তিনি বিশ্বাস করেন, এই ধারণাটি পরিবেশ, স্বাস্থ্য, বেকারত্ব ও দারিদ্র্যসহ যাবতীয় সমস্যার সমাধানে একটি সৃজনশীল পদ্ধতি হতে পারে।
তিনি উল্লেখ করেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গ্রামীণ আমেরিকা বছরে চার বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ নিম্ন-আয়ের নারী উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিতরণ করেছে এবং এর শতভাগই নিয়মিতভাবে পরিশোধ হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, সামাজিক ব্যবসা শুধু একটি ধারণা নয়, বরং একটি কার্যকর সমাধান। প্রধান উপদেষ্টা জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহতাকে একটি বৈশ্বিক সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন। তিনি ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড’ পুরোপুরি চালু করার এবং উচ্চ কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলোকে তাদের প্রতিশ্রুতি পালনের আহ্বান জানিয়েছেন। রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে তিনি এটিকে একটি মানবিক বিপর্যয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এ সমস্যার সমাধানে আরও চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, এটি বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক বিষয় নয়, বরং এটি একটি বৈশ্বিক দায়িত্ব। গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর সংঘটিত গণহত্যার তীব্র নিন্দা জানিয়ে তিনি দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে তিনি সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার এবং বিমসটেক, বিবিআইএন-এর মতো প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেন, বিশ্বে শান্তি টিকিয়ে রাখতে হলে পারস্পরিক নির্ভরশীল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। বর্তমানে ১২০টিরও বেশি সশস্ত্র সংঘাত চলছে এবং অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা ভেঙে গেলে এই সংঘাত আরও বাড়বে। তিনি মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত অঞ্চল প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। এ ছাড়াও তিনি জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবদানের কথা তুলে ধরেছেন এবং শান্তিরক্ষীদের নিরাপত্তা ও পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দের দাবি জানান।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ভাষণের সবচেয়ে অনুপ্রেরণামূলক অংশটি ছিল ‘তিন শূন্যের পৃথিবী’ গড়ার তার স্বপ্ন। তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এমন একটি বিশ্ব গড়ার দায়িত্ব নিতে হবে যেখানে থাকবে শূন্য কার্বন নিঃসরণ, শূন্য সম্পদ কেন্দ্রীভূতকরণ এবং শূন্য বেকারত্ব। এই ধারণাটি শুধু একটি ইউটোপিয়ান স্বপ্ন নয়, বরং এটি টেকসই উন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায়বিচারের একটি বাস্তবসম্মত রূপরেখা। এই লক্ষ্যের বাস্তবায়নে তিনি তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ৬০ শতাংশেরও বেশি মানুষের বয়স ৩৫ বছরের নিচে। এই তরুণ জনসংখ্যাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ উন্নত বিশ্বের শ্রম সমস্যার সমাধান করতে পারে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান যুগে প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন উন্নয়নশীল বিশ্বের তরুণদের জন্য ডিজিটাল বিভাজন তৈরি করছে। তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অন্যান্য প্রযুক্তির সুফল যেন সবার কাছে ন্যায্যভাবে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় একটি বঞ্চিত ও প্রান্তিক প্রজন্ম তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তিনি সামাজিক উদ্ভাবনের ওপর জোর দিয়েছেন। পরিশেষে, তিনি বলেন, আজকের পৃথিবীতে কোনো একটি দেশ সংকটে পড়লে অথবা বিশ্বের কোনো এক প্রান্তে সংকট দেখা দিলে, সমগ্র বিশ্বের নিরাপত্তাই ঝুঁকির মুখে পড়ে যায়। তাই সামনের দিনে যে চ্যালেঞ্জগুলো আসছে তা কোনো দেশের পক্ষে একা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। তার এই ভাষণটি শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, বরং পুরো বিশ্বের জন্য এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ভাষণটি শুধু তথ্য ও পরিসংখ্যানের সমষ্টি নয়, বরং এতে ছিল এক সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক দর্শন। তার ভাষণে বারবার উচ্চারিত হয়েছে অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ, জনগণের ক্ষমতায়ন এবং জবাবদিহিমূলক শাসনের কথা। তিনি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনকে একটি গণঅভ্যুত্থান হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যা জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের ফসল।
এর মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক মহলে এই বার্তা দিয়েছেন যে, বাংলাদেশের পরিবর্তন কোনো সামরিক বা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের ফল নয়, বরং তা জনগণের দীর্ঘদিনের সংগ্রামের চূড়ান্ত পরিণতি। ভাষণে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থানের পুনর্মূল্যায়ন। রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়ে তার বক্তব্য ছিল অত্যন্ত বাস্তববাদী এবং স্পষ্ট। তিনি এটিকে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সমস্যা হিসেবে দেখতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এর স্থায়ী সমাধানের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে, তিনি তহবিলের অভাবের কারণে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে মানবিক বিপর্যয় এড়ানোর জন্য জরুরি সহায়তা চেয়েছেন।
গাজায় চলমান সংঘাতের বিষয়ে তার জোরালো অবস্থান এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আহ্বান বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের নীতিগত অবস্থানেরই প্রতিফলন। ভাষণের শেষ অংশে তিনি একটি আশার বাণী শুনিয়েছেন। তিনি মানুষকে ভয় না দেখিয়ে আশার বাণী শোনানোর নীতিতে বিশ্বাসী। তার এই ভাষণ বাংলাদেশের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে, যেখানে দেশটি শুধু তার নিজস্ব সমস্যা সমাধানে সচেষ্ট নয়, বরং বৈশি^ক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়ও সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে প্রস্তুত।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক