কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

জাতিসংঘ আগামী শুক্রবার বিলুপ্ত হয়ে গেলে বিশ্বজুড়ে কী হতে পারে

জাতিসংঘের বর্তমান ভূমিকা এবং এর কার্যকারিতা নিয়ে অনেকে হতাশ। গাজায় ইসরায়েলি নৃশংসতা বন্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি বিশ্বসংস্থাটি। এ ছাড়া পশ্চিমা বিশ্বের এজেন্ডাকে বেশি অগ্রাধিকার দেয় এই সংস্থা। সুতরাং এই সংস্থার গুরুত্ব কতটুকু এবং এটি না থাকলেই বা কী হবে—এসব নিয়ে আল–জাজিরার অনলাইন সংস্কংরণে ৭ নভেম্বর লিখেছেন সাইমন স্পিকম্যান কর্ডাল। [সূত্র : প্রথম আলো, ১২ নভেম্বর ২০২৫]

জাতিসংঘ আগামী শুক্রবার বিলুপ্ত হয়ে গেলে বিশ্বজুড়ে কী হতে পারে

এখন থেকে ৮০ বছর আগে অক্টোবরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল জাতিসংঘ। এই বিশ্বসংস্থা এখন দুনিয়াজুড়ে দেশ ও মানুষের জীবনে এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।

 

 

বিগত আট দশকে বৈশ্বিক নানা সংকটে বিশ্বকে পথ দেখাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে জাতিসংঘ। বৈশ্বিক স্বাস্থ্য, আন্তর্জাতিক আইন, কূটনীতি, মানবিক সহায়তা, শান্তি রক্ষায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে আসছে। সঠিক বা ভুল যা–ই হোক না কেন—বেশির ভাগ মানুষ এটিকে বিশ্বব্যবস্থা বলে মনে করে।

 

 

তবে, অনেকে এর ভূমিকাকে এখনো গুরুত্বপূর্ণ মনে করলেও জাতিসংঘ গ্লোবাল সাউথের (উন্নয়নশীল দেশ) প্রয়োজনের তুলনায় পশ্চিমা বিশ্বের এজেন্ডাকে অগ্রাধিকার দেয়। এ জন্য ক্রমবর্ধমান সমালোচনার মুখে পড়েছে সংস্থাটি। এ ছাড়া জাতিসংঘের সেনা উপস্থিতি সত্ত্বেও ১৯৯০-এর দশকে রুয়ান্ডা ও বসনিয়া-হার্জেগোভিনার গণহত্যা এবং সুদানের দারফুর অঞ্চলে নৃশংস সহিংসতারোধে এই বিশ্বসংস্থা ব্যর্থ হয়েছে।

অনেকেই যুক্তি দেখাবেন, গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার হামলা বন্ধের ক্ষেত্রে জাতিসংঘ পুরোপুরি কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। ইসরায়েল সংস্থাটির বৈধতাকে প্রশ্নবদ্ধি করেছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার জাতিসংঘের ঐতিহ্যগত ভূমিকাকে যুক্তরাষ্ট্র ছিনতাই করেছে।

 

 

তাহলে এমন পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার কী। রাষ্ট্রগুলো কি নিজেরাই নিজেদের সমস্যা মোকাবিলা করতে পারত না? সর্বোপরি, জাতিসংঘ বৈশ্বিক সংস্থা হিসেবে প্রথম কোনো কোনো প্রচেষ্টাও নয়। এর আগে ১৯২০ সালে লিগ অফ নেশনস প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সংস্থাটি প্রায় টিকে থাকতে পারেনি। তাহলে, কেন আমরা আশা করব, জাতিসংঘ চিরকাল চলবে?

 

 

কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল–জাজিরা বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছে এবং তাদের জিজ্ঞাসা করেছে, আগামী শুক্রবার যদি জাতিসংঘ বিলুপ্ত হয়ে যায়, তবে তাদের মতে বিশ্বে কী ঘটবে।

 

অভিবাসী ও শরণার্থীদের কী হবে

 

 

 

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রিফিউজি স্টাডিজ সেন্টারের গবেষো সহযোগী জেফ ক্রিসপ বলছিলেন, আপনি যদি শুক্রবার জাতিসংঘ বিলুপ্ত করেন, তবে সোমবারের মধ্যে আপনি এটি পুনর্গঠনের একটি উপায় খুঁজবেন।

 

 

ক্রিসপ জাতসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমশিনের সাবেক হাইকমিশনার। তিনি বলছিলেন, আজ বিশ্ব যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে, তার মধ্যে অনেকগুলোই আন্তদেশীয়। উদাহরণস্বরূপ শরণার্থীদের কথা ধরুন—বিশ্বব্যাপী কমপক্ষে ১০ কোটি শরণার্থী, বাস্তুচ্যুত মানুষ এবং অনিয়মিত অভিবাসী রয়েছেন। এটি এমন একটি সমস্যা—যা কোনো একটি রাষ্ট্র সমাধান করতে পারে না। এ জন্য একটি আন্তদেশীয় উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

 

 

ক্রিসপ বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যেই সাহায্য কমানো দেখতে পাচ্ছি, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সহায়তা কমানো হচ্ছে। এর ফলে জাতিসংঘ–সমর্থিত ক্যাম্পগুলোয় খাদ্যনিরাপত্তা কমে যাচ্ছে এবং পুষ্টিহীনতা ও সামাজিক উত্তেজনা বেড়ে যাচ্ছে।’

 

 

এই গবষেণ সহযোগী বলেন, সহায়তা ফুরিয়ে গেলে আরও বেশি শরণার্থী আশ্রয়শিবির থেকে শহুরে অঞ্চলে চলে যাচ্ছে। সেখানে তারা কখনো কখনো অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির মাধ্যমে বেঁচে থাকতে পারেন। কিন্তু তাঁদের আগমনে সেই শহুরে অঞ্চলের সম্পদ ও পরিষেবার ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে। অবশ্য এতে তাদের কোনো দোষে নেই।

আশ্রয়শিবিরে স্বজনদের সঙ্গে অভিবাসী শিশুরা
আশ্রয়শিবিরে স্বজনদের সঙ্গে অভিবাসী শিশুরারয়টার্স ফাইল ছবি
 

জাতিসংঘের সাবেক এই কর্মকর্তা বলেন, যদি জাতিসংঘ পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যায়, তবে কিছু শরণার্থী নিঃসন্দেহে গ্লোবাল নর্থের (উন্নত পশ্চিমা বিশ্ব) দিকে চলে যাবে। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া হবে, যা সম্ভবত এক বছরের মধ্যে ইউরোপে প্রভাব ফেলবে। তবে অন্যরা ক্রমবর্ধমান অনিরাপদ পরিস্থিতিতে আটকা পড়বেন। শরণার্থীরা যত গরিব হবে, তাদের ভ্রমণের ক্ষমতা তত কমে যাবে।

 

 

ক্রিসপ বলেন, জাতিসংঘ না থাকলে রাষ্ট্রগুলো শরণার্থীদের সঙ্গে যেমন আচরণই করুক না কেন, তার জন্য আর জবাবদিহি করতে হবে না। এই পরিস্থিতির দ্রুতই অবনতি হবে। আপনি একতরফা পদক্ষেপের মার্কিন মডেলের বিস্তার দেখতে পাবেন এবং গাজা মানবিক ফাউন্ডেশনের (ইসরায়েল-মার্কিন ব্যক্তিগত সাহায্য মডেল, যার ফলে খাবার আনতে গিয়ে ৬০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন) মতো গোষ্ঠীগুলো এই শূন্যস্থান পূরণ করতে এগিয়ে আসবে।

 

 

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, সবচেয়ে বড় কথা, অবশ্যই জাতিসংঘ এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংস্থা ও সরবরাহকারীদের মধ্যে হাজার হাজার মানুষ চাকরি করেন, যাঁদের চাকরি এক রাতেই বিলীন হয়ে যাবে।

 

 

আন্তর্জাতিক আইনের কী হবে

 

 

সাবেক সার্ব নেতা স্লোবোদান মিলোসেভিচের মামলার প্রধান প্রসিকিউটর, যুক্তরাজ্যের আইনজীবী জিওফ্রে নাইস বলছিলেন, বৃহত্তর রাষ্ট্র বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সার্বভৌমত্বের কাছে আন্তর্জাতিক আইন সব সময়ই দ্বিতীয় স্থানে থাকে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) মতো সংস্থাগুলোর প্রভাব সংকুচিত হচ্ছে। আলাদা বিধির অধীনে এসব সংস্থা আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগ করে থাকে।

 

 

নাইস বলেন, ‘সুতরাং যখন আমরা জাতিসংঘ বিলুপ্ত করার আইনি প্রভাব নিয়ে কথা বলি, তখন আমরা আসলে এমন একটি প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করছি, যা ইতিমধ্যেই চলছে। এর আগেও মহৎ প্রতিষ্ঠানগুলো বিলীন হয়েছে। লিগ অব নেশনস হলো এর স্পষ্ট উদাহরণ।’

 

 

এই আইন বিশেষজ্ঞ বলেন, জাতিসংঘ বেশ কিছুদিন ধরেই রাজনৈতিক প্রভাব হারাচ্ছে। এই সংস্থা পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে। এই সংস্থার তহবিলের একটি বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসে। যদি এটি ঘটে, তবে আমরা সম্ভবত সিল করা সীমানা এবং বিশুদ্ধ ওয়েস্টফালিয়ান রাজনীতিতে ফিরে যাব (এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে প্রতিটি রাষ্ট্রের তার নিজের ভূখণ্ডের ওপর পরম সার্বভৌমত্ব থাকে), যা ঠিক আদর্শ নয়।

নেদারল্যান্ডসে আইসিসির ভবনের বাইরে কয়েক ব্যক্তিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫, দ্য হেগ
নেদারল্যান্ডসে আইসিসির ভবনের বাইরে কয়েক ব্যক্তিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫, দ্য হেগ ছবি: রয়টার্স
 

নাইস বলেন, জাতিসংঘ না থাকলেও, আন্তর্জাতিক আইন বিলুপ্ত হবে না। এনজিও এবং অ-রাষ্ট্রীয় পক্ষগুলো এখনো জাতীয় আদালত ব্যবহার করে নেতাদের (অ্যাক্টর) জবাবদিহি করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, জাতিসংঘের বাইরে স্বাধীনভাবে ফিলিস্তিনি মানবাধিকার সংস্থা আল-হক ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে যন্ত্রাংশ সরবরাহের জন্য যুক্তরাজ্যের সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে মামলা চালাচ্ছে।

 

 

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, চীনের জোরপূর্বক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংগ্রহের মামলার পর বাণিজ্য সংস্থাগুলো চীনের চিকিৎসাশিল্পের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়, যা গবেষণামূলক প্রকাশনাগুলোকে প্রভাবিত করেছে। আইসিসির আইনজীবীরাও আন্তসীমান্ত উদ্যোগের পথ দেখিয়েছেন, বিশেষ করে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নির্যাতনের তদন্ত—যা দেখিয়ে দিয়েছে, কীভাবে প্রসিকিউটররা অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে বিভিন্ন বিচারব্যবস্থায় সমন্বয় করতে পারে।

 

 

নাইস বলেন, আন্তর্জাতিক আদালতগুলো সম্ভবত টিকে থাকবে এবং গণহত্যার বিরুদ্ধে আইনও থাকবে। কিন্তু আইন প্রয়োগের দায়িত্ব ক্রমবর্ধমানভাবে রাষ্ট্র, করপোরেশন এবং সুশীল সমাজের ওপর বর্তাবে। এটি অপ্রত্যাশিত এক বোঝা, তবে কাউকে না কাউকে এটি বহন করতে হবে।

 

 

রাষ্ট্রগুলো কি শান্তি রক্ষার দায়িত্ব নিতে পারে

জাতিসংঘের সাবেক সহকারী মহাসচিব রমেশ ঠাকুর বলেন, একতরফা শান্তি রক্ষা আসলে শান্তি রক্ষা নয়, এটি দখলদারত্ব। এ কারণেই দেশগুলো এটি এড়িয়ে চলে বা আফ্রিকান ইউনিয়নের মতো একটি বহুপক্ষীয় ম্যান্ডেট খোঁজে। এমনকি সেক্ষেত্রেও তারা জাতিসংঘের অনুমোদন নিতে ফিরে আসে।

 

 

রমেশ ঠাকুর বলেন, শান্তি রক্ষায় জাতিসংঘের ভূমিকা এটাই—এটি বৈধতা দেয়। জাতিসংঘ নিজে যতক্ষণ না সম্পূর্ণ বৈধতা হারায়, ততক্ষণ সম্ভবত এটি বজায় থাকবে। উদাহরণস্বরূপ, জি২০-এর সঙ্গে এর তুলনা করুন। সেখানে থাকা ক্ষমতাধর দেশগুলো এবং তাদের অনুগামীরা জাতিসংঘের বেশির ভাগ কাজ করার আর্থিক ও সামরিক সক্ষমতা রাখে। কিন্তু এটিকে সব সময় এবং যৌক্তিকভাবে গরিব দেশগুলো ওপর ধনী দেশগুলো তাদের ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়া হিসেবে দেখা হবে। এটি এড়ানোর একমাত্র উপায় হলো জাতিসংঘ বা অনুরূপ কিছু থাকা।

 

 

জাতিসংঘের সাবেক এই কর্মকর্তা বলেন, কিন্তু সেই বৈধতা এখন হুমকির মুখে। এটি নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের (চীন, ফ্রান্স, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র) বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা প্রয়োগ করতে পারে না বা করতে চায় না। এটি সত্যিই আন্তর্জাতিক আইনকে হাস্যকর করে তুলেছে। যে আইন প্রয়োগ করা যায় না, তা আসলে আইনি ফিকশন (কাহিনি) এবং তা সবকিছুকে ক্ষয় করে।

 

 

রমেশ ঠাকুর বলেন, ‘দেখুন আমরা কোথায় আছি। আইসিজে, আইসিসি—আমরা (রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির) পুতিন এবং (ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন) নেতানিয়াহুকে কোনো গ্রেপ্তারের ভয় ছাড়াই সারা বিশ্বে উড়তে দেখছি।’

 

 

জাতিসংঘের সাবেক সহকারী মহাসচিব বলেন, ‘আমরা কি বর্তমানে এই রূপে জাতিসংঘকে ছাড়া চলতে পারি? হ্যাঁ, যদি আমরা আজ এটিকে নকশা করতাম, তবে সম্ভবত এটি ১৯৪৫ সালে সম্মত কাঠামো থেকে আমূল ভিন্ন হতো। বিশ্ব তখনকার তুলনায় এখন খুবই ভিন্ন একটি জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে।

 

 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কী হবে

 

 

শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ এবং ডব্লিউএইচওর সাবেক প্রধান বিজ্ঞানী সৌম্য স্বামীনাথন বলেন, ‘আমরা যদি আগামী শুক্রবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বিলুপ্ত করি, তবে বিশ্ব তাৎক্ষণিকভাবে এটিকে আবার প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ছুটবে। এই সংস্থার শক্তি এর কাঠামোর মধ্যে নিহিত—প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রের একটি সমান ভোট রয়েছে, যা এটিকে সত্যিকারের একটি বৈশ্বিক সংস্থা হিসেবে গড়ে তুলেছে।

 

 

সৌম্য স্বামীনাথন বলেন, এই বিশ্বসংস্থার অনুপস্থিতি সবচেয়ে বেশি অনুভূত হবে নিম্ন আয়ের দেশগুলোয়। অনেকেরই ওষুধ বা টিকার অনুমোদনের অবকাঠামো নেই এবং তারা এ জন্য ডব্লিউএইচওর ওপর নির্ভর করে থাকে। এই সংস্থা ছাড়া মানুষ হয় অপরিহার্য চিকিৎসা ছাড়াই থাকবে অথবা অনিরাপদ, যাচাইবিহীন চিকিৎসা পাবে, যার ফলে অনেক মানুষ মারা যেতে পারে।

 

 

এই শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘আমরা ভয়াবহ মহামারির প্রস্তুতিও হারাব। ডব্লিউএইচওর গ্লোবাল ইনফ্লুয়েঞ্জা ৫০ বছর ধরে নজরদারি এবং পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে কাজ করছে। এই সংস্থা সরকারগুলোর সঙ্গে গভীর বিশ্বাস তৈরি করেছে। এটি শুধু ইনফ্লুয়েঞ্জা নয়, প্রধান প্রধান সব ভাইরাসের ওপর নজর রাখে, যা দেশগুলোকে প্রাদুর্ভাবের প্রাথমিক সতর্কতা দেয়।

লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইউএনআইএফআইএলের শান্তিরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের টহল। ইসরায়েল সীমান্তবর্তী রামায়াহ গ্রামে
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইউএনআইএফআইএলের শান্তিরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের টহল। ইসরায়েল সীমান্তবর্তী রামায়াহ গ্রামেফাইল ছবি: এএফপি
 

ডব্লিউএইচওর সাবেক প্রধান বিজ্ঞানী উদাহরণ দিতে গিয়ে বলেন, ডব্লিউএইচও বর্তমানে উত্তর আমেরিকায় প্রাণীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া এইচ৫এন১ ভাইরাসের ওপর নজর রাখছে। মানুষ প্রাণী থেকে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। তবে মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ ডব্লিউএইচও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। অবশ্য তহবিল কমে যাওয়ায় অন্যান্য সংস্থা নানা সংকটে পড়েছে।

 

 

সৌম্য স্বামীনাথন বলেন, টিকার সমতা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। ডব্লিউএইচও হস্তক্ষেপ না করা পর্যন্ত কোভিড–১৯ মহামারির সময় ছোট দেশগুলো টিকা পেতে হিমশিম খাচ্ছিল। এটি বৈশ্বিক স্বাস্থ্য মান নির্ধারণ ও ঝুঁকির কারণগুলো তুলে ধরার মাধ্যমে বাণিজ্যিক স্বার্থের শোষণ থেকে নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করতেও সহায়তা করে।

 

 

এই বিজ্ঞানী বলেন, ডব্লিউএইচও নিখুঁত নয়। এর পরিচালনা ও দক্ষতাকে অবশ্যই আরও উন্নত করা যেতে পারে। কিন্তু বিশ্ব এটিকে ছাড়া নিরাপদে চলতে পারে না। এর অনুপস্থিতি এমন একটি শূন্যতা তৈরি করবে, যা কোনো একক সরকার বা সংস্থা পূরণ করতে পারবে না।

 

 

কে সহায়তা পরিচালনা করবে

 

 

নর্থ ক্যারোলাইনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক জেমস টমাস লেখকও। তিনি ‘বাট আই মিনট ওয়েল: আনলার্নিং কলোনিয়াল ওয়েজ অব ডুইং গুড’ বইয়ের লেখক।

 

 

জেমস টমাস বলেন, ‘আমরা জাতিসংঘ বিলুপ্ত করলে আমরা এ ধরনের প্রতিষ্ঠান কতটা অনিবার্য এবং কতটা গভীরভাবে আমাদের মধ্যে গেঁথে গেছে, তার মুখোমুখি হতে বাধ্য হব।’

 

 

এই অধ্যাপক বলেন, জাতিসংঘ, ডব্লিউএইচও এবং ইউএসএআইডি ব্যাপক কল্যাণমূলক কাজ করে থাকে। এসব সংস্থার কাছে লাখ লাখ মানুষের জীবন পরিবর্তন করার মতো তহবিল ও অবকাঠামো রয়েছে। ছোট ছোট এনজিও সত্যিকারের পরিবর্তন আনে। কিন্তু বৈশ্বিক কর্মসূচি বজায় রাখার মতো স্কেল বা স্থিতিশীলতা তাদের খুব কমই থাকে।

 

 

জেমস টমাস বলেন, ‘যখন আমি সপ্তাহে প্রায় ১০ লাখ ডলার বাজেটে একটি ইউএসএআইডি স্বাস্থ্য তথ্য উদ্যোগ পরিচালনা করতাম, তখন এটিকে একটি সাধারণ উন্নয়নমূলক কাজ মনে হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমি দেখলাম, ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক অগ্রাধিকারগুলো কতটা কঠোরভাবে আমরা কী করতে পারি এবং কী করতে পারি না, তা ঠিক করে দেয়।’

 

 

নর্থ ক্যারোলাইনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক বলেন, ‘জাতিসংঘ ও অনুরূপ সংস্থাগুলো শুধু সহায়তা দেয় না; তারা প্রায়শই গ্লোবাল নর্থের (পশ্চিমা বিশ্ব) আখ্যানকে শক্তিশালী করে। আমরা উন্নত, তোমরা নও—অগ্রগতি করতে হলে তোমাদের আমাদের মতো হতে হবে।’

 

 

অধ্যাপক টমাস বলেন, এই কাঠামোটি এখনো উপনিবেশিক উত্তরাধিকার বহন করে। সহায়তাকে উপনিবেশমুক্ত করার প্রচেষ্টা চলছে। কিন্তু সেগুলো অসম ও অসম্পূর্ণ।

 

 

এই লেখক বলেন, ‘যদি জাতিসংঘ হঠাৎ চলে যায়, তবে আমরা ছোট, আরও স্থানীয় সংস্থাগুলো দিয়ে শূন্যস্থান পূরণ করার জন্য ছুটব। এটি সাহায্যকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তুলবে। তবে একই সঙ্গে এটি আরও খণ্ডিত, ভঙ্গুর ও অনিশ্চিত হবে। আসল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে সত্যিই ভিন্ন কিছু কল্পনা এবং তৈরি করা।