কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ : জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা

ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী [সূত্র : যুগান্তর, ০৪ নভেম্বর ২০২৫]

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ : জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা

‘জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ : জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা’-বিষয়টি বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সময়োপযোগী। জাতির বৃহত্তর ঐক্য ছাড়া ভালো কিছু অর্জন করা যায় না, এটা অতীতে বারবার প্রমাণিত হয়েছে।

 

 

বাংলাদেশ ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। পৃথিবীর ইতিহাসে ইতঃপূর্বে ঘটে যাওয়া বহু তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট, পরিণতি ও অর্জনের ঘটনাগুলো বিচার-বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই, যে কোনো ন্যায়ভিত্তিক যৌক্তিক রাজনৈতিক আন্দোলন সাফল্য অর্জন করেছে, কখনো ব্যর্থ হয়নি। এসব আন্দোলন-সংগ্রামের প্রকৃতি ও আদর্শগত অবস্থানের মধ্যে ভিন্নতা থাকলেও অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলদারি স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে এগুলো সর্বদাই বিজয় লাভ করেছে। বিশ্বের প্রাচীন ইতিহাসেও স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে বারবার বিদ্রোহ ঘোষিত হয়েছে। কোথাও বিদ্রোহ সফল হয়েছে, কোথাও আবার ব্যর্থ হয়েছে। সাফল্য ও ব্যর্থতার ধারাবাহিকতায় আমরা দেখেছি আধুনিককালে কোনো স্বৈরশাসকই গণ-অভ্যুত্থানের প্রবল প্রতিরোধের মুখে তার মসনদ রক্ষা করতে পারেনি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সেকথা আবারও প্রমাণিত হয়েছে।

 

 

আপনারা নিশ্চয়ই অবগত আছেন, অন্তর্বর্তী সরকার আগামী বছর ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথমার্ধে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে পবিত্র রমজান শুরু হওয়ার আগেই আমরা জনগণের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত একটি নতুন সরকার পেয়ে যাব। বিগত সরকারের আমলে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে যে তিনটি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সেগুলোর ন্যূনতম গ্রহণযোগ্যতা ছিল না। আগের সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর বিভাজনকে পুঁজি করে পুরো জাতিকে অনৈক্যের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। জাতি ছিল দ্বিধাবিভক্ত। এ বিভক্তির সুযোগ নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার বিগত সাড়ে ১৫ বছর (২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত) জনগণের ওপর নির্মম নির্যাতন ও স্বৈরাচারী শাসন কায়েম করেছিল। দেশের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে ব্যাপক মাত্রায় দলীয়করণ ও আত্মীয়করণের মাধ্যমে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়। কিন্তু এক সময় দেশের মানুষ আওয়ামী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠে।

 

 

বিগত সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলো যখন আন্দোলন-সংগ্রামে রত ছিল, তখন ছাত্ররা বৈষম্য নিরসনের দাবিতে সরকারের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক আন্দোলন গড়ে তোলে। শিক্ষার্থীরা প্রথমে সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান কোটা সুবিধা সংস্কারের জন্য আন্দোলন শুরু করলেও সরকারের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের কারণে কোটা সংস্কার আন্দোলন একপর্যায়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয় এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে তা সরকার পতনের একদফা আন্দোলনে রূপ নেয়। কোটা সংস্কার আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ছাত্রদের নানাভাবে বৃহত্তর আন্দোলন থেকে বিরত রাখার জন্য সরকারি এজেন্সিগুলো তাদের প্রলোভন দেখায়, তাদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালায়। কিন্তু তারপরও তারা উদ্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে ইস্পাতকঠিন দৃঢ় ঐক্য বজায় রাখে। একপর্যায়ে ছাত্রদের আন্দোলনে দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দল এবং জনগণ সম্পৃক্ত হয়। ফলে সরকারের পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে। আন্দোলনের মাধ্যমে ছাত্রদের মধ্যে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে উঠেছিল এবং শেষ পর্যন্ত তা বহাল ছিল বলেই দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। এর মাধ্যমে আবারও প্রমাণ হলো, যে কোনো লক্ষ্য অর্জনের জন্য জনগণের বৃহত্তর ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। ঐক্যবদ্ধ জাতি কখনোই পরাজিত বা লক্ষ্যচুত হয় না। একটি দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতি ত্বরান্বিত করার জন্যও জনগণের মধ্যে সুদৃঢ় ঐক্যের বন্ধন গড়ে তোলা একান্ত প্রয়োজন।

 

 

 

কথায় বলে, ‘United we stand, divided we fall’. একটি জাতি যদি তাদের বৃহত্তর স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ থাকে, তাহলে কোনো জাগতিক শক্তি তাদের পরাজিত করতে পারে না। কিন্তু বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যে ফাটল দেখা দিলে একটি সম্ভাবনাময় জাতিও ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। তাই আমাদের সর্বাবস্থায় জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। বিশেষ করে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর জাতীয় ঐক্য ধরে রাখার বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কোনো কারণে আমরা যদি জাতীয় ঐক্য ধরে রাখতে না পারি, ক্ষুদ্র স্বার্থে পরস্পর বিচ্ছিন্ন বা বিভক্ত হয়ে পড়ি, তাহলে পরাজিত শক্তি সেই সুযোগে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। কাজেই এ মুহূর্তে আমাদের সবচেয়ে জরুরি কর্তব্য হচ্ছে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সৃষ্ট ঐক্য ধরে রাখা। কোনোভাবেই এ ঐক্যকে ভন্ডুল হতে দেওয়া যাবে না।

 

 

ভৌগোলিক অবস্থান ও ঐতিহ্যের কারণে বাংলাদেশের মানুষ শান্তিপ্রিয়, কিন্তু একই সঙ্গে তারা স্বাধীনতাপ্রিয়ও বটে। বাংলাদেশের মানুষ কোনোকিছুর বিনিময়ে তাদের স্বাধীনতাকে বিসর্জন দিতে চায় না। কিন্তু যখনই বাংলাদেশের মানুষ ষড়যন্ত্রের কারণে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে বা তাদের ঐক্যে ফাটল ধরেছে, তখনই তারা বিদেশি শক্তির আগ্রাসনের শিকার হয়েছে। একসময় বাঙালিদের ‘ভীতু বাঙালি’ বলে উপহাস করা হতো। বলা হতো, বাঙালি যোদ্ধা জাতি নয়। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ বারবার প্রমাণ করেছে তারা ভীতু নয় এবং স্বাধীনতা বিসর্জন দিয়ে বেঁচে থাকার মতো জাতি নয়। স্বাধীনতার প্রশ্নে তারা সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে কখনোই পিছপা হয় না।

 

 

আমি এখানে কিছু বিষয় উল্লেখ করতে চাই, যা সবারই জানা আছে। তারপরও আমি ইতিহাসের শিক্ষাকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। প্রাচীনকালে বাংলাদেশ ছিল বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে উর্বর একটি জনপদ। এখানে সম্পদের কোনো অভাব ছিল না। বিদেশি বণিক ও ব্যবসায়ীরা এখানে এসে ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থবিত্ত অর্জন করতেন। সপ্তদশ শতাব্দীতে ফরাসি পরিব্রাজক ফ্রাঁসোয়া বার্ণিয়ার বাংলাদেশের অপরূপ সৌন্দর্য এবং সম্পদের প্রাচুর্য দেখে এতটাই অভিভূত হয়েছিলেন যে, তিনি মন্তব্য করেন, ‘There are hundred gates open to enter bengal, but there is not a singal gate to come out of it’ . ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়ার কোনো সাধারণ পর্যটক ছিলেন না, তাকে বলা হয় দার্শনিক পর্যটক। তিনি গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে তৎকালীন ভারতীয় সমাজ, রাজনীতি ও সংস্কৃতিকে অবলোকন করে সত্যনির্ভর তথ্য গ্রহণ করেছিলেন। তাই তাকে স্বপ্নদ্রষ্টা হিসাবে আখ্যায়িত করা যায়। বার্নিয়ার যে সোনার বাংলা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন, আমরা সেই বাংলাকে আর আগের মতো সম্পদশালী করে রাখতে পারিনি।

 

 

বাংলাদেশ আজ একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ। বহু রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে এদেশের মানুষ ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূর্য ছিনিয়ে এনেছে। কিন্তু বার্নিয়ারের দেখা সেই সোনার বাংলার সৌন্দর্য ও প্রাচুর্য আজ রূপকথার মতো শোনায়। আমরা যদি ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে সবসময় ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারি, তাহলে সোনার বাংলার হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।

 

 

বাংলাদেশে সবসময়ই কিছু মানুষ নানা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে জাতীয় ঐক্য বিনষ্টের খেলায় মেতে থাকে। যখনই স্থানীয় ষড়যন্ত্রকারীরা অতিমাত্রায় সক্রিয় হয়ে ওঠে, তখনই বিদেশি শক্তি তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা হরণের চেষ্টায় লিপ্ত হয়। ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পতনের পেছনে সিরাজের বিশ্বস্ত অনেকেই দায়ী ছিলেন। সেদিন যদি ক্ষমতালিপ্সু মীর জাফর আলী খান সিরাজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে জাতিকে বিভক্ত না করতেন, তাহলে পলাশীর প্রান্তরে সিরাজের এমন নির্মম পরাজয়ের ইতিহাস রচনা হতো না।

 

 

ইংরেজরা ১৭৬৫ সালে দেউয়ানি লাভের মাধ্যমে বাংলার মসনদে বসার রাস্তা পরিষ্কার করে নেয়। পরবর্তীকালে ১৯০ বছর তারা বাংলাসহ ভারতবর্ষ শাসন করে। ইংরেজরা সবসময়ই চেষ্টা করত, এদেশের মানুষ যেন একতাবদ্ধ হতে না পারে। তারা জাতিতে জাতিতে, অঞ্চলে অঞ্চলে এবং ধর্মে ধর্মে বিভেদ সৃষ্টির মাধ্যমে তাদের ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করে। ইংরেজদের মূল উদ্দেশ্য ছিল ‘Divide and Rule’, অর্থাৎ ‘ভাগ কর এবং শাসন কর’। যতদিন তারা এ নীতির সফল বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়েছে, ততদিন ইংরেজদের বাংলাসহ ভারতের অন্যান্য অঞ্চল শাসন করার ক্ষেত্রে কোনো অসুবিধা হয়নি। আমি আগেই বলেছি, ভৌগোলিক অবস্থান ও ঐতিহ্যের কারণে বাংলাদেশের মানুষ সবসময়ই স্বাধীনতাপ্রিয়। অনেক সময় ঐক্যে ফাটল ধরার কারণে তারা বিদেশি শক্তির কাছে পরাভূত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই পরাজয় তারা প্রশ্নাতীতভাবে নীরবে সহ্য করেনি বা মেনে নেয়নি। তারা প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করেছে।

 

 

দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ ভাগ হয়ে ভারত ও পাকিস্তান সৃষ্টি হলে বাংলাদেশের মানুষ পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হয়। তারা ভেবেছিল, মুসলিম জাতিসত্তার ভিত্তিতে গঠিত পাকিস্তানে তারা ন্যায্য অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকতে পারবে। কিন্তু পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার অল্প কিছুদিন পরই বাংলাদেশের মানুষের ওপর আঘাত আসে। ঘোষণা করা হয় পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। সদ্য স্বাধীন পাকিস্তানে সেদিন মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় সোচ্চার হওয়া বা আন্দোলন করা সহজ কাজ ছিল না। তবে বাংলাদেশের মানুষ তাদের মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য পাকিস্তানি শাসকচক্রের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে রাস্তার নেমে এসেছিল। সেদিন যদি বাংলাদেশের মানুষ জাতীয় স্বার্থে মাতৃভাষার প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ না হতেন, তাহলে আজ আমাদের হয়তো ভিন্ন ভাষায় কথা বলতে হতো। পরবর্তীকালে পাকিস্তান আমলে এ অঞ্চলের জনগণ যত আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে, তার সবগুলোর পেছনেই একুশের চেতনা প্রেরণা জুগিয়েছে। একুশ আমাদের শিখিয়েছে, ঐক্যবদ্ধ হতে পারলে কোনো কিছুই অর্জন করা অসম্ভব নয়।

 

 

 

পরবর্তীকালে বাংলাদেশের মানুষ পাকিস্তানি শাসকদের শোষণের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে পেরেছিল বলেই ১৯৭১ সালে বিশ্বের অন্যতম প্রশিক্ষিত অথচ বর্বর সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জয়লাভ করতে সক্ষম হয়েছিল। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৮২ সালের মার্চে এক রক্তপাতহীন সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জেনারেল এরশাদ নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে অবৈধভাবে হটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে স্বৈরাচারী শাসন কায়েম করেন। দেশের মানুষ দলমতনির্বিশেষে ঐকমত্যে উপনীত হতে পেরেছিল বলেই ১৯৯০ সালে এরশাদ পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন। অর্থাৎ জাতি যখন কোনো ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ হয়, তখন বিজয় অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। স্বৈরাচার যতই শক্তিশালী হোক না কেন, জাতি যদি একতাবদ্ধ না থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তাহলে তার ওপর দুর্যোগ নেমে আসে।

 

 

 

জাতীয় ঐক্য বিনষ্ট করার জন্য বিভিন্ন সময় নানা কৌশল অবলম্বন করা হয়। এর মধ্যে অন্যতম হলো ম্যাকিয়াভিলির মতবাদ। বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ম্যাকিয়াভিলি তার ‘The Prince’ গ্রন্থে বলেছিলেন, ‘The prince should be as mighty as a lion and as clever as a fox’। অর্থাৎ একজন শাসককে হতে হবে সিংহের মতো শক্তিশালী এবং শৃগালের মতো ধূর্ত। তাকে ক্ষমতায় যেতে হবে এবং যে কোনো মূল্যে তা ধরে রাখতে হবে। তার কাছে নীতি-নৈতিকতা কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। তাকে শুধু রাষ্ট্রক্ষমতায় টিকে থাকতে হবে। এজন্য যে কোনো পন্থা অবলম্বন করা যেতে পারে। তাই তার মতে, End will justify the means; অর্থাৎ চূড়ান্ত পরিণতিই গৃহীত পদক্ষেপের যৌক্তিকতা নির্ধারণ করে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ম্যাকিয়াভিলির থিয়োরির বাস্তব প্রয়োগ লক্ষ করা গেছে। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে ম্যাকিয়াভিলির দীক্ষা গ্রহণ করেন। তবে ইতিহাসের সেই বহুকথিত আপ্তবাক্য : ‘ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা গ্রহণ করে না।’ ইতিহাসের শিক্ষা কেন ক্ষমতার কষ্টকল্পিত প্রাসাদের ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না-সে এক আশ্চর্য রহস্যময় জিজ্ঞাসা, যার উত্তর কোনোদিন, কোনোকালেই কোনো স্বৈরাচার দিতে পারেননি। তবে নিষ্ঠুরভাবে ভোগ করেছেন ইতিহাসের অমোঘ পরিণতি।

 

 

 

বিভিন্ন বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এখনো যে মতভেদ রয়েছে, তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। মনে রাখতে হবে, এমন কোনো সমস্যা নেই, যা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়। এমনকি যুদ্ধের মাধ্যমে বিজয়ী পক্ষকেও শান্তির জন্য আলোচনার টেবিলে বসতে হয়। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো নিশ্চয়ই দেশে অশান্তি চায় না। তারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়ন এবং জনগণের ভাগ্য পরিবর্তন করতে চায়। তাই তাদের আলোচনার টেবিলে বসে বিভিন্ন ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে ফেব্রুয়ারির নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ইস্পাতকঠিন ঐক্য গড়ে তুলতে হবে, যাতে শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে। মনে রাখতে হবে, নির্বাচনে জয়-পরাজয় স্বাভাবিক ঘটনা।

 

 

নভেম্বর বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি মাস। এ মাসেই মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের রায় প্রকাশ শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া নির্বাচনের তফশিল ঘোষণার সময় আগত। বিচারের রায় প্রকাশের আগে সারা দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালানো হতে পারে। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা হতে পারে। বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ওপর আক্রমণ হতে পারে। বাংলাদেশের মানুষ সরল প্রকৃতির। তাদের খুব সহজেই বিভ্রান্ত করা যায়। একটি মহল ইতোমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা ধরনের বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা চালাতে শুরু করেছে। এসব প্রচারণা দেখে যে কোনো মানুষ বিভ্রান্ত হতে পারে। তারা পথভ্রষ্ট হতে পারে। এদের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।

 

 

বিগত সরকারের আমলে যারা নানা ধরনের অনৈতিক সুবিধা ভোগ করেছে, তারা আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠার অপেক্ষায় আছে। রাজনৈতিক দলগুলো যদি নিজেদের মধ্যে সম্প্রীতি বজায় রাখতে না পারে, তাহলে জাতীয় ঐক্য বিনষ্ট হবে। সেই সুযোগে পরাজিত শত্রুরা ছোবল মারতে পারে। যে কোনো মূল্যেই হোক, আগামী দিনে জাতীয় ঐক্য বজায় রাখতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, সুযোগ বারবার আসে না। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান আমাদের জন্য যে সুযোগ সৃষ্টি এবং ঐক্যের ভিত রচনা করে দিয়েছে, তা কোনোভাবেই ধ্বংস হতে দেওয়া যাবে না। মনে রাখতে হবে, ঐক্যেই উত্থান, অনৈক্যেই পতন।

 

 

 

বিগত সরকার আমলে দেশের জনগণের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে রাখা সম্ভব হয়েছিল বলেই তারা দীর্ঘকাল দেশে স্বৈরশাসন চালাতে সক্ষম হয়েছিল। আমি একজন প্রবীণ শিক্ষক হিসাবে সব রাজনৈতিক দল এবং জনগণের কাছে বিনীত অনুরোধ জানাব-আপনারা ক্ষুদ্র স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে যে কোনো মূল্যে হোক জাতীয় ঐক্য ধরে রাখুন। আমরা এটি করতে ব্যর্থ হলে দেশের ভবিষ্যৎ আবারও অন্ধকারে নিমজ্জিত হতে পারে।

 

 


ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এবং বাহরাইনে নিযুক্ত সাবেক রাষ্ট্রদূত