জাতীয় এআই নীতিমালার খসড়া প্রকাশ
তথ্য সুরক্ষা ও নিরাপদ ব্যবহারে গুরুত্ব ২৫ জানুয়ারি প্রকাশিত হয়েছে জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতিমালা ২০২৬-২০৩০-এর খসড়া। বাংলাদেশে এআই প্রযুক্তি কিভাবে ব্যবহৃত হবে ও এটি নিয়ন্ত্রণে কেমন আইন প্রণীত হতে পারে সে বিষয়ে ফ্রেমওয়ার্ক তৈরিই এর লক্ষ্য। নীতিমালার বিষয়বস্তু নিয়ে লিখেছেন এস এম তাহমিদ [সূত্র : কালের কণ্ঠ, ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬]

স্টিম ইঞ্জিন, মাইক্রো প্রসেসর অথবা ইন্টারনেটের মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি মানবসভ্যতার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। বেশির ভাগ প্রযুক্তি ব্যবহার করা যায় অসাধু কাজে, এআই প্রযুক্তিও ব্যতিক্রম নয়। তাই এআইয়ের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে বেশ কয়েকটি দেশ এর মধ্যেই নীতিমালা তৈরি করেছে। ২৫ জানুয়ারি বাংলাদেশ সরকারও প্রকাশ করেছে ‘জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতিমালা ২০২৬-২০৩০’-এর খসড়া।
এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের আইনি কাঠামো তৈরির পথে বড় ধাপ এটি। তবে মনে রাখা জরুরি, এটি কোনো ‘এআই আইন’ নয়। বরং ভবিষ্যতে এআই ব্যবহারের আইনি কাঠামো তৈরির নীতিগত রূপরেখা বা ব্লুপ্রিন্ট। এর মাধ্যমে জনগণের সামনে তুলে ধরা হয়েছে এআই নিয়ন্ত্রণে সরকারের কী উদ্দেশ্য, কী ধরনের সুরক্ষামূলক বেষ্টনী বা গার্ডরেল নির্ধারণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতের আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে কোন বিষয়ে সরকারি নজর থাকবে।
নীতিমালার কাঠামো
জাতীয় এআই নীতিমালার খসড়ায় রয়েছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
♦ বাংলাদেশে এআই কিভাবে ব্যবহৃত ও পরিচালিত হবে সেসব নীতি সংজ্ঞায়িত করা।
♦ এআই সিস্টেম তদারকির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করা।
♦ ২০২৮ সালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যাক্ট’ বা এআই আইন প্রণয়নের পথ তৈরি করা।
এ নীতিমালার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে কে বা কারা এআই নিয়ন্ত্রণ করবে, কোন ধরনের ব্যবহার গ্রহণযোগ্য এবং কোন ঝুঁকিগুলো প্রতিরোধে রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করবে।
এআই ব্যবহারে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘এআই অ্যাক্ট’-এর আদলে এ নীতিমালায়ও ব্যবহৃত হয়েছে ঝুঁকিভিত্তিক মডেল। ফিচার, ডিজাইন ও সম্ভাব্য ব্যবহার আমলে নিয়ে এআই সিস্টেমকে ভাগ করা হয়েছে মোট চারটি ধরনে—
♦ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও আইনত নিষিদ্ধ এআই
♦ উচ্চমাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ এআই সিস্টেম
♦ মাঝারি ঝুঁকি এবং
♦ স্বল্প ঝুঁকির এআই
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, বায়োমেট্রিক শনাক্তকরণ, জনকল্যাণমুখী সেবা, কর্মসংস্থানবিষয়ক সিদ্ধান্ত, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং জরুরি জনসেবার সঙ্গে সম্পৃক্ত এআই সিস্টেমগুলো উচ্চমাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ ধরনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এসব সিস্টেম ডিজাইনে অবশ্যই থাকতে হবে কঠোর তদারকি, বাধ্যতামূলক ঝুঁকি যাচাই গবেষণা (ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট), কাজের প্রতিটি ধাপে মানবকর্মীদের নজরদারি নিশ্চিতকরণ এবং ব্যাবহারিক স্বচ্ছতা।
♦ কিছু ব্যবহার স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যেমন—
♦ এআইচালিত সোশ্যাল স্কোরিং বা সামাজিক রেটিং।
♦ মানুষকে বিভ্রান্ত বা ম্যানিপুুলেট করে এমন এআই সিস্টেম।
♦ এআই তৈরি ভুয়া তথ্য দিয়ে নির্বাচনে হস্তক্ষেপ।
♦ অননুমোদিত গণ-নজরদারি বা মাস বায়োমেট্রিক সার্ভেইল্যান্স।
মূল নিয়ন্ত্রক এনডিজিআইএ
(NDGIA)
খসড়া নীতিমালা অনুযায়ী এআই নিয়ন্ত্রণের মূল রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠান হবে ‘ন্যাশনাল ডেটা গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ইন্টার-অপারেবিলিটি অথরিটি’ (এনডিজিআইএ)। ব্যবহারকারীদের ডেটা সুরক্ষা, এআই ডিজাইন ও ব্যবহারে তদারকি এবং নীতি সমন্বয়ের কাজ করবে এ প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে রয়েছে—
♦ প্রতিটি ক্ষেত্রে এআই পরিচালনা সমন্বয় করা।
♦ এআই সিস্টেম ডিজাইনের মানদণ্ড নির্ধারণ।
♦ অ্যালগরিদমিক ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট (AIA) তদারকি করা।
♦ উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এআই সিস্টেমের সনদ বা সার্টিফিকেশন প্রদান করা।
♦ আন্তর্জাতিক এআই প্রোগ্রাম সমন্বয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করা।
এনডিজিআইএ-এর কার্যক্রম তদারকিতে গঠন করা হবে সম্পূর্ণ স্বাধীন কমিটি। নাগরিকসমাজ, একাডেমিয়া, শিল্প খাত, শ্রমিক ইউনিয়ন এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা থাকবেন এতে। কমিটির মূল কাজ এআই সিস্টেমগুলো অডিট বা নিরীক্ষা করা, এআইয়ের যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে কি না সে বিষয়ে বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা। অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ অনিরাপদ এআইসেবা স্থগিত বা প্রত্যাহারের সুপারিশ করতে পারবে এ কমিটি। তবে আইন প্রয়োগের ক্ষমতা এ কমিটির থাকছে না। সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থার হাতেই থাকছে।
নাগরিক অধিকার রক্ষা
প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে এআই ব্যবহৃত হলে সে ক্ষেত্রে নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে কি না সেদিকে নজর রাখা হবে। এআই সিস্টেম ডিজাইনে নাগরিকদের যেসব অধিকার অটুট রাখতে হবে, এর মধ্যে আছে—
♦ প্রত্যেক নাগরিকের তথ্য বিশ্লেষণ করে এআই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কি না তা জানার অধিকার
♦ এআই প্রদত্ত ফলাফলের বিরোধিতা করার অধিকার।
♦ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে মানবিক পর্যালোচনার (human review) অধিকার।
♦ কাউন্টারফ্যাকচুয়াল এক্সপ্ল্যানেশন বা ব্যাখ্যা পাওয়ার অধিকার, অর্থাৎ কী পরিবর্তন হলে ফলাফল ভিন্ন হতে পারত, তা জানার অধিকার।
♦ যদি কোনো ব্যক্তি এআই সিস্টেমের কারণে ক্ষতির প্রাথমিক প্রমাণ (prima facie case) দেখাতে পারে, তবে সেই সিস্টেমটি যে নিরপেক্ষ এবং বৈষম্যহীন ছিল, তা প্রমাণের দায়ভার ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর বর্তাবে।
উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এআই সিস্টেমের জন্য নীতিমালায় ‘স্ট্রিক্ট লায়াবিলিটি’ বা কঠোর দায়বদ্ধতা কাঠামো গ্রহণ করা হয়েছে। এর অর্থ, অবহেলা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ক্ষতি না হলেও এর দায় বহন করতে হবে এআই সিস্টেম ডিজাইন ও ব্যবহারকারীদের।
নজরদারি ও বাকস্বাধীনতা
নীতিমালায় বারবার বলা হয়েছে লাগামহীন নজরদারি, বাকস্বাধীনতা দমন, রাজনৈতিক কারসাজি ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বাধা দেয় এমন কাজে এআই ব্যবহার করা যাবে না। তবে প্রয়োজনে আদালতের অনুমোদন সাপেক্ষে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা প্রতিষ্ঠান। কোন ক্ষেত্রে আদালত এমন অনুমতি দিতে পারবে সে বিষয়ে ভবিষ্যতে আইন প্রণয়ন করা হবে।
এআই তৈরি মিডিয়া বা ডিপফেক কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। নিষিদ্ধ করা হয়েছে যৌনতাপূর্ণ এআই কনটেন্ট তৈরি, শিশুদের নিয়ে তৈরি ডিপফেক এবং হয়রানি বা ব্ল্যাকমেইলের উদ্দেশ্যে তৈরি কনটেন্ট। তবে রাজনৈতিক বক্তব্য, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ (satire) এবং সাংবাদিকতাকে ‘ক্ষতিকর এআই কনটেন্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না। যদি এআইয়ের তৈরি কনটেন্ট সরানো প্রয়োজন হয় সে জন্য লাগবে আদালতের আদেশ। জরুরি ভিত্তিতে কনটেন্ট সাময়িকভাবে সরানো যাবে, তবে করতে হবে বিচারিক পর্যালোচনা। প্ল্যাটফর্মগুলোকে ব্যবহারকারীদের ওপর নজরদারি চালাতে বাধ্য করা যাবে না।
উদ্ভাবনে প্রণোদনা
নীতিমালায় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে যে রেগুলেটরি স্যান্ডবক্স বা পরীক্ষামূলক পরিবেশে এআই পরীক্ষা চালানো যাবে। এআই সিস্টেম তৈরিতে স্টার্টআপ সহায়তা, কর প্রণোদনা, ২৫০ কোটি টাকার এআই ইনোভেশন ফান্ড দেবে সরকার। তৈরি করা হবে জাতীয় বাংলা লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল। তবে ডেটাসেন্টার ও এআই সিস্টেম তৈরিতে সরকারি সার্টিফিকেশনের শর্ত ও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সিস্টেমে কঠোর সরকারি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কিছু প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে। এআই প্রযুক্তি উদ্ভাবন প্রতিযোগিতামূলক না হয়ে অনুমতিনির্ভর হয়ে পড়ার ঝুঁকি আছে।
আপনার মতামত জানান
নীতিমালাটি এখনো খসড়া পর্যায়ে রয়েছে। এ বিষয়ে যে কেউ মতামত জানাতে পারবে। এ জন্য ভিজিট করতে হবে aipolicy.gov.bd। ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে নীতিমালার খসড়া পড়া বা ডাউনলোড করা যাবে, প্রয়োজনে দেওয়া যাবে মতামত।
দেশে এআই প্রযুক্তির বর্তমান বাস্তবতা
খসড়া জাতীয় এআই নীতিমালা প্রয়োগে এখনো অনেকটা পথ বাকি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পরিচালিত একটি এআই রেডিনেস বা প্রস্তুতিবিষয়ক সমীক্ষা বলছে, দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো পুরোদমে এআই কাজে লাগানোর জন্য প্রস্তুত নয়।
সেকেলে পাঠ্যক্রম
দেশের বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের এআই বিষয়ক কারিকুলাম এখনো অতিমাত্রায় তাত্ত্বিক। এআই প্রযুক্তির বাস্তব ব্যবহার শুরুর অনেক আগেই এসব পাঠ্যক্রম ডিজাইন করা হয়েছিল। শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সিলেবাসেও জেনারেটিভ এআই, এআই ডিজাইনে দায়িত্বশীলতা এবং অ্যাপ্লায়েড সিস্টেম ডিজাইনের ওপর কোনো আনুষ্ঠানিক কোর্স নেই। ফলে গ্র্যাজুয়েটরা মডেলের তত্ত্ব বুঝলেও এর বাস্তব প্রয়োগ বুঝতে পারছেন না। নীতিমালায় এ বিষয়ে তেমন জোর দেওয়া হয়নি।
প্রশিক্ষণের অভাব
খসড়া নীতিমালায় বারবার নৈতিকতা, নিরপেক্ষতা এবং জবাবদিহির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। অথচ সমীক্ষায় দেখা গেছে, জরীপকৃত কোনো বিশ্ববিদ্যালয়েই ‘এআই এথিক্স’ বা নৈতিকতাবিষয়ক কোনো স্বতন্ত্র কোর্স নেই। ডেটা প্রাইভেসি, বায়াস বা পক্ষপাত এবং কনসেন্টের মতো বিষয়গুলো প্রযুক্তিগত ক্লাসে খুব কমই পড়ানো হয়।
অবকাঠামো সংকট
হাতে-কলমে এআই শিক্ষার ক্ষেত্রে বড় বাধা কম্পিউটিং অবকাঠামোর অভাব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজিতে (আইআইটি) ১৪৮ জন শিক্ষার্থীর জন্য বরাদ্দ মাত্র দুটি জিপিইউ (GPU)। সিএসই বিভাগে ২৪০ জন শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছে মাত্র পাঁচটি জিপিইউ। প্রাতিষ্ঠানিক ক্লাউড সুবিধা না থাকায় শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত ল্যাপটপের ওপর নির্ভর করতে হয়, যা দিয়ে আধুনিক এআই নিয়ে গবেষণা প্রায় অসম্ভব।
লিঙ্গবৈষম্য
লিঙ্গবৈষম্য বাংলাদেশের এআই পাইপলাইনের একটি বড় দুর্বলতা। ঢাবির সিএসই এবং আইআইটি বিভাগে এআই বিষয়ক কোনো নারী শিক্ষক নেই এবং প্রযুক্তিশিল্পেও এআই টিমে নারীদের উপস্থিতি নগণ্য। ফলে জাতীয় লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল তৈরি করা হলে এতে একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি তৈরির ঝুঁকি রয়ে যাচ্ছে।
পাইপলাইনে সংস্কার প্রয়োজন
এআই নীতিমালার সঠিক বাস্তবায়নের জন্য দক্ষ ডেভেলপার, নিরীক্ষক, নিয়ন্ত্রক ও শিক্ষকের প্রয়োজন। কিন্তু এই সমীক্ষা বলছে, আমাদের মানবসম্পদ ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি এখনো বেশ নড়বড়ে। তাই নীতিমালায় অবশ্যই শিক্ষা সংস্কার, কম্পিউটিং সুবিধা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক মেধা পাইপলাইনে বিনিয়োগের ওপর আরো জোর দিতে হবে।