ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্পের নতুন উদ্যোগ
ড. ফরিদুল আলম [সূত্র : কালের কণ্ঠ, ২১ অক্টোবর ২০২৫]

আলাস্কায় ট্রাম্প-পুতিনের মধ্যকার বৈঠক থেকে প্রত্যাশিত ফল আসেনি। এর মধ্যে রাশিয়াকে হুমকি দিয়ে ট্রাম্প বলেছিলেন, রাশিয়া হামলা বন্ধ না করলে ইউক্রেনকে সহায়তা করবে যুক্তরাষ্ট্র। অল্প সময়ের ব্যবধানে বৈশ্বিক রাজনীতিতে বেশ গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিবর্তন এসেছে। ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধের আপাতত অবসান হয়েছে।
তবে এখানে এটিও মনে রাখতে হবে যে গাজা বা হামাস আর রাশিয়া এক নয়। সুতরাং এ ক্ষেত্রে জবরদস্তি চালানোর সুযোগ নেই। ট্রাম্প বরং কূটনৈতিক ভাষা প্রয়োগকে অধিকতর শ্রেয় মনে করছেন।
একই পরামর্শ তিনি পুতিনকেও দিয়েছেন। জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকের আগের দিন ট্রাম্প-পুতিনের দীর্ঘক্ষণ ফোনালাপ হয়। এই আলোচনায় ট্রাম্প যে যেখানে আছে, সেখান থেকেই যুদ্ধ বন্ধ করে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করতে পুতিনকেও চাপ দেন। পুতিনের দিক থেকে কী জবাব দেওয়া হয়েছে, সেটি এখনো স্পষ্ট জানা না গেলেও তাঁর এর আগের অবস্থান থেকে আমরা যতটুকু অনুমান করতে পারি, সেটি হচ্ছে ইউক্রেনকে ন্যাটোতে যোগদানের ইচ্ছা পরিত্যাগের বাইরেও সামরিক সক্ষমতা কমাতে হবে এবং অধিকৃত রুশ ভূখণ্ডগুলোতে রাশিয়ার সার্বভৌমত্বকে স্বীকার করে নিতে হবে।
ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে অভিষিক্ত হওয়ার পর থেকেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছিলেন এবং বিভিন্ন সময়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে রাশিয়াকে ইউক্রেনের কিছু ভূখণ্ড ছেড়ে দিয়ে হলেও এই যুদ্ধ বন্ধের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছিলেন। ইউক্রেন যদিও বারবার এ ধরনের দাবিকে প্রত্যাখ্যান করে আসছে, বাস্তবতার খাতিরে যুদ্ধ বন্ধ করতে হলে এর চেয়ে জুতসই আর কোনো বিকল্প আছে কি না, সেটি নিয়েও কিন্তু তারা বা তাদের ইউরোপীয় মিত্ররা কোনো বিকল্প দেখাতে পারছে না। ট্রাম্পের সঙ্গে এবারের বৈঠকে ট্রাম্পের পক্ষ থেকে যুদ্ধ বন্ধের পরামর্শের জবাবে ইউক্রেনের ভবিষ্যতের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চেয়েছেন জেলেনস্কি। তবে এখানে অন্যান্য বিষয় এখনো স্পষ্ট নয়।

এদিকে আলাস্কা বৈঠক থেকে প্রত্যাশিত কোনো ফল না এলেও ট্রাম্প বা পুতিন কেউই আলোচনা শেষ হয়ে গেছে, এটি মনে করছেন না, বরং উভয়েই আলোচনা চালিয়ে যেতে চাইছেন। আর তাই দুই নেতাই পরবর্তী সময়ে হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে আবারও বসতে যাচ্ছেন, যার দিনক্ষণ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে এটি ধারণা করা যেতে পারে যে বুদাপেস্ট বৈঠকের আগে ট্রাম্প এরই মধ্যে জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক সেরে নিয়েছেন, হয়তো বা ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গেও আরেক দফা বৈঠক করে একটি ফর্মুলা বের করার চেষ্টা করবেন, যা তিনি পুতিনের কাছে পেশ করবেন। এখানে এটিও উল্লেখ করা সংগত যে যুদ্ধরত অবস্থায় আলোচনা যখন চলমান থাকে, তখন যুদ্ধরত পক্ষদ্বয়কে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা রাখতে হবে। পুতিন এর আগে তাঁর যে দাবিগুলো পেশ করেছেন, এর সব কটিকে যদি বিবেচনায় নিতে হয়, তাহলে শুধু এটি ইউক্রেনের পরাজয়ের দিকটিকেই প্রকাশ করবে না, বরং রাশিয়ার বিরুদ্ধে গোটা পশ্চিমা শক্তির একটি বড় পরাজয়কে নির্দেশ করবে।
ট্রাম্প-জেলেনস্কির আলোচনা থেকে এটিই বোঝা যায় যে যুদ্ধ ইউক্রেনকে না যতটুকু বিধ্বস্ত করেছে এবং এই অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে ইউক্রেন যতটা না উদগ্রীব, যুক্তরাষ্ট্রও কোনো অংশে এর চেয়ে কম ব্যতিব্যস্ত নয়। তবে ট্রাম্প স্পষ্ট করে জেলেনস্কির সঙ্গে আলোচনার পর জানিয়ে দিয়েছেন যে তাঁর পক্ষ থেকে এমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া উচিত হবে না, যা পুতিনকে আরো ক্ষুব্ধ করে তুলতে পারে। বার্তাটি স্পষ্ট, তিনি পুতিনকে যথেষ্ট কেয়ার করছেন। এখন ধরে নিতে হবে, বাকি কাজটুকু সারতে অর্থাৎ যুদ্ধ বন্ধে একটি চুক্তি স্বাক্ষরে পুতিনের ভূমিকা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে আরেকটি জটিলতা রয়েছে, আর তা হচ্ছে এখন পর্যন্ত পুতিন ও জেলেনস্কির এক টেবিলে বসে আলোচনা করার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। জেলেনস্কি চাইলেও পুতিন তাঁর সঙ্গে বৈঠকে বসতে আগ্রহী নন। কেননা তিনি জেলেনস্কিকে ইউক্রেনের বৈধ নেতা মনে করছেন না। আসন্ন বুদাপেস্ট আলোচনায় এই বিষয়টি নিয়ে ট্রাম্প কতটা পুতিনকে রাজি করাতে পারবেন, সেটিই একটি বিষয়। তবে জেলেনস্কি এরই মধ্যে ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনার ফলাফল নিয়ে ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন বলে জানিয়েছেন।
ট্রাম্পের পক্ষ থকে সাম্প্রতিক সময়ে ‘ইউক্রেনের ভূমি ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে’—এমন মন্তব্যে রাশিয়া কিছুটা সতর্ক হয়ে থাকতে পারে। আর তাই টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের বিষয়টি ট্রাম্প-জেলেনস্কি আলোচনায় এসেছে। এর আগে আলাস্কা বৈঠকের আগেও রাশিয়ার প্রতি ট্রাম্পের আরো কঠোর নিষেধাজ্ঞার হুমকির পর পুতিন আলাস্কা বৈঠকে যোগ দিতে সম্মত হন। এবার আরো নতুন একটি বিষয় হচ্ছে, ভারতকে রাশিয়া থেকে তেল আমদানিতে নিরুৎসাহ করতে ট্রাম্প কাজ করছেন—এমন আলোচনা পুতিনকে কিছুটা হলেও চিন্তিত করে থাকতে পারে। চীনের পর ভারত হচ্ছে রাশিয়ার তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। সুতরাং যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্প এখন পর্যন্ত যে পথে এগোচ্ছেন এবং একই সঙ্গে পুতিনকে গুরুত্ব দিয়েই এর একটি সমাধানের চেষ্টা করছেন, তা এককথায় প্রশংসনীয়।
লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়