কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

ইরানে সম্ভাব্য মার্কিন হামলার কী পরিণতি হতে পারে

যুক্তরাষ্ট্রের এবারের হুমকি এবং এর জেরে যদি হামলার মতো ঘটনা ঘটে, তাহলে এটি কি সীমিত পরিসরের হবে নাকি তা ছাড়িয়ে যাবে, সেটা বলা মুশকিল । আর সীমিত পরিসর বলতে এখানে কি বুঝানো হচ্ছে, সেটাও স্পষ্ট নয়। ড. ফরিদুল আলম [প্রকাশ : ইত্তেফাক, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬]

ইরানে সম্ভাব্য মার্কিন হামলার কী পরিণতি হতে পারে

ইরানকে একটি চুক্তি স্বাক্ষরে সম্মত করাতে কিংবা চাপ দেওয়ার লক্ষ্যে সীমিত পরিসরে দেশটির ওপর হামলা চালানোর কথা ভাবছেন বলে জানিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা চলমান থাকার মধ্যেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে ঘোষণা এসেছে খুব শিগগির (আগামী ১০ দিনের মধ্যে) যদি ইরান তার পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে চুক্তিতে পৌঁছুতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ইরানের ওপর এই হামলা চালানো হবে। যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা, সীমিত পরিসরের এই হামলার মধ্য দিয়ে ইরান নতি স্বীকার করে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে একটি চুক্তি করতে বাধ্য হবে।

 

 

 ইতিমধ্যে ইরান অভিমুখে এই হামলা চালানোর জন্য সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন যে একটি চুক্তিতে পৌঁছুতে তারা আশাবাদী, এই লক্ষ্যে তারা চুক্তির খসড়া তৈরি করেছেন এবং দুই-এক দিনের মধ্যে তা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করা হবে। তবে এখানে কথা থেকে যায়, এই খসড়াটি যদি যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দ না হয়, তাহলে কি হবে? এই সময় নির্ধারণ করে চুক্তি স্বাক্ষর নিয়ে দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি এই মর্মে সতর্ক করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র যদি আবার ইরানে হামলা পরিচালনা করে, তবে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ। ইরান মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলো এবং তাদের বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন এবং ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড ধ্বংস করার সক্ষমতা রাখে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আয়াতুল্লাহ খামেনি।

বাস্তবিক অর্থে যুক্তরাষ্ট্রের এবারের হুমকি এবং এর জেরে যদি হামলার মতো ঘটনা ঘটে, তাহলে এটি কি সীমিত পরিসরের হবে নাকি তা ছাড়িয়ে যাবে, সেটা বলা মুশকিল। আর সীমিত পরিসর বলতে এখানে কি বুঝানো হচ্ছে, সেটাও স্পষ্ট নয়। গত বছর জুন মাসে পরিচালিত অপারেশন 'মিডনাইট হ্যামার'-কে কি সীমিত পরিসরের বলা যাবে, নাকি অন্যকিছু? হামলার সময়ের বিবেচনায় হয়তো সীমিত পরিসরের, তবে আয়োজন বিবেচনায় সেটা কোন ধরনের, তা বিশ্লেষণের অপেক্ষা রাখে। আর এবার তারা যে সাজসজ্জা করে এসেছে, তা কি আদৌ কোনো সীমিত পরিসরের হামলার নিশ্চয়তা দেয়? ১৯৪৫ সালে জাপানের হিরোশিমা এবং নাগাসাকিতে মার্কিন বোমারু বিমান থেকে হামলার ঘটনায় মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে যে বিশাল ধ্বংসযজ্ঞ সাধিত হয়, সেটি কি সীমিত পরিসরের? আপাতত এটা বলা যায় যে, এবারের প্রস্তুতি নেহাত ইরানকে পরমাণু অস্ত্র থেকে বিরত রাখার জন্য নয়; বরং দেশটির শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

 

 

 সেই সঙ্গে প্রথাগত অস্ত্র এবং ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ধ্বংস করা এবং ভবিষ্যতে দেশটি যেন আর কোনো আঞ্চলিক গোষ্ঠীকে সহায়তা করে তাদের জন্য প্রক্সি হিসেবে তৈরি করতে না পারে, সেটিকেও নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পরিচালিত হবে এই হামলা। এখানে এই বিষয়গুলো অবতারণা করার অর্থ এটাই যে ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে যদি টিকে থাকতে হয়, তাহলে তাকে অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্যে তার সবচেয়ে বড় মিত্র ইসরাইলের জন্য ভবিষ্যতে কোনো ঝুঁকি হয়ে উঠা চলবে না। এটিই যদি হয় বাস্তবতা, তাহলে এমন অবস্থার মধ্য দিয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কীভাবে বললেন যে, তারা দ্রুতই একটি চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে আশাবাদী— বিষয়টি বোধগম্য ঠেকছে না।

 
 
 
 
 
 

এটাই যদি যুক্তরাষ্ট্রের মাথাব্যথার মূল কারণ হয়ে থাকে, সেদিক থেকে চলমান আলোচনার প্রথম দিকটিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছিল, যার মধ্য দিয়ে তারা ইরানকে তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধিকরণ কর্মসূচি ৬০ শতাংশের নিচে ছেঁটে ফেলতে বলেছিল, সেই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোকে ইরান আর কোনো ধরনের সহায়তা দেবে না, এই মর্মে অঙ্গীকার করতে বলেছিল। এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার মধ্যে ইরানের পক্ষ থেকে যুক্তি দিয়ে এটা জানানো হয়েছিল যে তারা পরমাণু অস্ত্র রোধকরণ চুক্তি এনপিটির স্বাক্ষরকারী দেশ এবং পরমাণু অস্ত্র তৈরি করার কোনো পরিকল্পনা করছে না; বরং অপরাপর দেশের মতো এর শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের অধিকার রাখে। এর মধ্যে ইসরাইলের পক্ষ থেকে চাপিয়ে দেওয়া নতুন দাবি “ইরানের সব ধরনের ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে হবে' নতুন ধরনের অস্বস্তি এবং অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে যুক্তরাষ্ট্র আসলে কার স্বার্থে কাজ করছে, ইসরাইল, নিজের নাকি বিশ্বে শান্তির স্বপক্ষে?

 

 

 

মধ্যপ্রাচ্যের যে কোনো উত্তেজনা সংগত কারণেই সারা বিশ্বের জন্য অস্থিরতা সৃষ্টি করে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানে যেভাবে একের পর এক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে এর জের ধরে তারা এক ভয়াবহ হামলার দ্বারপ্রান্তে এসে ঠেকেছে, এর রেশ কোথায় যাবে, সেটা অনুমান করা দুরূহ। মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে এতদিন ধরে চলমান মার্কিন নীতি অনেকটাই পরিবর্তিত হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়ে এসে। আগের মার্কিন সরকারগুলো ইসরাইলকে সমর্থন দিয়ে আসলেও সরাসরি ইরানে হামলা পরিচালনার মত এ রকম অবস্থা সৃষ্টি হয়নি। ট্রাম্পের আগের মেয়াদে কাসেম সোলাইমানীর মতো ইরানী বিপ্লবী গার্ডের কমান্ডারের মৃত্যুর পর থেকে মাঝে একমেয়াদে জো বাইডেনের শাসনকাল অবসানের পর আবারও দুই পক্ষ অনেক বেশি মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। গত জুনে প্রথমে ইসরাইলের পক্ষ থেকে হামলা পরিচালনা করে ইরানের শীর্ষ বিজ্ঞানী এবং পরমাণু গবেষকদের হত্যার পর ইরানের পক্ষ থেকে ইসরাইলে পালটা হামলার জবাব হিসেবে তাদের পরমাণু স্থাপনা লক্ষ করে যুক্তরাষ্ট্রের অপারেশন 'মিডনাইট হ্যামার'- এর পথ ধরে বর্তমান সময়ে এসে ৪৭ বছরের ইসলামী প্রজাতন্ত্রের শাসনব্যবস্থা মারাত্মক হুমকীর মুখে এসে দাঁড়িয়েছে।

 

 

 

এই হামলা পরিচালনার জন্য সহায়ক পরিবেশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল ইরানের সাম্প্রতিক সময়ে সংগঠিত সরকারবিরোধী বিপ্লব, যার পেছনে সংগত কারণ থাকলেও মার্কিন এবং ইসরাইলি সমর্থন এটিকে আরো উসকে দিতে চেয়েছিল বলে অনেকেই মনে করেন। এই URE বিপ্লব দমন করতে ইরান সরকারকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে যে এর মধ্য দিয়ে ৫ হাজারের বেশি মানুষ এবং ৫ শতাধিক নিরাপত্তারক্ষী নিহত হয়েছেন। তবে ইরানের মানুষ খামেনির শাসনের অবসান চাইলেও এর বিকল্প হিসেবে মার্কিন অনুগত কোনো শাসককে তারা মেনে নিতে রাজি নয়, এটা অনেকটাই স্পষ্ট। সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা, তা সীমিত বা বৃহৎ যে কোনো পরিসরের হোক না কেন প্রতিরোধ করতে গিয়ে ইরান সরকার যে এবার কঠিন প্রতিক্রিয়া দেখাবে, সেটাও অনেকটা স্পষ্ট। আর এর মধ্য দিয়ে গোটা মধ্যপ্রাচ্য জুড়েই ইরানের প্রক্সিগুলোও আরো সক্রিয় হয়ে উঠবে, সরব হয়ে উঠবে ইসরাইলও। সেক্ষেত্রে যুদ্ধটা হয়ে উঠবে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল বনাম ইরান এবং তার প্রক্সিগুলোর মধ্যে।

 

 

 

এ ধরনের সম্ভাব্য পরিস্থিতিতে চীন এবং রাশিয়ার মতো অপরাপর বৃহৎ শক্তিগুলো এবার আগের মতো প্রতিক্রিয়াহীন থাকবে, সেটারও নিশ্চয়তা দেওয়া যাচ্ছে না। ইরানের গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্বের ২০ শতাংশের বেশি তেল বাণিজ্যই কেবল বন্ধ হবে না, বন্ধ হয়ে যাবে পারস্য এবং ওমান উপসাগর তীরবর্তী দেশগুলোর বাণিজ্যও এবং মুখ থুবরে পড়বে মধ্যপ্রাচ্যের গোটা আর্থিক ব্যবস্থা।

 

 

• লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়