ইরানে হামলা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সহজ হবে না
ড. ফরিদুল আলম [সূত্র : কালের কণ্ঠ, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬]

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের দিকে তাক করে আছে যুক্তরাষ্ট্রের সমরাস্ত্র, সেই সঙ্গে যুক্ত হতে যাচ্ছে দুটি বিমানবাহী রণতরি। যুক্তরাষ্ট্র কী করবে, তা এক অর্থে ঠিক করে রেখেছে বলে ধরে নেওয়া যায়। কেবল আলোচনার নামে নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করছে তারা। গত বছর ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে ইসরায়েলকে অন্যায়ভাবে ইরানের ভূখণ্ডে হামলার সমর্থন দিয়ে কেবল আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেই ক্ষান্ত হয়নি যুক্তরাষ্ট্র, উপরন্তু ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় বিমান হামলা চালিয়ে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি সাধন করে নিজেরাই মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে সেই যুদ্ধের অবসান ঘটায়।
কী কারণে আবারও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলার পরিকল্পনা করছে। এর উত্তর একটিই, তা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের জন্য একমাত্র ঝুঁকিকে ছেঁটে ফেলা।
ইরানের সঙ্গে যে আলোচনা শুরু হয়েছিল, সেখানে তুরস্ক গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।
বিষয়টি আরো ভয়ের হয়ে উঠেছে যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে জানান দিলেন, ইরানে সরকার পরিবর্তনই একমাত্র সমাধান। তিনি এটিও জানিয়েছেন যে আলোচনা ব্যর্থ হলে মার্কিন রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্স ইরানে হামলার জন্য সম্পূর্ণ তৈরি আছে। মজার বিষয় হচ্ছে, একই দিনে ইরানের নির্বাসিত যুবরাজ রেজা পাহলভিও দেশটির জনগণের উদ্দেশে আবারও সরকারবিরোধী আন্দোলনের ডাক দিলেন। এ যেন দুইয়ে দুইয়ে চার! তিনি স্বপ্ন দেখছেন, ইরানে খামেনির শাসনের অবসান ঘটবে এবং এরপর যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় তিনি সেখানে আবারও শাহ বংশের শাসন চালাবেন।
আলোচনার মাঝখানে কী কারণে ট্রাম্পের পক্ষ থেকে এমন সমরসজ্জা করা হচ্ছে এবং এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যি ইরানে হামলা চালাতে যাচ্ছে কি না, তা নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরাও। কেউ কেউ আলোচনার নামে সেখানে হামলার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তুতির পক্ষে কথা বললেও এমন সম্ভাবনায় কিছুটা অস্পষ্টতা রয়েছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বক্তব্যে। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি এমন মন্তব্য করেছেন যে আলোচনার মাঝখানে এ ধরনের সমরসজ্জার মাধ্যমে কিছুটা ভয় দেখানোর প্রয়োজন রয়েছে, যেন ইরান একটি পারমাণবিক চুক্তিতে সম্মত হয়।
অবস্থা যখন এমন জটিল হয়ে উঠেছে, তখন এটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে যে ইরানে আদৌ যুক্তরাষ্ট্র সফলভাবে হামলা করে সেখানে তাদের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে পারবে কি না। যুক্তরাষ্ট্রের দাবির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইসরায়েলের দাবি। আর তা হচ্ছে ইরানকে তার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পরিত্যাগ করতে হবে। ইরান আলোচনার মধ্য দিয়ে একটি কার্যকর চুক্তিতে উপনীত হতে এবং তার পারমাণবিক কর্মসূচি কিছুটা স্তিমিত করতে সম্মত হলেও যুক্তরাষ্ট্রের দাবি সম্পূর্ণভাবে মানতে নারাজ। সেই সঙ্গে ইসরায়েলের দাবির কাছে মাথা নত করতে চায় না। ইরানের সামর্থ্য বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমন্বিত শক্তির কাছে, এমনকি যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের কোনো পক্ষের সঙ্গেই পাল্লা দেওয়ার সামর্থ্য রাখে না—এ কথা অনস্বীকার্য। তবে ইরানের সবচেয়ে বড় সক্ষমতার দিক হলো গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি। সেই সঙ্গে তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা, যা দিয়ে তারা মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে তাদের লক্ষ্যবস্তু করে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষতি সাধন করতে পারে।
গত বছর ইসরায়েলের হামলায় ইরানের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের হত্যা কিংবা তাদের সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনায় ক্ষতির তুলনায় ইরানের পাল্টা হামলায় তুলনামূলক কম ক্ষতি হলেও বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। আর সে বিবেচনায় গত ৪৭ বছরেও ইরানের শাসনকাঠামো পরিবর্তনে এবং সেখানে মার্কিন ইচ্ছার পুরো বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। ইরান সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গাটি হচ্ছে, এত বছর ধরে সরকারের বিরুদ্ধে মাঝে মাঝেই দেশের জনগণের ক্ষোভের প্রকাশ ঘটলেও দিনশেষে সাধারণ এই মানুষই পাশ্চাত্যের আগ্রাসন এবং ইরসায়েলের নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান রক্ষা করে আসছে।
এরই ধারাবাহিকতায় সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী আন্দোলনে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর হামলায় পাঁচ সহস্রাধিক মানুষ এবং পাঁচ শতাধিক নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহত হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন থেকে এই হামলাকে আরো ত্বরান্বিত করতে বারবার আহবান করেছে এবং এক পর্যায়ে এই হামলার সমর্থনে ইরানের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ করতে প্রস্তুতি নিচ্ছিল, সেই অবস্থায় কেবল ইরান সরকারের হামলা বন্ধ বা কঠোরতার নীতি থেকে সরে আসাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেনি, বরং সাধারণ জনগণের পক্ষ থেকে আন্দোলনের গতি-প্রকৃতিকে স্তিমিত করে দেওয়াও অন্যতম প্রভাবকের ভূমিকা পালন করেছে।
এই সুযোগে ইরান কিছু মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির দণ্ড মওকুফ এবং উল্লেখযোগ্য কিছু ব্যক্তিকে কারামুক্ত করে জনগণের মধ্যে আবারও মার্কিনবিরোধী একটি মনোভাব জাগিয়ে তুলতে পেরেছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা বলতে পারি, যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে কোনো হামলা কেবল ইরান সরকার নয়, বরং সে দেশের জনগণকেও সমভাবে বিক্ষুব্ধ করে তুলতে পারে। তা ছাড়া ইরানের বড় অংশের মানুষ খামেনিবিরোধী বা বর্তমান সরকারবিরোধী হলেও তাদের কাছে এই মুহূর্তে দেশের অভ্যন্তর থেকে কোনো বিকল্প নেতৃত্ব আবির্ভূত হয়নি। রেজা পাহলভির বারবার সরকারবিরোধী আন্দোলনে জনগণকে প্ররোচিত করার আহবান জনগণের মধ্যে একই সঙ্গে নতুন করে শাহ শাসনের প্রত্যাবর্তনের শঙ্কা বাড়িয়ে তুলছে। এই অবস্থায় এ মুহূর্তে এটিই বলা যেতে পারে যে যুক্তরাষ্ট্র যতটা ভাবছে, পরিস্থিতি আসলে ততটা সহজ নয়।
লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়