ইরাক নিয়ে জুয়া খেলছে যুক্তরাষ্ট্র!
ফিরাস এন. দাব্বাঘ [যুগান্তর; ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫]

ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যের জন্য একটি সাহসী এবং অপ্রচলিত কৌশল প্রবর্তন করেছে। এ প্রশাসন ঐতিহাসিকভাবে সংঘাতজর্জরিত একটি অঞ্চলে মার্কিন প্রভাবকে আবারও বিন্যস্ত করার পরিকল্পনা করছে। তাদের লক্ষ্য হলো, অর্থনৈতিক শক্তি এবং সামরিক সংহতির মাধ্যমে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং একটি শক্তিশালী, ব্যবসায়িক মনোভাবাপন্ন মার্কিন উপস্থিতি নিশ্চিত করা।
ট্রাম্পের এ উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যের কেন্দ্রে রয়েছে ইরাকে নিযুক্ত নতুন মার্কিন দূত মার্ক সাভায়ার সেই উক্তি, যেখানে তিনি ইরাককে আবার মহান করার (make Iraq great again) লক্ষ্যের কথা জানিয়েছেন।
ইরাকের জন্য ট্রাম্পের প্রাথমিক পরিকল্পনার দুটি মূল মিশন রয়েছে-প্রথমত, সব সশস্ত্র বাহিনীকে বৈধ রাষ্ট্রের অধীনে আনা এবং দ্বিতীয়ত, ক্ষতিকর বিদেশি শক্তির-বিশেষ করে ইরানের প্রভাব ব্যাপকভাবে হ্রাস করা। প্রশাসন ইরাকি বাজারকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করতে, দেশের অবকাঠামো উন্নত করতে এবং জ্বালানি খাতের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে চায়। তাই পরিকল্পনাটি হলো এমন একটি প্রকৃত অংশীদারত্ব তৈরি করা, যা ইরাকের ঐক্যকে সম্মান করবে এবং নিশ্চিত করবে যে এটি আর মিলিশিয়া কার্যক্রম বা বাহ্যিক হস্তক্ষেপের কেন্দ্রবিন্দু থাকবে না।
মিলিশিয়া এবং রাজনৈতিক অচলাবস্থা
যুক্তরাষ্ট্রের এ কঠোর কৌশলটি ইরাকের একটি অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক এবং খণ্ডিত রাজনৈতিক পরিবেশে আঘাত হেনেছে। বর্তমানে ইরাক একটি একক রাষ্ট্রের চেয়ে বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির সমাহার হিসাবে বেশি পরিচিত। সমস্যার মূলে কেবল সংসদ নয়, বরং সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং মিলিশিয়াদের ছায়া প্রভাব রয়েছে, যারা প্রায়শই রাষ্ট্রীয় কমান্ডের বাইরে কাজ করে। ২০২৫ সালের নভেম্বরের নির্বাচনে এ গোষ্ঠীগুলো অন্যতম বড় বিজয়ী হিসাবে আবির্ভূত হয়েছিল।
বর্তমানে চলমান সরকার গঠনের আলোচনা এ অ-রাষ্ট্রীয় শক্তিগুলোর ওপর আলো ফেলেছে। তাদের ক্ষমতা ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করছে: সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো যদি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে, তবে ইরাক কীভাবে আইন প্রয়োগ করবে এবং পুনর্জাগরণের জন্য প্রয়োজনীয় বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করবে? আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং নিরাপত্তা হুমকির কারণে দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনা একটি জরুরি প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তাছাড়া, প্রকৃত স্থিতিশীলতা অর্জনের পথটি কায়েমি রাজনৈতিক স্বার্থের কারণে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ইরাকের স্থিতিশীলতার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী করা এবং ক্ষমতার পৃথকীকরণ নিশ্চিত করা জরুরি। তবুও, অনেক রাজনৈতিক দল দেশের প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নের চেয়ে লাভজনক রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতেই বেশি মনোযোগী। এর ফলে ইরাকের শাসনব্যবস্থা প্রতিদ্বন্দ্বী আনুগত্য এবং ক্ষমতার লড়াইয়ের মধ্যে টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করছে।
ওয়াশিংটনের চাল
এ উচ্চ লক্ষ্য অর্জনে ট্রাম্প প্রথাগত কূটনৈতিক পথ এড়িয়ে ১৯ অক্টোবর মার্ক সাভায়ারকে ইরাকে মার্কিন বিশেষ দূত হিসাবে নিযুক্ত করেছেন। সাভায়া ইরাকে জন্মগ্রহণকারী ডেট্রয়েটভিত্তিক একজন ব্যবসায়ী, যার কোনো প্রথাগত কূটনৈতিক পটভূমি নেই। তার অভিজ্ঞতা মূলত ক্যানাবিস শিল্পের বেসরকারি খাতের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। তবে মিশিগানে ট্রাম্পের প্রচারণার একজন সক্রিয় সমর্থক হিসাবে তিনি রাজনৈতিকভাবে পরিচিতি পান। ইরাকি মিলিশিয়াদের হাতে দুই বছরের বেশি সময় অপহৃত থাকা ইসরাইলি-রুশ শিক্ষাবিদ এলিজাবেথ সারকভকে মুক্ত করার আলোচনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। সাভায়ার সাম্প্রদায়িক এবং জাতিগত সম্পর্ক তাকে ইরাকি ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোতে এমন প্রবেশাধিকার দিয়েছে, যা প্রথাগত কূটনীতিকদের প্রায়ই থাকে না।
ইরান ফ্যাক্টর :
ভূ-রাজনৈতিক রশি টানাটানির মধ্যে ইরাকের অবস্থান তার অভ্যন্তরীণ সংগ্রামকে আরও জটিল করে তুলছে। ইরাক দুটি বড় শক্তি-যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখতে বাধ্য হচ্ছে। একদিকে ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্য স্পষ্ট: তারা ইরাকের সার্বভৌমত্ব বাড়াতে চায় এবং একই সঙ্গে শক্তিশালী, প্রায়শই ইরানসমর্থিত মিলিশিয়াদের আধিপত্য কমিয়ে দিতে চায়। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাস করে, এ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে অতিরিক্ত প্রশ্রয় দিলে দেশটিকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে এবং এর ভঙ্গুর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধ্বংস করে দেবে।
অন্যদিকে, ইরানের প্রভাব একটি শক্তিশালী এবং দীর্ঘস্থায়ী শক্তি হিসাবে রয়ে গেছে। তেহরান ইরাককে কেবল প্রতিবেশী হিসাবে নয়, বরং সমগ্র অঞ্চলে তার ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত মিত্র হিসাবে দেখে।
সাভায়ার মিশন এমন এক সময়ে শুরু হয়েছে, যখন ইরানের আঞ্চলিক ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ অভূতপূর্ব চাপের মুখে। ২০২৪ সালের শেষের দিকে আসাদ সরকারের পতনের পর সিরিয়ায় তাদের প্রাথমিক অবস্থান হারিয়ে এবং ২০২৫ সালে ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধে লেবাননে হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক ও সামরিক অবস্থান ধ্বংস হতে দেখে ইরানি প্রক্সিগুলো এখন ইরাকেও তাদের নিয়ন্ত্রণ হারানোর প্রকৃত আশঙ্কার সম্মুখীন। এ আঞ্চলিক পশ্চাদপসরণ মানে হলো, তেহরানের জন্য বাগদাদে প্রভাব বজায় রাখা একটি আঞ্চলিক শক্তি হিসাবে টিকে থাকার শেষ মরিয়া চেষ্টা।
অন্যান্য আঞ্চলিক পক্ষগুলো :
ট্রাম্পের এ বাজির সাফল্য অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির ভূমিকার ওপরও নির্ভর করে। তুরস্ক সম্প্রতি ইরাককে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার কৌশল নিয়েছে, যা ইরানের গুরুত্বকে কমিয়ে দিচ্ছে। একইসঙ্গে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো উপসাগরীয় দেশগুলো বাগদাদের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা অংশীদার হিসাবে আবির্ভূত হচ্ছে, যা ইরানের ওপর নির্ভরতার বিকল্প পথ দেখাচ্ছে।
যাইহোক, এ আঞ্চলিক শক্তিগুলোর নিজস্ব এজেন্ডাও রয়েছে-যেমন কুর্দি আন্দোলন দমনে তুরস্কের মনোযোগ-যা মার্কিন উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। সাভায়া যদি সফলভাবে এ বৈচিত্র্যময় আঞ্চলিক স্বার্থগুলোকে ট্রাম্পের পরিকল্পনার সঙ্গে মেলাতে পারেন, তবে তিনি ইরাকের অস্থির ভবিষ্যৎকে মৌলিকভাবে বদলে দিতে পারেন।
একটি বাস্তববাদী প্রয়োগ :
‘মেক ইরাক গ্রেট এগেইন’ কৌশলটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় মার্কিন স্বার্থের একটি বাস্তববাদী পুনরুত্থানকে প্রতিফলিত করে; যেখানে আদর্শগত লক্ষ্যের চেয়ে ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সাভায়ার মতো একজন অপ্রচলিত, ব্যবসামুখী দূত নিয়োগ করে ট্রাম্প প্রশাসন ‘লেনদেনমূলক বাস্তববাদ’ প্রয়োগ করছে, যেখানে অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং ব্যক্তিগত সম্পর্ককে ইরাককে ইরানের কক্ষপথ থেকে বের করে আনার কৌশলগত হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ইরাকে নিযুক্ত নতুন মার্কিন দূত স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ‘একটি পূর্ণ সার্বভৌম ইরাকে সশস্ত্র গোষ্ঠীর কোনো স্থান নেই।’ তার এ আহ্বান ইরাকি কর্মকর্তা এবং মিলিশিয়া নেতাদের মধ্যে সাড়া ফেলেছে-ইতোমধ্যেই ইরানের ঘনিষ্ঠ অন্তত তিনটি মিলিশিয়া অস্ত্র ত্যাগে জনসমক্ষে সম্মত হয়েছে। তবে অন্যান্য গোষ্ঠীগুলো এখনো তেমন সাড়া দেয়নি এবং শুরু থেকেই এ আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
ইরাকের ভবিষ্যতের ঝুঁকি :
সাভায়ার নিয়োগ ইরাকি সার্বভৌমত্বের জন্য একটি চূড়ান্ত পরীক্ষা। এটি একটি লেনদেনমূলক ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ কৌশলের দিকে পদার্পণ, যা ইরাককে আবার মহান করার লক্ষ্যে পরিচালিত। সামরিক কমান্ডকে রাষ্ট্রের অধীনে আনা এবং ইরানের প্রভাব বৃদ্ধিকারী ছায়া অর্থনীতিগুলো ধ্বংস করার প্রচেষ্টার মাধ্যমে সাভায়ার মিশন ইরাককে একটি স্থিতিশীল ও স্বায়ত্তশাসিত কেন্দ্রে রূপান্তরিত করতে চায়।
যাই হোক, এ ‘বড় জুয়ার’ সাফল্য নির্ভর করবে সাভায়ার রাজনৈতিক বিরোধিতা কাটিয়ে ওঠার এবং জাতীয় ঐক্যের দাবির সঙ্গে মার্কিন বাহিনীর উপস্থিতির সমন্বয় করার ক্ষমতার ওপর। যদি এ অপ্রচলিত কূটনৈতিক চাপ অভ্যন্তরীণ বিভাজনগুলো-বিশেষ করে বাগদাদ এবং উত্তরের আধা-স্বায়ত্তশাসিত কুর্দি অঞ্চলের মধ্যে মিটিয়ে দিতে পারে, তবে ইরাক শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক স্বাধীনতার পথ খুঁজে পেতে পারে। অন্যথায়, দেশটি ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যকার ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে চিরস্থায়ী রণক্ষেত্র হিসাবেই থেকে যাবে।
ফিরাস এন. দাব্বাঘ : গবেষক ও সহকারী অধ্যাপক, লুসাইল ইউনিভার্সিটি, কাতার