কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

হরমুজ প্রণালি: উৎপত্তি, সংকট ও বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা

ড. আব্দুল ওয়াদুদ [প্রকাশ : ইত্তেফাক, ২৯ মার্চ ২০২৬]

হরমুজ প্রণালি: উৎপত্তি, সংকট ও বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা

ইরান ও ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে আলোচিত নাম ‘হরমুজ প্রণালি’। পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক এই পথ আজ অনিশ্চয়তার মুখে। হরমুজ প্রণালিকে বলা যয় বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের ‘সাইফলাইন’। হরমুজ প্রণালির উত্তরে ইরান ও দক্ষিণে ওমান। পারস্য উপসাগর থেকে বের হওয়া তেলের একটি বড় অংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়েই বিশ্ববাজারে পৌছায়। তাই এর গুরুত্ব কেবল ভৌগোলিক নয়-অর্থনৈতিক, সামরিক ও কৌশলগত দিক থেকেও অপরিসীম। আজকের বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতিতে এই প্রণালির গুরুত্ব এতটাই বেশি যে, একে কেন্দ্র করে শক্তিধর দেশগুলোর প্রতিযোগিতা ও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। তাই এই প্রণালির উৎপত্তি কীভাবে এবং কেন এটি নিয়ে এত টানাপড়েন, তা বোঝা জরুরি।

 

 


প্রথমেই এর উৎপত্তির দিকে নজর দিলে দেখা যায়, হরমুজ প্রণালি কোনো কৃত্রিম জলপথ নয়: এটি প্রাকৃতিক ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার ফল। মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীর টেকটোনিক প্লেটগুলোর (tectonic plates) গতিশীলতার কারণে Arabian Plate এবং Eurasian Plate-4 সংঘর্ষ ঘটে। এই সংঘর্ষের ফলে পারস্য উপসাগর (Persian Gulf) এবং ওমান উপসাগরের (Gulf of Oman) মধ্যে একটি সরু জলপথ তৈরি হয়, যা পরে হরমুজ প্রণালি হিসেবে পরিচিতি পায়। অর্থাৎ, এটি প্রকৃতির দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তনের একটি অনন্য নিদর্শন।

 

 


হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের পথ আসলে খুব নির্দিষ্ট ও সংকীর্ণ-এটা ইচ্ছামতো যাওয়া-আসার জায়গা না; বরং ‘নির্ধারিত লেন’ (shipping lane) আছে। পারস্য উপসাগর থেকে তেলবাহী জাহাজগুলো প্রবেশ করে হরমুজ প্রণালিতে দুটি আলাদা দেন (Traffic Separation Scheme) দিয়ে। হরমুজ প্রণালিতে সাধারণত তিনটি অংশ থাকে ঢোকার লেন (Inbound lane) জাহাজ ভেতরে প্রবেশ করে, যার প্রস্থ প্রায় দুই-তিন কিমি আর বের হওয়ার দেন (Outbound lanc) দিয়ে জাহাজ বাইরে বের হয়। এটাও প্রায় দুই-তিন কিমি। মাঝখানে সেফটি জোন, দুই লেনের মাঝখানে ফাঁকা জায়গা দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য। পুরো প্রণালির প্রস্থ ৩৩-৩৯ কিমি হলেও ব্যবহারযোগ্য পথ খুবই সংকীর্ণ (মাত্র কয়েক কিমি)। হরমুজ পার হওয়ার পর জাহাজ যায় ওমান উপসাগর, তারপর আরব সাগর। এরপর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

 

 


তবে এই প্রণালির প্রকৃত গুরুত্ব শুরু হয় আধুনিক যুগে, বিশেষ করে তেল আবিষ্কারের পর। মধ্যপ্রাচ্যের বিশাল তেলভান্ডার থেকে উৎপাদিত তেলের একটি বড় অংশ এই প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি হয়। প্রতিদিন প্রায় ২০-২১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এই পথে সরবরাহ হয়। বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ (এক-পঞ্চমাংশ) এই প্রণালি দিয়ে বিভিন্ন দেশে পৌঁছে। তেলের মূল রপ্তানিকারক দেশগুলো সৌদি আরব (৩৭ শতাংশ), ইরাক (২৩ শতাংশ), সংযুক্ত আরব আমিরাত (১৩ শতাংশ), ইরান (১১ শতাংশ), কুয়েত (১০ শতাংশ) এবং কাতার (৪ শতাংশ)। হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন যে পরিমাণ তেল সরবরাহ হয় তার আন্তর্জাতিক বাজার মূল্য প্রায় ১.৪-২.০ বিলিয়ন ডলার, বছরে ৫০০-৭০০ বিলিয়ন ডলার। চীন, ভারত, জাপান, সাউথ কোরিয়া, সিংগাপুর, বাংলাদেশ এই পথে প্রয়োজনের বেশির ভাগ তেল আমদানি করে থাকে।

 

 

 

কোনো কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে বিশ্ব জুড়ে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যায়। সাম্প্রতিক ঘটনাতেও দেখা গেছে, এটি বন্ধ হওয়ার তেলের দাম বিশ্ববাজারে প্রভাব ফেলেছে। তাই হরমুজ প্রণালিকে বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ‘চেকপয়েন্ট’- এ পরিণত করেছে। এই কৌশলগত গুরুত্বই শক্তিধর দেশগুলোর আগ্রহের মূল কারণ। ইরান প্রণালির উত্তর উপকূলে অবস্থান করে এবং দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলে তার প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা করে আসছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এই পথকে আন্তর্জাতিক নৌপথ হিসেবে উন্মুক্ত রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। কারণ, এই প্রণালিতে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি হলে তা সরাসরি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে সংকট তৈরি করে, যা বিশ্ব অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করে তুলে। উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতি এই প্রণালির ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। ফলে তারা প্রত্যেকেই চায় এই পথটি নিরাপদ ও তাদের স্বার্থানুযায়ী নিয়ন্ত্রিত থাকুক। একই সঙ্গে চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্য অর্থনৈতিক শক্তিগুলোরও এই প্রণালির প্রতি গভীর নজর রয়েছে, কারণ তাদের জ্বালানি নিরাপত্তা এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

 

 


এখানে নিয়ন্ত্রণ বলতে সরাসরি মালিকানা বোঝায় না; বরং বোঝায় প্রভাব বিস্তার, সামরিক উপস্থিতি এবং কৌশলগত দখলদারিত্ব। বিভিন্ন দেশ নৌবাহিনী মোতায়েন, সামরিক ঘাঁটি স্থাপন কিংবা আঞ্চলিক জোট গঠনের মাধ্যমে এই প্রণালিতে নিজেদের প্রভাব বজায় রাখতে চায়। কারণ, যে এই পথকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, সে বিশ্ব অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্নায়ুকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা অর্জন করবে।

 

 


হরমুজ প্রণালি কেবল একটি প্রাকৃতিক জলপথ নয়: এটি আধুনিক বিশ্বের শক্তির ভারসাম্যের একটি কেন্দ্রবিন্দু। এর উৎপত্তি প্রকৃতির হাতে হলেও, এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিযোগিতা সম্পূর্ণ মানবসৃষ্ট। এই বাস্তবতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়-ভূগোল কখনো কখনো রাজনীতির নিয়ামক হয়ে ওঠে, আর একটি সরু জলপথও হয়ে উঠতে পারে বিশ্ব শক্তির দ্বন্দ্বের প্রধান মঞ্চ।

 

 

 

বিশ্ব অর্থনীতির প্রাণরস হিসেবে বিবেচিত জ্বালানি তেলের প্রবাহ হঠাৎ থমকে গেলে তার অভিঘাত কতটা গভীর হতে পারে-সাম্প্রতিক হরমুজ প্রণালি সংকট তার একটি বাস্তব উদাহরণ। এখানে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়া মানেই বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া। সম্প্রতি ইরান ও ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে এই প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি শুধু পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে খাদ্য, শিল্পপণ্য এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজারেও।

 

 

 

কারণ আধুনিক অর্থনীতিতে প্রায় প্রতিটি পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে জ্বালানির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলো, যেমন বাংলাদেশসহ অনেকগুলো দেশ এই সংকটে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বাংলাদেশে প্রয়োজনীয় মোট জ্বালানির ৯৫ শতাংশ আমদানি-নির্ভর। মোট তেলের ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান ও কাতার থেকে আসে হরমুজ প্রণালি হয়ে। মূলত ক্রুড অয়েল ও ডিজেল আসে এসব দেশ থেকে যা পরে প্রক্রিয়াজাত করা হয় বাংলাদেশের ইস্টার্ন রিফাইনারির মাধ্যমে।
বাংলাদেশ মূলত দুই ধরনের জ্বালানি আমদানি করে: ১. অপরিশোধিত তেল (crude oil), ২. পরিশোধিত তেল (diesel, furnace oil, petrol)। মোট আমদানি (আনুমানিক) বছরে ৭-৮ ডলার মিলিয়ন মেট্রিক টন ব্যারেলে হিসাব করলে ৫০-৬০ মিলিয়ন ব্যারেল/বছরে। দৈনিক ব্যবহার ১.৫-২ লাখ ব্যারেল।

 

 

 

খাতভিত্তিক ব্যবহার:

উৎপাদন: ৩০-৩৫ শতাংশ, পরিবহন: বিদ্যুৎ ৪০ শতাংশ, শিল্প: ২০-২৫ শতাংশ জ্বালানি তেলের জন্য বাংলাদেশ একক কোনো দেশের ওপর নির্ভরশীল নয়। তবে প্রধান উৎস মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ। সিংগাপুরের তেল বাণিজ্য কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশ রিফাইন্ড তেল (ডিজেল, অকটেন) কিনে থাকে, যার অংশ ২০-৩০ শতাংশ। এছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড থেকেও রিফাইন্ড তেল আমদানি করা হয়। বিকল্প ও জরুরি উৎস ভারত ও চীন, অর্থাৎ সংকটের সময় দ্রুত সরবরাহের জন্য ব্যবহৃত হয়।

 

 

 

স্পট মার্কেট (বিশ্ববাজার) হিসেবে আফ্রিকা, ইউরোপ বা অন্যান্য অঞ্চল থেকেও মাঝেমধ্যে জ্বালানি তেল কেনা হয় আন্তর্জাতিক ট্রেডারের মাধ্যমে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়া মানে শুধু তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়া নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতির শিরায় রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া। বাংলাদেশের বাস্তবতা আরও স্পষ্ট। স্থানীয় উৎপাদন খুবই সীমিত। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের সামান্য ওঠানামাও আমাদের অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলে। হরমুজ প্রণালি এক মাস বন্ধ থাকলে সরাসরি তেলের সরবরাহে বাধা সৃষ্টি হবে, তবে তার চেয়েও বড় সমস্যা হবে দামের ঊর্ধ্বগতি। প্রথম ধাক্কা আসবে বিদ্যুৎ খাতে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ এখনো ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল।

 

 

 

 তেলের দাম বেড়ে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ হঠাৎ করেই বেড়ে যাবে। সরকার হয় ভর্তুকি বাড়াতে বাধ্য হবে, নয়তো লোডশেডিং বাড়াতে হবে। দুই ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগী হবে সাধারণ মানুষ এবং শিল্প খাত। দ্বিতীয় বড় আঘাত আসবে পরিবহন খাতে। ডিজেলের দাম বাড়লে বাস, ট্রাক, লঞ্চ-সব ধরনের পরিবহনের খরচ বাড়বে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে বাজারে। পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়লে খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় সবকিছুর দাম বেড়ে যাবে। ফলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে, যা ইতিমধ্যেই সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। শিল্প খাতও এই সংকট থেকে রেহাই পাবে না। তৈরি পোশাকসহ দেশের রপ্তানিমুখী শিল্পগুলো বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। উৎপাদন ব্যাহত হলে রপ্তানি সময়মতো করা সম্ভব হবে না, যা আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে।

 

 

 

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। বেশি দামে তেল আমদানি করতে হলে ডলার ব্যয় বাড়বে। এতে রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হবে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। সব মিলিয়ে দেখা যায়, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়া মানে বাংলাদেশের জন্য প্রায় ১ থেকে ২ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হওয়া-যার প্রভাব সরাসরি ও পরোক্ষভাবে পড়ে প্রতিটি নাগরিকের জীবনে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ মানে বাংলাদেশে তেল পাওয়া যাবে না এমন না, কিন্তু কঠিন ও অনেক বেশি দামে পাওয়া। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে বাংলাদেশে তিনটি বড় সমস্যা হবেই। তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটবে, তেলের দাম বাড়বে পাবে ও অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি হবে। বিশ্ববাজারে এই অস্থিরতার পেছনে যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা একটি বড় কারণ। মিডেল ইস্ট অঞ্চলের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, সামরিক উপস্থিতি এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা হরমুজ প্রণালিকে বারবার ঝুঁকির মুখে ফেলে। যে কোনো সামান্য উত্তেজনাও এখানে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে।

 

 

 

এ পরিস্থিতিতে বিকল্প জ্বালানি উৎস ও সরবরাহ পথ খোঁজা এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক দেশ ইতিমধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি-যেমন সৌর ও বায়ুশক্তির দিকে ঝুঁকছে, যাতে তেলের ওপর নির্ভরতা কমানো যায়। একই সঙ্গে তেল আমদানির উৎস বৈচিত্র্যকরণ এবং কৌশলগত মজুত গড়ে তোলার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এই সংকট একটি সতর্কবার্তা। দীর্ঘ মেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে বিকল্প শক্তির উন্নয়ন, জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানো জরুরি। অন্যথায় বৈশ্বিক যে কোনো অস্থিরতা দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে বারবার নাড়া দিয়ে যাবে। হরমুজ প্রণালির এই সংকট কেবল একটি আঞ্চলিক সমস্যা নয়; এটি বিশ্ব অর্থনীতির আন্তঃনির্ভরতার একটি প্রকট উদাহরণ। একটি সংকীর্ণ জলপথে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়া পুরো বিশ্বের বাজারকে অস্থির করে তুলতে পারে-এ বাস্তবতা আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। বর্তমান যুদ্ধের কারণে এই প্রণালিতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়েছে অনেক গুণ। জাহাজ চলাচল অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে এবং বিমা খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

 

 

হরমুজ প্রণালি বর্তমানে কার্যত ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল’-এ পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি বিকল্প রুট বিবেচনা করছে, আবার অনেক তেলবাহী জাহাজ নিরাপত্তার কারণে বিলম্বিত হচ্ছে। এর ফলে সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়েছে, যা বিশ্ববাজারে তেলের দামের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এই পরিস্থিতির পেছনে মূলত সামরিক কৌশলগত হিসাব-নিকাশ কাজ করছে। ইরান বারবার ইঙ্গিত দিয়েছে যে, তার ওপর আক্রমণ বা চাপে পড়লে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হবে। অন্যদিকে, ইসরাইল সরাসরি এই প্রণালির তীরবর্তী দেশ না হলেও, তার সঙ্গে জড়িত আঞ্চলিক সংঘাত পরিস্থিতিকে অস্থির করে তুলছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সামরিক উপস্থিতি, যা একদিকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে উত্তেজনাকে আরও সংবেদনশীল করে তুলছে। বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এটি একটি গুরুতর সতর্কবার্তা।

 

 

এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। উত্তেজনা প্রশমিত করতে সংলাপ ও সমঝোতার বিকল্প নেই। একই সঙ্গে, দীর্ঘ মেয়াদে বিশ্বকে বিকল্প জ্বালানি উৎস ও সরবরাহ ব্যবস্থার দিকে এগোতে হবে, যাতে একটি মাত্র নৌপথের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো যায়। ইরান-ইসরাইল সংঘাত শুধু একটি আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব নয়; এটি বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। হরমুজ প্রণালির বর্তমান অনিশ্চিত অবস্থা আমাদের আবারও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে-বিশ্বায়নের এই যুড়ে কোনো অঞ্চলের সংকট আর স্থানীয় থাকে না, তা দ্রুতই বৈশ্বিক সমস্যায় রূপ নেয়।

 

 

লেখক: ফিকামলি তত্ত্বের জনক, বিশ্ববিদ্যালয় সাবেক শিক্ষক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক