গ্রামীণ অর্থায়ন টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি
ড. মো. শফিকুল ইসলাম [সূত্র : জনকণ্ঠ, ৮ নভেম্বর ২০২৫]

বাংলাদেশের অর্থনীতি কৃষিপ্রধান
বাংলাদেশের অর্থনীতি কৃষিপ্রধান। জনসংখ্যার ৬৭ শতাংশ বা তার বেশি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষি কার্যক্রমের ওপর নির্ভরশীল। মোট অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও কৃষি বিভাগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ এবং খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা, দারিদ্র্য হ্রাস এবং আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি অপরিহার্য সামাজিক খাত।
সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং ব্যাংকিং ক্ষেত্র হলো গ্রামীণ এবং কৃষি অর্থায়ন, যা আর্থিক ব্যবস্থার সামগ্রিক উন্নয়নে অনেকটা পিছিয়ে রয়েছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের গ্রামীণ অঞ্চলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির হার ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৯ শতাংশে, যা ২০১৫ সালে ছিল মাত্র ৪০ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় কৃষি ঋণের লক্ষ্য ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৬ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য নতুন দিগন্ত তৈরি করেছে।
গ্রামীণ অর্থায়ন বাংলাদেশে দারিদ্র্য বিমোচনের একটি উন্নয়ন কৌশ। বিশেষ করে মহিলাদের গ্রামীণ কাজে উৎসাহিত করে দ্রুত এবং বাস্তব ফল প্রদান করে দারিদ্র্য কমিয়ে থাকে। গ্রামীণ অর্থায়ন প্রায়ই এই ভিত্তির ওপর ভর করে গ্রামীণ মানুষকে তহবিলের অ্যাক্সেস দিয়ে দারিদ্র্যের চক্র থেকে মুক্ত হতে সহযোগিতা করে থাকে। ২০২৩ সালের এমআইএস রিপোর্ট অনুযায়ী, ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচিতে নারীর অংশগ্রহণ ৮৯ শতাংশে পৌঁছেছে, যা নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে গ্রামীণ অর্থায়নের শক্তিশালী ভূমিকা নির্দেশ করে।
জনগণের সম্পদ এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে উৎপাদনের বিভিন্ন উপাদানকে সংযুক্ত করে, গ্রামীণ অঞ্চলে আর্থিক পরিষেবার মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মের একাধিক দিক এবং বিভিন্ন আয় স্তরের বাসিন্দাদের তথ্য প্রচার করে এবং অর্থের সঠিক ব্যবহার করে সার্বিক গ্রামীণ উন্নয়ন সম্ভব। আর্থিক পরিষেবাগুলো যা কৃষি এবং অ-কৃষি উভয় ক্রিয়াকলাপকে সক্ষম এবং গতিশীল করে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গ্রামীণ অর্থায়নের মাধ্যমে যারা ব্যবসা শুরু করেছেন তাদের আয় প্রথম দুই বছরে গড়ে ২৭ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
আর্থিক পরিষেবা প্রদানকারীরা গ্রামীণ অর্থের ধারণা এবং গ্রামীণ অর্থায়নকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অন্তর্ভুক্তির কাজ সহজ করেছে। যা খুবই ইতিবাচক। ক্ষুদ্রঋণ, বিনিয়োগ ও বীমার মতো গ্রাহককেন্দ্রিক আর্থিক সুবিধা প্রদান এবং অন্যান্য আর্থিক সেবার মাধ্যমে নতুন নতুন পণ্য গ্রামীণ অর্থনীতিতে সংযুক্ত করে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন করতে পেরেছে সরকার। ২০২৪ সালে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবার ৮০ শতাংশ লেনদেন গ্রামীণ অঞ্চলে সম্পন্ন হয়েছে, যা ডিজিটাল আর্থিক অন্তর্ভুক্তির শক্তিশালী প্রবাহ নিশ্চিত করে।
সামগ্রিক গ্রামীণ উন্নয়নে গ্রামীণ অর্থায়ন দ্বারা সাহায্য করা হয়। বিশেষ করে অনুন্নত দেশগুলোয়। গ্রামীণ অর্থায়ন গ্রামীণ জনগণকে আর্থিক পরিষেবা ও নানামুখী আর্থিক পণ্যগুলোতে অ্যাক্সেস দেয়, যা এক সময় কেবলমাত্র শহরে বসবাসকারী ব্যক্তিদের জন্য উম্মুক্ত ছিল। গ্রামীণ অর্থায়ন বাংলাদেশে গ্রামীণ উন্নয়নের জন্য একটি তলানি থেকে ঊর্ধ্বমুখী দৃষ্টিভঙ্গি উন্নয়ন ঘটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ২০২২-২০২৪ সালে কৃষি যান্ত্রিকীকরণে সরকারের ভর্তুকি কর্মসূচি গ্রামীণ শ্রম সাশ্রয়, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কৃষকের লাভের অংশ বাড়িয়েছে। ফলে গ্রামীণ অর্থায়নের কার্যকারিতা হয়েছে আরও সুদৃঢ়।
গ্রামীণ অর্থায়ন দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামীণ অর্থায়ন গ্রামীণ মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে আরও বেশি ব্যবহার করা যেতে পারে, যা দেশের টেকসই উন্নয়ন বাস্তবায়ন করতে কাজে লাগতে পারে। এটি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে নগদ লেনদেন, অর্থপ্রদান, আমানত, ক্রেডিট এবং পেনশনের মতো ব্যাংকিং ও অর্থনৈতিক কার্যকলাপে অ্যাক্সেস দেয়। এই ধরনের পরিষেবাগুলোতে অ্যাক্সেস গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে সহযোগিতা করে। গ্রামীণ এলাকায় বিশ্বের দরিদ্র জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। ফলে বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য দূরীকরণের অন্যতম চাবিকাঠি হল এসব স্থানে বসবাসকারী মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন। বাংলাদেশের বর্তমান ঝউএ অগ্রগতি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দারিদ্র্য হ্রাসে গ্রামীণ অর্থায়নই প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত।
অন্যদিকে গ্রামীণ অর্থায়ন বলতে তহবিল সংগ্রহ এবং পাশাপাশি গ্রামীণ জনগণকে, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার কৃষকদের বিভিন্ন বাণিজ্যিক কার্যক্রমের সঙ্গে তাদের আর্থ-সামাজিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার জন্য নগদ অর্থ প্রদানকে বোঝায়। গ্রামীণ ফাইন্যান্সের মধ্যে রয়েছেÑ সমস্ত বিভাগীয় কাঠামোগত ও অনানুষ্ঠানিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রামীণ দরিদ্র মানুষকে একাধিক আর্থিক সুবিধা প্রদান করা এবং অন্যান্য ছোট ও মাঝারি গ্রামীণ সংস্থা এবং কৃষি প্রক্রিয়াকরণ সংস্থাগুলোকে আরও উল্লেখযোগ্য আর্থিক পরিষেবা প্রদান করা।
ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান যা আর্থিক সংস্থা থেকে শুরু করে গ্রামীণ ব্যাংক এবং কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন ব্যাংক, সেইসঙ্গে দেশীয় ঘূর্ণনশীল সঞ্চয় এবং ক্রেডিট ইউনিয়নগুলো গ্রামীণ অর্থ প্রদান করে। গ্রামীণ অর্থায়ন দারিদ্র্য হ্রাস, প্রবৃদ্ধি, জীবনযাত্রার মান এবং গ্রামীণ এলাকায় উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। উৎপাদন বাড়াতে এবং গ্রামীণ এলাকায় উপকারভোগীদের আয় ও জীবনযাত্রার মান উন্নত করার জন্য উৎপাদনের পরিবর্তনশীলতার সমন্বয়ে এটি তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৪ সালে কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্পে ১১ শতাংশ নতুন বিনিয়োগ হয়েছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করেছে।
কৃষি অর্থ, ক্ষুদ্র অর্থায়ন এবং এসএমই ফাইন্যান্স গ্রামীণ অর্থায়নের অংশ হিসেবে কাজ করে। কৃষি অর্থ বলতে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি ঋণ, অর্থায়ন এবং কৃষি ফসল এবং পশুসম্পদ বীমাসহ কৃষি উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ এবং বাণিজ্যিকীকরণের জন্য আর্থিক সেবার একটি পরিসীমা বোঝায়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের কৃষি খাত ছিল দেশের প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি। এতে জিডিপির প্রায় ৬০ শতাংশ অবদান ছিল। বাংলাদেশে মানুষের জীবিকা, চাকরি এবং জিডিপি অবদানের জন্য কৃষি গুরুত্বপূর্ণ।
সাম্প্রতিক দশকে, এর অবদান হ্রাস পেয়েছে, যা ২০১০ সালে ১৭ শতাংশ থেকে ২০২০ সালে ১২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এসেছিল। দারিদ্র্য হ্রাস এবং খাদ্যনিরাপত্তা বজায় রাখার ক্ষেত্রে শিল্প আমাদের অর্থনীতির সাফল্যের একটি মূল খাত। গ্রামীণ অর্থায়নের পরিষেবা উৎপাদনশীলতা এবং গ্রামাঞ্চলে বসবাসরত মানুষের আয় বৃদ্ধি, সম্ভাব্য দারিদ্র্য হ্রাস করে এবং তাদের জীবনযাত্রার মান আরও উন্নত করার মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০২৩-২৪ সালে কৃষি উৎপাদনে বার্ষিক গড়ে ৩ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, যা গ্রামীণ অর্থায়নের প্রসারের প্রতিফলন।
কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য একটি কার্যকরী হাতিয়ার। এটি খাদ্যের পর্যাপ্ততা বৃদ্ধি করে এবং দেশের দারিদ্র্য হ্রাস করে। যাই হোক, শিল্পে পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং সমসাময়িক প্রযুক্তির অভাবের কারণে জিডিপিতে কৃষির অবদান অপর্যাপ্ত এবং অসন্তোষজনক ছিল। এই পরিপ্রেক্ষিতে, এক গবেষণায় দেখা গেছে যে কৃষি খাতে ব্যাংক ঋণ এবং এনজিওর ঋণ দেশের সামগ্রিক কৃষি উৎপাদন/উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। কৃষি ক্ষেত্রে আরও অর্থায়ন দেশের সমষ্টিগত কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করবে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গ্রামীণ অর্থায়ন, যেমন- ব্যাংক ও এনজিও কৃষি খাতে ঋণ, বাংলাদেশের জিডিপিকে প্রভাবিত করেছে। আরও দেখা গেছে গ্রামীণ অর্থায়ন মানুষের আয় বৃদ্ধি, উদ্যোক্তা, কৃষি জমির বৃদ্ধি এবং তাদের বর্তমান পরিস্থিতির প্রতি জনগণের সন্তুষ্টিকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করে। ২০২৪ সালে কৃষি খাতে এনজিও ঋণ বিতরণ ১৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা এ খাতের প্রবৃদ্ধিতে সরাসরি সহায়তা করেছে।
বাংলাদেশের গ্রামীণ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গ্রামীণ অর্থের প্রভাব নির্ণয়কারী কৃষি ঋণ, কৃষিতে বিনিয়োগ এবং নতুন ব্যবসা শুরু করার মতো বিষয়গুলোকে চিহ্নিত করে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। গ্রামীণ বহুমাত্রিক দিকগুলোর সঙ্গে গ্রামীণ অর্থায়নের ইতিবাচক প্রভাব বাড়ানোর জন্য কাঠামোগত, নীতি সংস্কার এবং অন্যান্য বড় পরিবর্তনের দরকার রয়েছে। ২০২৪ সালে ঝগঊ নীতিমালার হালনাগাদ সংস্করণ গ্রামীণ উদ্যোক্তা তৈরিতে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য।
বাংলাদেশের গ্রামীণ এলাকায় জীবনযাত্রার মানে যে অভূতপূর্ব উন্নয়ন এবং ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে, তার পেছনে কাজ করেছে গ্রামীণ অর্থায়নের ব্যাপক উন্নয়ন। পাশাপাশি কৃষির আধুনিকায়ন, যোগাযোগ এবং পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি, কৃষি সম্পৃক্ত অন্যান্য খাতের বিস্তার, তথ্য ও প্রযুক্তির প্রসার এবং প্রবাসী আয় বৃদ্ধিও কার্যকর ভূমিকার রাখছে। তবে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে সরকারের যথাযথ পদক্ষেপ। তাই গ্রামীণ অর্থায়ন ব্যবস্থাকে সরকারকে আরও বেশি নজর দিতে হবে যা দেশের মানুষের সামগ্রিক উন্নয়ন ঘটাতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। ইতোমধ্যে স্মার্ট বাংলাদেশ কর্মপরিকল্পনা ২০৪১-এ গ্রামীণ অর্থায়নকে ডিজিটাল কৃষি, ডেটা-ভিত্তিক ঋণ মূল্যায়ন এবং গ্রামীণ শাখাবিহীন ব্যাংকিং সম্প্রসারণে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক
হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
ত্রিশাল, ময়মনসিংহ