গণভোট ও সংবিধান
[Share Biz News শনিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২৫]

একটি বাড়ি বানিয়েছেন, বাড়ির মালিক জনগণ। বাড়ির রক্ষাবেক্ষণের জন্য কেয়ারটেকার (তত্ত্বাবধায়ক) নিয়োগ দেয়া হয়। বাড়ি দেখাশোনার জন্য নিয়মকানুন হচ্ছে সংবিধান, যা দেশের মূলনীতি। যার ওপর রাষ্ট্রের পরিচালন ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে থাকে। অর্থাৎ রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়মের বই হচ্ছে সংবিধান। রাজনৈতিক দল হলো- বাড়ি দেখাশোনার কেয়ারটেকার। রাজনৈতিক দলগুলো প্রতি পাঁচ বছর বা নির্দিষ্ট সময় পরপর বাড়ির মালিকের কেয়ারটেকার হওয়ার জন্য আবেদন করেন। ইন্টারভিউ বোর্ড হচ্ছে নির্বাচন। রাজনৈতিক দল নির্বাচনের পর দেশটা কীভাবে চালাবে তার জন্য ইশতেহার বা মেনিফেস্টো জনগণের সামনে উপস্থাপন করে। যেমনটা একজন চাকরি প্রার্থী ইন্টারভিউ বোর্ডে বলেন- আমাকে চাকরি দিলে এটা করব, ওটা করব ইত্যাদি। রাজনৈতিক দলের মেনিফেস্টো দেখে জনগণ রাষ্ট্রে পরিচালনার দায়িত্ব দেন। বাড়ির মালিক কেয়ারটেকারকে যেসব নিয়মকানুন দিয়ে দিল, মালিকের দেয়া নিয়মই হলো সংবিধান। তাতে উল্লেখ থাকে কেয়ারটেকার কী কী করতে পারবে।
কেয়ারটেকার (তত্ত্বাবধায়ক) দৈনন্দিন কাজ করতে পারবে, তা ঠিক আছে। যেমন- এই বাড়ি ভাড়া উঠানো, বাড়ির ময়লা পরিষ্কার করা, ছাদে গাছে পানি দেয়া, দারোয়ানের বেতন দেয়া ইত্যাদি। এবং কী কী করতে পারবে না তাও বলে দেয়। যেমন- বাড়ি ভেঙে কমপ্লেন্স বানাতে পারবে না। বাড়ির বড় কিছু করতে হলে অর্থাৎ মূল কাঠামো পরিবর্তন করতে হলে বাড়ির মালিককে জিজ্ঞেস করতে হবে। তত্ত্বাবধায়ক কী করতে চাচ্ছে তা বাড়ির মালিক অনুমতি দিলেই তা করতে পারবে। কেয়ারটেকার বা তত্ত্বাবধায়ক (সরকার) যখন বাড়ির দেয়াল ভাঙার দরকার মনে করে। তখন বাড়ির মালিককে জিজ্ঞেস করবে কোন উপায়ে? জিজ্ঞেস করার উপায়-ই হলো গণভোট।
বাড়ির প্রবেশদ্বার, প্রধান দেয়াল ভাঙতে বা বদলাতে হলে বাড়ির মালিকের (জনগণের) অনুমতি লাগবে। কারণ এগুলো বাড়ির চরিত্র নির্দেশ করে। এই নীতিগুলো মেনে-ই কেয়ারটেকারকে (সরকারকে) রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হয়। এটির যেকোনো একটিতে আঘাত লাগা মানে বাড়ির প্রধান কাঠামোতে আঘাত লাগা। কেয়ারটেকার (সরকার) যেন ক্ষমতার অপব্যবহার করতে না পারে এবং বাড়ির মালিকের অধিকার ক্ষুণ্ন করতে না পারে এজন্যই সংবিধান মালিককে (জনগণকে) শক্তিশালী ঢাল দিয়েছে। এই বাড়ির চূড়ান্ত ক্ষমতা উত্তরাধিকার সূত্রে বাড়ির মালিক অর্থাৎ জনগণের হাতে। বাড়ির দেয়াল বা প্রবেশদ্বার পরিবর্তন করা সহজ নয়। কারণ এগুলো দুষ্পরিবর্তনীয়। বাড়ির মালিকের মৌলিক অধিকার বিষয়গুলো স্থগিত করতে চাইলে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টে দ্বারস্থ হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ সংবিধান তৈরি হয়েছে এক ঐতিহাসিক ঘটনার মধ্য দিয়ে, যা ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গৃহীত হয় এবং একই বছরের ১৬ ডিসেম্বর কার্যকর হয়। এটি জনগণের প্রতিনিধিদের দ্বারা তৈরি, যদিও জনপ্রতিনিধিরা ছিল ভিন্ন দেশের। বাংলাদেশ সংবিধান হলো এমন এক ধরনের সংবিধান, যা সহজে পরিবর্তন বা সংশোধন করা যায় না। এই ধরনের সংবিধান পরিবর্তন করতে হলে একটি বিশেষ ও জটিল পদ্ধতির প্রয়োজন হয়, এজন্য সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশের সংবিধান একটি দুষ্পরিবর্তনীয় সংবিধান। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়- কারণ এটি সংশোধন করতে হলে জাতীয় সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের ভোটের প্রয়োজন হয়, যা একটি কঠিন প্রক্রিয়া।
সংবিধান একটি রাজনৈতিক দলীল। ইহা রাষ্ট্রের জনগণের কল্যাণার্থে ব্যবহার হয়। সংবিধানে কার কী ক্ষমতা, তার সীমানা টেনে দেয় এবং প্রতিটি পদের ক্ষমতাকে নির্দিষ্ট করে দেয়। তাই সংবিধানের ওপরে কোনো আইনই প্রাধান্য পেতে পারে না। তবে জনগণের অভিপ্রায় প্রাধান্য পাবে। যখন নির্বাচিত জনপ্রতিনির মাধ্যমে কোনো বিষয়কে আইনি ভিত্তি দিবে জাতীয় সংসদ। আগে গণভোট, পরে জাতীয় সংসদ নির্বাচন, তা আইনের প্রচলিত নিয়মের পরিপন্থি ও উদ্ভট ধারণা বটে।
গণভোট হলো একটি প্রস্তাব, আইন বা রাজনৈতিক বিষয়ে ভোটারদের সরাসরি ভোট দেয়ার একটি প্রক্রিয়া, যেখানে জনগণ তাদের প্রতিনিধিদের পরিবর্তে নিজেদের মতামত প্রকাশ করে। এটি বাধ্যতামূলক হতে পারে, যেখানে ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে একটি নতুন নীতি গ্রহণ করা হয়। এটি কোনো গুরুত্বপূর্ণ বা বিতর্কিত বিষয়ে জনগণের মতামত সরাসরি জানার একটি উপায়, যেমন- বাংলাদেশের সংবিধানের কিছু অনুচ্ছেদ সংশোধনের জন্য বা সামরিক শাসনের মতো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য জনগণের সমর্থন আদায়ের জন্য গণভোট অনুষ্ঠিত হতে পারে। গণভোট অনুষ্ঠিত হয় একটিমাত্র প্রশ্নের ওপর ভিত্তি করে। উত্তর হতে হবে, ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’। বাংলাদেশে অতীতের তিনটি গণভোটও একটি প্রশ্নের ওপরই হয়েছে। গণভোটের মাধ্যমে কোনো প্রস্তাব দেয়ার সুযোগ থাকে না। আওয়ামী লীগ আমলে ২০১১ সালে জনগণের মতামত না নিয়ে-ই পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান থেকে গণভোটের বিধান বাতিল করে দেয়া হয়েছিল। তবে পরে পঞ্চদশ সংশোধনীকে চ্যালেঞ্জ করা এক মামলার রায়ে ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর সংশোধনীতে বাদ দেয়া গণভোট সংক্রান্ত ১৪২ অনুচ্ছেদ মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট পুনরায় বহাল করা হয়।
বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনটি গণভোটের নজির আছে। প্রথমটি ১৯৭৭ সালে পঁচাত্তর-পরবর্তী পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী বীর উত্তম জেনারেল জিয়াউর রহমান জনগণের মধ্যে তার আস্থা এবং ক্ষমতায় থাকার বৈধতার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ১৯৮৫ সালে সামরিক শাসক এইচ এম এরশাদ তার ক্ষমতার বৈধতা প্রমাণ করতে গণভোটের আয়োজন করে ছিলেন। সর্বশেষ গণভোট হয়েছিল ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব সংসদে পাস হওয়ার পর জনগণ তা গ্রহণ করছেন কিনা, তা যাচাইয়ের জন্য গণভোটের আয়োজন করা হয়েছিল। ২০১৬ সালের আইভরিয়ান সংবিধান সংশোধনী গণভোটের ব্যালট; ১৯৭১ সালের একটি মার্কিন গণভোটের প্রচারপত্র; ১৯৪৬ সালের ইতালীয় গণভোট, যেখানে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল দেশটি প্রজাতন্ত্র হবে নাকি রাজতন্ত্র ইত্যাদি গণভোটের আন্তর্জাতিক উদাহরণ।
আপনি ও আমি ফুটবল খেলতে নামলাম, আর আপনি বললেন ফুটবল খেলার নিয়মনীতি মানবেন না! ফাউলের নিয়ম, অফসাইডের নিয়ম, হ্যান্ডবলের নিয়ম ইত্যাদি মানি না বলবেন! কারণ আপনার লক্ষ্য শুধু গোল করা। জনগণের বৃহৎ স্বার্থের কথা বলে এবং জনগণের দোহাই দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার কিছু মৌলিক নিয়মগুলো মানবেন না, এটা হতে পারে কি! সারা পৃথিবীর প্রচলিত নিয়ম হচ্ছে একটি প্রস্তাব আগে সংসদে আইন পাস হবে, পরে গণভোটের জন্য দেয়া হবে। সংসদকে একটা আইন পাস করতে পক্ষে বা বিপক্ষে বাধ্য করলে তখন আর সংসদের স্বার্বভৌমত্ব থাকে না। যেহেতু জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করার মাধ্যমে মহান জাতীয় সংসদে আইন পাস করতে দায়িত্ব অর্পণ করে জনগণ (রাষ্ট্রের মালিক)।
নির্বাহী বিভাগের প্রধান কখনই আইন পাস করতে পারে না। নির্বাহী বিভাগ যদি আইন পাস করে, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে বিচার বিভাগ বলতে পারে আমরা আইন পাস করবো, কিংবা আইন সভা বা জাতীয় সংসদ বলতে চাইবে আমরা বিচার করবো, যা তাদের কার্য নয়। নির্বাহী বিভাগ সাংঘর্ষিক অধ্যাদেশ জারি করলে, এই জারিকৃত অধ্যাদেশ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে। একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হাতে নির্বাহী ও আইন পাসের ক্ষমতা থাকলে স্বাধীনতা নষ্ট হয়। তখন গণতন্ত্রচর্চা বাধাগ্রস্ত হয়। সংবিধান সংশোধন করতে পারে একমাত্র জাতীয় সংসদ, এটা অধ্যাদেশ দিয়ে হবে না সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদে তা উল্লেখ রয়েছে। আইন পাস করার ক্ষমতা মহান জাতীয় সংসদের। সংসদ কার্যকর না থাকলে বিশেষ পরিপ্রেক্ষিতে অধ্যাদেশ জারি করতে পারে মহামান্য রাষ্ট্রপতি। অধ্যাদেশ দিয়ে সংবিধান সংশোধন করা অত্যন্ত বিপজ্জনক বটে, আগে জারিকৃত বহু অধ্যাদেশ মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক বাতিল হয়েছে। অধ্যাদেশ দিয়ে সংবিধান সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস করা হলে জনগণ, ভোট এবং জাতীয় সংসদের দরকার আছে কি!
আইনজীবী