গণতান্ত্রিক কল্যাণরাষ্ট্র গড়ার পথ কী
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষক... [সূত্র : প্রথম আলো, ২৮ আগস্ট ২০২৫]

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী একটি গণতান্ত্রিক কল্যাণরাষ্ট্র গড়ার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছে। কল্যাণরাষ্ট্র দান বা করুণার ওপর দাঁড়ায় না। অধিকার কল্যাণরাষ্ট্রের মৌলিক ভিত্তি। রাষ্ট্রকে নাগরিকদের অধিকারভিত্তিক মৌলিক চাহিদা পূরণের নিশ্চয়তা দিতে হয়। খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক চাহিদা সুরক্ষিত হতে হয়। গণতান্ত্রিক হতে হলে মৌলিক অধিকার সমুন্নত রাখতে হয়।
প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন নিয়ে আলোচনায় এনজিওগুলোর বিষয় অনেকটাই অনুপস্থিত। অর্থনীতিতে সক্রিয় এনজিও ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান অনেক। ৭২৪টি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান প্রায় ১ লাখ ৫৯ হাজার ৪০০ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করে। তাদের ৩ কোটি ২০ লাখ ঋণগ্রহীতা রয়েছে।
রাষ্ট্রের কল্যাণের লক্ষ্যে অর্থনৈতিক এনজিও ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে শুধু ঋণ, সেবা ও ত্রাণ বিতরণের প্রচলিত গণ্ডি থেকে বের করে আনা দরকার। এ সংস্থাগুলো সম্পদ ও ব্যাপ্তি বাজারব্যবস্থাকে নতুন রূপ দিতে সক্ষম। তাদের খাদ্যমূল্য স্থিতিশীল রাখা, কৃষকের আয় নিশ্চিত করা ও সাশ্রয়ী আবাসন সরবরাহের মতো ব্যবস্থায় নিয়োজিত করা সম্ভব।
অবশ্যই নাগরিক সমাজের স্বাধীন কণ্ঠ, জনমত তৈরি, অ্যাডভোকেসি, সংগঠিতকরণ ও জবাবদিহি তৈরির ক্ষেত্র অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। গণতন্ত্রের স্বার্থে নাগরিক সমাজের এ গুরুত্বপূর্ণ কাজ আরও বেশি করে জারি রাখা জরুরি।
অলিগার্কি ভাঙতে সমবায় বাজার
খাদ্যপণ্যের আকাশচুম্বী দাম চলমান দীর্ঘস্থায়ী মুদ্রাস্ফীতির একটি বড় কারণ। এক বঞ্চনার গল্প। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, ২০২৪ সালের জুনে খাদ্যপণ্যের মুদ্রাস্ফীতি ১৪ শতাংশ ছিল, যা এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। গৃহস্থালি আয় ও ব্যয় জরিপে দেখা যাচ্ছে, খাদ্য এখনো পরিবারের ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ—৪৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ। কিন্তু ভোক্তারা যে দাম দেয়, তার সামান্য অংশই কৃষকেরা পায়। মধ্যস্বত্বভোগীরাই মুনাফা লুটে নেয়। তারাই পণ্য সংরক্ষণ, পরিবহন ও পাইকারি বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে।
এনজিওগুলো কৃষক–মালিকানাধীন সমবায় ও খুচরা বিপণনব্যবস্থা গড়ে তুলে এ প্রথা ভেঙে দিতে পারে। যেমন স্পেনের মনড্রাগন করপোরেশন দেখিয়েছে, কীভাবে মধ্যস্বত্বভোগীদের বাদ দিয়ে ভোক্তামূল্য কমানো সম্ভব এবং একই সঙ্গে উৎপাদকের আয় বাড়ানো যায়। তাদের সুপারমার্কেট চেইন ‘এরোস্কি’ সমবায় নীতির ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত।
সম্মিলিত মালিকানার মাধ্যমে পণ্যের দাম সাশ্রয়ী রাখা যায়। একইভাবে ভারতের আমুল দুগ্ধ সমবায় সংস্থা গ্রামের ছোট দুধ উৎপাদনকারীদের একত্র করে শক্তিশালী শক্তিতে পরিণত করেছে। গ্রাম পর্যায়ে সংগ্রহব্যবস্থা, প্রক্রিয়াকরণ অবকাঠামো ও সরাসরি খুচরা বিপণন চ্যানেল তৈরির মাধ্যমে এটি সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো চাল, সবজি, ডালের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য এ ত্রিপক্ষীয় মডেল তথা উৎপাদক সংগঠন, সমন্বিত সরবরাহব্যবস্থা ও নিজস্ব ব্র্যান্ডের খুচরা বিপণনব্যবস্থা নিয়ে কাজ করতে পারে।
আয় অনুসারে দক্ষিণ এশিয়ার শহরগুলোয় জমি ও আবাসনের দাম ঢাকায় সবচেয়ে বেশি। ঢাকায় শহরের কেন্দ্রে এক বর্গমিটার অ্যাপার্টমেন্টের দাম প্রায় ৭১৭ মার্কিন ডলার। একজন শ্রমজীবীর জন্য, যাঁর প্রকৃত মজুরি বাড়েনি, এক দুর্লঙ্ঘ্য পর্বতসম।
বাস্তবে রূপ দিতে তিনটি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। প্রথমত, এনজিওগুলো ছোট কৃষকদের একত্র করে আইনিভাবে স্বীকৃত কৃষক উৎপাদক সংগঠন তৈরি করতে পারে। কৃষকেরা সম্মিলিত দর-কষাকষির ক্ষমতা পাবেন। দ্বিতীয়ত, সমন্বিত হিমঘর ও পরিবহন নেটওয়ার্কে বিনিয়োগ করলে কৃষকের প্রাপ্তি বাড়বে। তৃতীয়ত, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এসক্রো অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে সরাসরি উৎপাদকের সঙ্গে ক্রেতাদের সংযোগ ঘটানো সম্ভব।
এ সম্মিলিত পদক্ষেপগুলো কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের মূল্য ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে পারে। এতে ফড়িয়া, দালাল, আড়তদার, মজুতদার ইত্যাদি মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য ও অলিগার্কিক নিয়ন্ত্রণ ভাঙবে। খুচরা দাম ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কমে ভোক্তার উদ্বৃত্ত বাড়াবে।
মুষ্টিমেয়দের নয়, সবার জন্য আবাসন
আয় অনুসারে দক্ষিণ এশিয়ার শহরগুলোয় জমি ও আবাসনের দাম ঢাকায় সবচেয়ে বেশি। ঢাকায় শহরের কেন্দ্রে এক বর্গমিটার অ্যাপার্টমেন্টের দাম প্রায় ৭১৭ মার্কিন ডলার। একজন শ্রমজীবীর জন্য, যাঁর প্রকৃত মজুরি বাড়েনি, এক দুর্লঙ্ঘ্য পর্বতসম।
গৃহস্থালি আয় ও ব্যয় জরিপে ২০২২ অনুযায়ী, বর্তমানে পরিবারের খরচের ১০ দশমিক ২৫ শতাংশ আবাসন বাবদ ব্যয় হয়। ২০০০ সালে ছিল ৬ শতাংশ। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জমির ফাটকাবাজি ও দুর্বল নিয়ন্ত্রণের কারণে বেশির ভাগ মানুষের জন্য বাড়ির মালিকানা ক্রমে অধরা হয়ে উঠেছে।
এনজিওগুলো তাদের নিজস্ব পরিস্থিতিতে সৃজনশীল প্রকল্প উদ্ভাবনে সক্ষম। আন্তর্জাতিক মডেলগুলো থেকেও কার্যকর সমাধান পাওয়া যেতে পারে। যেমন মেক্সিকোর ইনফোনাভিট অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের জন্য ৪ থেকে ৬ শতাংশ সুদে ক্ষুদ্র গৃহঋণ দেয়। তাদের ব্যাংকঋণের বাধা অতিক্রম করতে সাহায্য করেছে।
আরেকটি বিকল্প হতে পারে ‘রেন্ট-টু-ওন’ বা ভাড়ায় থেকে মালিকানা লাভের ব্যবস্থা। দক্ষিণ আফ্রিকার পিপলস হাউজিং প্রক্রিয়া দেখিয়েছে, ধাপে ধাপে বাড়ির মালিকানা অর্জন সম্ভব। কমিউনিটি ল্যান্ড ট্রাস্ট তৃতীয় একটি উদ্ভাবনী সমাধান হতে পারে। এই মডেলে এনজিওগুলো তাদের জমির ওপর আবাসন তৈরি করতে পারে এবং সম্মিলিত মালিকানা ধরে রেখে ফাটকাবাজারিজাত মূল্যবৃদ্ধি রোধ করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের শ্যাম্পলেইন হাউজিং ট্রাস্ট এই পদ্ধতিতে জমিকে দাম বাড়ানোর বাজার থেকে সরিয়ে গোষ্ঠীভিত্তিক আবাসনকাঠামোর কেন্দ্রে আঘাত করেছে। চতুর্থ উপায় হতে পারে, সরকার ভূমি দেবে ও অবকাঠামো নির্মাণে হ্রাসকৃত ঋণসুবিধা দেবে এবং এনজিওগুলো পুরো প্রকল্প পরিচালনা করবে।
প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতিগত সংস্কার
এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে হলে তদারকব্যবস্থায় সংস্কার প্রয়োজন। যেমন এনজিও পরিচালিত উদ্যোগগুলো সামাজিকভাবে নির্ধারিত মূল্যে পণ্য সরবরাহ করলে তাদের জন্য নির্দিষ্ট আইনি কাঠামো থাকা দরকার। লাভকে পুনর্বিনিয়োগ করলে করসুবিধা দেওয়া যেতে পারে। ওয়্যারহাউস রসিদব্যবস্থাকে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের ঋণের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। এতে কৃষকেরা তাঁদের গুদামজাত পণ্য জামানত হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন। কৃষক ও সমবায়ীরা স্থিতিশীল চাহিদা নিশ্চিত করতে সরকারি কেনাকাটার ক্ষেত্রে তথা স্কুল বা হাসপাতালের খাবার এনজিও পরিচালিত ব্যবস্থা থেকে সরবরাহ করা যেতে পারে।
আবাসননীতিতে সংস্কার ও অবকাঠামো অর্থায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে সরকারি সহায়তায় তৈরি এই ইউনিটগুলোর সাশ্রয়ী থাকার বাধ্যবাধকতা দরকার। মুনাফা অর্জন প্রাধান্য পাওয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্থনীতির পরিপ্রেক্ষিতে সুরক্ষাব্যবস্থা অপরিহার্য। উৎপাদক ও ভোক্তাদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে নির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদ থাকতে হবে। এ ছাড়া নিয়মিত নিরীক্ষা, স্বচ্ছ সংগ্রহ ও মূল্য নির্ধারণ বাধ্যতামূলক করতে হবে।
এনজিও পরিচালিত বাজার ব্যবস্থাপনার জন্য একটি সরকারি তদারকি কমিশন গঠন করা যেতে পারে। অর্থ মন্ত্রণালয়, ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্ত্রক সংস্থা, নাগরিক সমাজ ও উৎপাদকের প্রতিনিধিরা থাকবেন। দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় কারিগরি সহায়তা ব্যবহার করে শাসনব্যবস্থা-সম্পর্কিত স্ট্যান্ডার্ডগুলো প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে।
সর্বাত্মক সমাজভিত্তিক অংশীদারত্ব
এ পরিবর্তনগুলো কেবল মূল্যস্ফীতি ও বাসস্থানের ব্যয় কমাবে না; বরং অর্থনৈতিক সুযোগকে গণতান্ত্রিক করবে এবং কল্যাণরাষ্ট্রের এজেন্ডাকে এগিয়ে নেবে। পাশাপাশি মূল্য স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে।
ভবিষ্যৎ পথচলায় কেবল টেকনোক্রেটিক সমাধান যথেষ্ট নয়। সামাজিক চুক্তি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নতুনভাবে ভাবতে হবে। এনজিওনিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্মিলিত দর-কষাকষি, ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের অংশীদারে রূপান্তরিত করলে প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
গণতান্ত্রিক কল্যাণরাষ্ট্রের পথ আপনা–আপনি তৈরি হবে না। সর্বাত্মক সমাজভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে সাহসী অংশীদারত্বমূলক সহযোগিতাই পাথেয়।
ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক
মতামত লেখকের নিজস্ব