কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

গাজা শান্তিচুক্তি : আশার আলো না ভ্রান্তি

ড. জহুরুল আলম [সূত্র : জনকণ্ঠ, ২৮ অক্টোবর ২০২৫]

গাজা শান্তিচুক্তি : আশার আলো না ভ্রান্তি

দুই বছরের সহিংস সংঘাত, রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও মানবিক বিপর্যয়ের পর যখন বিশ্বনেতারা শারম এল-শেইখে গাজা শান্তি ঘোষণা স্বাক্ষরের জন্য মিলিত হন, তখন এক ধরনের সতর্ক আশাবাদ দেখা দিয়েছিল যে, এ অঞ্চল অবশেষে একটি স্থায়ী শান্তির পথে অগ্রসর হতে যাচ্ছে। কিন্তু এ উচ্চমার্গের বক্তৃতা ও নেতৃবৃন্দের স্বাক্ষরের আড়ালে লুকিয়ে আছে একটি গভীর বাস্তবতা- কোনো ঘোষণাই কি গাজার জনগণের প্রকৃত স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে? এ চুক্তি কি সত্যিই মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে? প্রশ্নগুলো উঠে আসার কারণ। কে বা কারা এ শান্তিচুক্তির মূল রূপকার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন? তাদের কৌশলগত ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কী? গাজার জনগণের ওপর দীর্ঘকাল ধরে চলা অপমান ও অমানবিক দমনপীড়নের যে ভয়াবহতা, তা কি যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়েছে এ ঘোষণায়?  এ প্রশ্নগুলো প্রাসঙ্গিক এ কারণেই যে, কাগজে স্বাক্ষর আর জনগণের আশা আকাঙ্খার বাস্তবায়নের মধ্যে এক বিশাল ব্যবধান রয়ে যায়। আর এ ব্যবধানের আশঙ্কাই মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ও মানবিক নিরাপত্তার জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে আছে। এ সম্ভাব্য অস্থিতিশীলতা পরবর্তীতে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে কোনো ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে তা চুক্তি বাস্তবায়নের ফলের ওপর নির্ভরশীল।

 

 


এ সংকটকে পুরোপুরি বুঝতে হলে কেবল যুদ্ধ ও প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের গণ্ডীতে চিন্তাধারাকে আবদ্ধ না রেখে দৃষ্টি প্রসারিত করে বুঝতে হবে যে, এ সংঘাতের শিকড় বহু গভীরে। বহু দশকের বঞ্চনা, বিরোধপূর্ণ অবস্থান এবং অধিকার পূরণে ব্যর্থতার মধ্যে তা নিহিত। ইসরাইলের গাজা নীতি সূচনা থেকেই ছিল এবং এখনো রয়েছে এর চারপাশের নিয়ন্ত্রণ ও ইসলামপন্থিদের হুমকি দমন করার ওপর ভিত্তি করে। হামাসের রকেট হামলা, সুড়ঙ্গপথ ব্যবহার এবং গাজার নিয়ন্ত্রণ ইসরাইলের জন্য এক স্থায়ী নিরাপত্তা হুমকিতে পরিণত করেছিল। ২০২৩ সালের অক্টোবরের হামাসের আক্রমণ ছিল শুধু একটি সামরিক কৌশল নয়; বরং এটি ইসরাইলের দৃষ্টিতে একটি বার্তা- হামাস এখনো সক্ষম এবং সক্রিয়। ইসরাইলের প্রতিক্রিয়া ছিল কেবল হামাসকে দুর্বল করা নয়, বরং গাজার নিরাপত্তা কাঠামোকে দীর্ঘমেয়াদে পুনর্গঠন করা। 

 


বহু বছর অতিক্রান্ত হলেও গাজা একটি কঠোর অবরোধ, বারবার সামরিক হামলা ও ক্রমশ খারাপ হতে থাকা জীবনযাত্রার মধ্যে রয়েছে। তাই সেখানে প্রতিরোধের আবহ গড়ে উঠেছে স্বাভাবিকভাবেই। প্রতিটি প্রতিরোধের জবাবে ইসরাইলের অতিমাত্রায় শক্তি প্রয়োগ শুধু অবিচারের অনুভূতিকে তীব্র করেছে। দীর্ঘদিন ধরে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায়, হামাসকে কিছু মানুষ ইসরাইলি সামরিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে সক্রিয় প্রতিরোধকারী একমাত্র সংগঠন হিসেবে গণ্য করে। এছাড়া ফিলিস্তিনি যুবকদের মধ্যে ক্রমশ বাড়তে থাকা হতাশা প্রতিরোধ, প্রতিবাদ ও যুদ্ধের একটি বড় নিমিত্ত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এখনকার প্রজন্ম ন্যূনতম রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক সুযোগ এবং মান সম্মান থেকে বঞ্চিত। এ প্রেক্ষাপটে, হামাসের সহিংসতা যতই নির্মম ও দুঃখজনক হোক, অনেকেই মনে করেন এটি দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অবিচার, পদ্ধতিগত নিপীড়ন ও বিকল্পের অভাবের ফল। 

 


গাজার যুদ্ধে, বিশেষ করে ৭ অক্টোবর ২০২৩ সালের সংঘাতের শুরু সম্পর্কে ফিলিস্তিনিদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং অনেক পর্যবেক্ষকের বক্তব্য মূলধারার ধারণার বিপরীতে একটি বিকল্প বর্ণনা তুলে ধরে, যেখানে হামাসকে একমাত্র আগ্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বিশেষত, ফিলিস্তিনিরা দাবি করে যে, এ যুদ্ধ বহু দশক ধরে চলমান ইসরাইলের দখলদারিত্ব, অবরোধ এবং গাজা ও পশ্চিম তীরের পদ্ধতিগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতিফলন। এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে হামাসের আক্রমণই যুদ্ধের শুরু নয়, বরং চলমান অবস্থা ও অত্যাচারের প্রতিক্রিয়া হিসাবে বিবেচিত। সংক্ষেপে সংঘাতের মূল কারণগুলো হচ্ছে- ১. গাজায় ইসরাইল ও মিসর কর্তৃক ১৬ বছর ধরে অবরোধ ও মানবিক দুর্যোগ সৃষ্টি; ২.  পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি স্থাপন সম্প্রসারণ; ৩. ইসরাইলি বাহিনীর হাতে পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনি যুবকদের হত্যাকাণ্ড; ৪. আল-আকসা মসজিদে হামলা ও পূর্ব জেরুজালেমে উত্তেজনার বৃদ্ধি; ৫. রমজানে আল-আকসা মসজিদে অভিযান; ও ৬.  বিচারবিহীন দমন, গণহত্যা ও স্থানচ্যুতি। এই প্রেক্ষাপটে, হামাসের কর্মসূচিকে শুধু আগ্রাসনের কাজ হিসেবে দেখা হয় না, বরং তা প্রতিরোধের প্রকাশ হিসেবেই গণ্য করা হয়। সাধারণ ফিলিস্তিনি জনগণের একটি বড় অংশ এই গোষ্ঠীকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘদিনের হতাশা, অবহেলার মধ্য থেকে উদ্ভূত প্রতিরোধ আন্দোলনের প্রতিভূ হিসেবে দেখে। 

 


শারম আল-শেইখ সম্মেলনের কেন্দ্রে ছিল ‘ট্রাম্প শান্তি ও সমৃদ্ধির ঘোষণা’, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মিসর, কাতার এবং তুরস্কসহ একাধিক দেশ যৌথভাবে স্বাক্ষর করে। এ ঘোষণায় ইসরাইলি ও ফিলিস্তিনিদের জন্য নিরাপত্তা, মানবাধিকার, মর্যাদা এবং সমৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার সংকল্প প্রকাশ করা হয়।

 


এই ঘোষণার সঙ্গে যুক্ত ছিল ট্রাম্প প্রশাসন কর্তৃক ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ প্রকাশিত একটি ‘২০ বা ২১ দফার পরিকল্পনা’, যেখানে যুদ্ধবিরতির শর্ত, পর্যায়ক্রমিক সেনা প্রত্যাহার, শাসন কাঠামো, বন্দি বিনিময়, সাধারণ ক্ষমা ও স্থানান্তরকালীন প্রক্রিয়া সম্পর্কেও উল্লেখ করা হয়।  হামাসের জন্য এই যুদ্ধ ছিল তাদের কৌশলগত প্রাসঙ্গিকতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার এক সুযোগ, যেখানে তারা ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ অসন্তোষের মধ্যেও জনসমর্থন জোগাড় করতে চেয়েছে এবং জিম্মিদের ব্যবহার করেছে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে। মূলত, উভয় পক্ষই এ সংঘাতকে কেবল সামরিক লড়াই হিসেবে দেখেনি; বরং এটি ছিল একটি উচ্চমূল্যের বৈধতা এবং শক্তি প্রদর্শনের প্রচেষ্টা। যুদ্ধের ধ্বংসাত্মক যুক্তি নিজেই নিজেকে প্রবল করেছে। গৃহস্থালি অবকাঠামো, ঘরবাড়ি, হাসপাতাল, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা এগুলো সবই প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে, যার ফলে বেসামরিক মানুষের দুঃখ-কষ্ট বেড়েছে বহুগুণ। গাজার অবরোধ ও সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা সংকটকে আরও তীব্র করেছে। হাসপাতালগুলো ধসে পড়েছে, সরবরাহ লাইন ভেঙে পড়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের সহনশীলতা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। মানবিক বিপর্যয় ও যুদ্ধ একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে গেছে। সংক্ষেপে, এটি নিছক একটি যুদ্ধ ছিল না; বরং রাজনীতি, পরিচয়, অবরোধ এবং বলপ্রয়োগের এক জটিল মিশ্রণ।

 

 


শান্তি ঘোষণা ॥ উচ্চাকাক্সক্ষা ও ভঙ্গুরতা


বিশ্লেষকরা মনে করেন যে, এই ঘোষণাটি উচ্চাকাক্সক্ষায় পরিপূর্ণ হলেও, কার্যকর রূপায়নের দিক থেকে দুর্বল। প্রকাশিত দলিলে কঠোর সময়সীমা, প্রয়োগযোগ্যতা বা যাচাই-বাছাইয়ের সুস্পষ্ট কোনো কাঠামো নেই। ফলে এই সম্মেলন কার্যত একটি কূটনৈতিক বার্তা হিসেবে কাজ করেছে, যা প্রধান গ্যারান্টর ও স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর সম্মিলিত এক প্রতিশ্রুতি, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ আলোচনার ভিত্তিতে চূড়ান্ত কোন চুক্তি নয়। ২০ দফার পরিকল্পনার রচয়িতা ও প্রধান গ্যারান্টর হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা দ্বৈত- একদিকে মধ্যস্থতাকারী, অন্যদিকে প্রয়োগকারী শক্তি। ইসরাইলের নিরাপত্তা ও আরব বিশ্বের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতার ভারসাম্য বজায় রাখা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। যদিও যুক্তরাষ্ট্র দৃঢ়ভাবে বলেছে যে, টেকসই শান্তি অর্জনে ফিলিস্তিনিদের মর্যাদা এবং ইসরাইলের নিরাপত্তা উভয়ই অপরিহার্য। তবে এই প্রভাব-প্রয়োগের সক্ষমতা সীমিত। তারা চাপ প্রয়োগ করতে পারে, অর্থ সহায়তা বন্ধ করতে পারে বা অবাধ্য পক্ষকে নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে, কিন্তু মাঠের বাস্তবতা কিংবা ধর্মীয় বৈধতা স্থায়ীভাবে সমাধান করতে পারে না। শারম আল-শেইখ ঘোষণার গ্যারান্টর হিসেবে মিসর, কাতার এবং তুরস্ক এগিয়ে আসে। তাদের প্রেরণা ছিল ভিন্ন ভিন্ন। মিসর গাজার অস্থিরতা থেকে নিজ দেশে সংঘর্ষের স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় গাজার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে চায়; কাতার কূটনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখতে চায়; আর তুরস্ক নিজেকে একটি ইসলামপন্থি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়।  একাধিক আরব রাষ্ট্র এই কাঠামোর প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেছে এবং তা ঘোষণার আকারে লিপিবদ্ধ করেছে। কিন্তু বিনিয়োগ, তদারকি কাঠামো এবং সক্রিয় অংশগ্রহণের বিষয়গুলো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

 

 


অন্যদিকে চীন ও রাশিয়া এই প্রক্রিয়ায় রয়েছে ‘আগ্রহী পর্যবেক্ষক’ হিসেবে। চীন একটি সংযত অবস্থান বজায় রেখেছে: শান্তির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, সংযমের আহ্বান জানিয়েছে এবং কেবল একটি কূটনৈতিক ভূমিকা পালন করতে আগ্রহী। রাশিয়াও উত্তেজনা বৃদ্ধির বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যীয় কূটনীতিতে নিজেদের পুনঃস্থাপন করার সুযোগ করে নেওয়ার চেষ্টা করছে। এই দুটি দেশের গাজায় কাঠামোগত প্রভাব সীমিত থাকা সত্ত্বেও তারা জাতিসংঘের কর্মকাণ্ড ও গতিশীলতা প্রভাবিত করতে পারে এবং প্রতিরোধকারী রাষ্ট্রগুলোর জন্য কূটনৈতিক নিরাপত্তা তৈরি করতে সক্ষম।

 


আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ইতোমধ্যে গাজার পুনর্গঠন ব্যয় ৪০-৫৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হিসেবে অনুমান করেছে, যেখানে পূর্ণ পুনর্গঠনে সময় লাগতে পারে তিন থেকে সাত বছর পর্যন্ত। চ্যালেঞ্জগুলো বিশাল। বিধ্বস্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থা, ১৯ লক্ষ মানুষের স্থানচ্যুতি, জরাজীর্ণ আবাসন, পরিবেশগত অবক্ষয়, দক্ষ জনশক্তির অভাব এবং আরও অনেক কিছু। জাতিসংঘকে আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ এবং নাগরিক সমাজকে সমন্বয় করে এই পুনর্গঠন চালাতে হবে। কিন্তু তাদের কার্যকারিতা নির্ভর করবে এই শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের ওপর। অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতেই রয়ে গেছে মূল চাবিকাঠি।

 


যদি হামাস তাদের সশস্ত্র ক্ষমতা ধরে রাখে, তাহলে সামান্য উত্তেজনা বা অবিশ্বাসও এই নাজুক শান্তিকে ভেঙে দিতে পারে। অথচ হামাসকে পুরোপুরি নিরস্ত্রীকরণ করলে গাজার জনগণের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা আরও গভীর হতে পারে। যা উগ্রপন্থার উত্থান ঘটাতে পারে এবং আরও চরমপন্থি গোষ্ঠীর জন্ম দিতে পারে। মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে নিরাপত্তার প্রয়োজন ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং সামাজিক পুনর্মিলন- এই তিনটির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা।

 


গাজার ভবিষ্যৎ শাসন কাঠামো এখনো অস্পষ্ট। ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে একটি ‘বোর্ড অব পিস’-এর অধীনে একটি ট্রানজিশনাল টেকনোক্র্যাটিক কর্তৃপক্ষ গঠিত হবে, যেখানে আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ থাকবে। কিন্তু শাসনব্যবস্থা হতে হবে স্থানীয় ক্ষমতায়নের প্রতিফলন- নাগরিক সমাজ, পৌর প্রতিষ্ঠান এবং অংশগ্রহণমূলক কাঠামোর মাধ্যমে।  যদি গাজায় স্থিতিশীলতা আসে, তবে তা মিসর ও ইসরাইলের সীমান্তে চাপ কমাবে, সীমান্ত অতিক্রম হ্রাস করবে এবং সিনাই উপদ্বীপে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমাবে। এই শান্তি প্রস্তাব বৃহত্তর আরব-ইসরাইল সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে উৎসাহ জোগাতে পারে, যেখানে লেনদেন নয়, বরং ফিলিস্তিনিদের স্বার্থরক্ষার ভিত্তিতে আপোসের কথা বলা হয়েছে। ইসরাইলের জন্য এই যুদ্ধবিরতি একটি সুযোগ। তারা চাইলে তাদের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি পুনর্গঠন করতে পারে, সমালোচনা প্রশমিত করতে পারে এবং সামরিক অভিযান থেকে সরে এসে কূটনৈতিক সংলাপে সমস্যার সমাধান খোঁজার প্রয়াস গ্রহণ করতে পারে। 

 

 


ভূরাজনীতি ও বিশ্বশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রেক্ষাপটে, গাজা হয়তো কোমল শক্তির বা ংড়ভঃ ঢ়ড়বিৎ-এর একটি  মঞ্চে পরিণত হতে পারে। চীন ও রাশিয়া তুলনামূলক কম শর্তে পুনর্গঠন তহবিল দিতে পারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চাইবে আরব কূটনীতিতে তার নেতৃত্ব বজায় রাখতে। আঞ্চলিক দেশগুলোকে তাদের মিত্রতা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ব্যালান্স করে নিতে হবে। যদি গাজার মডেল সফল হয়, তবে তা লেবানন, সিরিয়া ও ইরাকের কিছু অংশের জন্যও শান্তির এক টেমপ্লেট হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। একটি ট্রানজিশনাল কর্তৃপক্ষ, নিরস্ত্রীকরণ, বাইরের গ্যারান্টর এবং ধাপে ধাপে পুনর্গঠনের ধারণা অন্যান্য যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলেও প্রয়োগ করা যেতে পারে। কিন্তু এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে, ভবিষ্যতের কূটনৈতিক প্রয়াসগুলোও থেমে যেতে পারে।

 


গাজার শান্তি ঘোষণা কেবল কথার ফুলঝুরি নয়, এটি হতে পারে এক আশার রূপরেখা, তবে বহুবিধ শর্তসাপেক্ষে। এটি মানবাধিকার, সম্মিলিত সমৃদ্ধি এবং মর্যাদার মতো মৌলিক নীতিগুলোকেই অগ্রাধিকার দেয় বলে মনে করা হলেও তা কতখানি নির্ভেজাল তা সময় বলে দেবে। তবে নিঃসন্দেহে এর সফলতা নির্ভর করবে রাজনীতির কঠোর বাস্তবতার ওপর, শুধু সদিচ্ছার ওপর নয়। যদি গ্যারান্টর রাষ্ট্রসমূহ টেকসই স্থিতিশীলতার চেয়ে কৌশলগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়, অথবা এ প্রক্রিয়ায় স্থানীয় কণ্ঠগুলোকে উপেক্ষা করা হয়, তবে এ শান্তি চুক্তি হয়তো পরিণত হবে দীর্ঘমেয়াদি ভোগান্তির আরেকটি অনুষঙ্গ মাত্র।  কিন্তু যদি এ ঘোষণার কাঠামোকে আন্তর্জাতিক সমাজ দীর্ঘমেয়াদে প্রতিশ্রুতিশীলভাবে রক্ষা করে এবং যদি এটি এক বাধা নয়, বরং এক রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে, তবে হয়তো বহু প্রজন্ম পর গাজার মানুষ একটিবারের জন্য হলেও সেই শান্তির আভাস দেখতে পাবে, যা এতকাল ধরে তাদের অস্বীকৃতই রয়ে গেছে।

 

 

লেখক : ডিন , স্কুল অব বিজনেস,  কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ