ফ্যামিলি কার্ডের সম্ভাবনা
শাহাদাৎ স্বাধীন [প্রকাশ : দেশ রূপান্তর, ০৬ এপ্রিল ২০২৬]

বাংলাদেশের সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন সময় নানা ধরনের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। তবে বর্তমান সরকারের ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রকল্পটি বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এই সামাজিক কর্মসূচি, দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য বিমোচনের ভিত্তি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর ক্ষমতায়নের মাধ্যমে নারীর অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিতকরণ, পরিবারে পুষ্টির চাহিদা নিশ্চিতকরণ এবং একটি স্বাবলম্বী পরিবার গড়ে তোলার লক্ষ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ সামাজিক কর্মসূচি গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে, ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে গত ১০ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে ‘ফ্যামিলি কার্ড পাইলটিং বাস্তবায়ন গাইডলাইন-২০২৬’ প্রণয়ন করা হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির সেøাগান রাখা হয়েছে ‘ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক’। বর্তমানে এটি পাইলট প্রকল্প হিসেবে দেশের ১৪টি উপজেলায় (প্রতিটিতে একটি ইউনিয়নের একটি ওয়ার্ডে) চালু রয়েছে। এই মুহূর্তে প্রায় ৬,৫০০ পরিবার ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধাভোগী। ধাপে ধাপে এটি সারা দেশে সম্প্রসারণ করা হবে। আগামী চার বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে ৪ কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনা হবে। এর মধ্যে আগামী তিন মাসে আরও ৩০ হাজার পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় নগদ ২,৫০০ টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে। প্রতিটি পরিবারকে মাসিক ২,৫০০ টাকা সরাসরি তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া হবে। ফলে এখানে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী থাকবে না এবং কোনো ধরনের ভোগান্তি ছাড়াই সুবিধাভোগীরা এই আর্থিক সহায়তা গ্রহণ করতে পারবেন। এই কর্মসূচির আওতায় শুরুতে হতদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। চগঞ বা সম্পদের মালিকানার ভিত্তিতে দরিদ্রতা নির্ধারণের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করে, সুবিধাভোগী নির্ধারণ করা হবে।
তবে কার্ডধারী হবেন পরিবারের নারী সদস্য। এতে পরিবারে নারীর সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণ বাড়বে। ফলে পরিবার ও সমাজে নারীর আত্মমর্যাদা আরও সুদৃঢ় হবে। এই কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য, একটি বৈষম্যহীন ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা। সরকার এমন কর্মসূচির মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে ‘চরম দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ’ গড়ে তুলতে চায়। এ ধরনের কর্মসূচির ফলে পরিবারে পুষ্টির চাহিদা পূরণ হবে। যা একটি সুস্থ, সবল ও মেধাবী ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তুলতে সহায়ক হবে। পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে, যা স্বাস্থ্য অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সরাসরি আর্থিক সহায়তা পাওয়ায় পরিবারগুলো উদ্বৃত্ত অর্থ দিয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসা বা উদ্যোক্তা কার্যক্রম শুরু করার সুযোগও পাবে। ফ্যামিলি কার্ড প্রদান প্রক্রিয়ায় কোনো রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বিবেচনা রাখা হবে না। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতাদেরও কোনো ভূমিকা থাকবে না। উপজেলা পর্যায়ে ইউএনওর তত্ত্বাবধানে সরকারি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ওয়ার্ড পর্যায়ে যাচাই-বাছাই করে, ফ্যামিলি কার্ড প্রদান করা হবে। ফলে এ প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের দুর্বৃত্তায়নের সুযোগ থাকবে না।
ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্প কেন দরকার : বিগত সরকারের আমলে আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও তৃণমূল মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য উল্লেখযোগ্য কোনো প্রকল্প ছিল না। অন্যদিকে দেশে যেসব সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ছিল সেগুলোর মধ্যে কার্যকর কোনো সমন্বয় ছিল না। ফলে একদিকে কর্মসূচিতে দ্বৈধতা সৃষ্টি হয়েছে, অন্যদিকে উপকারভোগী নির্বাচনে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও দেখা গেছে। এই দুর্নীতির কারণে অনেক ক্ষেত্রে, এসব কর্মসূচির সুফল প্রকৃত মানুষের কাছে পৌঁছায়নি। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি দেশের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সব ধরনের সমন্বয়হীনতা দূর করে স্বচ্ছ, বৈজ্ঞানিক ও তথ্য-প্রযুক্তিনির্ভর কাঠামো নিশ্চিত করবে। এ ছাড়া ২০২০ সালে করোনা মহামারীর সময় দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। তখন নিম্নবিত্ত পরিবারের অনেকেই তাদের চাকরি ও আয়ের উৎস হারায়। কিন্তু তাদের পুনরুদ্ধার ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত প্রণোদনা দেওয়া হয়নি। ২০২২ সালে অযৌক্তিক জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যায়, যার ফলে সামগ্রিকভাবে দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি পায়। এমন প্রেক্ষাপটে ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্প অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে সরাসরি আর্থিক সহায়তা প্রদান করে পরিবারগুলোকে স্বাবলম্বী করে তোলা সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে পরিবারকে উন্নয়নের মূল একক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যাবে।
দারিদ্র্য থেকে খাদ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা : ফ্যামিলি কার্ড প্রদানে সরকার ঘোষিত নীতিমালা অনুযায়ী, নিম্নআয়ের পরিবারগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এর ফলে পরিবারগুলো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের নিশ্চয়তা পাবে এবং একটি সচ্ছল পরিবার হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে। সেই সঙ্গে পরিবারে সঞ্চয়ের সুযোগও তৈরি হবে। ধীরে ধীরে এটি পরিবারগুলোকে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসতে সহায়তা করবে।
নারীর ক্ষমতায়নের নতুন দিগন্ত : নারী আমাদের পরিবারগুলোতে সবচেয়ে বেশি পরিশ্রমী সদস্য। কিন্তু পরিবারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণ এখনো সীমিত। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির মাধ্যমে ব্যক্তি নয়, পরিবারই হয়ে উঠবে উন্নয়নের মূল একক। অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে পরিবারের নারী-পুরুষের মধ্যে একটি সমন্বয় তৈরি হবে, যা পরিবার ও সমাজে নারীর মর্যাদা বৃদ্ধি করবে।
পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ : ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নগদ অর্থ সহায়তা বা নিয়মিত খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত হওয়ায় পরিবারের সদস্যদের পুষ্টির চাহিদা পূরণ হবে। বিশেষ করে, শিশু ও গর্ভবতী নারীদের পুষ্টির চাহিদা মেটানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে। এর ফলে পরিবারের শিশুদের সুষম খাদ্য নিশ্চিত করা যাবে। এই খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া শারীরিক ও মানসিক বিকাশে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ফলে একটি সুস্থ, সবল ও মেধাবী ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তুলতে ফ্যামিলি কার্ড দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকা রাখবে। এর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে একটি দক্ষ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী তৈরি হবে।
স্বাবলম্বিতার পথে পরিবার : ফ্যামিলি কার্ড শুধু একটি আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি নয়, এটি একটি সহায়ক ব্যবস্থা, যা পরিবারগুলোকে স্বাবলম্বী করে তুলতে সহায়তা করবে। এই কর্মসূচি দেশের দারিদ্র্য বিমোচনের পাশাপাশি নারীর ক্ষমতায়ন ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। ফ্যামিলি কার্ড শুধু সহায়তা নয়, এটি একটি সহায়ক ব্যবস্থা, যা পরিবারগুলোকে ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করবে। খাদ্যের নিশ্চয়তা থাকায় তারা আয়ের একটি অংশ শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা ক্ষুদ্র বিনিয়োগে ব্যয় করতে পারবে। এর ফলে ছোট ব্যবসা শুরু করা এবং তাদের দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি হবে। ফ্যামিলি কার্ড শুধু অনুদান প্রকল্প নয় বরং দরিদ্র পরিবারকে দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করার একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। কেউ পিছিয়ে থাকবে না এই মূল মন্ত্রকে সামনে নিয়ে বাংলাদেশকে একটি উন্নত, বৈষম্যহীন কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্যে ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়েছে। সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে এটি বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। ফ্যামিলি কার্ড শুধু সহায়তা নয়, এটি একটি সম্ভাবনার দরজা, যেখানে প্রতিটি পরিবার পেতে পারে নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং উন্নত জীবনের স্বপ্ন।