ফিলিস্তিনি সমস্যা : ইসরাইলের বিচারেই সমাধান

ফিলিস্তিনি সমস্যা : ইসরাইলের বিচারেই সমাধান
কলামআন্তর্জাতিক

ফিলিস্তিনি সমস্যা : ইসরাইলের বিচারেই সমাধান

১২ জুলাই, ২০২৬

ব্রি. জে. (অব.) এইচআরএম রোকন উদ্দিন [সূত্র : যুগান্তর, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫]

গাজায় ইসরাইলের সাম্প্রতিক অব্যাহত বোমা হামলা, নতুন বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা এবং সীমান্ত অতিক্রম করে প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলা আবারও পশ্চিমাদের দ্বিচারিতাকে সামনে এনেছে। ওয়াশিংটন ও ইউরোপীয় রাজধানীগুলো শান্তি, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে বক্তৃতা দিলেও ইসরাইলের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে তাদের নীরবতা বা প্রশ্রয় দীর্ঘদিনের ভন্ডামিকে উন্মোচিত করেছে। বিশেষ করে দোহায় তথাকথিত শান্তি বৈঠকের সময় হামলা চালানো আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ হিসাবে বিবেচিত হতে পারে।

 

 

ফিলিস্তিন সংকটের শেকড় রয়েছে ইতিহাসে। ১৯১৭ সালে ব্রিটেন বেলফোর ঘোষণা জারি করে ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য একটি ‘জাতীয় নিবাস’ গঠনের প্রতিশ্রুতি দেয়, সেখানে বসবাসরত আরব জনগোষ্ঠীর মতামত উপেক্ষা করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর হলোকাস্টের দায়বোধ থেকে পশ্চিমারা ইসরাইল গঠনে জোর দেয়, যার ফলে ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠার সময় ঘটে নাকবা বিপর্যয়, যখন ৭ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিজভূমি থেকে বিতাড়িত হয়। পরে ইসরাইল জাতিসংঘ নির্ধারিত সীমার বাইরে ক্রমাগত সম্প্রসারিত হয়েছে। ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধ ছিল এক মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা, যেখানে ইসরাইল পশ্চিম তীর, গাজা, পূর্ব জেরুজালেম, সিনাই ও গোলান দখল করে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব ২৪২-এ ইসরাইলকে দখলকৃত এলাকা থেকে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হলেও তা আজও বাস্তবায়িত হয়নি। বরং বসতি স্থাপন বেড়েছে, বর্তমানে পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ৭ লাখেরও বেশি ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারী অবৈধভাবে বসবাস করছে।

 

 

পশ্চিমারা সিরিয়া, ইরান বা রাশিয়ার মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সরব হলেও ইসরাইলের ফিলিস্তিনি গণহত্যা নিয়ে নীরব থাকে। জাতিসংঘ তথ্য অনুযায়ী, গাজায় ২০১৪, ২০২১, ২০২৩ এবং চলমান ২০২৫ সালের অভিযানে হাজার হাজার বেসামরিক নিহত হয়েছেন। তাদের বড় অংশ নারী ও শিশু। সন্ত্রাসবাদকে নিন্দা করা হয়; কিন্তু ইসরাইলের নির্বিচার হত্যাযজ্ঞকে বলা হয় ‘আত্মরক্ষা’। ২০১৪ সালে রাশিয়া যখন ক্রিমিয়া দখল করেছিল, তখন পশ্চিমারা কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। কিন্তু ইসরাইল পূর্ব জেরুজালেম দখল বা বসতি স্থাপন করলে তা ‘জটিল’ বা ‘আলোচনাযোগ্য’ বলে পাশ কাটিয়ে যায়। আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগে এই বাছাইচর্চা বিশ্ববাসীর আস্থা নষ্ট করেছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবছর ইসরাইলকে প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা দেয়। এ অস্ত্র শুধু গাজায় নয়, লেবানন, সিরিয়া ও সাম্প্রতিক সময়ে কাতার পর্যন্ত হামলায় ব্যবহার হচ্ছে। কোনো মুসলিম দেশ এভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে হামলা চালালে তা ‘সন্ত্রাসবাদ’ হিসাবে আখ্যা পেত। কিন্তু ইসরাইল করলে তাকে বলা হয় ‘সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান’।

 

 

সাম্প্রতিক এক সপ্তাহেই গাজায় ইসরাইলি বোমা বর্ষণে অসংখ্য বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে, ধ্বংস হয়েছে স্কুল, হাসপাতাল, মসজিদ ও বসতবাড়ি। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো একে ‘সমষ্টিগত শাস্তি’ হিসাবে অভিহিত করছে, যা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। গাজার মতো জনবহুল এলাকায় নির্বিচারে বোমা বর্ষণ শুধু সামরিক অভিযান নয়, বরং এটি সুস্পষ্ট মানবাধিকার লঙ্ঘন ও যুদ্ধাপরাধের শামিল। এদিকে দোহায় হামলা চালানো কেবল ফিলিস্তিনি ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক নিরাপত্তার জন্যও এক ভয়াবহ দৃষ্টান্ত। কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের রাজধানীতে, তাও শান্তি আলোচনার সময় বোমা হামলা চালানো রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ ছাড়া আর কিছু নয়। এ ধরনের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মৌলিক নীতি-অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা-পুরোপুরি ভেঙে দিয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে শুধু ইসরাইল-ফিলিস্তিন ইস্যুই নয়, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

 

 

অনেকে মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র এই হামলার বিষয়ে আগেই অবগত ছিল অথবা নীরব সম্মতি প্রদান করেছিল। যদিও ওয়াশিংটন তা প্রকাশ্যে অস্বীকার করেছে, তবে ইতিহাস প্রমাণ করে যে, ইসরাইলের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র বারবার আন্তর্জাতিক আইনকে উপেক্ষা করেছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে গত কয়েক দশকে ৪৫টিরও বেশি ইসরাইলবিরোধী প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে ভেটো করেছে। এসব প্রস্তাবের বেশির ভাগই ছিল ফিলিস্তিনি বেসামরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা বা ইসরাইলি দখলদারি বন্ধ করার আহ্বান নিয়ে। এ ধারাবাহিক ভেটো প্রমাণ করে, ইসরাইলের জন্য কার্যত দায়মুক্তি নিশ্চিত করেছে ওয়াশিংটন।

 

 

অন্যদিকে, ইউরোপীয় মঞ্চেও নতুন ধরনের সংকেত দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, যদি ইসরাইল অবিলম্বে গাজায় যুদ্ধ বন্ধ না করে এবং পশ্চিম তীর দখল অব্যাহত রাখে, তবে ব্রিটেন জাতিসংঘে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হবে। এটি এক ঐতিহাসিক মোড় নির্দেশ করতে পারে। কারণ যুক্তরাজ্যই ছিল বেলফোর ঘোষণার মাধ্যমে ইসরাইল গঠনের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক। এখন সেই দেশ ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি দিলে তা ইসরাইলের জন্য কূটনৈতিকভাবে বড় ধাক্কা হবে। কিন্তু ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এ পদক্ষেপকে তীব্র সমালোচনা করেছেন। তার দাবি, ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়া মানেই হামাসকে পুরস্কৃত করা এবং এটি নাকি পশ্চিমাদের ‘ভুল সিদ্ধান্ত’ হবে। নেতানিয়াহুর এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, ইসরাইল যে কোনো ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র স্বীকৃতির প্রচেষ্টা ব্যাহত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে, কারণ এটি তাদের দখলদারির বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।

 

 

ফলে বর্তমান পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে এক জটিল ও সূক্ষ্ম কূটনৈতিক দ্বন্দ্বে। একদিকে ইসরাইল অব্যাহত আগ্রাসন চালাচ্ছে, অন্যদিকে পশ্চিমা শক্তির ভেতরে ভাঙন শুরু হয়েছে। ব্রিটেনের মতো ঐতিহাসিক মিত্র দেশের অবস্থান পরিবর্তনের ইঙ্গিত ইসরাইলের জন্য উদ্বেগজনক হলেও যুক্তরাষ্ট্রের একচেটিয়া সমর্থন এখনো তাদের সবচেয়ে বড় ঢাল হয়ে রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি শুধু গাজা বা ফিলিস্তিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি এক বহুমাত্রিক কূটনৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছে। যুক্তরাজ্যের সম্ভাব্য স্বীকৃতির ঘোষণার ফলে অন্যান্য ইউরোপীয় দেশও একই পথে হাঁটতে পারে। ইতোমধ্যেই আয়ারল্যান্ড, নরওয়ে, স্পেন ও সুইডেনের মতো দেশ ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে বা দেওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। যদি যুক্তরাজ্যের মতো বড় শক্তি প্রকাশ্যে এ পথে এগোয়, তবে তা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সামগ্রিক নীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।

 

 

অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছে। দোহায় অনুষ্ঠিত জরুরি সম্মেলনে মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের ডাক দেওয়া হলেও কার্যকর পদক্ষেপের অভাবই এখন বড় প্রশ্ন। যদি মুসলিম দেশগুলো সত্যিই ঐক্যবদ্ধভাবে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে, তবে ইসরাইলের ওপর নতুন ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো যদি কৌশলগতভাবে নীতি পরিবর্তন করে, তবে তা পশ্চিমাদের জন্য একটি বড় ধাক্কা হবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের একপক্ষীয় ভেটো কূটনীতি ক্রমেই সমালোচনার মুখে পড়ছে। যদি ইউরোপীয় শক্তিগুলো ধীরে ধীরে ফিলিস্তিন স্বীকৃতির পথে এগোয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র একপ্রকার কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার ঝুঁকিতে পড়বে। এ অবস্থায় রাশিয়া ও চীন নিজেদেরকে মুসলিম বিশ্বের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসাবে উপস্থাপন করবে, যা বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে নতুন মাত্রা যোগ করবে।

 

 

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি রয়েছে আঞ্চলিক নিরাপত্তায়। যদি ইসরাইল আগ্রাসন অব্যাহত রাখে, তবে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী বা অন্যান্য প্রতিরোধ গোষ্ঠী সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। এতে গোটা মধ্যপ্রাচ্য নতুন এক অপ্রত্যাশিত আঞ্চলিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে। সুতরাং, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু ইসরাইল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্ব নয়, বরং আন্তর্জাতিক শক্তির পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতারও এক প্রতিফলন। আগামী মাসগুলোয় এই দ্বন্দ্ব কোনদিকে মোড় নেবে, তা নির্ভর করবে মুসলিমবিশ্বের বাস্তব পদক্ষেপ, ইউরোপের কূটনৈতিক অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত পরিবর্তনের ওপর।

 

 

এই পরিস্থিতিতে দোহায় জরুরি বৈঠকে যোগ দিয়েছে ৫৫টিরও বেশি মুসলিম দেশ। আরব লীগের মহাসচিব আহমেদ আবুল গেইত বলেছেন, ইসরাইলই অঞ্চলের অস্থিতিশীলতার মূল কারণ। আরব ও ইরানি নেতারা সতর্ক করেছেন, কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে হামলা বাড়বে এবং কোনো পক্ষের নিরাপত্তাই থাকবে না। তবে ইতিহাস সাক্ষী, মুসলিম নেতৃত্ব অনেক সময় শুধু বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ থাকে, কার্যকর পদক্ষেপে নয়। এখন প্রশ্ন হলো, তারা কি বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হতে পারবে এবং পশ্চিমাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারবে? যদি যুক্তরাষ্ট্র ইতিবাচক ভূমিকা না নেয়, তবে মুসলিম দেশগুলোকে হয়তো রাশিয়া, চীনসহ অন্যান্য শক্তির সঙ্গে জোটবদ্ধ হতে হবে।

 

 

ফিলিস্তিন সমস্যা সামরিকভাবে সমাধান সম্ভব নয়; এর জন্য দরকার কূটনীতি, ন্যায়বিচার ও আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতা। এখনই সময় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দ্বিচারিতা পরিহার করে ইসরাইলকে তার অপরাধের জন্য বিচারের মুখোমুখি করা। ন্যায়বিচার ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি আসবে না।


ব্রি. জে. (অব.) এইচআরএম রোকন উদ্দিন : নিরাপত্তা বিশ্লেষক

ট্যাগ:BCSকলামআন্তর্জাতিক